বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি (Foreign Policy of Bangladesh): শেকড়ের সন্ধান, ভূ-রাজনীতি এবং আগামীর পথরেখা March 29, 2026 Sumit Roy বাংলাদেশ, ভূরাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক 0 (এখানে সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। বিভিন্ন দেশ বা অঞ্চলের সাথে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে জানতে দেখুন – বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কসমূহ (Bangladesh’s Bilateral Relations): ইতিহাস, কৌশল ও বৈশ্বিক অবস্থান) Table of Contents ভূমিকা রাষ্ট্রের ধারণায়ন (Conceptualising State) রাষ্ট্রের প্রাথমিক ধারণা ও উপাদান আন্তর্জাতিক সম্পর্কের চোখে রাষ্ট্র রাষ্ট্রের মনস্তত্ত্ব ও প্রতিরক্ষামূলক প্রবৃত্তি রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং এর বিবর্তন আধুনিক রাষ্ট্রে ক্ষমতার রূপরেখা রাষ্ট্র বনাম সরকার: একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য বিশ্বায়নের যুগে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ধারণায়ন (Conceptualising the Bangladesh State) বদ্বীপের ভূগোল এবং একটি জনপদের ঐতিহাসিক আত্মপরিচয় ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের স্ফুরণ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা অভ্যন্তরীণ উপনিবেশবাদ এবং অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রাম মুক্তিযুদ্ধ এবং গণপ্রজাতন্ত্রের আইনি ও দার্শনিক ভিত্তি বিশ্বায়নের অভিঘাত এবং রাষ্ট্রের আধুনিক রূপান্তর শ্রেণিদ্বন্দ্ব, সুশীল সমাজ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষা জাতীয় স্বার্থ (National Interest) জাতীয় স্বার্থের মূল কথা ও বিবর্তন টিকে থাকার সংগ্রাম ও নিরাপত্তার সমীকরণ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও সম্পদের লড়াই মতাদর্শ ও সাংস্কৃতিক প্রভাবের রাজনীতি জাতীয় স্বার্থ নির্ধারণের অভ্যন্তরীণ সমীকরণ পরিবর্তনশীল বিশ্বে জাতীয় স্বার্থের নতুন রূপ বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল ও বহুমাত্রিক সমীকরণ ভূ-কৌশলগত অবস্থান এবং প্রথাগত প্রতিরক্ষার মনস্তত্ত্ব অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং সাপ্লাই চেইনের নতুন রাজনীতি অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা এবং উগ্রবাদের মনস্তাত্ত্বিক মোকাবেলা পরিবেশগত নিরাপত্তা এবং সম্পদ বণ্টনের ভূ-রাজনীতি সাইবার স্পেসের নতুন রণাঙ্গন এবং প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্ব গোয়েন্দা কূটনীতি এবং পরাশক্তির সাথে কৌশলগত ভারসাম্য ডিপ স্টেট বা গভীর রাষ্ট্র (Deep State) অদৃশ্য ক্ষমতার ভরকেন্দ্র ও কাঠামোগত ভিত্তি গণতান্ত্রিক আবরণে ছায়া সরকারের বিবর্তন পররাষ্ট্রনীতি ও দীর্ঘমেয়াদী জাতীয় স্বার্থের ব্লু-প্রিন্ট আমলাতন্ত্র, গোয়েন্দা সংস্থা এবং কর্পোরেট আঁতাত ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং দৃশ্যমান বনাম অদৃশ্য সরকার তথ্যপ্রযুক্তির যুগে গভীর রাষ্ট্রের নতুন রূপ বাংলাদেশের গভীর রাষ্ট্র বা ডিপ স্টেট: বিবর্তন, কাঠামো ও প্রভাব স্বাধীনতাপরবর্তী শূন্যতা ও আমলাতান্ত্রিক উত্তরাধিকার পঁচাত্তরের পটপরিবর্তন ও সামরিক গোয়েন্দা বলয়ের উত্থান নব্বইয়ের দশকের রূপান্তর এবং ছায়া ক্ষমতার আপস এক-এগারোর ভূমিকম্প এবং নজরদারির প্রযুক্তিগত রূপ কর্পোরেট সিন্ডিকেট এবং নব্য অভিজাততন্ত্রের অর্থনীতি পররাষ্ট্রনীতিতে অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ ও ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য যুক্ত পাকিস্তানের পতনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস (Brief history of events leading to disintegration of United Pakistan) ভৌগোলিক অসংলগ্নতা এবং একটি বিচিত্র রাষ্ট্রের জন্ম ভাষার ওপর আঘাত এবং সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা অর্থনৈতিক বৈষম্য ও অভ্যন্তরীণ উপনিবেশবাদ রাজনৈতিক বঞ্চনা ও সামরিক-আমলাতান্ত্রিক বলয় স্বায়ত্তশাসনের দাবি এবং ছয় দফা আন্দোলন সত্তরের নির্বাচন এবং ক্ষমতা হস্তান্তরের টানাপোড়েন চূড়ান্ত আঘাত এবং একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্ম (Birth of Bangladesh as an independent country) স্নায়ুযুদ্ধের চরম মেরুকরণ এবং ভূ-রাজনৈতিক দাবার চাল বিশ্বরাজনীতির দাবার ছক এবং পরাশক্তির মেরুকরণ ভারতের কৌশলগত হিসাব-নিকাশ ও হস্তক্ষেপ সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি এবং জাতিসংঘের কূটনৈতিক যুদ্ধ গানবোট কূটনীতি এবং ওয়াশিংটন-বেইজিং অক্ষ অসম যুদ্ধ এবং অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধের স্বরূপ আন্তর্জাতিক জনমত এবং বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা নতুন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় এবং আগামী দিনের পররাষ্ট্রনীতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি (Bangladesh foreign policy) জন্মলগ্নের বাস্তবতা এবং পররাষ্ট্রনীতির মূলমন্ত্র জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন এবং পরাশক্তির মেরুকরণ মুসলিম বিশ্বের সাথে সম্পর্ক এবং পরিচয়ের রাজনীতি পরিচয়ের পুনর্গঠন এবং অর্থনৈতিক কূটনীতির সফল প্রয়োগ অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং সাহায্যনির্ভরতা থেকে উত্তরণ অপ্রতিসম ক্ষমতা সম্পর্ক এবং প্রতিবেশীদের সাথে ভূ-রাজনীতি বহুপাক্ষিক কূটনীতি এবং বৈশ্বিক মঞ্চে অবস্থান সমুদ্র কূটনীতি এবং ভবিষ্যতের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন (NAM) ও ওআইসি (OIC)-তে ভূখণ্ডের কৌশলগত অবস্থান স্নায়ুযুদ্ধের চরম মেরুকরণ এবং জোটনিরপেক্ষতার অমোচনীয় তাগিদ পরাশক্তির রেষারেষি বনাম স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির উন্মেষ জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনে প্রবেশ এবং বহুপাক্ষিক কূটনীতির সূচনা পরিচয়ের পুনর্গঠন এবং মুসলিম বিশ্বের সাথে সম্পর্কের নতুন সমীকরণ ওআইসি-তে ঐতিহাসিক যোগদান এবং কূটনৈতিক মাস্টারস্ট্রোক মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার এবং অর্থনৈতিক কূটনীতির অভাবনীয় সাফল্য মতাদর্শিক ভারসাম্য ও আধুনিক ভূ-রাজনীতিতে জোটগুলোর প্রাসঙ্গিকতা জাতিসংঘ ও শান্তিরক্ষা মিশনে ভূমিকা (UNO and UN Peace Keeping Missions) আন্তর্জাতিক বৈধতা এবং বহুপাক্ষিকতাবাদের নির্ভরতা শান্তিরক্ষা মিশনের পটভূমি ও সামরিক কূটনীতির বিবর্তন অর্থনৈতিক প্রণোদনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক আধুনিকায়ন মৃদু ক্ষমতার বিস্তার ও বিশ্বমঞ্চে ভাবমূর্তি গঠন শান্তিরক্ষীদের পেশাদারিত্ব ও পরাশক্তির মনস্তাত্ত্বিক সমীকরণ পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থা এবং জাতিসংঘে আগামীর কৌশল পররাষ্ট্রনীতির নির্ধারকসমূহ (Determining factors of foreign policy) ভৌগোলিক অবস্থান ও ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা ঔপনিবেশিক অতীত ও ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার জনসংখ্যা, জনমিতি এবং মানবসম্পদ দুর্বল অর্থনীতি এবং অর্থনৈতিক কূটনীতি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গতিশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো সামরিক শক্তি ও কৌশলগত বাধ্যবাধকতা পরাশক্তির মেরুকরণ এবং পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থা বাণিজ্যনির্ভরতা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মেরুকরণ পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া (Foreign policy formulation process) আমলাতন্ত্র ও নীতি নির্ধারণের জটিল রসায়ন শীর্ষ নেতৃত্ব এবং রাজনৈতিক দর্শনের প্রভাব আইনসভার ভূমিকা এবং জবাবদিহিতার ঘাটতি বুদ্ধিবৃত্তিক রসদ এবং থিংক ট্যাংকের ক্রমবর্ধমান প্রভাব অভ্যন্তরীণ জনমত এবং গণমাধ্যমের প্রভাব অর্থনৈতিক স্বার্থগোষ্ঠী এবং কর্পোরেট প্রভাব জাতীয় ক্ষমতার উপাদানসমূহ (Factors of National Power) ভূগোল এবং ভূ-রাজনৈতিক কৌশলগত সুবিধা বিশাল জনসংখ্যা ও জনমিতিক লভ্যাংশের শক্তি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বিশ্ববাজারে তুলনামূলক সুবিধা মৃদু ক্ষমতা বা সফট পাওয়ারের নীরব প্রভাব সামরিক সক্ষমতা এবং প্রথাগত প্রতিরক্ষার হিসাব-নিকাশ নেতৃত্বের মনস্তত্ত্ব এবং জাতীয় ঐক্যের অদৃশ্য শক্তি প্রযুক্তিগত অভিযোজন এবং ভবিষ্যতের ক্ষমতার মানদণ্ড পররাষ্ট্রনীতির গতিপ্রকৃতি (Direction of foreign policy) সত্তরের দশকের আদর্শবাদ এবং প্রাথমিক রূপরেখা আদর্শবাদ থেকে বাস্তববাদের দিকে পটপরিবর্তন নব্বইয়ের দশক ও অর্থনৈতিক কূটনীতির উত্থান সাহায্যনির্ভরতা থেকে বাণিজ্যনির্ভরতায় উত্তরণ একুশ শতকের বহুমুখী কূটনীতি এবং ভূ-কৌশলগত ভারসাম্য ভবিষ্যৎ গতিপথ এবং পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক সমীকরণ আঞ্চলিক শক্তির প্রতি ক্ষুদ্র দেশগুলোর কৌশল (Strategy of small countries towards regional power) ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের মনস্তত্ত্ব ও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার রূঢ় বাস্তবতা ব্যালেন্সিং বা ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার কৌশল ব্যান্ডওয়াগনিং বনাম হেজিং: টিকে থাকার দ্বিধা ভূ-রাজনৈতিক দড়াবাজি ও বহুপাক্ষিক কূটনীতি অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা হ্রাস এবং বিকল্পের সন্ধান দক্ষিণ এশিয়ার বাস্তবতা ও শক্তির সমীকরণ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক (Relations with countries in South Asia) দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও কাঠামোগত অসংলগ্নতা সার্কের উত্থান, পতন এবং বহুপাক্ষিকতার সংকট ভারত-পাকিস্তান বৈরিতা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার স্থবিরতা নেপাল ও ভুটানের সাথে সম্পর্ক: উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার নতুন রূপরেখা শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ এবং সামুদ্রিক কূটনীতির ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব কানেক্টিভিটি বা সংযুক্তির রাজনীতি এবং আগামী দিনের অর্থনীতি আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা ফোরাম: বিমসটেক এবং ডি-৮ (BIMSTEC and D-8) সার্কের স্থবিরতা এবং বিকল্প আঞ্চলিক রূপরেখার সন্ধান উপ-আঞ্চলিকতাবাদের তাত্ত্বিক ভিত্তি এবং বিমসটেকের উদ্ভব বঙ্গোপসাগরীয় অর্থনীতি এবং ভূ-কৌশলগত সংযোগ দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতার নতুন দিগন্ত ও ডি-এইট বাণিজ্য বহুমুখীকরণ ও পশ্চিমা নির্ভরতা হ্রাসের কৌশল অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এড়ানোর সমীকরণ আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংস্থা, বৈদেশিক সাহায্য ও বাণিজ্য (International Economic Institutions, Foreign Aid, International Trade) বৈদেশিক সাহায্যের অন্তরালের রাজনীতি ও নবীন রাষ্ট্রের সংকট আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, বিশ্বব্যাংক এবং কাঠামোগত সমন্বয়ের ফাঁদ ওয়াশিংটন কনসেনসাস এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির টানাপোড়েন সাহায্যনির্ভরতার শৃঙ্খল থেকে বাণিজ্যমুখী কূটনীতির ঐতিহাসিক পালাবদল বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মঞ্চে স্বল্পোন্নত দেশের দরকষাকষির লড়াই এলডিসি উত্তরণের নতুন সমীকরণ এবং মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির চ্যালেঞ্জ একুশ শতকের ভূ-অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ গতিপথ অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গতিশীলতা এবং ভারতের প্রতি পররাষ্ট্রনীতি অভ্যন্তরীণ রাজনীতির মেরুকরণ ও পররাষ্ট্রনীতির অবিচ্ছেদ্য সংযোগ ঐতিহাসিক নৈকট্য বনাম আধিপত্যবাদের বিরোধিতার বয়ান নির্বাচনমুখী রাজনীতি এবং প্রতিবেশীর ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব অমীমাংসিত সমস্যা এবং অভ্যন্তরীণ জনমতের প্রবল চাপ নিরাপত্তা উদ্বেগ, ট্রানজিট এবং কৌশলগত আস্থার গভীর সংকট প্রাতিষ্ঠানিক কূটনীতি বনাম রাজনৈতিক কাঠামোর দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্ব বাংলাদেশের নিরাপত্তা ইস্যুসমূহ (Security issues for Bangladesh) জাতীয় নিরাপত্তার বহুমাত্রিক ধারণা ও প্রথাগত সমীকরণ অ-প্রথাগত নিরাপত্তা এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধের বিস্তৃতি সীমান্ত হত্যা এবং মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বের সমীকরণ পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূ-রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও নীল অর্থনীতির সুরক্ষা সাইবার স্পেস এবং আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির নতুন হুমকি নীল অর্থনীতি ও সমুদ্রকেন্দ্রিক কূটনীতির নতুন দিগন্ত নীল অর্থনীতির তাত্ত্বিক ভিত্তি ও ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব সমুদ্রসীমা বিজয় এবং আইনি কূটনীতির যুগান্তকারী প্রয়োগ সামুদ্রিক সম্পদের বিপুল সম্ভাবনা ও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা ইন্দো-প্যাসিফিক সমীকরণ এবং পরাশক্তির রেষারেষি সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতার কাঠামো পরিবেশগত বিপর্যয় এবং সমুদ্র রক্ষার ভবিষ্যৎ কূটনীতি বাংলাদেশের সামাজিক ও অন্যান্য ইস্যুসমূহ (Social and other issues for Bangladesh) অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন ও জল-রাজনীতির জটিলতা অবৈধ অভিবাসনের অভিযোগ ও জনতাত্ত্বিক টানাপোড়েন সীমান্ত এলাকার আর্থ-সামাজিক বঞ্চনা ও ছায়া অর্থনীতি পরিবেশগত বিপর্যয় এবং আন্তঃসীমান্ত জলবায়ু উদ্বাস্তু সাংস্কৃতিক বিশ্বায়ন এবং আন্তঃরাষ্ট্রীয় সামাজিক প্রভাব মানব নিরাপত্তা এবং উন্নয়নের সামাজিক মূল্য বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর সাথে সম্পর্ক (Relations with Global Powers) ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক উত্থান ও সামুদ্রিক সমীকরণ চীনের অর্থনৈতিক কূটনীতি ও অবকাঠামোগত বিস্তৃতি যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল ও আদর্শিক দরকষাকষি রাশিয়ার কৌশলগত প্রত্যাবর্তন ও জ্বালানি কূটনীতি ত্রিমুখী পরাশক্তির মাঝে কৌশলগত ভারসাম্য বা হেজিং ভবিষ্যতের বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা ও ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের টিকে থাকার রূপরেখা বহুমুখী টানাপোড়েন এবং কৌশলগত ভারসাম্যের কূটনীতি অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং তৈরি পোশাক খাত (Economic Diplomacy and RMG Sector) অর্থনৈতিক কূটনীতির তাত্ত্বিক ভিত্তি ও বিশ্বায়নের প্রভাব তৈরি পোশাক শিল্পের উত্থান এবং কাঠামোগত রূপান্তর শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার এবং আন্তর্জাতিক দরকষাকষি কমপ্লায়েন্স, শ্রম অধিকার এবং বৈশ্বিক মানদণ্ডের রাজনীতি নতুন বাজারের সন্ধান এবং বহুমাত্রিক বাণিজ্য কৌশল শ্রমিক অভিবাসন, রেমিট্যান্স এবং জনমিতিক লভ্যাংশ জনশক্তি রপ্তানি ও প্রবাসী শ্রমিকদের বঞ্চনা (Man-power exploitation) শ্রম অভিবাসনের কাঠামোগত ভিত্তি এবং অর্থনীতির মেরুদণ্ড কাফালা ব্যবস্থা এবং আধুনিক দাসত্বের অদৃশ্য শৃঙ্খল বৈশ্বিক পুঁজিবাদ এবং সস্তা শ্রমের কাঠামোগত শোষণ দূতাবাসের কূটনৈতিক সীমাবদ্ধতা এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের দড়াবাজি মানব নিরাপত্তা বনাম রাষ্ট্রীয় স্বার্থের টানাপোড়েন আন্তর্জাতিক শ্রম আইন এবং বহুপাক্ষিক দরকষাকষির ভবিষ্যৎ জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত কূটনীতি (Climate Change and Environmental Diplomacy) কার্বন নিঃসরণের বৈপরীত্য এবং এক নীরব অস্তিত্বের সংকট অ-প্রথাগত নিরাপত্তা এবং জলবায়ু উদ্বাস্তুর ভূ-রাজনীতি বৈশ্বিক পুঁজিবাদ এবং পরিবেশগত ন্যায্যতার লড়াই বহুপাক্ষিক কূটনীতি এবং দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর জোটবদ্ধতা ক্ষয়ক্ষতি পূরণের তহবিল ও দরকষাকষির কৌশল অভিযোজন কৌশল এবং ভবিষ্যৎ কূটনীতির রূপরেখা রোহিঙ্গা সংকট ও বহুপাক্ষিক কূটনীতি (Rohingya Crisis and Multilateral Diplomacy) মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় বঞ্চনা এবং নাগরিকত্ব হরণের ইতিহাস দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির সীমাবদ্ধতা এবং আস্থার চরম শূন্যতা বহুপাক্ষিক কূটনীতির রূপরেখা এবং আন্তর্জাতিক ফোরাম ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ এবং পরাশক্তির স্বার্থের খেলা আন্তর্জাতিক বিচারালয় এবং আইনি কূটনীতির প্রয়োগ আর্থ-সামাজিক চাপ এবং অ-প্রথাগত নিরাপত্তা হুমকি মানবিক কূটনীতির ভবিষ্যৎ এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রত্যাবাসন উপসংহার তথ্যসূত্র Related ভূমিকা পৃথিবীর মানচিত্রের দিকে তাকালে মাঝে মাঝে অদ্ভুত এক ঘোর তৈরি হয়। মানুষের আঁকা কাল্পনিক সব সীমারেখা কীভাবে কোটি কোটি মানুষের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দেয়, তা ভাবলে অবাক হতে হয়। একটি রাষ্ট্র যখন জন্ম নেয়, সে তো আর একা একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপে বাঁচতে পারে না। তার চারপাশে থাকে আরও অনেক রাষ্ট্র – কেউ পরম বন্ধু, কেউ সুযোগসন্ধানী, কেউবা ঘোরতর শত্রু, আবার কেউ শুধুই নীরব দর্শক। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এই বিশাল ও জটিল রঙ্গমঞ্চে কেউ কারও চিরস্থায়ী আপন নয়, আবার কেউ চিরশত্রুও নয়। এই যে বিশ্বমঞ্চে টিকে থাকার নিরন্তর সংগ্রাম, বন্ধু খোঁজার প্রাণান্তকর চেষ্টা, আর নিজের স্বার্থটুকু কড়ায়-গণ্ডায় আদায় করে নেওয়ার যে সূক্ষ্ম ও নির্মোহ শিল্প, তারই পোশাকি নাম পররাষ্ট্রনীতি (Foreign Policy)। বিষয়টি অনেকটা শূন্যে দড়াবাজির মতো, একটু পা হড়কালেই অতল গহ্বরে পতন অবধারিত। ভৌগোলিক অবস্থানের দিকে তাকালে বদ্বীপ অঞ্চলের একটি রাষ্ট্রের বাস্তবতা খুব সহজেই চোখে পড়ে। তিন দিক দিয়ে একটি বিশাল ও শক্তিশালী প্রতিবেশী রাষ্ট্র দ্বারা পরিবেষ্টিত, আর একদিকে অনন্ত সমুদ্র। এই ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা (Geopolitical reality) রাষ্ট্রটিকে বাধ্য করে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পা ফেলতে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা একটি অমোঘ কথা বলেন – একটি দেশ তার ইতিহাস বদলাতে পারে, তার অর্থনীতি বদলাতে পারে, কিন্তু সে তার ভূগোল বদলাতে পারে না। এই ভূগোলের বন্দিদশা বা আশীর্বাদ একটি রাষ্ট্রের মনস্তত্ত্বকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দাবার বোর্ডে এই রাষ্ট্রটিকে প্রতিটি চাল দিতে হয় মেপে মেপে। কারণ, এখানে ভুলের মাশুল অনেক চড়া; কখনো তা মেটাতে হয় দেশের অর্থনীতি দিয়ে, কখনো বা সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দিয়ে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক (International Relations) কোনো দাতব্য সংস্থা নয়। এখানে দুর্বলকে কেউ স্বেচ্ছায় জায়গা ছেড়ে দেয় না, নিজের জায়গাটি গায়ের জোরে কিংবা বুদ্ধির জোরে আদায় করে নিতে হয়। একটি সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্র যখন বিশ্বমঞ্চে পা রাখে, তার চারপাশের পৃথিবীটা থাকে ভীষণ অচেনা, স্বার্থান্ধ এবং রূঢ়। পরাশক্তিগুলোর ক্ষমতার লড়াই, আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের স্নায়ুযুদ্ধ – এসবের মাঝে একটি ছোট রাষ্ট্রকে নিজের অস্তিত্বের জানান দিতে হয় প্রতিনিয়ত। এই টিকে থাকার সমীকরণে আবেগ, মান-অভিমান বা উচ্ছ্বাসের কোনো স্থান নেই, আছে কেবল নিরেট হিসাব-নিকাশ। জাতীয় স্বার্থ (National Interest) নামক এক অমোঘ কম্পাস দিকনির্দেশনা দেয় এই কণ্টকাকীর্ণ যাত্রায়। পররাষ্ট্রনীতি কোনো স্থির, বদ্ধ বা জমাট বাঁধা বিষয় নয়, এটি পাহাড়ি নদীর স্রোতের মতো প্রবহমান এবং সতত পরিবর্তনশীল। সময় বদলায়, বৈশ্বিক ক্ষমতার ভরকেন্দ্র বদলায়, সমীকরণ বদলায়, আর তার সাথে সাথে খাপ খাইয়ে বদলাতে হয় রাষ্ট্রের নিজস্ব কৌশল। গতকালের পরম মিত্র আজ চরম বৈরী হতে পারে, আবার আজকের শত্রু কাল হতে পারে সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। এই লেখায় আমরা একটি সদ্য স্বাধীন হওয়া রাষ্ট্রের টিকে থাকার সংগ্রাম থেকে শুরু করে বর্তমান সময়ের জটিল ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে তার অবস্থান – সবকিছুই ধাপে ধাপে বোঝার চেষ্টা করব। কোনো রোমান্টিসিজম বা কল্পনার আশ্রয় না নিয়ে, বরং কাঠখোট্টা বাস্তবতার আয়নায় আমরা দেখব কীভাবে একটি মানচিত্রের রেখা তার ভেতরের মানুষদের ভাগ্য নির্মাণ করে চলেছে। রাষ্ট্রের ধারণায়ন (Conceptualising State) রাষ্ট্রের প্রাথমিক ধারণা ও উপাদান রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মোটা মোটা বইপত্রে রাষ্ট্রের অনেক গালভরা সংজ্ঞা আছে। কিন্তু খুব সহজ করে বললে রাষ্ট্র কী? রাষ্ট্র হলো এমন একটি প্রতিষ্ঠান যার একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ড আছে, জনগণ আছে, সরকার আছে এবং আছে সার্বভৌমত্ব (Sovereignty)। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্পর্ক (International Relations) এর ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ধারণা আরও একটু জটিল। এখানে রাষ্ট্রকে একটি একক সত্তা (Unitary actor) হিসেবে ধরা হয়, যে সত্তা নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য প্রতিনিয়ত অন্য রাষ্ট্রগুলোর সাথে মিথস্ক্রিয়া করে (Weber, 1919)। রাষ্ট্র কেবল একটি ভৌগোলিক সীমারেখা নয়, এটি একটি জীবন্ত কাঠামোর মতো, যার নিজস্ব মনস্তত্ত্ব এবং প্রতিরক্ষামূলক প্রবৃত্তি রয়েছে। একটি ভূখণ্ডকে রাষ্ট্র হয়ে ওঠার জন্য শুধুমাত্র কিছু মানুষের জড়ো হওয়াই যথেষ্ট নয়। সেই মানুষদের মধ্যে একটি অলিখিত চুক্তি থাকতে হয়, যেই চুক্তির মাধ্যমে তারা নিজেদের কিছু স্বাধীনতা একটি কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেয়। এই কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ আবার সেই ক্ষমতার জোরে পুরো ভূখণ্ডের ভেতরে শৃঙ্খলা বজায় রাখে। একটি নির্দিষ্ট সীমানার ভেতরে বসবাসরত হাজারো বা কোটি কোটি মানুষ একে অপরের অচেনা হলেও, তারা একই রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে এক ধরনের অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা পড়ে। এই বাঁধনটি তৈরি হয় অভিন্ন আইন, অভিন্ন মুদ্রা এবং একটি নির্দিষ্ট পতাকার প্রতি আনুগত্যের মাধ্যমে। সাধারণ দৃষ্টিতে সীমানার কাঁটাতার বা পিলারের বাইরে রাষ্ট্রের কোনো ভৌত অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া মুশকিল। বাস্তবে রাষ্ট্র একটি বিমূর্ত ধারণা, যা মানুষের মগজে এবং বিশ্বাসে বেঁচে থাকে। সবাই বিশ্বাস করে বলে রাষ্ট্রের কাগজের মুদ্রার দাম আছে, সবাই মেনে নেয় বলে পুলিশের পোশাক পরা একজন সাধারণ মানুষের কথার অবাধ্য হওয়ার সাহস কেউ দেখায় না। এই যে ক্ষমতার একচ্ছত্র আধিপত্য, এটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য। আপনি চাইলেই রাস্তায় নেমে নিজের ইচ্ছেমতো বিচার বসাতে পারবেন না। আপনার প্রতিবেশীর সাথে বিরোধ হলে আপনি নিজে তার সমাধান গায়ের জোরে করতে পারবেন না। শক্তি প্রয়োগের এই অধিকার সমাজ থেকে পুরোপুরি ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। বিখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার (Max Weber) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ পলিটিক্স অ্যাজ আ ভোকেশন (Politics as a Vocation)-এ ঠিক এই কথাটিই খুব সুন্দর করে বুঝিয়েছেন। তাঁর মতে, রাষ্ট্র হলো সেই মানব সম্প্রদায়, যারা একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের ভেতরে বৈধভাবে শারীরিক বলপ্রয়োগের একচেটিয়া অধিকার দাবি করে। এর মানে দাঁড়ায়, একমাত্র রাষ্ট্রই পারে বৈধভাবে শক্তি প্রয়োগ করতে, অন্য কেউ নয়। যদি রাষ্ট্রের ভেতরে অন্য কোনো গোষ্ঠী গায়ের জোরে নিজেদের শাসন চালাতে শুরু করে, তবে বুঝতে হবে সেই রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে গেছে। সুতরাং একটি কার্যকর রাষ্ট্রকে অবশ্যই তার সীমানার ভেতরে নিজের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে হয়। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দেয়ার বিনিময়ে রাষ্ট্র জনগণের কাছ থেকে কর আদায় করে এবং বিনা বাক্যব্যয়ে আইন মেনে চলার নিশ্চয়তা আদায় করে নেয়। এই পুরো ব্যবস্থাটি বাইরে থেকে দেখতে একটি বিশাল এবং জটিল যন্ত্রের মতো মনে হলেও, এর ভেতরের মূল চালিকাশক্তি হলো মানুষের বিশ্বাস এবং নিরাপত্তার আদিম আকাঙ্ক্ষা। মানুষ একা বাঁচতে ভয় পায়, তাই সে রাষ্ট্রের মতো একটি বিশাল ছাতার নিচে আশ্রয় খোঁজে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের চোখে রাষ্ট্র রাষ্ট্রবিজ্ঞানের নিজস্ব আঙিনায় রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ কাঠামো নিয়ে অনেক আলোচনা হলেও, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দাবার বোর্ডে সেই আলোচনা খুব একটা গুরুত্ব পায় না। এখানে রাষ্ট্রকে দেখা হয় বাইরে থেকে। একটু কল্পনা করা যাক। বিশাল একটি বিলিয়ার্ড টেবিল, আর সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নানা রঙের বিলিয়ার্ড বল। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অনেক তাত্ত্বিক পৃথিবীকে ঠিক এভাবেই দেখেন। প্রতিটি বিলিয়ার্ড বল হলো একেকটি রাষ্ট্র। একটি বল অন্য বলের সাথে ধাক্কা খাচ্ছে, কখনো ছিটকে যাচ্ছে, আবার কখনো এক জায়গায় স্থির থাকছে। বলের ভেতরে কী আছে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কোনো মাথাব্যথা নেই। একটি রাষ্ট্রের ভেতরে গণতন্ত্র চলছে, নাকি একনায়কতন্ত্র, জনগণ সুখে আছে নাকি কষ্টে – এসব বিষয় অন্য রাষ্ট্রের আচরণের ক্ষেত্রে খুব কমই প্রভাব ফেলে। এই দৃষ্টিভঙ্গিকে বলা হয় বাস্তববাদ (Realism)। আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম প্রধান প্রবক্তা হ্যান্স মরগেনথাউ (Hans Morgenthau) তাঁর সুবিখ্যাত বই পলিটিক্স অ্যামাং নেশনস (Politics Among Nations)-এ উল্লেখ করেছেন যে, আন্তর্জাতিক রাজনীতি মূলত ক্ষমতার লড়াই ছাড়া আর কিছুই নয়। প্রতিটি রাষ্ট্র এখানে তার নিজের সর্বোচ্চ স্বার্থ আদায় করতে চায় এবং সেই স্বার্থ আদায়ের প্রধানতম হাতিয়ার হলো ক্ষমতা। একটি রাষ্ট্র যখন বিশ্বমঞ্চে কথা বলে, তখন সে তার কোটি কোটি নাগরিকের ভিন্ন ভিন্ন মতামতের প্রতিনিধিত্ব করে না। সে কথা বলে একটি অখণ্ড এবং একক সত্তা হিসেবে। এই কারণেই আমরা খবরের কাগজে পড়ি “চীন এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে” কিংবা “ভারত ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।” যেন চীন বা ভারত রক্তমাংসের কোনো মানুষ, যার নিজস্ব চিন্তাশক্তি এবং সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা আছে। এই একক সত্তা হিসেবে রাষ্ট্রকে কল্পনা করার পেছনে একটি বড় কারণ হলো সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রতিনিয়ত অসংখ্য সংকট তৈরি হয়। এসব সংকটের মুহূর্তে রাষ্ট্রের ভেতরে বসে বিতর্ক করার মতো অফুরন্ত সময় সবসময় থাকে না। খুব দ্রুত একটি অবস্থান নিতে হয়। তাই রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতৃত্ব যে সিদ্ধান্ত নেয়, ধরে নেয়া হয় সেটিই পুরো রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত। প্রাচীনকাল থেকেই এই ধারণাটি চলে আসছে। সেই গ্রিক নগররাষ্ট্রের যুগ থেকে শুরু করে আধুনিক পরাশক্তির যুগ পর্যন্ত, একটি বিষয় খুব পরিষ্কার – আন্তর্জাতিক সম্পর্কে টিকে থাকতে হলে দুর্বলতার কোনো স্থান নেই। রেনেসাঁ যুগের বিখ্যাত চিন্তাবিদ নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি (Niccolo Machiavelli) তাঁর কালজয়ী রচনা দ্য প্রিন্স (The Prince)-এ শাসকদের পরামর্শ দিয়েছিলেন যে, প্রয়োজনে তাদের শেয়ালের মতো ধূর্ত এবং সিংহের মতো পরাক্রমশালী হতে হবে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাষ্ট্র ঠিক এই নীতিতেই চলে। এখানে কেউ কাউকে বিনা কারণে এক ইঞ্চি জমিও ছাড়ে না। বন্ধুত্বের আড়ালে লুকিয়ে থাকে গভীর স্বার্থ। দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে যখন কোনো চুক্তি হয়, তার প্রতিটি ধারা এবং উপধারায় মেপে দেখা হয় নিজের লাভ কতটুকু। আবেগের বশবর্তী হয়ে বা নিছক মানবিক কারণে একটি রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের জন্য খুব বড় কোনো আত্মত্যাগ করবে, এমনটা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সাধারণত ঘটে না। তাই রাষ্ট্রকে এখানে একটি অত্যন্ত বুদ্ধিমান, স্বার্থপর এবং হিসেবি সত্তা হিসেবেই বিবেচনা করা হয়। রাষ্ট্রের মনস্তত্ত্ব ও প্রতিরক্ষামূলক প্রবৃত্তি রাষ্ট্রের যদি নিজস্ব কোনো মনস্তত্ত্ব থাকে, তবে সেই মনস্তত্ত্বের সবচেয়ে বড় অংশ জুড়ে আছে ভয় এবং সন্দেহ। একটি রাষ্ট্র কখনোই তার প্রতিবেশীকে বা অন্য কোনো শক্তিশালী রাষ্ট্রকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারে না। মানুষের সমাজে যেমন চুরি-ডাকাতি হলে পুলিশ ডাকার সুযোগ আছে, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় তেমন কোনো বিশ্ব-পুলিশ নেই, যার কাছে গিয়ে নালিশ করা যায়। আন্তর্জাতিক কাঠামোর এই অভিভাবকহীন অবস্থাকে তাত্ত্বিকরা বলেন নৈরাজ্য (Anarchy)। নৈরাজ্য মানে এই নয় যে সারাদিন শুধু যুদ্ধ-বিগ্রহ চলছে। নৈরাজ্য মানে হলো, এখানে রাষ্ট্রের ওপরে খবরদারি করার মতো কোনো কেন্দ্রীয় বা সর্বোচ্চ ক্ষমতা নেই। প্রতিটি রাষ্ট্রকে নিজের সুরক্ষার দায়িত্ব নিজেকেই নিতে হয়। এই পরিস্থিতি রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে এক ধরনের চিরস্থায়ী স্নায়ুচাপ তৈরি করে। ধরে নেয়া যাক, একটি দেশ শুধু মাত্র তার নিজের সীমান্ত রক্ষার জন্য কিছু নতুন অস্ত্র কিনল। তার কোনো খারাপ উদ্দেশ্য নেই, সে শুধু নিজেকে নিরাপদ রাখতে চায়। কিন্তু তার পাশের দেশটি এই ঘটনা দেখে ভয় পেয়ে যাবে। সে ভাববে, ওই অস্ত্রগুলো হয়তো তার বিরুদ্ধেই ব্যবহার করা হবে। ফলে সেও বাজার থেকে আরও উন্নত অস্ত্র কিনে আনবে। এই যে একজনের আত্মরক্ষার চেষ্টা অন্যজনের মনে নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দেয়, একে বলা হয় নিরাপত্তা সংকট (Security dilemma)। এই সংকটের কারণে রাষ্ট্রগুলো কখনো শান্তিতে ঘুমাতে পারে না। তাদের প্রতিনিয়ত নিজেদের সামরিক শক্তি বাড়াতে হয় এবং মিত্র খুঁজতে হয়। এই প্রতিরক্ষামূলক প্রবৃত্তির বিষয়টি খুব চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন প্রখ্যাত তাত্ত্বিক কেনেথ ওয়াল্টজ (Kenneth Waltz)। তাঁর রচিত থিওরি অফ ইন্টারন্যাশনাল পলিটিক্স (Theory of International Politics) বইটিতে তিনি দেখিয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক কাঠামোর কারণেই রাষ্ট্রগুলো নির্দিষ্ট কিছু আচরণ করতে বাধ্য হয়। একটি বনে যেমন দুর্বল প্রাণী সবসময় ভয়ে ভয়ে থাকে এবং শক্তিশালী প্রাণী সুযোগ পেলেই আক্রমণ করে, আন্তর্জাতিক রাজনীতিও ঠিক তেমনি। রাষ্ট্রগুলো মূলত বেঁচে থাকার জন্যই প্রতিনিয়ত ক্ষমতার হিসাব-নিকাশ করে। অনেক সময় দেখা যায়, একটি রাষ্ট্র নিজের ভেতরের অর্থনৈতিক অবস্থার চেয়েও সামরিক খাতে বেশি জোর দিচ্ছে। সাধারণ চোখে এটি বোকামি মনে হলেও, রাষ্ট্রের মনস্তত্ত্বের দিক থেকে এটি অত্যন্ত স্বাভাবিক। কারণ, রাষ্ট্র জানে যে একবার যদি তার অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ে, তবে অর্থনীতি বা সংস্কৃতি দিয়ে সেই অস্তিত্ব রক্ষা করা যাবে না। তাকে টিকে থাকতে হবে শক্তির জোরেই। আবার কিছু কিছু রাষ্ট্র মনে করে, শুধু বসে বসে আত্মরক্ষা করলেই চলবে না। সেরা আত্মরক্ষা হলো আক্রমণ। এই চিন্তাধারার প্রবক্তা জন মেয়ারশাইমার (John Mearsheimer) তাঁর দ্য ট্র্যাজেডি অফ গ্রেট পাওয়ার পলিটিক্স (The Tragedy of Great Power Politics) বইয়ে বলেছেন যে, পরাশক্তিগুলো সবসময় আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ খোঁজে। কারণ, আপনি যদি সবচেয়ে শক্তিশালী হন, তবে কেউ আপনাকে আক্রমণ করার সাহস পাবে না। ফলে রাষ্ট্রের মনস্তত্ত্ব সবসময়ই একটি অদৃশ্য আতঙ্কে ভোগে এবং সেই আতঙ্ক থেকেই সে ক্রমাগত শক্তি সঞ্চয় করতে থাকে। রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং এর বিবর্তন রাষ্ট্রের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত শব্দগুলোর একটি হলো সার্বভৌমত্ব। সহজ ভাষায় এর মানে হলো নিজের বাড়ির কর্তা নিজে হওয়া। একটি রাষ্ট্রের ভৌগোলিক সীমানার ভেতরে ওই রাষ্ট্রের সরকারই হলো সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী। বাইরের কোনো রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠান তাকে বলে দিতে পারবে না কীভাবে দেশ চালাতে হবে। আধুনিক এই রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং সার্বভৌমত্বের ধারণা একদিনে আকাশ থেকে পড়েনি। ১৬৪৮ সালের ওয়েস্টফালিয়ার শান্তিচুক্তির মাধ্যমে এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছিল বলে ধরে নেয়া হয়। সেই চুক্তির পর থেকে ধীরে ধীরে এই নীতি প্রতিষ্ঠিত হয় যে, প্রতিটি রাষ্ট্র, সে আকারে যতই ছোট হোক বা অর্থনীতিতে যতই দুর্বল হোক, আইনিভাবে সে অন্য যেকোনো বড় রাষ্ট্রের সমান। আন্তর্জাতিক আইনের চোখে সবার মর্যাদা এক। এই নীতিটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় এক ধরনের শৃঙ্খলা নিয়ে আসে। সবাই মেনে নেয় যে অন্যের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানো অন্যায়। কিন্তু কাগজে-কলমে এই নিয়ম যতটা সুন্দর, বাস্তবে ততটা নিখুঁত নয়। ক্ষমতাবান রাষ্ট্রগুলো নিজেদের স্বার্থে প্রায়ই এই নিয়ম ভেঙে ফেলে। তারা দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর ওপর অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে, এমনকি কখনো কখনো সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপও করে। এর মানে দাঁড়ায়, সার্বভৌমত্ব এমন একটি পোশাক যা সব রাষ্ট্র গায়ে জড়ালেও, সবার পোশাকের জোর সমান নয়। সার্বভৌমত্বের এই দ্বিমুখী আচরণের বিষয়টি নিয়ে বিস্তর গবেষণা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রখ্যাত পণ্ডিত স্টিফেন ক্রাসনার (Stephen Krasner) এই পরিস্থিতিকে খুব কড়া ভাষায় সমালোচনা করেছেন। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ সভরেন্টি: অর্গানাইজড হিপোক্রিসি (Sovereignty: Organized Hypocrisy)-এ তিনি দেখিয়েছেন যে, সার্বভৌমত্বের নিয়মগুলো আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আসলে এক ধরনের সংগঠিত ভণ্ডামি ছাড়া আর কিছু নয়। পরাশক্তিগুলো যখন নিজেদের স্বার্থের অনুকূলে থাকে, তখন তারা খুব সুন্দর করে সার্বভৌমত্বের পবিত্রতার কথা বলে। আবার সেই একই পরাশক্তি যখন দেখে যে অন্য কোনো দেশে হস্তক্ষেপ না করলে তাদের ভূ-রাজনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে, তখন তারা নিমিষেই সার্বভৌমত্বের নিয়মাবলি ছুড়ে ফেলে দেয়। বিশ্বায়নের এই যুগে সার্বভৌমত্বের ধারণাটি আরও বেশি প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছে। এখন আর সৈন্য পাঠিয়ে দেশ দখলের প্রয়োজন হয় না। বিশাল বিশাল বহুজাতিক কোম্পানি, আন্তর্জাতিক ঋণদানকারী সংস্থা এবং তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ প্রবাহ রাষ্ট্রের ভেতরের সিদ্ধান্তগুলোকে প্রতিনিয়ত প্রভাবিত করছে। একটি দেশ হয়তো নিজের ইচ্ছেমতো কোনো অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করতে চাইল, কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারের চাপে তাকে সেই নীতি থেকে সরে আসতে হলো। তাহলে প্রশ্ন জাগে, সেই দেশটির সার্বভৌমত্ব কি পুরোপুরি অটুট থাকল? আসলে সার্বভৌমত্ব এখন আর কোনো নিরেট বা অপরিবর্তনীয় বিষয় নয়। এটি একটি আপেক্ষিক ধারণা, যা রাষ্ট্রের নিজস্ব ক্ষমতা এবং দরকষাকষির সামর্থ্যের ওপর নির্ভর করে প্রতিনিয়ত রূপ বদলাচ্ছে। আধুনিক রাষ্ট্রে ক্ষমতার রূপরেখা রাষ্ট্রের টিকে থাকার প্রধান জ্বালানি হলো ক্ষমতা। প্রাচীনকালে বা মধ্যযুগে ক্ষমতা মানেই ছিল বিশাল সেনাবাহিনী, ধারালো তলোয়ার আর দুর্ভেদ্য দুর্গ। যে রাজার সৈন্য যত বেশি, তার ক্ষমতা তত বেশি। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রে ক্ষমতার রূপরেখা অনেক পাল্টে গেছে। সামরিক শক্তি এখনো গুরুত্বপূর্ণ, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এর পাশাপাশি আরও অনেক ধরনের ক্ষমতা রাষ্ট্রের হাতে চলে এসেছে। সামরিক শক্তি বা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মতো সরাসরি জবরদস্তিমূলক ক্ষমতাকে বলা হয় কঠিন ক্ষমতা (Hard power)। এর বিপরীতে একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের ক্ষমতা আছে, যা জোর করে কিছু আদায় করে না, বরং অন্যকে প্রলুব্ধ করে। এই ধারণার জনক হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোসেফ নাই (Joseph Nye)। তাঁর যুগান্তকারী কাজ বাউন্ড টু লিড (Bound to Lead) বইতে তিনি এই নতুন ধরনের ক্ষমতার নাম দিয়েছেন মৃদু ক্ষমতা (Soft power)। একটি রাষ্ট্রের সংস্কৃতি, তার রাজনৈতিক আদর্শ, তার সিনেমা, গান বা সাহিত্য যখন অন্য দেশের মানুষকে আকর্ষণ করে, তখন সেই রাষ্ট্রটি বিনা যুদ্ধেই অনেক কিছু অর্জন করতে পারে। অন্য দেশের মানুষ স্বেচ্ছায় সেই রাষ্ট্রের মতাদর্শ গ্রহণ করতে শুরু করে। আধুনিক রাষ্ট্রগুলো এখন এই দুই ধরনের ক্ষমতার এক ধরনের সংমিশ্রণ ব্যবহার করে, যাকে অনেক সময় স্মার্ট পাওয়ারও বলা হয়। শুধু পেশিশক্তি দিয়ে এখন আর বিশ্বমঞ্চে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব বিস্তার করা সম্ভব নয়। ক্ষমতার এই বহুমাত্রিকতার পাশাপাশি আধুনিক রাষ্ট্রের ভেতরেও ক্ষমতার একটি নিজস্ব বিন্যাস আছে। আমরা বাইরে থেকে রাষ্ট্রের যে চেহারাটি দেখি, অর্থাৎ সরকার বা রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সেটাই কিন্তু রাষ্ট্রের সবটুকু নয়। রাষ্ট্রের ভেতরে গভীরে প্রোথিত থাকে বিশাল এক আমলাতান্ত্রিক কাঠামো, সামরিক বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থা। রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে জেতে আর হারে, সরকার বদলায়, কিন্তু এই গভীর কাঠামোগুলো তাদের জায়গাতেই অবিচল থাকে। এই স্থায়ী কাঠামোটিই মূলত রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থগুলো পাহারা দেয়। অনেক সময় দেখা যায়, একটি নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে পররাষ্ট্রনীতিতে বড় কোনো পরিবর্তন আনতে চাইছে, কিন্তু রাষ্ট্রের ভেতরের ওই স্থায়ী কাঠামো নানাভাবে সেই পরিবর্তনকে ধীর করে দিচ্ছে বা বাধা দিচ্ছে। কারণ, তারা বিশ্বাস করে যে সাময়িক রাজনৈতিক আবেগের চেয়ে রাষ্ট্রের কাঠামোগত নিরাপত্তা অনেক বেশি জরুরি। ক্ষমতার এই অদৃশ্য বলয়টি আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। সমাজবিজ্ঞানী চার্লস টিলি (Charles Tilly) তাঁর সুবিখ্যাত বই কোয়ার্সন, ক্যাপিটাল, অ্যান্ড ইউরোপিয়ান স্টেটস (Coercion, Capital, and European States)-এ আধুনিক রাষ্ট্রের উৎপত্তির ইতিহাস খুঁজতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে, যুদ্ধ করার প্রয়োজনীয়তা থেকেই মূলত রাষ্ট্র তার নিজস্ব আমলাতন্ত্র এবং কর আদায়ের ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল। সেই ব্যবস্থাটি সময়ের সাথে সাথে এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠেছে যে, এখন তারাই রাষ্ট্রের দৈনন্দিন জীবনের আসল চালিকাশক্তি। ফলে আধুনিক রাষ্ট্রে ক্ষমতার খেলাটি কেবল আন্তর্জাতিক সীমানাতেই সীমাবদ্ধ নেই, সেটি রাষ্ট্রের ভেতরেও সমানভাবে চলমান। রাষ্ট্র বনাম সরকার: একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য সাধারণ আলোচনায় আমরা প্রায়ই রাষ্ট্র এবং সরকারকে একই অর্থে ব্যবহার করি। কেউ যখন সরকারের সমালোচনা করে, অনেকেই ধরে নেয় সে রাষ্ট্রেরই সমালোচনা করছে। কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এই দুটির মধ্যে আসমান-জমিন তফাত রয়েছে। বিষয়টি খুব সহজে একটি উদাহরণের মাধ্যমে বোঝা যেতে পারে। একটি জাহাজ যখন সমুদ্রে ভাসে, সেই জাহাজটি হলো রাষ্ট্র। আর ওই জাহাজের নাবিক বা ক্যাপ্টেন হলো সরকার। ক্যাপ্টেনের কাজ হলো জাহাজটিকে সঠিক গন্তব্যে নিয়ে যাওয়া, যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জাহাজের নিয়মকানুন বজায় রাখা। নির্দিষ্ট সময় পর পর ক্যাপ্টেন বদল হতে পারে, নতুন ক্রু আসতে পারে। কিন্তু জাহাজটি তার জায়গাতেই থাকে। সরকারের মেয়াদ থাকে, কিন্তু রাষ্ট্রের কোনো নির্দিষ্ট মেয়াদ নেই। রাষ্ট্র একটি স্থায়ী প্রতিষ্ঠান, যা শত শত বছর ধরে টিকে থাকতে পারে। অন্যদিকে সরকার হলো সেই ক্ষণস্থায়ী দল বা গোষ্ঠী, যারা একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পায়। সরকার মূলত রাষ্ট্রের ইচ্ছা বা উদ্দেশ্যকে বাস্তবায়ন করার একটি মাধ্যম মাত্র। রাষ্ট্র নিজে কথা বলতে পারে না, তার হয়ে কথা বলে সরকার। রাষ্ট্রের নিজস্ব কোনো হাত-পা নেই, সরকারের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীই হলো রাষ্ট্রের হাত-পা। এই সূক্ষ্ম পার্থক্যটি বুঝতে না পারলে অনেক সময় রাজনৈতিক আলোচনায় চরম বিভ্রান্তি তৈরি হয়। এই পার্থক্যটি আরও স্পষ্ট হয় যখন আমরা রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আনুগত্যের বিষয়টি বিবেচনা করি। একজন নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য থাকা বাধ্যতামূলক। রাষ্ট্রের নিয়মকানুন মানা, কর দেয়া – এগুলো নাগরিকের পবিত্র দায়িত্ব। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট সরকারের প্রতি অন্ধ আনুগত্য থাকা নাগরিকের জন্য বাধ্যতামূলক নয়। একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নাগরিকের পূর্ণ অধিকার আছে সরকারের নীতিমালার সমালোচনা করার, তাদের ভুল ধরিয়ে দেয়ার এবং ভোটের মাধ্যমে তাদের ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়ার। সরকারের বিরোধিতা করা মানেই রাষ্ট্রের বিরোধিতা করা নয়। বরং অনেক সময় রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থ রক্ষার জন্যই সরকারের ভুল নীতির বিরোধিতা করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে। তাছাড়া, আন্তর্জাতিক চুক্তির ক্ষেত্রেও এই পার্থক্যটি খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একটি দেশের সরকার যখন অন্য কোনো দেশের সাথে কোনো দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি স্বাক্ষর করে, তখন সেটি আসলে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকেই করা হয়। পরবর্তী সময়ে যদি সেই দেশে নতুন কোনো সরকার ক্ষমতায় আসে, তারপরও সেই চুক্তি বাতিল হয়ে যায় না। নতুন সরকার আগের সরকারের করা চুক্তি মেনে চলতে বাধ্য থাকে। কারণ চুক্তিটি দুটি সরকারের মধ্যে হয়নি, হয়েছে দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে। রাষ্ট্র নামক এই বিশাল এবং চিরস্থায়ী কাঠামোর কারণেই মানবসমাজে এক ধরনের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, বিপ্লব বা ক্ষমতার পালাবদলের মাঝেও রাষ্ট্র নামক প্রতিষ্ঠানটি তার নিজস্ব গতিতে এগিয়ে চলে, যা মানব সভ্যতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদ্ভাবন। বিশ্বায়নের যুগে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ একবিংশ শতাব্দীতে এসে মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থা, অর্থনীতি এবং প্রযুক্তির যে অভূতপূর্ব বিকাশ ঘটেছে, তার নাম দেয়া হয়েছে বিশ্বায়ন। এই বিশ্বায়নের প্রবল ঢেউয়ে অনেকেই মনে করতে শুরু করেছিলেন যে, রাষ্ট্র নামক প্রতিষ্ঠানটির হয়তো এবার বিদায়ঘণ্টা বাজতে চলেছে। কারণ বিশ্বায়নের মূল কথাই হলো সীমানাহীন পৃথিবী। পুঁজি এক দেশ থেকে আরেক দেশে চোখের পলকে চলে যাচ্ছে, ইন্টারনেটের কল্যাণে তথ্য মুহূর্তের মধ্যে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে। বড় বড় বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর বাৎসরিক আয় অনেক মাঝারি আকারের রাষ্ট্রের জিডিপির চেয়েও বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা স্বভাবতই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এখন শুধু রাষ্ট্রই একমাত্র খেলোয়াড় নয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, এমনকি প্রভাবশালী ব্যক্তিরাও বিশ্বরাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব রাখছে। এদেরকে বলা হয় অ-রাষ্ট্রীয় সত্তা (Non-state actors)। এই সত্তাগুলোর দাপটে রাষ্ট্রের চিরায়ত দেয়ালগুলো যেন কিছুটা ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে। একটি দেশের সরকার চাইলেই এখন নিজের দেশের অর্থনীতিকে বাইরের দুনিয়া থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে রাখতে পারে না। আন্তর্জাতিক বাজারের সামান্য উত্থান-পতনে দেশের ভেতরের অর্থনীতি কেঁপে ওঠে। ফলে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, যে রাষ্ট্র নিজের অর্থনীতির ওপরই পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে না, সেই রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ আসলে কী? তবে এত সব জল্পনা-কল্পনার পরও বাস্তব চিত্রটি কিন্তু ভিন্ন। রাষ্ট্র মোটেও হারিয়ে যাচ্ছে না, বরং সে নতুন পরিস্থিতির সাথে নিজেকে মানিয়ে নিচ্ছে। বিশ্বায়নের এই যুগেও যখন কোনো বড় ধরনের বৈশ্বিক সংকট তৈরি হয়, তখন মানুষ কিন্তু বহুজাতিক কোম্পানি বা আন্তর্জাতিক সংস্থার দিকে তাকিয়ে থাকে না। মানুষ তাকিয়ে থাকে নিজের রাষ্ট্রের দিকে। অর্থনৈতিক মহামন্দা কিংবা ভয়াবহ কোনো স্বাস্থ্য সংকটের সময় রাষ্ট্রকেই এগিয়ে আসতে হয় তার নাগরিকদের রক্ষা করার জন্য। সীমান্ত পার হওয়ার সময় এখনো পাসপোর্ট আর ভিসার প্রয়োজন হয়। নাগরিকত্বের পরিচয়টি এখনো মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়গুলোর একটি হয়েই টিকে আছে। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে আগের মতো সবকিছুতেই রাষ্ট্র একনায়কতন্ত্র চালাতে পারে না। তাকে এখন অনেক বেশি হিসাব করে চলতে হয়, অনেক অ-রাষ্ট্রীয় সত্তার সাথে দরকষাকষি করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কিন্তু দিন শেষে আইন প্রণয়ন করা, সীমানা পাহারা দেয়া এবং জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দেয়ার মতো মৌলিক কাজগুলো করার জন্য রাষ্ট্রের কোনো বিকল্প এখনো তৈরি হয়নি। রাষ্ট্র হয়তো তার খোলস পাল্টাচ্ছে, তার কাজ করার ধরন পাল্টাচ্ছে, কিন্তু তার মূল অস্তিত্ব বিন্দুমাত্র ম্লান হয়নি। পৃথিবীর মানচিত্র থেকে কাল্পনিক রেখাগুলো মুছে গিয়ে একটি অখণ্ড বিশ্বরাষ্ট্র তৈরি হওয়ার যে রোমান্টিক স্বপ্ন কেউ কেউ দেখেন, তা আপাতত সুদূর পরাহত। রাষ্ট্র টিকে ছিল, রাষ্ট্র টিকে আছে এবং খুব সম্ভবত অদূর ভবিষ্যতেও মানব সমাজের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাষ্ট্রই তার রাজত্ব বজায় রাখবে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ধারণায়ন (Conceptualising the Bangladesh State) বদ্বীপের ভূগোল এবং একটি জনপদের ঐতিহাসিক আত্মপরিচয় একটি রাষ্ট্র হুট করে একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে তৈরি হয়ে যায় না। এর পেছনে থাকে শত শত বছরের এক দীর্ঘ, জটিল এবং অনেক ক্ষেত্রেই রক্তক্ষয়ী প্রক্রিয়া। এই বদ্বীপ অঞ্চলের দিকে নিবিড়ভাবে তাকালে এর ভৌগোলিক স্বকীয়তা খুব সহজেই চোখে পড়ে। জালের মতো ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য নদী, বর্ষার প্লাবন এবং পলিমাটির নরম বুনন এখানকার মানুষদের মনস্তত্ত্বকে এক বিশেষ ছাঁচে গড়ে তুলেছে। ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, এই অঞ্চলটি বরাবরই দিল্লির কেন্দ্রীয় শাসন থেকে এক ধরনের মানসিক এবং ভৌগোলিক দূরত্ব বজায় রেখে চলেছে। যোগাযোগের দুর্গমতার কারণে দিল্লির সম্রাটদের পক্ষে এই ভাটি অঞ্চলের ওপর নিরঙ্কুশ আধিপত্য বজায় রাখা সব সময়ই এক দুঃসাধ্য কাজ ছিল। একারণে এখানকার স্থানীয় শাসনকর্তারা সুযোগ পেলেই নিজেদের স্বাধীন বলে ঘোষণা করতেন। এই ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা মূলত এখানকার মানুষদের মনে এক ধরনের স্বাধীনচেতা মানসিকতার জন্ম দেয়। প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ রিচার্ড ইটন (Richard Eaton) তাঁর সাড়া জাগানো গবেষণা দ্য রাইজ অফ ইসলাম অ্যান্ড দ্য বেঙ্গল ফ্রন্টিয়ার (The Rise of Islam and the Bengal Frontier)-এ অত্যন্ত চমৎকারভাবে দেখিয়েছেন, কীভাবে কৃষিভিত্তিক সমাজ এবং নদীমাতৃক ভূগোল এখানকার মানুষের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়কে একটি নির্দিষ্ট রূপ দিয়েছিল (Eaton, 1993)। এই ঐতিহাসিক ভূগোল (Historical Geography) মূলত একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের সবচেয়ে প্রাথমিক এবং অদৃশ্য ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে কাজ করেছে। মাটির এই বৈশিষ্ট্য এখানকার মানুষকে শিখিয়েছে কীভাবে প্রবল প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে লড়াই করে টিকে থাকতে হয়, আর সেই টিকে থাকার অদম্য স্পৃহাই পরবর্তীতে রাজনৈতিক স্বাধিকার আদায়ের সংগ্রামে রূপান্তরিত হয়েছে। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ধারণাটি এই অঞ্চলে প্রবেশ করে মূলত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের হাত ধরে। ব্রিটিশরা নিজেদের প্রশাসনিক সুবিধা এবং শাসন টিকিয়ে রাখার স্বার্থে ১৯০৫ সালে প্রথমবার এই অঞ্চলটিকে ভাগ করার চেষ্টা করে। সেই বিভাজন খুব বেশিদিন টিকতে না পারলেও, মানুষের মনে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বিভেদের একটি সূক্ষ্ম বীজ বপন করে দিয়ে যায়। এর চূড়ান্ত এবং ভয়াবহ পরিণতি দেখা যায় ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময়। ব্রিটিশরা বিদায় নেওয়ার আগে মানচিত্রের ওপর পেনসিল দিয়ে যে রেখা টেনে দিয়েছিল, তা মূলত একটি কৃত্রিম এবং অবাস্তব রাষ্ট্রীয় কাঠামোর জন্ম দেয়। সম্পূর্ণ আলাদা ভাষা, সংস্কৃতি এবং হাজার মাইলের ভৌগোলিক দূরত্ব থাকা সত্ত্বেও কেবল ধর্মের দোহাই দিয়ে পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তের দুটি ভিন্ন জনপদকে একটি রাষ্ট্রের ফ্রেমে আটকে ফেলা হয়। এই অবাস্তব ধারণার তাত্ত্বিক ভিত্তি ছিল দ্বিজাতি তত্ত্ব (Two-Nation Theory)। এই তত্ত্বের প্রবক্তারা ভেবেছিলেন, ধর্মের এক অদৃশ্য সুতো দিয়ে তারা হাজার মাইলের দূরত্ব এবং হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ভিন্নতাকে খুব সহজেই ঢেকে দিতে পারবেন। বাস্তবে একটি রাষ্ট্রের ভিত্তি কেবল ধর্মীয় অনুভূতির ওপর নির্ভর করে দীর্ঘকাল টিকে থাকতে পারে না। মাটির সাথে, ভাষার সাথে এবং দৈনন্দিন যাপনের সাথে রাষ্ট্রের যে নাড়ির সম্পর্ক থাকার কথা, পাকিস্তান নামক সেই নবীন রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে পূর্ব প্রান্তের মানুষদের সাথে তার কোনো অস্তিত্ব ছিল না। এই কৃত্রিম রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে পূর্ব প্রান্তের মানুষেরা খুব দ্রুতই নিজেদের এক ধরনের শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থার মধ্যে আবিষ্কার করে। তারা বুঝতে শুরু করে যে, স্বাধীন একটি দেশের নাগরিক হওয়ার যে স্বপ্ন তারা দেখেছিল, তা মূলত এক নতুন ধরনের পরাধীনতায় রূপ নিয়েছে। রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দু, সামরিক বাহিনীর সদর দপ্তর এবং অর্থনীতির চাবিকাঠি – সবকিছুই পশ্চিম প্রান্তের মুষ্টিমেয় কিছু অভিজাত মানুষের হাতে কুক্ষিগত হয়ে পড়ে। এই চরম কাঠামোগত বঞ্চনা এখানকার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে। তারা উপলব্ধি করে, ভৌগোলিক অসংলগ্নতা এবং সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতার ওপর দাঁড়িয়ে কোনো রাষ্ট্রের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য প্রকাশ করা সম্ভব নয়। এই গভীর রাজনৈতিক হতাশা এবং বঞ্চনাবোধ থেকেই মূলত একটি নতুন রাষ্ট্রীয় ধারণার সূত্রপাত ঘটে। সাধারণ মানুষ ধর্মের আবরণের বাইরে এসে নিজেদের একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের সন্তান হিসেবে ভাবতে শুরু করে। তারা বুঝতে শেখে, তাদের আসল পরিচয় তাদের মাটি এবং ভাষায় লুকিয়ে আছে, ভিনদেশি কোনো শাসকের চাপিয়ে দেওয়া ধর্মীয় বয়ানে নয়। এই যে নিজেদের শেকড়ের দিকে ফিরে তাকানো এবং নিজেদের ভূখণ্ডকে ভালোবাসতে শুরু করা, এটিই মূলত স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ধারণায়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক পালাবদল ছিল। ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের স্ফুরণ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা ভাষা কোনো সাধারণ যোগাযোগের মাধ্যম নয়। এটি একটি মানুষের চিন্তার জগৎ, তার আবেগ এবং তার অস্তিত্বের সবচেয়ে বড় প্রকাশ। একটি জাতি কীভাবে চিন্তা করে, কীভাবে স্বপ্ন দেখে, তা তার ভাষার গাঁথুনিতে লুকিয়ে থাকে। পাকিস্তান রাষ্ট্রটি সৃষ্টির পরপরই যখন সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মুখের ভাষা বাংলাকে অবজ্ঞা করে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হলো, তখন তা এই জনপদের মানুষের অস্তিত্বের মূলে প্রচণ্ড আঘাত হানে। শাসকগোষ্ঠীর এই সিদ্ধান্ত কোনো সাধারণ প্রশাসনিক ভুল ছিল না। এটি ছিল মূলত সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সংস্কৃতি এবং আত্মপরিচয় মুছে ফেলার এক সুপরিকল্পিত চক্রান্ত। মাতৃভাষা কেড়ে নেওয়ার অর্থ হলো একটি জাতির চিন্তার স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া এবং তাদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করা। এই চরম অন্যায়ের বিরুদ্ধে এখানকার ছাত্রসমাজ এবং সাধারণ মানুষ যেভাবে ফুঁসে উঠেছিল, তা পৃথিবীর ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি রাজপথে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে তারা যে ইতিহাস রচনা করেছিল, তা মূলত একটি নতুন জাতিরাষ্ট্রের ভ্রূণ রোপণ করে দিয়েছিল। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই জন্ম নেয় ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ (Linguistic Nationalism), যা ধর্মের বিভেদ মুছে ফেলে সব মানুষকে এক কাতারে দাঁড় করিয়ে দেয়। এই জাতীয়তাবাদের ধারণাটি বুঝতে হলে তাত্ত্বিক বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন (Benedict Anderson)-এর গবেষণার দিকে তাকাতে হয়। তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ইমাজিনড কমিউনিটিজ (Imagined Communities)-এ দেখিয়েছেন, কীভাবে একটি নির্দিষ্ট ভাষা এবং ছাপার অক্ষরের প্রসারের মাধ্যমে লাখ লাখ মানুষ, যারা একে অপরকে কখনো দেখেনি, তারা নিজেদের একটি অভিন্ন সম্প্রদায়ের অংশ হিসেবে কল্পনা করতে শুরু করে (Anderson, 1983)। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন এখানকার মানুষদের ঠিক সেইভাবেই একটি কাল্পনিক কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী সম্প্রদায়ের সুতোয় বেঁধে ফেলেছিল। হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ বা খ্রিষ্টান – সবাই বুঝতে পেরেছিল যে তাদের প্রথম এবং প্রধান পরিচয় তারা বাঙালি। ধর্মের ভিত্তিতে তৈরি হওয়া রাষ্ট্রের যে বয়ান, তা এই ভাষার দাবির কাছে পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। ভাষা আন্দোলন কেবল রাষ্ট্রভাষা প্রতিষ্ঠার কোনো খণ্ডিত দাবি ছিল না। এটি ছিল মূলত একটি ধর্মনিরপেক্ষ এবং অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনের প্রথম স্পষ্ট এবং জোরালো পদক্ষেপ। এই আন্দোলনের পর থেকে রাজনীতি আর কেবল মুষ্টিমেয় অভিজাতদের ড্রয়িংরুমের আড্ডায় সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা সাধারণ মানুষের চায়ের দোকানে এবং কৃষকের ফসলের মাঠে পৌঁছে যায়। ভাষার এই জাগরণ সমাজ এবং সংস্কৃতির প্রতিটি স্তরে এক অভূতপূর্ব রেনেসাঁ বা নবজাগরণের সৃষ্টি করে। সাহিত্য, নাটক, গান এবং শিল্পের অন্যান্য শাখায় বাঙালিরা নিজেদের স্বকীয়তাকে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসের সাথে তুলে ধরতে শুরু করে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম কিংবা লালন সাঁইয়ের দর্শনগুলো নতুন করে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। শাসকগোষ্ঠী বারবার রবীন্দ্রসংগীত সম্প্রচার নিষিদ্ধ করার মতো হাস্যকর সিদ্ধান্ত নিয়ে এই সাংস্কৃতিক জাগরণকে স্তব্ধ করার চেষ্টা করেছে। তারা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিল যে, মানুষের মুখের ভাষা এবং তার হাজার বছরের ঐতিহ্যকে কোনো সামরিক ডিক্রি দিয়ে মুছে ফেলা যায় না। এই সাংস্কৃতিক স্বাধিকারের সংগ্রাম মানুষের মনের ভেতরে এমন একটি অদৃশ্য রাষ্ট্রের মানচিত্র এঁকে দিয়েছিল, যা বাস্তব সীমানা তৈরি হওয়ার অনেক আগেই পূর্ণতা পেয়েছিল। সাধারণ মানুষ যখন একুশের প্রভাতফেরিতে খালি পায়ে হেঁটে শহীদ মিনারে ফুল দিতে যেত, তখন তারা মূলত একটি অসাম্প্রদায়িক এবং স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতিই তাদের অলিখিত আনুগত্য প্রকাশ করত। ভাষাভিত্তিক এই জাতীয়তাবাদই মূলত ভবিষ্যৎ মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে বড় আদর্শিক রসদ হিসেবে কাজ করেছে। অভ্যন্তরীণ উপনিবেশবাদ এবং অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রাম একটি রাষ্ট্র কেবল আবেগ বা ভাষার ওপর ভর করে টিকে থাকতে পারে না, তার জন্য একটি শক্ত অর্থনৈতিক ভিত্তি প্রয়োজন হয়। যুক্ত পাকিস্তানের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, এই বদ্বীপ অঞ্চলটি প্রতিনিয়ত চরম এবং নির্মম অর্থনৈতিক শোষণের শিকার হয়েছে। কাগজ-কলমে সবাই একই রাষ্ট্রের নাগরিক হলেও, সম্পদের বণ্টনের ক্ষেত্রে পূর্ব প্রান্তের মানুষদের সাথে পুরোপুরি সৎমায়ের মতো আচরণ করা হয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানে উৎপাদিত পাটের বৈদেশিক মুদ্রা দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে গড়ে তোলা হয়েছে সুরম্য অট্টালিকা, বিশাল সব শিল্পকারখানা এবং আধুনিক রাস্তাঘাট। অন্যদিকে, এই ভূখণ্ডের সাধারণ কৃষকরা তাদের ফসলের ন্যায্য মূল্যটুকুও পায়নি। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এই অদ্ভুত এবং বৈষম্যমূলক সমীকরণকে তাত্ত্বিকরা অভ্যন্তরীণ উপনিবেশবাদ (Internal Colonialism) হিসেবে আখ্যায়িত করেন। ব্রিটিশরা যেমন ভারতবর্ষ থেকে সম্পদ লুটে নিয়ে নিজেদের দেশ গড়েছিল, পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীও ঠিক একই কায়দায় পূর্ব পাকিস্তানকে নিজেদের একটি কাঁচামাল সরবরাহের এবং উৎপাদিত পণ্য বিক্রির একচেটিয়া বাজার হিসেবে ব্যবহার করছিল। অর্থনৈতিক এই ভয়াবহ বঞ্চনার বিষয়টি দেশের সচেতন অর্থনীতিবিদ এবং চিন্তাবিদদের দৃষ্টি এড়ায়নি। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহানসহ অনেকেই অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে এই বৈষম্যের পরিসংখ্যানগুলো সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরেন। তারা একটি চমৎকার তাত্ত্বিক কাঠামোর মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে, পাকিস্তানের ভেতরে মূলত দুটি সম্পূর্ণ আলাদা অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কাজ করছে। এই ধারণাকেই দুই অর্থনীতি তত্ত্ব (Two-Economy Theory) বলা হয় (Sobhan, 1992)। এই তত্ত্ব সাধারণ মানুষকে তাদের দারিদ্র্য এবং পিছিয়ে পড়ার আসল কারণটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। মানুষ বুঝতে পারে, তাদের এই দুর্দশা কোনো প্রাকৃতিক নিয়তি নয়, এটি সম্পূর্ণ একটি মানবসৃষ্ট এবং রাজনৈতিক শোষণের ফলাফল। ব্যাংকিং খাত থেকে শুরু করে বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিকানা সবই ছিল পশ্চিম পাকিস্তানিদের হাতে। কোনো বাঙালি উদ্যোক্তা চাইলেও সহজে ব্যাংক থেকে ঋণ পেতেন না। এই চরম কাঠামোগত বৈষম্য সাধারণ মানুষের মনে পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতি তীব্র ক্ষোভ এবং চরম ঘৃণার জন্ম দেয়। তারা উপলব্ধি করে, এই শোষণের জাঁতাকল থেকে মুক্তি না পেলে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম চিরকাল পরাধীনতার গ্লানি বয়ে বেড়াবে। অর্থনৈতিক মুক্তির এই প্রবল আকাঙ্ক্ষা থেকেই মূলত ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবির জন্ম হয়। ১৯৬৬ সালে পেশ করা এই ছয় দফা কোনো সাধারণ রাজনৈতিক ইশতেহার ছিল না। এটি ছিল বাঙালি জাতির অর্থনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার এক পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা। এই দফার মূল কথা ছিল, দেশরক্ষা এবং পররাষ্ট্রনীতি ছাড়া রাষ্ট্রের বাকি সব ক্ষমতা প্রদেশের হাতে ছেড়ে দিতে হবে এবং প্রদেশগুলো নিজেদের ইচ্ছেমতো কর আদায় ও বৈদেশিক বাণিজ্য করতে পারবে। সাধারণ মানুষ খুব দ্রুতই এই দাবিগুলোকে নিজেদের মুক্তির সনদ হিসেবে গ্রহণ করে। ছয় দফার কারণে তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্ব সাধারণ মানুষের কাছে অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত হন। শাসকগোষ্ঠী এই দাবিকে বিচ্ছিন্নতাবাদের ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যায়িত করে রাজনৈতিক নেতাদের কারাগারে বন্দি করে রাখে। কিন্তু এই দমন-পীড়ন সাধারণ মানুষকে দমাতে পারেনি। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে কৃষক, শ্রমিক এবং ছাত্রসমাজ একযোগে রাজপথে নেমে আসে। তারা প্রমাণ করে দেয়, অর্থনৈতিক স্বাধিকারের দাবি এখন আর কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি পুরো জাতির বাঁচার দাবিতে পরিণত হয়েছে। এই অর্থনৈতিক বঞ্চনাবোধই মূলত স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং বাস্তবসম্মত চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। মুক্তিযুদ্ধ এবং গণপ্রজাতন্ত্রের আইনি ও দার্শনিক ভিত্তি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ কোনো আকস্মিক বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন ছিল না। এটি ছিল দীর্ঘ দুই দশকের ধারাবাহিক বঞ্চনা, শোষণ এবং সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে একটি জাতির চূড়ান্ত ঘুরে দাঁড়ানো। শাসকগোষ্ঠী যখন ব্যালট পেপারের গণতান্ত্রিক রায়কে বুলেটের মাধ্যমে স্তব্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল, তখন সাধারণ মানুষের সামনে সশস্ত্র প্রতিরোধ ছাড়া আর কোনো বিকল্প পথ খোলা ছিল না। ২৫শে মার্চ কালরাতের ভয়াবহ গণহত্যা প্রমাণ করে দেয়, যে রাষ্ট্র তার নিজের নাগরিকদের ওপর ট্যাংকার এবং মেশিনগান নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে, সেই রাষ্ট্রের প্রতি ন্যূনতম আনুগত্য রাখার কোনো আইনি বা নৈতিক বাধ্যবাধকতা থাকে না। এই রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম মূলত একটি জনযুদ্ধ (People’s War) ছিল, যেখানে প্রথাগত সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি সাধারণ কৃষক, শ্রমিক এবং ছাত্ররা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছিল। এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ একটি নতুন রাষ্ট্রের ধারণায়নকে এক অভাবনীয় নৈতিক শক্তি প্রদান করে। সাধারণ মানুষ নিজেদের রক্ত এবং জীবনের বিনিময়ে যে রাষ্ট্রটি স্বাধীন করছিল, তারা স্বভাবতই সেই রাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ মালিকানা দাবি করেছিল। স্বাধীনতার এই ঘোষণাকে প্রাতিষ্ঠানিক এবং আইনি রূপ দেওয়ার জন্য ১৯৭১ সালের ১০ই এপ্রিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র জারি করা হয়। এই ঘোষণাপত্রটি নতুন রাষ্ট্রের প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনি দলিল। আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে এই দলিলের মাধ্যমে রাষ্ট্রটি বিশ্বমঞ্চে নিজেদের একটি স্বাধীন সত্তা হিসেবে দাবি করে। এই ঘোষণাপত্রে সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করার কথা অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়। একটি রাষ্ট্র কেবল কিছু ভূখণ্ড আর ক্ষমতার সমষ্টি নয়। তাত্ত্বিক জঁ-জাক রুসো (Jean-Jacques Rousseau) তাঁর দ্য সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট (The Social Contract) বইয়ে বলেছেন, একটি রাষ্ট্র মূলত তার নাগরিকদের সাথে করা একটি চুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। স্বাধীনতার এই ঘোষণাপত্রটি ছিল মূলত সেই অলিখিত সামাজিক চুক্তির একটি আনুষ্ঠানিক রূপ, যেখানে রাষ্ট্র তার প্রতিটি নাগরিককে সমমর্যাদা এবং অধিকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়। এই দার্শনিক ভিত্তিটি অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল, কারণ এটি দীর্ঘদিনের বৈষম্য এবং শোষণের অভিজ্ঞতা থেকে জন্ম নিয়েছিল। সাধারণ মানুষ এমন একটি রাষ্ট্র চেয়েছিল, যেখানে কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণি বা গোষ্ঠীর একচেটিয়া আধিপত্য থাকবে না। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে যে সংবিধান প্রণয়ন করা হয়, তা মূলত রাষ্ট্রের এই দার্শনিক ভিত্তিরই এক পূর্ণাঙ্গ এবং লিখিত দলিল। সংবিধানে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রের চারটি মূল স্তম্ভ হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এই নীতিগুলো কোনো আকাশ থেকে পড়া আদর্শ ছিল না, এগুলো ছিল মূলত এই জনপদের মানুষের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংগ্রামের সরাসরি ফসল। সংবিধানে রাষ্ট্রটিকে একটি গণপ্রজাতন্ত্র (Republic) হিসেবে ঘোষণা করা হয়, যার সহজ অর্থ হলো এই রাষ্ট্রের সমস্ত ক্ষমতার চূড়ান্ত মালিক হবে সাধারণ জনগণ। কোনো রাজা, মহারাজা বা সামরিক জান্তার স্থান এই রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে রাখা হয়নি। সংবিধানে ধর্ম, বর্ণ এবং লিঙ্গ নির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকারের কথা অত্যন্ত জোরালোভাবে বলা হয়। তবে, সংবিধানের এই সুন্দর এবং আদর্শিক কথাগুলো বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করাটা সদ্য স্বাধীন একটি দেশের জন্য মোটেও সহজ কাজ ছিল না। যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি এবং ভঙ্গুর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর কারণে রাষ্ট্রের এই আদর্শিক রূপরেখা অনেক ক্ষেত্রেই হোঁচট খেয়েছে। তারপরও, এই আইনি এবং দার্শনিক ভিত্তিগুলো আজও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। বিশ্বায়নের অভিঘাত এবং রাষ্ট্রের আধুনিক রূপান্তর একটি রাষ্ট্রের ধারণা সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হতে থাকে। সত্তর দশকের একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত এবং সাহায্যনির্ভর দেশ থেকে একুশ শতকের আধুনিক পৃথিবীতে এসে রাষ্ট্রটি এক সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ ধারণ করেছে। নব্বইয়ের দশকের পর থেকে পুরো পৃথিবী বিশ্বায়ন (Globalization)-এর প্রবল স্রোতে ভাসতে শুরু করে। এই নতুন বিশ্বব্যবস্থায় তথ্য, প্রযুক্তি এবং পুঁজি খুব দ্রুত এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাতায়াত করতে সক্ষম হয়। বদ্বীপের এই রাষ্ট্রটিও নিজেদের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখার জন্য এই বিশ্বায়নের সাথে তাল মেলাতে বাধ্য হয়। তারা বুঝতে পারে, কেবল বিদেশি সাহায্যের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘকাল টিকে থাকা সম্ভব নয়। রাষ্ট্র অত্যন্ত সুচিন্তিতভাবে নিজেদের অফুরন্ত সস্তা শ্রমকে পুঁজি করে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তৈরি পোশাক শিল্প এবং মানবসম্পদ রপ্তানি দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। এই রূপান্তরটি প্রমাণ করে, রাষ্ট্র এখন আর কেবল সীমানা রক্ষার কাজে সীমাবদ্ধ নেই। তারা এখন আন্তর্জাতিক পুঁজির সাথে নিরন্তর দরকষাকষি করছে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির একটি সক্রিয় অংশে পরিণত হয়েছে। বিশ্বায়নের এই যুগে রাষ্ট্রের কাজের ধরন বিশ্লেষণ করার জন্য তাত্ত্বিকরা উন্নয়নকামী রাষ্ট্র (Developmental State) ধারণার অবতারণা করেছেন। প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী চ্যামার্স জনসন (Chalmers Johnson) জাপানের অর্থনীতির উত্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রথম এই ধারণাটি সামনে আনেন (Johnson, 1982)। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, রাষ্ট্র নিজেই দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল কারিগর হিসেবে কাজ করে এবং বেসরকারি খাতকে নানাভাবে সাহায্য করে। এই ভূখণ্ডেও রাষ্ট্র ঠিক একই ধরনের ভূমিকা পালন করছে। তারা দেশের ভেতরে বিশাল বিশাল অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি করছে, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য নানা রকম প্রণোদনা দিচ্ছে এবং যোগাযোগ অবকাঠামোর ব্যাপক উন্নতি সাধন করছে। পদ্মাসেতু বা মেট্রো রেলের মতো মেগা প্রকল্পগুলো কেবল যাতায়াতের মাধ্যম নয়, এগুলো মূলত রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং আত্মবিশ্বাসের এক বিশাল প্রতীক। রাষ্ট্র এখন বিশ্বমঞ্চে নিজেদের একটি আধুনিক, প্রযুক্তিবান্ধব এবং বিনিয়োগের জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। সাহায্যনির্ভরতার গ্লানি মুছে ফেলে একটি বাণিজ্যনির্ভর রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার এই যাত্রা সত্যিই অভাবনীয়। তবে বিশ্বায়নের এই অবাধ প্রবাহ রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ধারণায় এক নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। বড় বড় বহুজাতিক কোম্পানি এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক সময় রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তগুলোকে দারুণভাবে প্রভাবিত করে। বিশ্ববাজারের নানা রকম পরিবেশগত এবং শ্রম অধিকার সংক্রান্ত শর্ত পূরণ করতে গিয়ে রাষ্ট্রকে অনেক সময় দেশের ভেতরের কারখানার মালিকদের ওপর কঠোর নিয়মকানুন চাপিয়ে দিতে হয়। অর্থাৎ, বিদেশের বাজারের চাহিদার কারণে দেশের ভেতরের আইনকানুন পরিবর্তন করতে হচ্ছে। এটি প্রমাণ করে যে, আধুনিক বিশ্বে কোনো রাষ্ট্রই একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো বাঁচতে পারে না। রাষ্ট্রকে প্রতিনিয়ত বাইরের পৃথিবীর এই প্রবল চাপের সাথে নিজেদের মানিয়ে নিতে হয়। তাছাড়া, সাইবার নিরাপত্তা বা জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলো এখন রাষ্ট্রের প্রথাগত সীমানার ধারণাকে পুরোপুরি অর্থহীন করে দিয়েছে। একটি দেশের সার্ভার হ্যাক করে হাজার মাইল দূর থেকে দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়া সম্ভব। এই পরিবর্তনশীল এবং চরম প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে টিকে থাকার জন্য রাষ্ট্রকে প্রতিনিয়ত নিজেদের ধারণায়ন এবং কাজ করার কৌশল নতুন করে সাজাতে হচ্ছে। শ্রেণিদ্বন্দ্ব, সুশীল সমাজ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষা বাইরে থেকে একটি রাষ্ট্রকে যতই অখণ্ড এবং ঐক্যবদ্ধ মনে হোক না কেন, এর ভেতরে সব সময় নানা রকম বিভাজন এবং স্বার্থের সংঘাত চলতে থাকে। একটি রাষ্ট্র কখনো সব নাগরিকের জন্য সমানভাবে কাজ করতে পারে না। অর্থনীতি যত বড় হয়, সমাজে সম্পদের বৈষম্যও তত বাড়তে থাকে। এই ভূখণ্ডের ক্ষেত্রেও দেখা যায়, তৈরি পোশাক শিল্প বা মেগা প্রকল্পগুলোর কারণে একটি নির্দিষ্ট ব্যবসায়ী এবং কর্পোরেট গোষ্ঠী বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছে। রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণী পর্যায়গুলোতে এই সম্পদশালী গোষ্ঠীর এক বিশাল প্রভাব কাজ করে। তারা অনেক সময় নিজেদের ব্যবসার সুবিধার জন্য রাষ্ট্রের আইনকানুনগুলোকে নিজেদের ইচ্ছেমতো পরিবর্তন করিয়ে নেয়। সমাজবিজ্ঞানী এবং অর্থনীতিবিদরা এই অবস্থাকে এলিট ক্যাপচার (Elite Capture) হিসেবে আখ্যায়িত করেন। যখন রাষ্ট্রের ক্ষমতা এবং সম্পদ গুটিকয়েক মানুষের হাতে কুক্ষিগত হয়ে পড়ে, তখন সাধারণ কৃষক, শ্রমিক এবং প্রান্তিক মানুষগুলো উন্নয়নের সুফল থেকে বঞ্চিত হয়। এই কাঠামোগত বৈষম্য সমাজের ভেতরে এক ধরনের নীরব কিন্তু অত্যন্ত গভীর শ্রেণিদ্বন্দ্বের জন্ম দেয়। রাষ্ট্রের এই কাঠামোগত দুর্বলতাগুলোর কারণে অনেক সময় সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষার জন্য নতুন নতুন প্রতিষ্ঠানের উদ্ভব ঘটে। এই বদ্বীপ অঞ্চলে গত কয়েক দশকে হাজার হাজার বেসরকারি সংস্থা বা এনজিও (NGO) গড়ে উঠেছে, যারা মূলত শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে কাজ করছে। তাত্ত্বিক আন্তোনিও গ্রামশি (Antonio Gramsci) তাঁর বিশ্লেষণে সুশীল সমাজ (Civil Society)-এর যে ক্ষমতার কথা বলেছেন, এই এনজিও এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা মূলত সেই ক্ষমতারই একটি অংশ (Gramsci, 1971)। তারা অনেক সময় রাষ্ট্রের সেই কাজগুলো করে দেয়, যা রাষ্ট্রের একাই করার কথা ছিল। ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে লাখ লাখ গ্রামীণ নারীকে স্বাবলম্বী করার এই মডেলটি আজ সারা বিশ্বে প্রশংসিত। সুশীল সমাজের এই বিস্তৃতি প্রমাণ করে, রাষ্ট্রযন্ত্র একা সব সমস্যার সমাধান করতে পারে না। তবে অনেক সময় এই সুশীল সমাজের সাথে রাষ্ট্রের এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন তৈরি হয়। রাষ্ট্র অনেক সময় মনে করে, এই প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কাজে অযাচিত হস্তক্ষেপ করছে। আবার সুশীল সমাজ অভিযোগ করে, রাষ্ট্র সাধারণ মানুষের কথা না শুনে কেবল ক্ষমতাশালী গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করছে। এই নিরন্তর বিতর্ক এবং আলোচনা একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত জরুরি। দিন শেষে একটি রাষ্ট্রের আসল সার্থকতা লুকিয়ে থাকে এর সাধারণ মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর ওপর। কেবল জিডিপির প্রবৃদ্ধি বা বড় বড় দালানকোঠা একটি রাষ্ট্রের চূড়ান্ত সফলতা হতে পারে না। একটি রাষ্ট্রকে সব সময় চেষ্টা করতে হয় তার প্রতিটি নাগরিককে অন্তর্ভুক্ত করার। পাহাড়ি জনপদের একজন আদিবাসী, একজন দলিত নারী বা একজন রিকশাচালক – সবারই এই রাষ্ট্রের ওপর সমান অধিকার রয়েছে। রাষ্ট্র যদি কেবল রাজধানী কেন্দ্রিক বা এলিট কেন্দ্রিক হয়ে পড়ে, তবে সেই রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে টিকতে পারে না। লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে যে রাষ্ট্রটি জন্ম নিয়েছিল, তার মূল আকাঙ্ক্ষা ছিল এমন একটি সমাজ তৈরি করা, যেখানে কোনো মানুষ তার অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে না। সেই অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং মানবিক রাষ্ট্র গড়ার সংগ্রাম এখনো শেষ হয়নি। এটি একটি চলমান এবং অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়া। প্রতিনিয়ত ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বগুলো মিটিয়ে এবং সাধারণ মানুষের চাওয়া-পাওয়াগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়েই মূলত এই রাষ্ট্র সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের এই ধারণায়ন কোনো একটি নির্দিষ্ট সময়ে আটকে থাকা স্থির চিত্র নয়, এটি মূলত কোটি কোটি মানুষের স্বপ্ন এবং ঘামে ভেজা এক জীবন্ত এবং বহমান আখ্যান। জাতীয় স্বার্থ (National Interest) জাতীয় স্বার্থের মূল কথা ও বিবর্তন পররাষ্ট্রনীতির দাবার বোর্ডে আবেগের কোনো জায়গা নেই, সেখানে শুধুই নিরেট হিসাব-নিকাশ। একটি রাষ্ট্র সারাদিন যত কাজ করে, আন্তর্জাতিক ফোরামে যত বক্তৃতা দেয় কিংবা অন্য কোনো দেশের সাথে যত চুক্তি সই করে, তার সবকিছুর মূলেই থাকে একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য। এই অলিখিত কিন্তু ধ্রুব লক্ষ্যটির নাম জাতীয় স্বার্থ (National Interest)। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পণ্ডিতরা এই বিষয়টি নিয়ে বিস্তর গবেষণা করেছেন। তাদের মতে, বিশ্বমঞ্চে একটি রাষ্ট্রকে বুঝতে হলে তার স্বার্থের ভেতরের জায়গাটি সবার আগে বুঝতে হবে। প্রাচীনকালে বা মধ্যযুগে পরিস্থিতি অন্যরকম ছিল। তখন রাজার খেয়ালখুশিই ছিল রাষ্ট্রের ইচ্ছে। রাজা যদি মনে করতেন পাশের রাজ্যটি দখল করা দরকার, তবে বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে তিনি যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তেন। সাধারণ মানুষের সেখানে মতামতের কোনো সুযোগ ছিল না। সময়ের সাথে সাথে সভ্যতার চাকা ঘুরেছে এবং ধারণার ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। এখন আর কোনো একক ব্যক্তির ইচ্ছায় রাষ্ট্র চলে না। এখন রাষ্ট্রের নিজস্ব একটি গন্তব্য থাকে। সেই নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য রাষ্ট্র প্রতিনিয়ত নানামুখী ছক কষে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির এই বিশাল আঙিনায় কেউ কারও চিরস্থায়ী বন্ধু বা শত্রু নয়। চিরস্থায়ী কেবল এই স্বার্থ। এই নিরবচ্ছিন্ন এবং বাস্তববাদী চিন্তাধারার অন্যতম প্রধান প্রবক্তা হ্যান্স মরগেনথাউ তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ পলিটিক্স অ্যামাং নেশনস (Politics Among Nations)-এ বিষয়টি খুব পরিষ্কার করে তুলে ধরেছেন (Morgenthau, 1948)। তাঁর মতে, ক্ষমতাই হলো এই স্বার্থ আদায়ের মূল চাবিকাঠি এবং ক্ষমতা ছাড়া আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে টিকে থাকা অসম্ভব। রাষ্ট্রের সীমানার ভেতরে কোটি কোটি মানুষ বাস করে। স্বাভাবিকভাবেই তাদের সবার চাওয়া-পাওয়া একরকম হয় না। কেউ হয়তো চায় দেশে প্রচুর ভারী শিল্পকারখানা গড়ে উঠুক। একই সাথে অন্য একটি গোষ্ঠী হয়তো পরিবেশ বাঁচাতে সেই শিল্পকারখানার তীব্র বিরোধিতা করে। এত সব সাংঘর্ষিক ও ভিন্ন মতের মাঝে রাষ্ট্রের আসল স্বার্থ কোনটি, তা বের করা মোটেও সহজ কাজ নয়। জোসেফ ফ্রাঙ্কেল তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক বা সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীরা মূলত নিজেদের বিচার-বুদ্ধি ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করেই এই স্বার্থ নির্ধারণ করেন (Frankel, 1970)। তারা সবসময় দেশের বৃহত্তর কল্যাণের কথা মাথায় রাখার চেষ্টা করেন। তবে এই বৃহত্তর কল্যাণ বলতে আসলে কী বোঝায়, তা নিয়েও তাত্ত্বিকদের মধ্যে বিস্তর বিতর্ক আছে। এক দেশের কাছে যা কল্যাণকর বলে বিবেচিত হয়, অন্য দেশের কাছে ঠিক তা-ই হয়তো মারাত্মক বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে অনেকেই একটি বিশাল ও উন্মুক্ত বাজার হিসেবে দেখেন। এই বাজারে সবাই নিজের সর্বোচ্চ লাভ খুঁজছে। কেউ একটু বেশি লাভবান হচ্ছে, কেউ বা লোকসানের মুখে পড়ে হাবুডুবু খাচ্ছে। লোকসানের এই ধাক্কা ঠেকাতে রাষ্ট্রগুলো নিজেদের মধ্যে নানা রকম জোট বাঁধে। আবার যখন দেখা যায় জোট থেকে আর কোনো ফায়দা আসছে না, তখন অবলীলায় সেই জোট ভেঙেও দেয়। এই নিরন্তর ভাঙা-গড়ার খেলাই হলো আন্তর্জাতিক রাজনীতির মূল সুর। এখানে কোনো আদর্শ বা নৈতিকতার পাঠ নেই। বাস্তবে এখানে আছে কেবল টিকে থাকার প্রতিযোগিতা এবং যেকোনো মূল্যে নিজের হিস্যাটুকু বুঝে নেওয়ার অদম্য আকাঙ্ক্ষা। টিকে থাকার সংগ্রাম ও নিরাপত্তার সমীকরণ জাতীয় স্বার্থের তালিকা করতে বসলে সবার আগে যে বিষয়টি অনায়াসে চলে আসে, তা হলো টিকে থাকা। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিভাষায় একে বলা হয় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা। একটি রাষ্ট্রের যদি মানচিত্রে কোনো অস্তিত্বই না থাকে, তবে তার অন্য কোনো স্বার্থ নিয়ে আলোচনা করাটা একেবারেই অর্থহীন। মানবসমাজের একেবারে শুরুর দিকে মানুষ যেমন হিংস্র প্রাণীর হাত থেকে বাঁচতে দলবদ্ধ হয়ে গুহায় আশ্রয় নিত, রাষ্ট্রগুলোও তেমনি ধ্বংসের হাত থেকে নিজেদের বাঁচাতে নানা ধরনের কৌশল গ্রহণ করে। পৃথিবীতে রাষ্ট্রের ওপরে খবরদারি করার মতো কোনো কেন্দ্রীয় সরকার নেই। ভুল করলে বা বিপদে পড়লে পুলিশের কাছে গিয়ে সাহায্য চাওয়ার কোনো সুযোগ রাষ্ট্রের সামনে খোলা থাকে না। আন্তর্জাতিক কাঠামোর এই অভিভাবকহীন ও বিশৃঙ্খল অবস্থাকে তাত্ত্বিকরা নৈরাজ্য (Anarchy) বলে আখ্যায়িত করে থাকেন। এই নৈরাজ্যময় ব্যবস্থায় প্রতিটি রাষ্ট্রকে নিজের সুরক্ষার দায়িত্ব পুরোপুরি নিজেকেই নিতে হয়। ফলে রাষ্ট্রগুলো সবসময় এক ধরনের চাপা ভীতির মধ্যে বসবাস করে। ধরা যাক, প্রতিবেশী কোনো রাষ্ট্র সম্পূর্ণ আত্মরক্ষার জন্যই নিজস্ব সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছে। কিন্তু অন্য রাষ্ট্রটি দূর থেকে সেই প্রস্তুতি দেখে ভাবতে শুরু করে, হয়তো তাকে আক্রমণ করার জন্যই এই বিশাল আয়োজন চলছে। মূলত এই ভুল বোঝাবুঝি ও আস্থার অভাব থেকে তৈরি হয় নিরাপত্তা সংকট (Security Dilemma), যার কথা জন হার্জ খুব বিস্তারিতভাবে এবং নিখুঁত যুক্তির সাহায্যে আলোচনা করেছেন (Herz, 1950)। টিকে থাকার এই আদিম সংগ্রাম রাষ্ট্রকে কখনো কখনো বেশ কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে। আমরা ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখতে পাই, ছোট ও দুর্বল রাষ্ট্রগুলো বারবার বড় শক্তির নির্মম আক্রমণের শিকার হয়েছে। আবার অনেক সময় এই ছোট রাষ্ট্রগুলো নিজেদের অস্তিত্ব বাঁচাতে বড় কোনো শক্তির সাথে বাধ্য হয়ে হাত মিলিয়েছে। নিজের ভৌগোলিক সীমানা সুরক্ষিত রাখা, দেশের নাগরিকদের বাইরের যেকোনো আক্রমণ থেকে বাঁচানো – এগুলোই যেকোনো রাষ্ট্রের জন্য প্রাথমিক ও প্রধানতম লক্ষ্য। এই লক্ষ্য অর্জনে রাষ্ট্র প্রয়োজনে বড় ধরনের যুদ্ধে জড়াতেও সামান্যতম পিছপা হয় না। কোনো কোনো আধুনিক তাত্ত্বিক মনে করেন, রাষ্ট্রগুলো মূলত জন্মগতভাবে ক্ষমতালোভী নয়, তারা কেবল নিরাপদ একটি বলয়ে থাকতে চায়। তারা চায় না অন্য কোনো পরাশক্তি তাদের ওপর ছড়ি ঘোরাক বা খবরদারি করুক। এই স্বাধীনভাবে বাঁচার ইচ্ছাই মূলত তাদের পররাষ্ট্রনীতিকে পরিচালিত করে। তবে সব রাষ্ট্রের টিকে থাকার চ্যালেঞ্জ বা সমীকরণ কখনোই একরকম হয় না। চারদিকে সমুদ্রবেষ্টিত একটি দ্বীপরাষ্ট্রের নিরাপত্তার হিসাব-নিকাশ আর তিন দিক থেকে বৈরী শত্রুর দ্বারা পরিবেষ্টিত একটি স্থলবেষ্টিত রাষ্ট্রের হিসাব-নিকাশ সম্পূর্ণ আলাদা। ভৌগোলিক অবস্থান এখানে বড় একটি নির্ধারক হিসেবে কাজ করে। একারণে এক রাষ্ট্র যে কৌশল গ্রহণ করে সফল হয়, অন্য রাষ্ট্র হুবহু সেই কৌশল অনুসরণ করে কখনোই সফল হতে পারে না। নিজের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে নিজস্ব কৌশল উদ্ভাবন করাই হলো টিকে থাকার মূল শর্ত। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও সম্পদের লড়াই নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পর রাষ্ট্রের মনোযোগ স্বাভাবিকভাবেই ঘুরে যায় অর্থনীতির দিকে। কারণ বিশ্বমঞ্চে শুধু টিকে থাকাই তো শেষ কথা হতে পারে না। দেশের মানুষকে ভালোভাবে বাঁচাতে হবে। নাগরিকদের মুখে তিন বেলা খাবার তুলে দিতে হবে, তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে হবে। মূলত এই প্রাথমিক চাওয়া থেকেই জন্ম নেয় অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির প্রবল আকাঙ্ক্ষা। আজকের আধুনিক বিশ্বে সামরিক শক্তির চেয়ে অর্থনৈতিক শক্তি কোনো অংশেই কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। অনেক সময় দেখা যায়, সরাসরি কোনো যুদ্ধে না জড়িয়েও কেবল অর্থনৈতিক অবরোধ বা নিষেধাজ্ঞা দিয়ে একটি পরাক্রমশালী রাষ্ট্রকে কাবু করে ফেলা সম্ভব। এই নতুন ধরনের স্নায়ুযুদ্ধ বা সম্পদের লড়াইকে বলা হয় ভূ-অর্থনীতি (Geo-economics)। রাষ্ট্রগুলো এখন বিশ্বজুড়ে বাজার দখলের জন্য তীব্র প্রতিযোগিতা করে। কোথায় সস্তায় খনিজ পদার্থ বা কাঁচামাল পাওয়া যাবে, কোথায় নিজেদের তৈরি পণ্য বিনা বাধায় বিক্রি করা সহজ হবে – এসব জটিল হিসাব-নিকাশই এখন কূটনীতির বড় একটি অংশ। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নিজেদের অবস্থান মজবুত করার জন্য রাষ্ট্রগুলো বিভিন্ন আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক জোটে যোগ দেয়। রবার্ট কিওহ্যান এবং জোসেফ নাই তাদের যুগান্তকারী তত্ত্বে দেখিয়েছেন, আধুনিক রাষ্ট্রগুলো একে অপরের ওপর অত্যন্ত গভীরভাবে নির্ভরশীল (Keohane & Nye, 1977)। বিশ্বের এক প্রান্তে কোনো দেশে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিলে তার ঢেউ খুব দ্রুত অন্য প্রান্তের দেশগুলোতেও আছড়ে পড়ে। পারস্পরিক এই নির্ভরশীলতার কারণে আধুনিক পররাষ্ট্রনীতিতে নয়া-উদারনীতিবাদ (Neo-liberalism) বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চিন্তাধারায় বিশ্বাসীরা দৃঢ়ভাবে মনে করেন, রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্য বাড়লে বড় ধরনের যুদ্ধের আশঙ্কা বহুগুণে কমে যায়। কারণ কোনো যুদ্ধে জড়ালে দুই পক্ষেরই বাণিজ্যের ব্যাপক ক্ষতি হবে, আর সেই নিশ্চিত ক্ষতি কেউ স্বেচ্ছায় মেনে নিতে চায় না। তাই নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার্থেই রাষ্ট্রগুলো সংঘাতের বদলে শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ খোঁজে। উদাহরণস্বরূপ ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের কথা খুব সহজেই বলা যায়। একসময়কার যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলো কেবল অর্থনৈতিক স্বার্থের কারণেই এক ছাতার নিচে জড়ো হয়েছে। তারা নিজেদের মধ্যে সীমানার কড়াকড়ি তুলে দিয়েছে, অভিন্ন মুদ্রা ব্যবস্থা চালু করেছে। এই ব্যাপক অর্থনৈতিক একীভূতকরণ তাদের জাতীয় স্বার্থের সাথে খুব গভীরভাবে মিলে গেছে। তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। অনেক সময় বিশ্বমঞ্চের বড় অর্থনৈতিক শক্তিগুলো ছোট ও দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর ওপর নানা ধরনের অন্যায় শর্ত চাপিয়ে দেয়। ঋণের কঠিন ফাঁদে ফেলে ছোট দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ বন্দর বা প্রাকৃতিক সম্পদ কুক্ষিগত করার চেষ্টা করে। তখন সেই দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর জন্য একদিকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করা আর অন্যদিকে নিজেদের স্বাধীনতা রক্ষা করা – এই দুইয়ের মধ্যে সঠিক সমন্বয় করা ভীষণ কঠিন হয়ে পড়ে। এরপরও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির এই অন্তহীন ইঁদুর দৌড় থেকে কোনো রাষ্ট্রেরই সহজে বের হয়ে আসার সুযোগ নেই। মতাদর্শ ও সাংস্কৃতিক প্রভাবের রাজনীতি জাতীয় স্বার্থ কেবল আধুনিক অস্ত্র, সামরিক জোট আর টাকাপয়সার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর একটি সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক দিকও রয়েছে, যা অনেক সময় অস্ত্রের চেয়েও বেশি কার্যকর। রাষ্ট্রগুলো সব সময় চায় তাদের নিজস্ব মতাদর্শ এবং সংস্কৃতি বিশ্বজুড়ে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হোক। স্নায়ুযুদ্ধের দীর্ঘ সময়ে আমরা দেখেছি কীভাবে পুরো পৃথিবী দুটি স্পষ্ট ভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। একদল ছিল পুঁজিবাদের কট্টর পক্ষে, আর অন্যদল ছিল সমাজতন্ত্রের লাল পতাকার নিচে। এই দীর্ঘমেয়াদী মতাদর্শগত সংঘাত (Ideological Conflict) সে সময় বড় বড় রাষ্ট্রগুলোর পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছিল। একটি রাষ্ট্র সাধারণত তার নিজস্ব মতাদর্শকে শ্রেষ্ঠ মনে করে এবং চায় অন্যরাও তা বিনাবাক্যে মেনে নিক। কারণ মতাদর্শের মিল থাকলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বন্ধু বানানো অনেক সহজ হয়। গণতান্ত্রিক দেশগুলো সাধারণত অন্য গণতান্ত্রিক দেশের সাথে সম্পর্ক রাখতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। আবার একনায়কতান্ত্রিক বা স্বৈরতান্ত্রিক দেশগুলো নিজেদের মধ্যে এক ধরনের অলিখিত জোট তৈরি করার চেষ্টা করে। আলেকজান্ডার ওয়েন্ট তাঁর তত্ত্বে খুব চমৎকারভাবে দেখিয়েছেন, রাষ্ট্রগুলোর আচরণ কেবল বস্তুগত স্বার্থ বা সামরিক হিসাব-নিকাশ দিয়ে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায় না; তাদের নিজস্ব পরিচয় এবং বিশ্বাসও খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে (Wendt, 1999)। এই নতুন তত্ত্বটিকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিভাষায় গঠনবাদ (Constructivism) বলা হয়। বিশ্বমঞ্চে নীরব ও সাংস্কৃতিক প্রভাব বিস্তার করাও জাতীয় স্বার্থের একটি বড় এবং শক্তিশালী অংশ। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একটি দেশের ভাবমূর্তি কেমন, তার ওপর অনেক গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত নির্ভর করে। একটি দেশের সাহিত্য, চলচ্চিত্র, গান বা খাদ্যাভ্যাস যদি অন্য কোনো দেশে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়, তবে সেই দেশের প্রতি সাধারণ মানুষের মনে এক ধরনের ইতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। এই সফট পাওয়ার বা ইতিবাচক ধারণাকে পুঁজি করে রাষ্ট্র অনেক বড় কূটনৈতিক ফায়দা লুটতে পারে। কোনো একটি দেশের ভাষা শিখতে যদি ভিনদেশি মানুষ প্রবল আগ্রহী হয়, তবে বুঝতে হবে বিশ্বমঞ্চে সেই দেশের সাংস্কৃতিক প্রভাব দ্রুত বাড়ছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে তাই শুধু শুষ্ক চুক্তিপত্র আর সামরিক মহড়ার চশমা দিয়ে দেখলে বড় ধরনের ভুল হবে। এখানে মানুষের মনস্তত্ত্বের সূক্ষ্ম খেলা চলে প্রতিনিয়ত। বড় রাষ্ট্রগুলো বিশাল অংকের অর্থ খরচ করে বহির্বিশ্বে নিজেদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার জন্য। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে নিজেদের সপক্ষে অবিরাম প্রচার চালায়, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচির আয়োজন করে। মনে রাখতে হবে, এগুলো কোনোটিই বিনা স্বার্থে বা দাতব্য কারণে করা হয় না। এর প্রতিটির পেছনে থাকে রাষ্ট্রের সুনির্দিষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য। আজ যে দেশের চমৎকার সংস্কৃতি বা সিনেমা আপনার ভালো লাগছে, কাল হয়তো সেই দেশের কোনো বিতর্কিত রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে আপনি অবচেতনভাবেই সমর্থন দিয়ে বসবেন। রাষ্ট্র মানুষের এই মনস্তত্ত্বটি খুব ভালো করেই বোঝে এবং কাজে লাগায়। জাতীয় স্বার্থ নির্ধারণের অভ্যন্তরীণ সমীকরণ জাতীয় স্বার্থ নামক এই জটিল ও বিমূর্ত বস্তুটি আসলে কারা নির্ধারণ করে? বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, পুরো দেশ বুঝি একসুরে কথা বলছে এবং সবাই একমত। বাস্তবে কিন্তু ভেতরের চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। একটি দেশের সীমানার ভেতরে নানা ধরনের শক্তিশালী গোষ্ঠী থাকে। সামরিক বাহিনী, বড় ব্যবসায়ী মহল, আমলাতন্ত্র, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ জনগণ – এদের সবার স্বার্থ কখনো এক বিন্দুতে মেলে না। রবার্ট পুটনাম তাঁর বিখ্যাত গবেষণায় পররাষ্ট্রনীতিকে একটি ‘টু-লেভেল গেম’ বা দ্বি-স্তর বিশিষ্ট খেলা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন (Putnam, 1988)। তাঁর মতে, দেশের নেতাদের একই সাথে আন্তর্জাতিক মঞ্চে এবং দেশের ভেতরের রাজনৈতিক মঞ্চে এক দারুণ ভারসাম্য বজায় রেখে চলতে হয়। বাইরে তারা অন্য দেশের প্রতিনিধিদের সাথে কঠিন দরকষাকষি করেন, আবার দেশে ফিরে সেই চুক্তিকে সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলার চেষ্টা করেন। যদি দেশের মানুষ সেই চুক্তি কোনো কারণে মেনে না নেয়, তবে নেতার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার বা সরকারের পতন ঘটার শঙ্কা থাকে। তাই জাতীয় স্বার্থ নির্ধারণের প্রক্রিয়াটি কখনোই মসৃণ বা সরলরৈখিক হয় না। এটি মূলত বিভিন্ন প্রভাবশালী গোষ্ঠীর মধ্যে এক ধরনের নিরন্তর দড়ি টানাটানির চূড়ান্ত ফল। এই দড়ি টানাটানিতে অনেক সময় সমাজের সবচেয়ে শক্তিশালী গোষ্ঠীগুলোই জয়লাভ করে। যেমন, কোনো দেশের অস্ত্র ব্যবসায়ীরা যদি সরকারের ভেতরে খুব প্রভাবশালী হয়, তবে তারা চাইবে রাষ্ট্র যেন সবসময় যুদ্ধের এক ধরনের আবহ বা প্রস্তুতি নিয়ে থাকে। কারণ যুদ্ধ বা সীমান্ত উত্তেজনা থাকলেই তাদের অস্ত্রের ব্যবসা রমরমা চলবে। আবার অন্যদিকে কোনো দেশের রপ্তানিকারক বা গার্মেন্টস মালিকরা চাইবে অন্য দেশের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে, যাতে তাদের তৈরি পণ্য বিক্রিতে কোনো ধরনের বাধা বা শুল্ক না আসে। দেশের ভেতরের এই ভিন্ন ভিন্ন স্বার্থের সংঘাতকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বহুত্ববাদ (Pluralism) বলে থাকেন। তবে রাষ্ট্রের সব সিদ্ধান্তই যে শুধু অভ্যন্তরীণ চাপে নেওয়া হয়, তা কিন্তু নয়। অনেক সময় রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অবস্থান বা ভৌগোলিক রাজনীতি (Geopolitics) একটি সরকারকে কিছু নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে। দেশের ভেতরে যতই রাজনৈতিক মতবিরোধ বা বিভাজন থাকুক না কেন, সীমান্ত দিয়ে বাইরের কোনো শত্রুর আক্রমণ হলে সবাই একজোট হতে বাধ্য হয়। অর্থাৎ, জাতীয় স্বার্থ নির্ধারণের ক্ষেত্রে দেশের ভেতরের নানা সমীকরণ যেমন কাজ করে, তেমনি বাইরের বৈশ্বিক চাপও বড় ধরনের ভূমিকা রাখে। এই দুই প্রবল শক্তির মাঝখানে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রনেতাদের সিদ্ধান্ত নিতে হয়, যা অনেক সময়ই বেশ কঠিন এবং জনগণের কাছে অজনপ্রিয় হতে পারে। পরিবর্তনশীল বিশ্বে জাতীয় স্বার্থের নতুন রূপ আমাদের চারপাশের পৃথিবী খুব দ্রুত বদলাচ্ছে, আর তার সাথে তাল মিলিয়ে প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে জাতীয় স্বার্থের সংজ্ঞাও। আগে জাতীয় স্বার্থ বলতে প্রধানত নিজেদের সীমান্ত রক্ষা আর অন্য দেশের সাথে যুদ্ধ জয়কেই বোঝানো হতো। এখনকার পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। বিশ্বায়ন (Globalization) পুরো পৃথিবীর চেহারা এবং রাজনীতি পাল্টে দিয়েছে। এখন আর কেবল সীমানার কাঁটাতার দিয়ে দেশের ভেতরের সব বিপদ ঠেকানো যায় না। জলবায়ু পরিবর্তন, সাইবার আক্রমণ কিংবা বৈশ্বিক মহামারির মতো নতুন সংকটগুলো কোনো নির্দিষ্ট দেশের ভৌগোলিক সীমানা মেনে চলে না। এসব অদৃশ্য বিপদ থেকে বাঁচতে হলে রাষ্ট্রগুলোকে বাধ্য হয়েই একে অপরের সাথে সহযোগিতা করতে হয়। ব্যারি বুজান এই নতুন ধরনের হুমকিগুলোকে অ-প্রথাগত নিরাপত্তা (Non-traditional Security) হিসেবে চিহ্নিত করেছেন (Buzan, 1991)। এখন আর শুধু ট্যাংক আর যুদ্ধবিমান কিনলেই দেশের নিরাপত্তা পুরোপুরি নিশ্চিত হয় না। কার্বন নিঃসরণ কমানো, দেশের ইন্টারনেট ও ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে সুরক্ষিত রাখা এবং নাগরিকদের জনস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা – এগুলোও এখন রাষ্ট্রের টিকে থাকার অপরিহার্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি দেশের সার্ভার হ্যাক করে যদি পুরো যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল করে দেওয়া যায়, তবে সেখানে সামরিক বাহিনীর কিছুই করার থাকে না। এই পরিবর্তনশীল ও জটিল বিশ্বে জাতীয় স্বার্থ অর্জন করা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন। এক দেশের কারখানার বিষাক্ত ধোঁয়া অন্য দেশের নির্মল পরিবেশ নষ্ট করছে। এক দেশে তৈরি হওয়া নতুন কোনো ভাইরাস চোখের পলকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে কোনো রাষ্ট্রই একা একা নিজের স্বার্থ বা নিরাপত্তা রক্ষা করতে পারে না। বাধ্য হয়েই তাদের বহুপাক্ষিক কূটনীতির দ্বারস্থ হতে হচ্ছে। জাতিসংঘ বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মাধ্যমে সাধারণ সমস্যার একটি যৌথ সমাধান খোঁজার চেষ্টা চলছে প্রতিনিয়ত। তবে এখানেও সেই পুরোনো ক্ষমতার লড়াই ঠিকই রয়ে গেছে। বড় ও ধনী রাষ্ট্রগুলো পরিবেশ রক্ষার চুক্তিতে নিজেদের মনগড়া শর্ত চাপিয়ে দিতে চায়। অন্যদিকে ছোট রাষ্ট্রগুলো তাদের বাঁচার তাগিদে ন্যায্য হিস্যা আদায়ের আপ্রাণ চেষ্টা করে। অর্থাৎ, সমস্যার ধরন নতুন হলেও সমাধানের টেবিলে সেই পুরোনো জাতীয় স্বার্থের হিসাব-নিকাশই ফিরে আসে বারবার। ভবিষ্যৎ পৃথিবীতে হয়তো আরও নতুন নতুন ভয়াবহ সংকটের উদ্ভব হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি হয়তো আগামী দিনে বিশ্বরাজনীতির সমীকরণ পুরোপুরি পাল্টে দেবে। কিন্তু রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য সেই একই থাকবে – যেকোনো মূল্যে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এবং সমৃদ্ধির পথে আরও সামনে এগিয়ে যাওয়া। সময়ের সাথে সাথে রূপ বা কৌশল বদলালেও জাতীয় স্বার্থের এই চিরন্তন সত্য কখনোই মুছে যাবে না। বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল ও বহুমাত্রিক সমীকরণ ভূ-কৌশলগত অবস্থান এবং প্রথাগত প্রতিরক্ষার মনস্তত্ত্ব মানচিত্রের দিকে নিবিড়ভাবে তাকালে একটি রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষার মূল রূপরেখা খুব সহজেই অনুমান করা যায়। বদ্বীপ অঞ্চলের এই ভূখণ্ডের তিন দিক ঘিরে রয়েছে এক বিশাল আয়তনের শক্তিশালী প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত। একদিকে রয়েছে মিয়ানমারের দুর্গম সীমান্ত এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের উন্মুক্ত জলরাশি। এমন একটি ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় সরাসরি কোনো দীর্ঘমেয়াদী আক্রমণাত্মক যুদ্ধে জড়ানোর সুযোগ বা সামর্থ্য কোনোটিই এই রাষ্ট্রের হাতে নেই। এখানকার সামরিক পরিকল্পনাবিদরা খুব ভালো করেই জানেন, তাদের মূল লক্ষ্য অন্য ভূখণ্ড দখল করা নয়, বরং নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা। এই টিকে থাকার প্রধান সামরিক কৌশলটি আবর্তিত হয় প্রতিরোধ তত্ত্ব (Deterrence Theory)-এর চারপাশে। এই তত্ত্বের মূল কথা হলো, নিজের সামরিক সক্ষমতাকে এমন একটি পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া, যাতে যেকোনো সম্ভাব্য আক্রমণকারীর জন্য হামলার পরিণতি অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং ধ্বংসাত্মক হয়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ধ্রুপদী তাত্ত্বিক কেনেথ ওয়াল্টজ (Kenneth Waltz) তাঁর বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন, নৈরাজ্যকর বিশ্বব্যবস্থায় রাষ্ট্রগুলোকে নিজেদের সুরক্ষার জন্য নিজস্ব শক্তির ওপরই নির্ভর করতে হয়। এই বাস্তববাদ (Realism)-এর আলোকেই মূলত ফোর্সেস গোল ২০৩০-এর মতো দীর্ঘমেয়াদী সামরিক আধুনিকায়ন প্রক্রিয়া হাতে নেওয়া হয়েছে। নৌবাহিনীতে সাবমেরিন যুক্ত করা বা বিমানবাহিনীর জন্য অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান কেনার মূল উদ্দেশ্য সাগরে আধিপত্য বিস্তার নয়, বরং একটি নীরব এবং শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। প্রথাগত প্রতিরক্ষার এই মনস্তত্ত্বটি মূলত একটি সজারুর মতো। সজারু আকারে ছোট এবং নিরীহ হলেও, আক্রমণকারী জানে তাকে ঘাঁটাতে গেলে গায়ে ধারালো কাঁটা বিঁধতে বাধ্য। এই ভূখণ্ডের সামরিক বাহিনীও ঠিক সেই কাঁটার মতো নিজেদের প্রস্তুত রাখে। বিশাল প্রতিবেশীর সাথে প্রথাগত যুদ্ধে পেরে ওঠা কঠিন হবে জেনে তারা অসম যুদ্ধ (Asymmetric Warfare)-এর কৌশলগুলো নিয়ে নিবিড়ভাবে কাজ করে। এখানকার নদীমাতৃক ভূগোল, নরম কাদামাটি এবং বর্ষার প্লাবন কোনো ভিনদেশি সেনাবাহিনীর জন্য এক ভয়ংকর ফাঁদ। সামরিক বাহিনী এই প্রাকৃতিক দুর্গমতাকে নিজেদের কৌশলগত গভীরতা হিসেবে ব্যবহার করতে শেখে। একটি নিয়মিত বাহিনী যখন স্থানীয় জনগণের সাথে মিশে গিয়ে গেরিলা কায়দায় যুদ্ধ পরিচালনা করে, তখন যেকোনো পরাক্রমশালী সেনাবাহিনীর পক্ষেই সেই ভূখণ্ড দখল করে রাখা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা এই সামরিক মনস্তত্ত্বের সবচেয়ে বড় ভিত্তিপ্রস্তর। সেই সময়কার প্রতিরোধ ব্যবস্থা প্রমাণ করেছে, কেবল অস্ত্র দিয়ে একটি জনযুদ্ধকে স্তব্ধ করা যায় না। আধুনিক সমরাস্ত্র কেনার পাশাপাশি সামরিক বাহিনীর সদস্যদের মনস্তাত্ত্বিক দৃঢ়তা এবং সাধারণ মানুষের সাথে তাদের আস্থার সম্পর্ক তৈরি করার দিকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই নিখুঁত প্রস্তুতি এবং লড়াকু মানসিকতাই মূলত রাষ্ট্রের প্রথাগত প্রতিরক্ষার সবচেয়ে বড় অদৃশ্য বর্ম। সীমান্ত সুরক্ষার ক্ষেত্রে প্রথাগত সামরিক হুমকির বাইরেও নানা ধরনের দৈনন্দিন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়। চোরাচালান, মানব পাচার এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণের জন্য সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে সব সময় সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় থাকতে হয়। প্রতিবেশী দেশের সীমান্তরক্ষীদের সাথে অনেক সময় অনাকাঙ্ক্ষিত গোলাগুলির ঘটনা ঘটে, যা সাধারণ মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। এই ধরনের উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে সামরিক বাহিনীকে চরম পেশাদারিত্ব এবং ধৈর্য প্রদর্শন করতে হয়। হুট করে কোনো সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়লে তা দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতির জন্য কত বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে, নীতিনির্ধারকরা তা খুব ভালোভাবেই অনুধাবন করেন। তাই উসকানির মুখেও তারা আলোচনার টেবিলে বসে সমস্যার সমাধান খোঁজার চেষ্টা করেন। এটি কোনো দুর্বলতা নয়, বরং এটি হলো বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থ রক্ষার্থে নেওয়া এক অত্যন্ত পরিণত সামরিক কূটনীতি। সশস্ত্র বাহিনীর কাজ কেবল সীমান্তে টহল দেওয়া নয়, তারা দেশের ভেতরে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নির্মাণেও বিরাট ভূমিকা রাখে। অর্থাৎ, প্রথাগত সামরিক বাহিনী এখানে কেবল যুদ্ধের হাতিয়ার নয়, তারা রাষ্ট্র গঠনের এক অপরিহার্য এবং বহুমুখী অংশীদার হিসেবে কাজ করে চলেছে। অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং সাপ্লাই চেইনের নতুন রাজনীতি আধুনিক বিশ্বে নিরাপত্তার সংজ্ঞা আর কেবল সেনা ব্যারাক বা অস্ত্রের গুদামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। একটি দেশের ভেতরে যদি খাদ্যের অভাব দেখা দেয় বা জ্বালানির অভাবে শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যায়, তবে সেই দেশের সামরিক বাহিনী যতই শক্তিশালী হোক না কেন, রাষ্ট্রযন্ত্র ভেতর থেকে ভেঙে পড়তে বাধ্য। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ মাহবুব উল হক (Mahbub ul Haq) তাঁর যুগান্তকারী মানব নিরাপত্তা (Human Security) তত্ত্বে দেখিয়েছেন, মানুষের পেটে ক্ষুধা থাকলে বা জীবনযাত্রার ন্যূনতম মান না থাকলে কোনো সীমানার নিরাপত্তাই আসলে কাজে আসে না। এই বদ্বীপ রাষ্ট্রের জন্য অর্থনৈতিক নিরাপত্তা তাই প্রথাগত সামরিক নিরাপত্তার চেয়ে কোনো অংশে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। দেশের কোটি কোটি মানুষের জন্য প্রতিদিনের খাদ্য নিশ্চিত করা এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। এখানকার উর্বর জমি প্রচুর ফসল ফলায় ঠিকই, কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কোনো বছর ফসলের ক্ষতি হলে মুহূর্তের মধ্যে দেশে চরম হাহাকার দেখা দেয়। এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে দ্রুত খাদ্য আমদানি করতে হয় এবং জরুরি খাদ্যভান্ডার গড়ে তুলতে হয়। খাদ্যের এই নিরবচ্ছিন্ন জোগান নিশ্চিত করাটা এখন সরাসরি জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। অর্থনৈতিক নিরাপত্তার আরেকটি বড় দুর্বল জায়গা হলো জ্বালানি খাতের পরনির্ভরশীলতা। দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং শিল্পকারখানাগুলো সচল রাখার জন্য বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG), কয়লা এবং জ্বালানি তেল আমদানি করতে হয়। বিশ্ববাজারের এই সরবরাহ ব্যবস্থা বা সাপ্লাই চেইন অত্যন্ত ভঙ্গুর। পূর্ব ইউরোপ বা মধ্যপ্রাচ্যে কোনো সংঘাত তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম হু হু করে বাড়তে থাকে। সেই মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি ধাক্কা এসে লাগে দেশের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। পরিবহন খরচ বেড়ে যায়, জিনিসপত্রের দাম সাধারণের নাগালের বাইরে চলে যায়। এই পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করার জন্য তাত্ত্বিক রবার্ট কিওহ্যান (Robert Keohane) এবং জোসেফ নাই (Joseph Nye)-এর জটিল পারস্পরিক নির্ভরশীলতা (Complex Interdependence) তত্ত্বটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তাঁরা দেখিয়েছেন, বৈশ্বিক বাণিজ্যের সুতোয় রাষ্ট্রগুলো এমনভাবে বাঁধা পড়েছে যে, হাজার মাইল দূরের একটি ঘটনা মুহূর্তের মধ্যে অন্য একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা নষ্ট করে দিতে পারে। এই পরনির্ভরশীলতার ঝুঁকি কমানোর জন্য রাষ্ট্রকে এখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে নজর দিতে হচ্ছে এবং বিভিন্ন দেশের সাথে দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি চুক্তি স্বাক্ষর করতে হচ্ছে। অর্থনীতির লাইফলাইন বা জীবনীশক্তি মূলত সমুদ্রপথের ওপর দিয়ে বয়ে চলে। দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাক শিল্পের কাঁচামাল আসা এবং উৎপাদিত পণ্য বিদেশে যাওয়ার পুরো প্রক্রিয়াটি সমুদ্রবন্দরের ওপর নির্ভরশীল। বঙ্গোপসাগরের এই সমুদ্রপথগুলো যদি কোনো কারণে অবরুদ্ধ হয়ে যায়, তবে দেশের অর্থনীতি আক্ষরিক অর্থেই পঙ্গু হয়ে পড়বে। এই কারণে সি লাইন্স অব কমিউনিকেশন (SLOC) বা সামুদ্রিক যোগাযোগ পথ সুরক্ষিত রাখা নৌবাহিনীর প্রধান দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থনীতিবিদরা সমুদ্রের এই বিশাল সম্পদ এবং বাণিজ্য সম্ভাবনাকে নীল অর্থনীতি (Blue Economy) হিসেবে আখ্যায়িত করেন। বিদেশি ট্রলার যাতে অবৈধভাবে মাছ ধরতে না পারে বা কেউ যেন সাগরের তলদেশের সম্পদ লুট করতে না পারে, তার জন্য সমুদ্রে সার্বক্ষণিক নজরদারি প্রয়োজন। সমুদ্রবন্দরগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের কাজগুলো মূলত এই অর্থনৈতিক নিরাপত্তারই একেকটি দৃশ্যমান স্তম্ভ। সোজা কথায়, রাষ্ট্রের বর্তমান নিরাপত্তা কৌশল মূলত কারখানার চাকা সচল রাখা এবং বিশ্ববাজারের সাথে যুক্ত থাকার এই নিরন্তর লড়াইয়ের ওপরই শক্তভাবে দাঁড়িয়ে আছে। অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা এবং উগ্রবাদের মনস্তাত্ত্বিক মোকাবেলা ইতিহাসের পাতা ঘাটলে দেখা যায়, শক্তিশালী অনেক সাম্রাজ্য বাইরের শত্রুর আক্রমণের চেয়ে ভেতরের কোন্দল এবং অস্থিরতার কারণেই বেশি ধ্বংস হয়েছে। একটি রাষ্ট্রের জন্য অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা রক্ষা করা তাই সবচেয়ে বড় এবং জটিল চ্যালেঞ্জ। সমাজে যখন সম্পদের চরম বৈষম্য তৈরি হয় এবং একটি বড় অংশ নিজেদের বঞ্চিত ভাবতে শুরু করে, তখন সেখানে প্রাকৃতিকভাবেই অস্থিরতার বীজ বপিত হয়। সমাজবিজ্ঞানী টেড রবার্ট গুর (Ted Robert Gurr) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ হোয়াই মেন রিবেল (Why Men Rebel)-এ বঞ্চনা তত্ত্ব (Relative Deprivation Theory)-এর মাধ্যমে দেখিয়েছেন, মানুষের প্রাপ্তির প্রত্যাশা এবং বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান তৈরি হলে কীভাবে তারা সহিংস হয়ে ওঠে (Gurr, 1970)। চরমপন্থী এবং উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো সমাজের এই হতাশাগ্রস্ত তরুণদের খুব সহজেই নিজেদের দলে টেনে নেয়। তারা ধর্মের বা আদর্শের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে এই তরুণদের মনে রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতি চরম ঘৃণার জন্ম দেয়। এই ধরনের উগ্রবাদ মোকাবেলার কাজটা শুধু পুলিশের অভিযান বা গ্রেপ্তারের মাধ্যমে করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক এবং সামাজিক লড়াই, যেখানে ডি-র‍্যাডিক্যালাইজেশন বা মনস্তাত্ত্বিক পুনর্বাসন কর্মসূচি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে প্রতিনিয়ত এই অদৃশ্য শত্রুদের সাথে ইঁদুর-বিড়াল খেলা চালাতে হয়। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কগুলো এখন অনেক বেশি প্রযুক্তি-নির্ভর। তারা ডার্ক ওয়েব ব্যবহার করে যোগাযোগ করে এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে অর্থ লেনদেন করে। এই আধুনিক সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলার জন্য রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে প্রযুক্তিগতভাবে অনেক বেশি দক্ষ হতে হয়। সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা এবং বেসামরিক পুলিশ বাহিনীর মধ্যে তথ্যের নিখুঁত সমন্বয় থাকাটা এখানে জীবন-মরণের প্রশ্ন। একটি ছোট তথ্য হাতছাড়া হয়ে গেলে হোলি আর্টিজানের মতো ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার (Max Weber) রাষ্ট্রকে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে বলেছিলেন, কেবল রাষ্ট্রেরই বৈধভাবে বলপ্রয়োগের একচেটিয়া অধিকার রয়েছে। যখনই কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী বা চরমপন্থী নেটওয়ার্ক রাষ্ট্রের এই একচেটিয়া অধিকারে ভাগ বসাতে চায়, তখন রাষ্ট্রকে চরম কঠোরতা প্রদর্শন করতে হয়। জঙ্গিবাদ দমনে রাষ্ট্রের জিরো টলারেন্স নীতি মূলত সেই রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব টিকিয়ে রাখারই এক অবশ্যম্ভাবী পদক্ষেপ। তবে দীর্ঘমেয়াদে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে কেবল অস্ত্রের ব্যবহার যথেষ্ট নয়। একটি রাজনৈতিকভাবে মেরুকৃত এবং সামাজিকভাবে বিভক্ত দেশ যেকোনো বিদেশি শক্তির জন্য হস্তক্ষেপের উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করে দেয়। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যদি ন্যূনতম আস্থার সম্পর্ক না থাকে, তবে সমাজ খুব সহজেই গুজবের শিকার হয়। এই ধরনের পরিস্থিতি রোধ করার জন্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক কাঠামোর প্রয়োজন, যেখানে প্রতিটি নাগরিক মনে করবে রাষ্ট্রের ওপর তার সমান অধিকার রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রতিনিধি এবং সুশীল সমাজের নেতাদের দায়িত্ব হলো সমাজে পরমতসহিষ্ণুতা এবং সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া। সাধারণ মানুষ যখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা রাখে, তখন বাইরের কোনো উসকানি বা ভেতরের কোনো চরমপন্থা সহজে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে না। অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা মূলত একটি অদৃশ্য দেয়াল, যা রাষ্ট্রকে যেকোনো ধরনের ভূ-রাজনৈতিক ঝড় বা ষড়যন্ত্র থেকে অত্যন্ত শক্তভাবে আগলে রাখে। পরিবেশগত নিরাপত্তা এবং সম্পদ বণ্টনের ভূ-রাজনীতি প্রকৃতি কোনো দেশের রাজনৈতিক সীমানার তোয়াক্কা করে না। একটি বদ্বীপ অঞ্চলের জন্য প্রকৃতির এই খামখেয়ালিপনা মাঝেমধ্যেই এক অস্তিত্বের সংকটে রূপ নেয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা উপকূলীয় অঞ্চলের বিস্তীর্ণ কৃষিজমিকে লবণাক্ত করে তুলছে। লাখ লাখ মানুষ নিজেদের ভিটেমাটি হারিয়ে কাজের সন্ধানে শহরের দিকে পাড়ি জমাচ্ছে। এই মানুষগুলো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জলবায়ু উদ্বাস্তু (Climate Refugees) হিসেবে পরিচিত। পরিবেশ বিজ্ঞানী নরম্যান মায়ার্স (Norman Myers) এই ভয়াবহ পরিস্থিতিকে পরিবেশগত নিরাপত্তা (Environmental Security) হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর মতে, পরিবেশের ভারসাম্য একবার নষ্ট হয়ে গেলে সমাজে সম্পদের তীব্র অভাব দেখা দেয়, যা শেষ পর্যন্ত ভয়াবহ সামাজিক সংঘাতের দিকে নিয়ে যায়। শহরগুলোতে যখন হঠাৎ করে লাখ লাখ উদ্বাস্তু এসে জড়ো হয়, তখন বস্তিগুলো উপচে পড়ে এবং সুপেয় জল, বাসস্থান ও কর্মসংস্থানের চরম সংকট তৈরি হয়। এই অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং আর্থসামাজিক কাঠামোর ওপর এক বিশাল এবং অসহনীয় চাপ সৃষ্টি করে। পরিবেশগত এই নিরাপত্তার সাথে সরাসরি যুক্ত রয়েছে প্রাকৃতিক সম্পদের ভূ-রাজনীতি। এই ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া অধিকাংশ নদীর উৎপত্তিস্থল উজানের প্রতিবেশী দেশগুলোতে অবস্থিত। উজানের দেশগুলো যখন নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে বা বাঁধ নির্মাণ করে, তখন ভাটির দেশে শুষ্ক মৌসুমে চরম খরা এবং বর্ষায় প্রলয়ঙ্করী বন্যা দেখা দেয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গবেষক মার্ক জেইতুন (Mark Zeitoun) এবং জন ওয়ার্নার (John Warner) এই পরিস্থিতিকে হাইড্রো-হেজিমনি (Hydro-hegemony) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো পানির প্রবাহকে একটি নীরব অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে দুর্বল প্রতিবেশীদের ওপর নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখে। নদীর পানিবণ্টন নিয়ে দরকষাকষি করা তাই এখন আর কেবল পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের কাজ নয়, এটি কূটনীতির অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে। পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় করতে না পারলে দেশের কৃষিব্যবস্থা এবং জীববৈচিত্র্য চিরতরে ধ্বংস হয়ে যাবে, যা শেষ পর্যন্ত পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকেই পঙ্গু করে দেবে। জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় রাষ্ট্র এখন কেবল ত্রাণের ওপর নির্ভর না করে অভিযোজন বা অ্যাডাপটেশনের দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, লবণাক্ততা-সহিষ্ণু ধানের জাত উদ্ভাবন এবং আগাম সতর্কবার্তা পাঠানোর আধুনিক ব্যবস্থা মূলত এই অভিযোজন কৌশলেরই অংশ। আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলনগুলোতে রাষ্ট্র অত্যন্ত জোরালোভাবে দাবি তুলছে যেন উন্নত দেশগুলো তাদের কার্বন নিঃসরণের ঐতিহাসিক দায় স্বীকার করে এবং ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে ক্ষতিপূরণ প্রদান করে। পরিবেশগত কূটনীতি এখন প্রথাগত সামরিক কূটনীতির মতোই সমান গুরুত্ব বহন করে। কারণ পরাশক্তির কোনো বোমারু বিমান যে ক্ষতি করতে পারবে না, সমুদ্রের জলের নীরব আগ্রাসন তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে সক্ষম। এই প্রাকৃতিক শত্রুর বিরুদ্ধে লড়তে হলে রাষ্ট্রকে যেমন নিজের ভেতরের সক্ষমতা বাড়াতে হবে, তেমনি বৈশ্বিক ফোরামগুলোতে সমমনা দেশগুলোকে নিয়ে সম্মিলিতভাবে চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রাখতে হবে। সাইবার স্পেসের নতুন রণাঙ্গন এবং প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্ব আধুনিক যুদ্ধ এখন আর কেবল সমতল ভূমি, আকাশ বা সাগরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর একটি পঞ্চম মাত্রার উদ্ভব ঘটেছে, যার নাম সাইবার স্পেস। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে একটি দেশের সম্পূর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থা, ব্যাংক খাত বা বিদ্যুৎ গ্রিডকে অচল করে দেওয়ার জন্য কোনো দেশের সীমানা পেরিয়ে সৈন্য পাঠানোর প্রয়োজন পড়ে না। হাজার মাইল দূরে বসে একটি ল্যাপটপ এবং ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবহার করে হ্যাকাররা নিমিষেই একটি রাষ্ট্রের অর্থনীতিকে ধসিয়ে দিতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিমণ্ডলে এই নতুন হুমকির নাম দেওয়া হয়েছে সাইবার যুদ্ধ (Cyber Warfare)। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনাটি ছিল এই নতুন রণাঙ্গনের এক ভয়ংকর সতর্কবার্তা। ডিজিটাল অর্থনীতি এবং ই-গভর্ন্যান্সের দিকে রাষ্ট্র যত বেশি এগোচ্ছে, সাইবার আক্রমণের ঝুঁকিও ঠিক ততটাই বাড়ছে। গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো বা ক্রিটিক্যাল ইনফরমেশন ইনফ্রাস্ট্রাকচার রক্ষা করা এখন জাতীয় নিরাপত্তার একটি অবিচ্ছেদ্য এবং অত্যন্ত স্পর্শকাতর অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাইবার নিরাপত্তার বাইরে গিয়ে তথ্যপ্রযুক্তি এখন মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের একটি বড় হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোকে ব্যবহার করে প্রতিনিয়ত গুজব, মিথ্যা খবর এবং অপতথ্য ছড়ানো হচ্ছে। একটি বানোয়াট ভিডিও বা উসকানিমূলক পোস্ট মুহূর্তের মধ্যে লাখ লাখ মানুষের কাছে পৌঁছে গিয়ে সমাজে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বা রাজনৈতিক সহিংসতা তৈরি করতে পারে। সমাজবিজ্ঞানী মানুয়েল কাস্তেলজ (Manuel Castells) তাঁর দ্য রাইজ অফ দ্য নেটওয়ার্ক সোসাইটি (The Rise of the Network Society) গ্রন্থে দেখিয়েছেন, কীভাবে তথ্যের প্রবাহ আধুনিক সমাজে ক্ষমতার মূল কাঠামো নিয়ন্ত্রণ করে (Castells, 1996)। শত্রু রাষ্ট্র বা ভেতরের কোনো চরমপন্থী গোষ্ঠী এই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের মনোজগতে এক ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি করার চেষ্টা করে। এই ধরনের কগনিটিভ ওয়ারফেয়ার বা মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ মোকাবেলা করা অত্যন্ত দুরূহ একটি কাজ। ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া বা সামাজিক মাধ্যম ব্লক করা কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। এর জন্য প্রয়োজন ডিজিটাল লিটারেসি বাড়ানো এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে দ্রুত গুজব শনাক্ত করার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা তৈরি করা। প্রযুক্তির এই বিশ্বে টিকে থাকার জন্য রাষ্ট্রকে এখন নিজেদের প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্ব (Technological Sovereignty) অর্জনের দিকে মনোনিবেশ করতে হচ্ছে। বিদেশি হার্ডওয়্যার এবং সফটওয়্যারের ওপর অন্ধভাবে নির্ভর করাটা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বিশাল এক ঝুঁকি। বিদেশি কোম্পানিগুলো অনেক সময় সফটওয়্যারের ভেতরে ব্যাকডোর বা নজরদারির ব্যবস্থা লুকিয়ে রাখতে পারে। এই ঝুঁকি কমানোর জন্য নিজস্ব সাইবার কমান্ড তৈরি করা, দেশীয় এথিক্যাল হ্যাকারদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং নিজস্ব ডেটা সেন্টার স্থাপন করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। পরাশক্তিগুলো ইতিমধ্যেই সাইবার অস্ত্র তৈরিতে শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করছে। একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে সেই অসম প্রতিযোগিতায় সরাসরি অংশ নেওয়া সম্ভব না হলেও, একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষামূলক সাইবার দেয়াল তৈরি করা ছাড়া গত্যন্তর নেই। একুশ শতকের জাতীয় নিরাপত্তা মূলত এই ডিজিটাল সীমানা পাহারা দেওয়া এবং তথ্যের অখণ্ডতা বজায় রাখার এক নিরন্তর বুদ্ধিভিত্তিক যুদ্ধের ওপরই নির্ভর করছে। গোয়েন্দা কূটনীতি এবং পরাশক্তির সাথে কৌশলগত ভারসাম্য আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দৃশ্যমান মঞ্চে কূটনীতিকরা যখন হাসিমুখে করমর্দন করেন, তখন পর্দার আড়ালে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো রাষ্ট্রের আসল স্বার্থ রক্ষায় নীরবে কাজ করে যায়। একটি ভূ-রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় সঠিক এবং আগাম তথ্য পাওয়াটা এই রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। প্রতিবেশী দেশগুলোতে কী ঘটছে, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো কী পরিকল্পনা করছে বা চোরাকারবারিদের নতুন রুট কোনটি – এই সব তথ্য আগে থেকে জানা না থাকলে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ভয়াবহ হুমকির মুখে পড়ে। এই তথ্য সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে এক ধরনের পারস্পরিক সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যাকে গোয়েন্দা কূটনীতি (Intelligence Diplomacy) বলা হয়। রাজনৈতিকভাবে দুটি দেশের সম্পর্ক শীতল থাকলেও অনেক সময় বড় ধরনের সন্ত্রাসী হামলা ঠেকাতে তাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো একে অপরের সাথে তথ্য বিনিময় করে। গোয়েন্দা তথ্যের এই আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কিং মূলত রাষ্ট্রের চোখ এবং কান হিসেবে কাজ করে, যা যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত চমক থেকে রাষ্ট্রকে রক্ষা করে। নিরাপত্তা কৌশলের সবচেয়ে কঠিন অংশটি হলো পরাশক্তিগুলোর পরস্পরবিরোধী স্বার্থের মাঝখানে নিজেদের ভারসাম্য বজায় রাখা। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের যে প্রকাশ্য রেষারেষি চলছে, তার ঢেউ বঙ্গোপসাগরের তীর পর্যন্ত আছড়ে পড়ছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে আঞ্চলিক পরাশক্তি ভারতের নিজস্ব নিরাপত্তা উদ্বেগ। এই তিন বিশাল হাতির লড়াইয়ের মাঝখানে পড়ে রাষ্ট্রটি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে হেজিং (Hedging) কৌশল অবলম্বন করে চলেছে। এর অর্থ হলো, কোনো পরাশক্তির সামরিক বলয়ে সরাসরি যোগ না দিয়ে সবার সাথে সমান্তরাল সম্পর্ক বজায় রাখা। চীন থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনা, আবার যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যৌথ সামরিক মহড়ায় অংশ নেওয়া – এটি মূলত কোনো এক পক্ষের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল না হওয়ারই একটি সুচিন্তিত কৌশল। পরাশক্তিগুলো সব সময় চায় ছোট রাষ্ট্রগুলো প্রকাশ্যে তাদের পক্ষ নিক। কিন্তু নীতিনির্ধারকরা জানেন, একবার কারো ব্লকে ঢুকে পড়লে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা চিরতরে হারিয়ে যাবে। জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো রাষ্ট্রের এই কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বা স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি বজায় রাখা। রাষ্ট্রকে এমনভাবে নিজের ঘুঁটিগুলো চালতে হয়, যাতে কেউ তাকে নিজের পকেটের অংশ মনে করার সুযোগ না পায়। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, সামরিক প্রতিরোধ সক্ষমতা এবং অভ্যন্তরীণ সামাজিক ঐক্য – এই তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়েই মূলত একটি শক্তিশালী নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি হয়। পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় নতুন নতুন সংকট আসবে, প্রযুক্তির ধরন বদলাবে এবং পরাশক্তির সমীকরণ নতুন রূপ নেবে। এই সব পরিবর্তনের সাথে দ্রুত নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা বা অ্যাডাপটাবিলিটিই হবে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ। জাতীয় নিরাপত্তা কোনো নির্দিষ্ট ফোল্ডারে আটকে থাকা স্থির পরিকল্পনা নয়; এটি হলো প্রতিনিয়ত চোখ-কান খোলা রেখে, অসীম ধৈর্য এবং ধূর্ততার সাথে বিশ্বরাজনীতির নিষ্ঠুর দাবার বোর্ডে টিকে থাকার এক অনন্ত সংগ্রাম। ডিপ স্টেট বা গভীর রাষ্ট্র (Deep State) অদৃশ্য ক্ষমতার ভরকেন্দ্র ও কাঠামোগত ভিত্তি রাষ্ট্রের দিকে তাবার পর আমরা সাধারণত যা দেখি, তা হলো একটি জমকালো দৃশ্যমান কাঠামো। সেখানে সংসদ আছে, মন্ত্রীরা আছেন, তারা প্রতিদিন টেলিভিশনের পর্দায় ভাষণ দিচ্ছেন এবং সাধারণ মানুষের সাথে হাত মেলাচ্ছেন। দৃশ্যত মনে হয় এরাই রাষ্ট্রের সর্বেসর্বা এবং এরাই সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। বাস্তবে পর্দার আড়ালে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি সমীকরণ কাজ করে। রাষ্ট্রের ভেতরেও অনেকটা নীরবে আরেকটা রাষ্ট্র বিরাজ করে, যাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় গভীর রাষ্ট্র (Deep State)। এরা সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত কোনো সরকার নয়। জনগণের কাছে এদের কোনো জবাবদিহিতাও নেই। তারপরও এরা প্রতিনিয়ত রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর কলকাঠি নাড়ে। সামরিক বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়, গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানগণ, উচ্চপদস্থ ঝানু আমলা এবং দেশের অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণকারী কিছু প্রভাবশালী কর্পোরেট ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সমন্বয়ে এই অদৃশ্য কাঠামোটি তৈরি হয়। সাধারণ নাগরিকরা হয়তো এদের নামও ঠিকমতো জানেন না। কিন্তু দেশের ভেতরে কোথায় নতুন রাস্তা হবে, কোন দেশের কাছ থেকে অস্ত্র কেনা হবে, অথবা প্রতিবেশী দেশের সাথে সম্পর্ক কেমন হবে – তার মূল ব্লু-প্রিন্ট এরাই তৈরি করেন। এরা প্রকাশ্যে কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত থাকেন না। তাদের মূল কাজ হলো রাষ্ট্রের স্থায়ী স্বার্থগুলোকে পাহারা দেওয়া। নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার আসে এবং যায়, কিন্তু রাষ্ট্রের ভেতরের এই স্থায়ী আমলাতন্ত্র এবং প্রতিরক্ষা কাঠামো তাদের জায়গাতেই অবিচল থাকে। এই অদৃশ্য কাঠামোর কাজের ধরন নিয়ে তাত্ত্বিকরা বিশদ গবেষণা করেছেন। মার্কিন গবেষক পিটার ডেল স্কট (Peter Dale Scott) এই বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করার জন্য একটি চমৎকার শব্দবন্ধ তৈরি করেছিলেন, যাকে তিনি বলেছেন গভীর রাজনীতি (Deep Politics)। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ডিপ পলিটিক্স অ্যান্ড দ্য ডেথ অফ জেএফকে (Deep Politics and the Death of JFK)-এ তিনি দেখিয়েছেন যে, রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াটি কখনোই শুধুমাত্র উন্মুক্ত এবং আইনি কাঠামোর ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকে না। দৃশ্যমান রাজনীতির ঠিক নিচেই সমান্তরালভাবে আরেকটি জগত কাজ করে, যেখানে গোয়েন্দা সংস্থা, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী এবং এমনকি অনেক সময় সংগঠিত অপরাধী চক্রের সাথেও রাষ্ট্রের অঘোষিত আঁতাত তৈরি হয়। এই গভীর রাজনীতির জগতে কোনো আদর্শিক লড়াই নেই, সেখানে আছে কেবল ক্ষমতা ধরে রাখার নিরন্তর চেষ্টা। পিটার ডেল স্কটের মতে, রাষ্ট্রের এই অদৃশ্য অংশটি মনে করে যে সাধারণ মানুষ বা পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত রাজনীতিকদের হাতে রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তার ভার ছেড়ে দেওয়াটা নিরাপদ নয়। রাজনীতিকরা মূলত পরবর্তী নির্বাচনে জেতার চিন্তায় মগ্ন থাকেন। তারা জনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নিতে ভালোবাসেন। কিন্তু রাষ্ট্রের টিকে থাকার জন্য অনেক সময় এমন সব কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়, যা সাধারণ মানুষের কাছে মোটেও জনপ্রিয় হবে না। ঠিক এই জায়গাতেই গভীর রাষ্ট্র নিজের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয় এবং লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করতে শুরু করে। এই কাঠামোর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এদের ধারাবাহিকতা। একজন রাজনীতিবিদের মেয়াদ শেষ হলে তাকে ক্ষমতা ছাড়তে হয়। কিন্তু একজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা বা একজন প্রভাবশালী গোয়েন্দা প্রধান দশকের পর দশক ধরে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকেন। তারা রাষ্ট্রের ভেতরের সমস্ত গোপন তথ্য জানেন। কোন দেশের সাথে আগে কী চুক্তি হয়েছিল, কোন ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সাথে সরকারের কী ধরনের গোপন বোঝাপড়া আছে – এই সবকিছুর নাড়িনক্ষত্র তাদের নখদর্পণে থাকে। তথ্যই আধুনিক যুগের সবচেয়ে বড় ক্ষমতা। যে গোষ্ঠীর কাছে রাষ্ট্রের সব গোপন নথিপত্র এবং গোয়েন্দা তথ্য থাকে, তারা স্বাভাবিকভাবেই নির্বাচিত প্রতিনিধিদের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। অনেক সময় দেখা যায়, কোনো নতুন মন্ত্রী ক্ষমতায় এসে তার মন্ত্রণালয়ে বড় ধরনের সংস্কার করতে চাইছেন। তিনি হয়তো এমন কোনো উদ্যোগ নিলেন, যা পুরনো ব্যবস্থার সাথে সাংঘর্ষিক। ঠিক তখনই সেই মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ আমলারা নানা ধরনের আইনি জটিলতা তৈরি করে বা ফাইলের পাহাড় জমিয়ে সেই সংস্কার প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেন। তারা সরাসরি মন্ত্রীর কথার অবাধ্য হন না। তারা শুধু ফাইলের পর ফাইলে এমন সব আমলাতান্ত্রিক মারপ্যাঁচ তৈরি করেন যে, মন্ত্রীর সেই উদ্যোগ আর আলোর মুখ দেখে না। এভাবেই একটি অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করে গভীর রাষ্ট্র তার নিজস্ব ক্ষমতা এবং স্বার্থের বলয়কে যেকোনো মূল্যে সুরক্ষিত রাখে। গণতান্ত্রিক আবরণে ছায়া সরকারের বিবর্তন গভীর রাষ্ট্রের এই ধারণাটি আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় রাতারাতি গড়ে ওঠেনি। এর একটি দীর্ঘ এবং ধারাবাহিক বিবর্তনের ইতিহাস রয়েছে। ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাকালে দেখা যায়, তুরস্কে এই ধরনের অদৃশ্য কাঠামোর অস্তিত্ব সবচেয়ে বেশি প্রকট ছিল। সেখানে একে বলা হতো ডেরিন ডেভলেট (Derin Devlet), যার সরাসরি অর্থ হলো গভীর রাষ্ট্র। আধুনিক তুরস্কের জনক মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের সময় থেকেই রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র এবং অখণ্ডতা রক্ষার দায়িত্ব অঘোষিতভাবে সামরিক বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। তুরস্কের ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে, যখনই কোনো রাজনৈতিক দল সেই ধর্মনিরপেক্ষ নীতির বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করেছে, তখনই এই ডেরিন ডেভলেট পেছন থেকে কলকাঠি নেড়ে সেই সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে। তবে এই ছায়া সরকারের ধারণাটি কেবল তুরস্কের মতো উন্নয়নশীল বা সামরিক প্রভাবাধীন দেশগুলোতেই সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্বের সবচেয়ে পুরনো এবং শক্তিশালী গণতান্ত্রিক দেশগুলোতেও এর শেকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। সমাজবিজ্ঞানী সি. রাইট মিলস (C. Wright Mills) তাঁর কালজয়ী তত্ত্ব ক্ষমতাশালী অভিজাত (Power Elite)-এর মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে, পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশগুলোতেও ক্ষমতার চর্চা গুটিকয়েক মানুষের হাতে কুক্ষিগত। তাঁর রচিত বিখ্যাত বই দ্য পাওয়ার এলিট (The Power Elite)-এ তিনি খুব স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন যে, গণতন্ত্রের আবরণে সাধারণ মানুষকে মূলত একটি বিভ্রমের মধ্যে রাখা হয়। মানুষ ভোটকেন্দ্রে গিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেয় এবং ভাবে যে তারা দেশের ভাগ্য পরিবর্তন করছে। বাস্তবে দেশের মূল নীতিগুলো নির্ধারণ করে সমাজের একেবারে চূড়ায় বসে থাকা একটি ক্ষুদ্র অংশ। এই অংশের মধ্যে থাকেন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা, বিশাল সব কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের মালিক এবং জাতীয় পর্যায়ের হাতে গোনা কয়েকজন শীর্ষ রাজনীতিবিদ। মিলস দাবি করেছেন, এরা সবাই একই ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেন, একই ক্লাবে আড্ডা দেন এবং তাদের ব্যবসায়িক ও ব্যক্তিগত স্বার্থগুলো একে অপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে। ফলে নির্বাচনে যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, এই ক্ষমতাশালী অভিজাতদের স্বার্থের কখনো কোনো ক্ষতি হয় না। কারণ তারা সব দলের নেপথ্যের চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। এই ব্যবস্থাটি সময়ের সাথে সাথে এতটাই নিখুঁত হয়ে উঠেছে যে, এখন আর ক্ষমতা দখলের জন্য সরাসরি সামরিক অভ্যুত্থানের প্রয়োজন পড়ে না। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাইরে থেকে সম্পূর্ণ অক্ষত রেখে ভেতর থেকে সেগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এই ছায়া সরকারের বিবর্তনের বিষয়টি সবচেয়ে ভালোভাবে টের পাওয়া যায় স্নায়ুযুদ্ধের সময়। সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনার কারণে সেখানে বিশাল এক সামরিক ও গোয়েন্দা কাঠামো গড়ে ওঠে। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোয়াইট ডি. আইজেনহাওয়ার তাঁর বিদায়ী ভাষণে এই কাঠামোর বিপদ সম্পর্কে দেশবাসীকে সতর্ক করে গিয়েছিলেন। তিনি এই কাঠামোর নাম দিয়েছিলেন মিলিটারি-ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স (Military-Industrial Complex)। এটি হলো অস্ত্র প্রস্তুতকারী বিশাল বিশাল কর্পোরেশন এবং সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্তাদের মধ্যে গড়ে ওঠা এক অশুভ আঁতাত। এই আঁতাতের মূল লক্ষ্য থাকে যুদ্ধ বা আন্তর্জাতিক উত্তেজনা জিইয়ে রাখা, কারণ এর ওপর ভিত্তি করেই তাদের হাজার হাজার কোটি ডলারের ব্যবসা চলে। যদি বিশ্বে চিরস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা হয়ে যায়, তবে অস্ত্র কারখানার মালিকদের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে। এই কারণে তারা গোয়েন্দা সংস্থা এবং আমলাতন্ত্রের সাহায্যে সবসময় এমন পরিস্থিতি তৈরি করে রাখে, যাতে মনে হয় রাষ্ট্র প্রতিনিয়ত কোনো না কোনো বড় হুমকির মুখে আছে। ফলস্বরূপ, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা চাইলেও সামরিক বাজেট কমাতে পারেন না বা শান্তির পথে হাঁটার কোনো দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপ নিতে পারেন না। এভাবেই গণতন্ত্রের ছদ্মবেশে একটি অদৃশ্য শক্তি পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে। পররাষ্ট্রনীতি ও দীর্ঘমেয়াদী জাতীয় স্বার্থের ব্লু-প্রিন্ট দেশের ভেতরের রাজনীতিতে দলগুলোর মধ্যে যতই কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি চলুক না কেন, পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে একটি দেশের অবস্থান সাধারণত খুব একটা বদলায় না। রাজনৈতিক সরকারের পালাবদল হলেও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মঞ্চে একটি দেশের মিত্র বা শত্রু রাতারাতি পরিবর্তিত হয়ে যায় না। এর পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে ডিপ স্টেট। রাজনৈতিক নেতারা সাধারণত পাঁচ বা দশ বছরের মেয়াদ নিয়ে চিন্তা করেন। তাদের মাথায় থাকে পরবর্তী নির্বাচনে কীভাবে জয়লাভ করা যায়। কিন্তু গভীর রাষ্ট্র কোনো নির্বাচনের পরোয়া করে না। তারা রাষ্ট্রের টিকে থাকার জন্য বিশ বা পঞ্চাশ বছর পরের পৃথিবীর কথা মাথায় রেখে একটি দীর্ঘমেয়াদী ব্লু-প্রিন্ট তৈরি করে। এই ব্লু-প্রিন্টে নির্ধারণ করা থাকে কোন দেশগুলোর সাথে কৌশলগত জোট বাঁধতে হবে, কোন দেশের ওপর অর্থনৈতিক নির্ভরতা কমাতে হবে এবং আন্তর্জাতিক ফোরামে কোন ইস্যুতে কী ধরনের অবস্থান নিতে হবে। আলী রিয়াজ তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পালাবদল অনেক সময় পররাষ্ট্রনীতিকে বাহ্যিকভাবে কিছুটা প্রভাবিত করলেও, রাষ্ট্রের মূল কৌশলগত স্বার্থগুলো মূলত এই অদৃশ্য কাঠামো দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হয় (Riaz, 2016)। তারা একটি অলিখিত লক্ষ্মণরেখা টেনে দেয়, নির্বাচিত সরকার সাধারণত যার বাইরে পা রাখার সাহস দেখায় না। এই ধারাবাহিকতা রক্ষার বিষয়টি আন্তর্জাতিক রাজনীতির অনেক পণ্ডিত বেশ গুরুত্বের সাথে বিশ্লেষণ করেছেন। আধুনিক চিন্তাবিদ মাইক লফগ্রেন (Mike Lofgren), যিনি প্রায় তিন দশক মার্কিন কংগ্রেসে কাজ করেছেন, তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে এই বিষয়টি পরিষ্কার করেছেন। তাঁর লেখা দ্য ডিপ স্টেট: দ্য ফল অফ দ্য কনস্টিটিউশন অ্যান্ড দ্য রাইজ অফ আ শ্যাডো গভর্নমেন্ট (The Deep State: The Fall of the Constitution and the Rise of a Shadow Government) বইয়ে তিনি দেখিয়েছেন যে, হোয়াইট হাউসে ডেমোক্র্যাট আসুক বা রিপাবলিকান আসুক, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তার মূল বিষয়গুলো কখনোই বদলায় না। নির্বাচনের আগে প্রার্থীরা হয়তো বৈদেশিক যুদ্ধের তীব্র সমালোচনা করেন বা অন্য কোনো দেশের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু ক্ষমতায় বসার পরপরই পেন্টাগন, সিআইএ এবং স্টেট ডিপার্টমেন্টের ঝানু কর্মকর্তারা নবনির্বাচিত নেতাকে তাদের দীর্ঘমেয়াদী হিসাব-নিকাশের ফাইলগুলো ধরিয়ে দেন। তারা বুঝিয়ে দেন যে, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে গিয়ে হঠাৎ করে কোনো চুক্তি বাতিল করলে রাষ্ট্রের কী পরিমাণ ভূ-রাজনৈতিক ক্ষতি হতে পারে। ফলস্বরূপ, নতুন নেতা খুব দ্রুতই সিস্টেমের সাথে মানিয়ে নেন এবং আগের সরকারের সেই একই নীতি একটু ভিন্ন মোড়কে বাস্তবায়ন করতে শুরু করেন। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ডিপ স্টেটের এই নিয়ন্ত্রণের একটি বড় কারণ হলো গোপনীয়তা। কূটনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অনেক কিছু সাধারণ মানুষের সামনে প্রকাশ করা যায় না। দুই দেশের মধ্যে প্রকাশ্যে হয়তো তুমুল উত্তেজনা চলছে, সংবাদমাধ্যমে একে অপরকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। একই সাথে পর্দার আড়ালে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ এবং তথ্য আদান-প্রদান অব্যাহত থাকে। এই দ্বিমুখী নীতি বজায় রাখার জন্য এমন একটি কাঠামো প্রয়োজন, যারা মিডিয়ার আলো থেকে দূরে বসে ঠান্ডা মাথায় কাজ করতে পারে। নির্বাচিত সরকারের পক্ষে অনেক সময় জনরোষ এড়িয়ে এই ধরনের বাস্তববাদী সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয় না। জনগণ হয়তো আবেগতাড়িত হয়ে প্রতিবেশী কোনো দেশের সাথে সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করার দাবি তুলল। রাজনৈতিক সরকার ভোটের আশায় হয়তো সেই দাবির সাথে সুরও মেলালো। কিন্তু রাষ্ট্রের ভেতরের ওই ডিপ স্টেট খুব ভালো করেই জানে যে, ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে প্রতিবেশী দেশের সাথে পুরোপুরি সম্পর্ক ছিন্ন করা একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হবে। তাই তারা নীরবে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও নিরাপত্তার ন্যূনতম চ্যানেলগুলো খোলা রাখার ব্যবস্থা করে। এভাবেই আবেগময় রাজনীতির হাত থেকে বাস্তববাদী কূটনীতিকে রক্ষা করার ঢাল হিসেবে গভীর রাষ্ট্র কাজ করে থাকে। আমলাতন্ত্র, গোয়েন্দা সংস্থা এবং কর্পোরেট আঁতাত গভীর রাষ্ট্র বলতে আমরা আসলে কাদের বোঝাই? এটি কোনো নির্দিষ্ট গুপ্ত সমিতি বা মাফিয়া সংগঠন নয়। এটি মূলত রাষ্ট্রের ভেতরেই গড়ে ওঠা তিনটি শক্তিশালী পিলারের একটি অনানুষ্ঠানিক জোট। প্রথম পিলারটি হলো আমলাতন্ত্র। রাষ্ট্রের আইন এবং নিয়মকানুন তৈরি থেকে শুরু করে তা বাস্তবায়নের সব দায়িত্ব থাকে এই সিভিল সার্ভেন্ট বা আমলাদের কাঁধে। তারা সংবিধান এবং আইনের বিভিন্ন ফাঁকফোকর সম্পর্কে এত ভালো জানেন যে, যেকোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে তারা নিজেদের ইচ্ছেমতো ব্যাখ্যার মাধ্যমে আটকে দিতে পারেন। দ্বিতীয় পিলারটি হলো গোয়েন্দা সংস্থা এবং সামরিক বাহিনী। রাষ্ট্রের সমস্ত গোপন তথ্য, নজরদারির যন্ত্রপাতি এবং বৈধ অস্ত্র থাকে এদের হাতে। এরা নির্ধারণ করে দেশের জন্য আসল হুমকি কোনটি। আর তৃতীয় পিলারটি হলো বিশাল সব বহুজাতিক কোম্পানি বা কর্পোরেট গোষ্ঠী। রাজনীতি করার জন্য এবং নির্বাচন জেতার জন্য প্রচুর টাকার প্রয়োজন হয়। এই কর্পোরেট গোষ্ঠীগুলো রাজনৈতিক দলগুলোকে সেই অর্থের যোগান দেয়। বিনিময়ে তারা নিজেদের ব্যবসার জন্য সুবিধাজনক আইন পাস করিয়ে নেয়। এই তিন পিলারের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা ব্যবস্থাকে অনেকেই কর্পোরেটোক্রেসি (Corporatocracy) বলে আখ্যায়িত করেন। এই ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তগুলো জনগণের কল্যাণের বদলে কিছু নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ব্যবসায়িক ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষার জন্য নেওয়া হয়। এই তিনটি পিলারের মধ্যে সম্পর্কের সমীকরণটা বুঝতে হলে ‘রিভলভিং ডোর’ বা ঘূর্ণায়মান দরজার ধারণাটি বুঝতে হবে। দেখা যায়, সামরিক বাহিনীর একজন শীর্ষ জেনারেল অবসরে যাওয়ার পরপরই কোনো একটি বড় অস্ত্র নির্মাণকারী কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে যোগ দিয়েছেন। আবার সেই একই কোম্পানির সাবেক কোনো সিইও হয়তো সরকারের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন। একইভাবে, গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা অবসরে গিয়ে সাইবার সিকিউরিটি ফার্ম খুলছেন, আর সরকার কোটি কোটি টাকার চুক্তিতে সেই ফার্মের সেবা কিনছে। এই যে ক্ষমতা, তথ্য এবং অর্থের একটি বদ্ধ চক্র, এটিই হলো ডিপ স্টেটের মূল শক্তি। এদের স্বার্থ এতটাই গভীরভাবে একে অপরের সাথে মিশে থাকে যে, এদের আলাদা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এরা সবাই একই ভাষায় কথা বলেন এবং একই রকম বিশ্ববোধ ধারণ করেন। আমলারা পলিসি তৈরি করেন, গোয়েন্দারা সেই পলিসির যৌক্তিকতা প্রমাণের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করেন, আর কর্পোরেট গোষ্ঠীগুলো সেই পলিসি বাস্তবায়নের মাধ্যমে আর্থিক ফায়দা লুটে নেয়। পুরো প্রক্রিয়াটি এমন নিখুঁতভাবে সম্পন্ন হয় যে, সাধারণ নাগরিকরা এর পেছনের এই আঁতাত সম্পর্কে বিন্দুমাত্রও আঁচ করতে পারেন না। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এই আঁতাতে সবচেয়ে ভয়ংকর ভূমিকা পালন করে। তাদের মূল কাজ দেশের নিরাপত্তা বিধান করা হলেও, অনেক সময় তারা সেই ক্ষমতার অপব্যবহার করে দেশের ভেতরের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেয়। তারা প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ, বিচারপতি এবং সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত জীবনের সমস্ত গোপন তথ্য সংগ্রহ করে রাখে। যখনই কোনো রাজনীতিবিদ এই সিস্টেমের বিরুদ্ধে কথা বলার চেষ্টা করেন বা আমলাতন্ত্রের ক্ষমতা কমানোর উদ্যোগ নেন, তখনই গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তাদের হাতে থাকা ওই গোপন তথ্যগুলো সংবাদমাধ্যমের কাছে ফাঁস করে দেয়। এর ফলে মুহূর্তের মধ্যে সেই রাজনীতিবিদের ক্যারিয়ার ধ্বংস হয়ে যায়। এই ভয়ের সংস্কৃতির কারণে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা সবসময় এই অদৃশ্য শক্তির সাথে এক ধরনের আপস করে চলতে বাধ্য হন। তারা জানেন যে, সিস্টেমের সাথে লড়াই করতে গেলে তাদের নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়বে। ফলে তারা দৃশ্যমান ক্ষমতায় আসীন থেকেও মূলত ওই আমলাতন্ত্র এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তৈরি করে দেওয়া ছকের ভেতরেই তাদের রাজনৈতিক জীবন পার করে দেন। ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং দৃশ্যমান বনাম অদৃশ্য সরকার গণতন্ত্রের একটি বড় দুর্বলতা হলো, এখানে দৃশ্যমান সরকার এবং অদৃশ্য সরকারের মধ্যে প্রায়ই ক্ষমতার এক নীরব কিন্তু তীব্র দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। একজন জনপ্রিয় নেতা যখন বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় আসেন, তিনি স্বাভাবিকভাবেই মনে করেন যে তিনি পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন। তিনি হয়তো জনগণের কাছে এমন কিছু পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসেন, যা পুরনো ব্যবস্থার মূলে আঘাত হানে। কিন্তু ক্ষমতায় বসার কিছুদিন পরই তিনি বুঝতে পারেন যে, সচিবালয় বা সামরিক সদর দপ্তরে বসা মানুষগুলো তার আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করছে না। তারা আদেশ অমান্য করছে না ঠিকই, কিন্তু নানা অজুহাতে কাজগুলো ফেলে রাখছে। এই পরিস্থিতি তৈরি হলে রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং ডিপ স্টেটের মধ্যে শুরু হয় স্নায়ুযুদ্ধ। দৃশ্যমান সরকার চেষ্টা করে তাদের নিজেদের পছন্দের লোকদের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে বসাতে। অন্যদিকে অদৃশ্য সরকার চেষ্টা করে মিডিয়ার মাধ্যমে সরকারের বিভিন্ন কেলেঙ্কারি সামনে এনে তাদের জনসমর্থন কমিয়ে দিতে। এই দ্বন্দ্বে শেষ পর্যন্ত সাধারণত অদৃশ্য সরকারই জয়লাভ করে। কারণ রাজনৈতিক সরকারের হাতে সময় খুব কম থাকে, আর ডিপ স্টেটের কাছে থাকে অনন্ত সময় এবং অসীম ধৈর্য। এই দ্বন্দ্বের মনস্তাত্ত্বিক দিকটি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তাত্ত্বিকরা অনেক আগে থেকেই সতর্ক করেছেন। প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট মিশেলস (Robert Michels) তাঁর যুগান্তকারী তত্ত্ব লৌহ কঠিন অভিজাততন্ত্র (Iron Law of Oligarchy)-এর মাধ্যমে এই ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত রূপটি উন্মোচন করেছেন। মিশেলস দেখিয়েছেন যে, যেকোনো বড় এবং জটিল সংগঠনে – তা সে রাজনৈতিক দল হোক বা রাষ্ট্রীয় কাঠামো – শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা কিছু হাতে গোনা মানুষের কাছেই চলে যায়। যতই গণতান্ত্রিক কাঠামো তৈরি করা হোক না কেন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা একটি ছোট অভিজাত গোষ্ঠীর হাতেই কুক্ষিগত হতে বাধ্য। একজন সাধারণ মানুষ যখন রাজনীতিতে আসেন, তখন তার অনেক বিপ্লবী চিন্তা থাকে। কিন্তু তিনি যখন ক্ষমতার শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছান, তখন তিনি দেখেন যে সিস্টেমটি বদলানোর চেয়ে সিস্টেমের সাথে তাল মিলিয়ে চলাই অনেক বেশি সহজ ও নিরাপদ। ফলে তিনি নিজেই ধীরে ধীরে সেই অভিজাততন্ত্র বা ডিপ স্টেটের একটি অংশে পরিণত হন। তিনি বুঝতে পারেন যে, যাদের সাথে তিনি লড়তে চেয়েছিলেন, রাষ্ট্র চালাতে গিয়ে তাদেরকেই তার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। দৃশ্যমান সরকারের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, রাষ্ট্রের যেকোনো ব্যর্থতার দায়ভার তাদেরকেই নিতে হয়। দেশে মূল্যস্ফীতি বাড়লে, বেকারত্ব বাড়লে বা আইনশৃঙ্খলার অবনতি হলে সাধারণ মানুষ সরকারকেই গালমন্দ করে। বিরোধী দলগুলো সংসদে দাঁড়িয়ে সরকারের সমালোচনা করে। কিন্তু অর্থনীতি বা আইনশৃঙ্খলার এই বেহাল দশার পেছনে যদি আমলাতন্ত্র বা কোনো সিন্ডিকেটের কারসাজি থাকে, তবে তাদের কাউকে কখনোই জবাবদিহিতার আওতায় আনা যায় না। অদৃশ্য সরকার পর্দার আড়ালে থেকে সব সুবিধা ভোগ করে, অথচ যেকোনো ভুলের মাশুল গোনে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা। এটি আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় এক ধরনের কাঠামোগত বৈপরীত্য তৈরি করেছে। জনগণ মনে করে যে তারা তাদের ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রের ভুলগুলো শুধরে নিতে পারবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, ভোট দিয়ে শুধু দৃশ্যমান মুখের পরিবর্তন হয়, পেছনের আসল নিয়ন্ত্রকরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়। এই জবাবদিহিতাহীন ব্যবস্থার কারণেই অনেক সময় রাষ্ট্রে বড় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক স্থবিরতা দেখা দেয়। জনপ্রতিনিধিরা চাইলেও যুগান্তকারী কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারেন না, কারণ অদৃশ্য সরকারের তৈরি করা অদৃশ্য শেকল তাদের সবসময় আটকে রাখে। তথ্যপ্রযুক্তির যুগে গভীর রাষ্ট্রের নতুন রূপ একবিংশ শতাব্দীতে এসে তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় বিকাশের সাথে সাথে ডিপ স্টেটের কাজের ধরনেও আমূল পরিবর্তন এসেছে। আগে রাষ্ট্রের নাগরিকদের ওপর নজরদারি করার জন্য গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হতো। মানুষের পেছনে গুপ্তচর লাগাতে হতো, টেলিফোনে আড়িপাততে হতো। কিন্তু এখন আর সেসবের কোনো প্রয়োজন নেই। মানুষ স্বেচ্ছায় নিজেদের সমস্ত ব্যক্তিগত তথ্য, পছন্দ-অপছন্দ, রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং দৈনন্দিন চলাফেরার হিসাব সোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোড করছে। এর ফলে গভীর রাষ্ট্রের হাতে এখন নাগরিকদের প্রোফাইলিং করার এক অসীম ক্ষমতা চলে এসেছে। বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো, যারা গুগল, ফেসবুক বা এক্স (সাবেক টুইটার) নিয়ন্ত্রণ করে, তারা এখন আধুনিক ডিপ স্টেটের সবচেয়ে শক্তিশালী সহযোগী হয়ে উঠেছে। রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এই বিশাল ডেটাবেস ব্যবহার করে খুব সহজেই বুঝতে পারে দেশের মানুষের মানসিক অবস্থা কেমন, তারা কী নিয়ে ক্ষুব্ধ এবং কোন ধরনের খবর প্রচার করলে তাদের মতামত পরিবর্তন করা সম্ভব। হার্ভার্ডের ইমেরিটাস অধ্যাপক শোশানা জুবফ (Shoshana Zuboff) এই নতুন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে নজরদারি পুঁজিবাদ (Surveillance Capitalism) হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। তাঁর যুগান্তকারী গ্রন্থ দ্য এজ অফ সার্ভেইল্যান্স ক্যাপিটালিজম (The Age of Surveillance Capitalism)-এ তিনি দেখিয়েছেন যে, মানুষের ব্যক্তিগত তথ্যই এখন বিশ্বের সবচেয়ে দামি সম্পদ। আগে রাষ্ট্র মানুষের শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করত, এখন তারা মানুষের মন এবং আচরণ নিয়ন্ত্রণ করার প্রযুক্তি হাতে পেয়েছে। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো অ্যালগরিদমের মাধ্যমে মানুষের নিউজফিডে এমন সব খবর বা বিজ্ঞাপন সামনে আনে, যা তাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে অবচেতনভাবেই প্রভাবিত করে। কোনো দেশের ডিপ স্টেট যদি চায় যে নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসুক বা নির্দিষ্ট কোনো আন্দোলন ব্যর্থ হোক, তবে তারা প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর সাথে হাত মিলিয়ে খুব সহজেই সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম নিজেদের পক্ষে কাজে লাগাতে পারে। যারা সরকারের বিরোধী মত পোষণ করে, তাদের পোস্টগুলোর রিচ কমিয়ে দেওয়া হয়। অন্যদিকে রাষ্ট্রের পছন্দসই মতাদর্শগুলোকে খুব সুকৌশলে ভাইরাল করা হয়। এর ফলে সাধারণ মানুষ মনে করে যে তারা নিজেদের স্বাধীন বুদ্ধিতে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে তাদের চিন্তাধারাকে আগে থেকেই একটি অদৃশ্য কাঠামো দ্বারা ম্যানিপুলেট বা প্রভাবিত করা হয়েছে। প্রযুক্তির এই যুগে অদৃশ্য সরকার এখন আর শুধুমাত্র সচিবালয়ের ফাইল বা সামরিক ব্যারাকে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন প্রতিটি মানুষের পকেটে থাকা স্মার্টফোনের ভেতরে ঢুকে পড়েছে। সাইবার নজরদারির মাধ্যমে রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখা হচ্ছে। কোনো রাজনীতিবিদ যদি ডিপ স্টেটের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে চান, তবে তার পুরনো কোনো চ্যাট হিস্ট্রি, ইমেইল বা কল রেকর্ড ফাঁস করে তাকে সামাজিকভাবে ধ্বংস করে দেওয়া এখন মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যাপার। এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) ব্যবহার করে ডিপফেক ভিডিও তৈরি করে বিরোধী পক্ষের চরিত্র হনন করাও নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে আধুনিক ডিপ স্টেট আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী এবং অপ্রতিরোধ্য। তারা এখন আর শুধু নীতি নির্ধারণ করে না, তারা পুরো সমাজের চিন্তার কাঠামোটিকে নিজেদের ইচ্ছেমতো ছাঁচে ঢেলে সাজানোর ক্ষমতা রাখে। এই নতুন বাস্তবতায় সাধারণ নাগরিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বলে আর কিছু অবশিষ্ট নেই। প্রযুক্তির এই পরাবাস্তব যুগে দৃশ্যমান রাজনীতির চেয়ে ডেটা এবং অ্যালগরিদমের অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণই শেষ পর্যন্ত যেকোনো রাষ্ট্রের চূড়ান্ত ভাগ্য নির্ধারণ করে দিচ্ছে। বাংলাদেশের গভীর রাষ্ট্র বা ডিপ স্টেট: বিবর্তন, কাঠামো ও প্রভাব স্বাধীনতাপরবর্তী শূন্যতা ও আমলাতান্ত্রিক উত্তরাধিকার একটি নতুন দেশ যখন মানচিত্রে জায়গা করে নেয়, তখন তার ভেতরের সবকিছু রাতারাতি বদলে যায় না। দীর্ঘ নয় মাসের সশস্ত্র সংগ্রামের পর ১৯৭১ সালে যে নতুন ভূখণ্ডটির জন্ম হয়েছিল, তার দৃশ্যমান শাসনভার গ্রহণ করেছিলেন জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতারা। সাধারণ মানুষের কাছে তাদের বিপুল গ্রহণযোগ্যতা ছিল। দেশ চালানোর মতো কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা তাদের ছিল না। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য দৈনন্দিন ফাইলের কাজ, রাজস্ব আদায়ের জটিল হিসাব এবং প্রশাসনিক চেইন অব কমান্ড বা শৃঙ্খলার যে প্রয়োজন হয়, সেই জায়গায় এক বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়েছিল। এই শূন্যস্থান পূরণের জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্বকে বাধ্য হয়েই সেই পুরোনো আমলাতন্ত্রের ওপর নির্ভর করতে হয়, যারা মূলত ব্রিটিশ এবং পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক মানসিকতা ধারণ করতেন। এই বেসামরিক আমলারা স্বাধীন দেশের সেবক হিসেবে নিজেদের ভাবতে পারেননি। তারা বরং নিজেদের রাষ্ট্রের স্থায়ী অভিভাবক হিসেবেই দেখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। রাজনৈতিক নেতারা জনসভার মঞ্চে আগুনঝরা বক্তৃতা দিতে পারতেন, কিন্তু মন্ত্রণালয়ের বদ্ধ কামরায় একটি ফাইলের আইনি মারপ্যাঁচ বোঝার ক্ষমতা তাদের ছিল না। ফলে খুব নীরবেই রাষ্ট্রের ক্ষমতার চাবিকাঠি সেই পুরোনো আমলাতন্ত্রের হাতেই থেকে যায়। এই যে সদ্য স্বাধীন দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর আমলাতন্ত্রের আধিপত্য, সমাজবিজ্ঞানে এটি খুব সুপরিচিত একটি বিষয়। প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী হামজা আলাভি (Hamza Alavi) তাঁর যুগান্তকারী গবেষণায় অতি-উন্নত রাষ্ট্র (Overdeveloped State) তত্ত্বের মাধ্যমে এই বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন (Alavi, 1972)। তাঁর মতে, ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো নিজেদের শাসন টিকিয়ে রাখার জন্য একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং সুসংগঠিত শাসনযন্ত্র তৈরি করে যায়, যা স্থানীয় সমাজের স্বাভাবিক বিকাশের সাথে মেলে না। স্বাধীনতার পর নতুন এবং দুর্বল রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো এই বিশাল আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর ভার বহন করতে পারে না। ফলে আমলারাই মূলত রাষ্ট্রের আসল চালিকাশক্তিতে পরিণত হন। এই ভূখণ্ডের ক্ষেত্রেও ঠিক তা-ই ঘটেছিল। মন্ত্রীরা হয়তো সাধারণ মানুষের উন্নয়নের জন্য কোনো নতুন প্রকল্পের নির্দেশ দিতেন। অভিজ্ঞ আমলারা সেই নির্দেশ সরাসরি অমান্য করতেন না। তারা ফাইলের ভেতরে নানা রকম আইনি ত্রুটি এবং পদ্ধতিগত জটিলতা তৈরি করে সেই প্রকল্পকে মাসের পর মাস আটকে রাখতেন। এভাবেই রাজনৈতিক সদিচ্ছাকে আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার নিচে চাপা দিয়ে গভীর রাষ্ট্রের প্রথম অদৃশ্য ভিত্তিপ্রস্তরটি স্থাপন করা হয়। রাজনীতিবিদেরা একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নির্বাচিত হয়ে আসেন, কিন্তু একজন আমলা তার চেয়ারে দশকের পর দশক ধরে বসে থাকেন। সময়ের এই বিস্তর ব্যবধান আমলাতন্ত্রকে রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতির একমাত্র মালিক বানিয়ে দেয়। আন্তর্জাতিক চুক্তির ভাষা কেমন হবে বা কোন আইনের ফাঁক দিয়ে সরকারি কোষাগার থেকে টাকা বের করা যাবে, তার সবকিছুই আমলাদের নখদর্পণে থাকে। সাধারণ মানুষ ভোট দিয়ে সরকার পরিবর্তন করে তৃপ্তি পায়। তারা বুঝতে পারে না যে রাষ্ট্রের ভেতরের ওই স্থায়ী কাঠামোটিকে স্পর্শ করার কোনো ক্ষমতা তাদের ব্যালট পেপারের নেই। আমলারা পর্দার আড়ালে থেকে পলিসি বা নীতিগুলো এমনভাবে সাজান, যা দিন শেষে তাদের নিজস্ব গোষ্ঠীগত স্বার্থকেই পাহারা দেয়। তারা নিজেদের জন্য ভালো আবাসন, গাড়ি এবং আজীবন পেনশনের ব্যবস্থা খুব পাকাপোক্ত করে নেন। দৃশ্যমান সরকারের পরিবর্তন হলেও রাষ্ট্রের ভেতরের এই আমলাতান্ত্রিক সিন্ডিকেট কখনো ভাঙে না। মূলত এই স্বাধীনতাপরবর্তী শূন্যতাকে কাজে লাগিয়েই বাংলাদেশের গভীর রাষ্ট্র বা ডিপ স্টেট তাদের প্রথম শক্তিশালী শেকড়টি মাটির অনেক গভীরে প্রোথিত করতে সক্ষম হয়। পঁচাত্তরের পটপরিবর্তন ও সামরিক গোয়েন্দা বলয়ের উত্থান ইতিহাসের গতিপথ সব সময় সরলরেখায় চলে না। পঁচাত্তর সালের মাঝামাঝি সময়ে এই ভূখণ্ডের রাজনীতিতে এক ভয়াবহ এবং রক্তক্ষয়ী পটপরিবর্তন ঘটে। রাতের অন্ধকারে সংঘটিত হওয়া হত্যাকাণ্ডগুলো কেবল রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তন করেনি, এটি রাষ্ট্রের মূল চরিত্রকেই আমূল বদলে দিয়েছিল। রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যকার বিভাজন এবং দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে সামরিক বাহিনী ব্যারাক থেকে সরাসরি ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসে। এর মাধ্যমে গভীর রাষ্ট্রের চরিত্রে এক নতুন এবং ভয়ংকর মাত্রার যোগ হয়। আগে যেখানে ক্ষমতার চাবিকাঠি ছিল কেবল আমলাদের ফাইলের নিচে, এখন তার সাথে যুক্ত হলো বন্দুকের নল। সামরিক শাসকরা খুব ভালো করেই জানতেন যে কেবল পেশিশক্তি দিয়ে দীর্ঘকাল একটি দেশ শাসন করা যায় না। সাধারণ মানুষের ক্ষোভ দমন করার জন্য এবং রাজনৈতিক বিরোধীদের নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য তাদের একটি নিখুঁত নজরদারি ব্যবস্থার প্রয়োজন ছিল। এই প্রয়োজন থেকেই রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে নতুন করে ঢেলে সাজানো হয় এবং তাদের অসীম ক্ষমতা প্রদান করা হয়। এই গোয়েন্দা সংস্থাগুলোই মূলত নতুন ডিপ স্টেটের স্নায়ুকেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই ধরনের সামরিক উত্থানের পেছনের কারণ খুঁজতে গেলে তাত্ত্বিক স্যামুয়েল হান্টিংটন (Samuel Huntington)-এর গবেষণার দিকে তাকাতে হয়। তিনি তাঁর বিশ্লেষণে এই ধরনের সমাজব্যবস্থাকে প্রিটোরিয়ানবাদ (Praetorianism) হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন (Huntington, 1968)। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, সমাজের ভেতরে যখন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের মধ্যকার বিবাদ মেটাতে ব্যর্থ হয় এবং চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়, তখন সমাজের সবচেয়ে সুসংগঠিত অংশ হিসেবে সামরিক বাহিনী ক্ষমতার শূন্যস্থান দখল করে নেয়। পঁচাত্তরের পরের দেড় দশক ধরে চলা প্রকাশ্য এবং প্রচ্ছন্ন সামরিক শাসনামলে এই প্রিটোরিয়ান কাঠামোটাই রাষ্ট্রের নিয়তিতে পরিণত হয়। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বেসামরিক প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এবং সংবাদমাধ্যমে নিজেদের লোক বসিয়ে দেয়। কে বিরোধী দলের মিছিলে যাবে, কে পত্রিকায় সরকারের সমালোচনা করে কলাম লিখবে – সবকিছুর তালিকা তৈরি হতে থাকে। একটি ভয়ের সংস্কৃতি পুরো সমাজকে গ্রাস করে ফেলে। মানুষ নিজের ঘরের ভেতরে বসেও রাজনৈতিক আলাপ করতে ভয় পেত। অদৃশ্য এই গোয়েন্দা বলয় দৃশ্যমান যেকোনো সরকারের চেয়ে অনেক বেশি পরাক্রমশালী হয়ে ওঠে। সামরিক বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর এই উত্থান বেসামরিক আমলাতন্ত্রের সাথে কোনো সংঘাত তৈরি করেনি। বরং তারা একে অপরের পরিপূরক হিসেবে একটি অলিখিত জোট তৈরি করে নেয়। সামরিক কর্মকর্তাদের বেসামরিক প্রশাসনের উচ্চপদে, কূটনীতিতে এবং লাভজনক রাষ্ট্রীয় কর্পোরেশনগুলোতে নিয়োগ দেওয়ার রেওয়াজ শুরু হয়। আমলারা সামরিক বাহিনীর ছত্রছায়ায় থেকে নিজেদের ক্ষমতা নিষ্কণ্টক করেন। অন্যদিকে সামরিক বাহিনী আমলাদের প্রশাসনিক দক্ষতার ওপর ভর করে নিজেদের শাসনকাজ পরিচালনা করে। এই সামরিক-বেসামরিক জোটটি রাষ্ট্রের কাঠামোগত ডিএনএ-তে এমনভাবে মিশে যায় যে, পরবর্তীতে গণতান্ত্রিক সরকার এলেও তাদের পক্ষে এই জোটকে ভাঙা সম্ভব হয়নি। রাজনৈতিক নেতারা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য এই গোয়েন্দা এবং আমলাতান্ত্রিক বলয়ের সাথে আপস করতে বাধ্য হন। তারা বুঝতে শেখেন যে, ক্ষমতায় আসার পথটি হয়তো ব্যালট বাক্সের ভেতর দিয়ে যায়, কিন্তু ক্ষমতায় টিকে থাকার আসল চাবিকাঠিটি রয়ে গেছে ওই গোয়েন্দা সংস্থা এবং ক্যান্টনমেন্টের ভেতরেই। এভাবেই গভীর রাষ্ট্র তার নিজস্ব একটি সুরক্ষিত এবং স্থায়ী রাজত্ব কায়েম করে। নব্বইয়ের দশকের রূপান্তর এবং ছায়া ক্ষমতার আপস নব্বইয়ের দশকের শুরুতে এক বিশাল গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সামরিক স্বৈরশাসনের পতন ঘটে। রাজপথের এই বিজয় সাধারণ মানুষের মনে এক বিশাল আশার সঞ্চার করেছিল। সবাই ভেবেছিল, এবার হয়তো রাষ্ট্রযন্ত্র পুরোপুরি সাধারণ মানুষের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে চলে আসবে। ভোটের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠিত হয়, সংসদ প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে এবং সংবাদমাধ্যমগুলোও কিছুটা স্বাধীনভাবে কথা বলার সুযোগ পায়। বাইরে থেকে দেখে মনে হচ্ছিল, গভীর রাষ্ট্রের বোধহয় চিরবিদায় ঘণ্টা বেজে গেছে। বাস্তবে ঘটনাটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। দৃশ্যমান মঞ্চ থেকে সরে গেলেও রাষ্ট্রের ভেতরের ওই সামরিক-বেসামরিক আমলাতান্ত্রিক বলয় বিন্দুমাত্র শক্তি হারায়নি। তারা কেবল তাদের কাজের ধরন পাল্টে ফেলেছিল। সরাসরি ক্ষমতা দখল না করে তারা পর্দার আড়াল থেকে রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার কৌশল বেছে নেয়। নতুন গণতান্ত্রিক সরকারগুলো খুব দ্রুতই বুঝতে পারে যে, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওই স্থায়ী শক্তিগুলোকে পাশ কাটিয়ে তারা এক পা-ও সামনে এগোতে পারবে না। ফলে শুরু হয় দৃশ্যমান রাজনীতির সাথে অদৃশ্য ছায়া ক্ষমতার এক অলিখিত এবং দীর্ঘমেয়াদী আপস। এই ধরনের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে বিশ্লেষণ করার জন্য তাত্ত্বিক স্টিভেন লেভিটস্কি (Steven Levitsky) এবং লুকান ওয়ে (Lucan Way) একটি চমৎকার ধারণার প্রবর্তন করেছেন। তাঁরা একে প্রতিযোগিতামূলক স্বৈরতন্ত্র (Competitive Authoritarianism) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এই ব্যবস্থায় নিয়মিত নির্বাচন হয়, বিরোধী দল থাকে, কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রের মূল প্রতিষ্ঠানগুলো এমনভাবে একটি নির্দিষ্ট বলয়ের পক্ষে কাজ করে যে আসল ক্ষমতার পালাবদল কখনোই ঘটে না। নব্বইয়ের দশকের পর থেকে এই ভূখণ্ডের রাজনীতি অনেকটা সেই পথেই হাঁটতে শুরু করে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নির্বাচনে কে জিতবে বা কে হারবে, তার কলকাঠি নাড়তে শুরু করে। তারা নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দলকে সরাসরি ক্ষমতায় না বসালেও, নির্বাচনের মাঠে এক ধরনের অদৃশ্য ইঞ্জিনিয়ারিং বা কারসাজি বজায় রাখে। রাজনৈতিক নেতারাও এই খেলাটি মেনে নেন। তারা জানেন, প্রতিরক্ষা বাজেট কমানোর কথা বলা বা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জবাবদিহিতা চাওয়ার মানে হলো নিজেদের রাজনৈতিক পায়ে কুড়াল মারা। তাই সংসদে দাঁড়িয়ে তারা একে অপরের বিরুদ্ধে তুমুল বিষোদ্গার করলেও, গভীর রাষ্ট্রের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে সবাই এক অদ্ভুত নীরবতা পালন করেন। এই আপসমূলক সম্পর্কের কারণে দেশের ভেতরে এক ধরনের জবাবদিহিতাহীন সংস্কৃতির জন্ম হয়। রাজনৈতিক সরকার যেকোনো ব্যর্থতার দায়ভার নিজেদের কাঁধে নিতে বাধ্য হয়, কিন্তু পেছনের কারিগররা সব সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। অর্থনীতি খারাপ হলে বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে সাধারণ মানুষ মন্ত্রীদের গালমন্দ করে। সেই ব্যর্থতার পেছনে যদি আমলাতন্ত্রের চরম অসহযোগিতা বা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ভুল তথ্য দায়ী থাকে, তার কোনো বিচার হয় না। গভীর রাষ্ট্র এই পরিস্থিতিটি দারুণভাবে উপভোগ করে। তারা কোনো রাজনৈতিক দায়ভার না নিয়েই রাষ্ট্রের সমস্ত সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে থাকে। অনেক সময় তারা ইচ্ছে করেই বিরোধী দলের কোনো নেতার গোপন আর্থিক কেলেঙ্কারির খবর মিডিয়াতে ফাঁস করে দেয়, যাতে রাজনৈতিক অঙ্গনে সব সময় এক ধরনের চাপ এবং ভারসাম্য বজায় থাকে। রাজনীতিবিদেরা মূলত এই অদৃশ্য সুতোর পুতুল হিসেবে কাজ করতে বাধ্য হন। নব্বইয়ের দশকের সেই বহু আকাঙ্ক্ষিত গণতান্ত্রিক রূপান্তর শেষ পর্যন্ত গভীর রাষ্ট্রের রিমোট কন্ট্রোলে চালিত একটি সুন্দর নাটকে পরিণত হয়। এক-এগারোর ভূমিকম্প এবং নজরদারির প্রযুক্তিগত রূপ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি এবং সংঘাত যখন চরমে পৌঁছায়, তখন গভীর রাষ্ট্র অনেক সময় তার খোলস ছেড়ে সরাসরি মাঠে নেমে আসে। এই ভূখণ্ডের ইতিহাসে ২০০৭ সালের জানুয়ারি মাসের ঘটনাটি, যা এক-এগারো বা ১/১১ নামে পরিচিত, ঠিক তেমনই একটি রাজনৈতিক ভূমিকম্প ছিল। রাজনৈতিক দলগুলোর জেদাজেদির কারণে যখন দেশে প্রায় গৃহযুদ্ধ লাগার উপক্রম, তখন সামরিক-বেসামরিক জোটটি আর পর্দার আড়ালে বসে থাকেনি। তারা সরাসরি হস্তক্ষেপ করে একটি বেসামরিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করে এবং পেছন থেকে কলকাঠি নাড়তে শুরু করে। এই হস্তক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য কেবল নির্বাচন করা ছিল না। তাদের আসল লক্ষ্য ছিল দেশের পুরো রাজনৈতিক কাঠামোকে ছাঁকনি দিয়ে ছেঁকে ফেলা। তারা ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলা নামের একটি প্রজেক্ট হাতে নেয়, যার লক্ষ্য ছিল দেশের শীর্ষ দুই রাজনৈতিক নেত্রীকে রাজনীতি থেকে চিরতরে নির্বাসনে পাঠানো। যদিও সাধারণ মানুষের তীব্র প্রতিরোধের মুখে সেই ফর্মুলা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়, তবুও এই ঘটনাটি প্রমাণ করে দিয়েছিল যে রাষ্ট্রের ভেতরের এই অদৃশ্য শক্তি কতটা দুঃসাহসী এবং ক্ষমতাধর। তারা চাইলে যেকোনো মুহূর্তে পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে তাসের ঘরের মতো ভেঙে দিতে পারে। এক-এগারোর সেই প্রকাশ্য হস্তক্ষেপ ব্যর্থ হওয়ার পর গভীর রাষ্ট্র একটি বড় শিক্ষা লাভ করে। তারা বুঝতে পারে যে, সরাসরি মাঠে নেমে জনরোষের শিকার হওয়ার চেয়ে প্রযুক্তির আড়ালে থেকে নজরদারি করাটা অনেক বেশি নিরাপদ। এর পর থেকেই শুরু হয় নজরদারির এক সম্পূর্ণ নতুন এবং ডিজিটাল অধ্যায়। ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো (Michel Foucault) তাঁর সাড়া জাগানো গ্রন্থ ডিসিপ্লিন অ্যান্ড পানিশ (Discipline and Punish)-এ প্যানপটিকন (Panopticon) নামের একটি ধারণার কথা বলেছেন (Foucault, 1975)। প্যানপটিকন হলো এমন একটি বন্দিশালা, যেখানে পাহারাদার সবাইকে দেখতে পায়, কিন্তু বন্দিরা পাহারাদারকে দেখতে পায় না। ফলে বন্দিরা সব সময় ভয়ে থাকে এবং নিজেদের আচরণ নিজেরাই নিয়ন্ত্রণ করে। একুশ শতকের আধুনিক প্রযুক্তি গভীর রাষ্ট্রকে ঠিক সেই প্যানপটিকনের ক্ষমতা এনে দিয়েছে। ফোন ট্যাপ করা, হোয়াটসঅ্যাপের মেসেজ পড়া এবং সোশ্যাল মিডিয়ার প্রতিটি পোস্টের ওপর নজরদারি করা এখন অত্যন্ত সহজ একটি ব্যাপার। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এখন আর মানুষের পেছনে গুপ্তচর লাগায় না, মানুষের পকেটে থাকা স্মার্টফোনটিই এখন সবচেয়ে বড় গুপ্তচর হিসেবে কাজ করে। প্রযুক্তিগত এই নজরদারির কারণে সমাজ থেকে ভিন্নমত প্রায় পুরোপুরি উধাও হয়ে গেছে। বিরোধী দলের কোনো নেতা বা ভিন্নমতাবলম্বী বুদ্ধিজীবী যদি সরকারের বা রাষ্ট্রের কোনো নীতির সমালোচনা করার চেষ্টা করেন, তবে মুহূর্তের মধ্যেই তার পুরনো কোনো ব্যক্তিগত কল রেকর্ড বা অডিও ক্লিপ সোশ্যাল মিডিয়ায় ফাঁস করে দেওয়া হয়। চরিত্র হননের এই ডিজিটাল অস্ত্রটি বন্দুকের গুলির চেয়েও অনেক বেশি কার্যকর। সাধারণ মানুষ ভয়ে নিজেদের গুটিয়ে নেয়। তারা বুঝতে পারে যে তাদের ডিজিটাল জীবনের কোনো ব্যক্তিগত গোপনীয়তা আর অবশিষ্ট নেই। ডিপ স্টেট এখন আর কেবল রাজনীতিবিদদের নিয়ন্ত্রণ করে না, তারা পুরো সমাজের চিন্তার কাঠামোটিকে নিজেদের ইচ্ছেমতো ছাঁচে ঢেলে সাজানোর ক্ষমতা রাখে। অ্যালগরিদম ব্যবহার করে তারা নির্দিষ্ট কিছু খবরকে মানুষের নিউজফিডে ছড়িয়ে দেয়, আবার নিজেদের বিরুদ্ধে যাওয়া খবরগুলোকে সুকৌশলে ব্লক করে দেয়। প্রযুক্তিগত এই নিরঙ্কুশ আধিপত্য প্রমাণ করে যে, গভীর রাষ্ট্র এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী, অদৃশ্য এবং অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। কর্পোরেট সিন্ডিকেট এবং নব্য অভিজাততন্ত্রের অর্থনীতি একটি শক্তিশালী গভীর রাষ্ট্র কেবল গোয়েন্দা তথ্য বা আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতা দিয়ে চলতে পারে না। তাদের বিশাল নেটওয়ার্ক টিকিয়ে রাখার জন্য প্রচুর পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হয়, যার হিসাব কোনো সরকারি অডিট খাতায় থাকে না। গত কয়েক দশকে এই ভূখণ্ডের অর্থনীতিতে এক বিশাল পরিবর্তন এসেছে। ব্যাংক মালিক, তৈরি পোশাক খাতের শীর্ষ ব্যবসায়ী এবং মেগা প্রকল্পের ঠিকাদারদের নিয়ে একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে। এই কর্পোরেট পুঁজিপতিরা খুব দ্রুতই বুঝতে পেরেছিলেন যে, ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখার জন্য রাষ্ট্রের ভেতরের ওই স্থায়ী কাঠামোর সাথে হাত মেলানো অপরিহার্য। ফলে আমলা, গোয়েন্দা কর্তা এবং এই কর্পোরেট পুঁজিপতিদের মধ্যে এক ধরনের অলিখিত এবং ভয়ংকর শক্তিশালী আঁতাত গড়ে ওঠে। ব্যবসায়ীরা গভীর রাষ্ট্রের বিভিন্ন গোপন কার্যক্রমে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী প্রচারে অঢেল অর্থ জোগান দেন। বিনিময়ে তারা নিজেদের ব্যবসার জন্য সুবিধাজনক আইন পাস করিয়ে নেন এবং হাজার হাজার কোটি টাকার ব্যাংক ঋণ নিয়ে তা আর পরিশোধ করেন না। এই ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের কোষাগার মূলত একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর পৈতৃক সম্পত্তিতে পরিণত হয়। অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিটজ (Joseph Stiglitz) এই পরিস্থিতিকে খুব চমৎকারভাবে নিয়ন্ত্রক দখল (Regulatory Capture) তত্ত্বের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছেন। বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য রাষ্ট্র যেসব প্রতিষ্ঠান, যেমন – কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা পরিবেশ অধিদপ্তর তৈরি করে, সেই প্রতিষ্ঠানগুলোই ধীরে ধীরে ওই পুঁজিপতিদের পকেটে চলে যায়। ব্যাংকের ঋণখেলাপিরাই যখন ব্যাংক আইন প্রণয়ন কমিটিতে বসেন, তখন সাধারণ মানুষের আমানতের টাকা স্বাভাবিকভাবেই চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। এই নব্য অভিজাত বা এলিট শ্রেণি দেশের আইনসভা বা সংসদেও নিজেদের নিরঙ্কুশ আধিপত্য কায়েম করেছে। একসময় যারা কেবল রাজনৈতিক দলের পেছনের অর্থদাতা ছিলেন, তারা এখন সরাসরি আইনপ্রণেতার চেয়ারে বসে রাষ্ট্রের গতিপথ নির্ধারণ করছেন। রাজনীতি এখন আর কোনো আদর্শিক সেবামূলক কাজ নেই, এটি মূলত একটি অত্যন্ত লাভজনক বিনিয়োগের খাতে পরিণত হয়েছে। এই পুঁজিপতিরা আমলাতন্ত্র এবং নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে এক গভীর সামাজিক এবং ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে তোলেন, যা সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার সম্পূর্ণ বাইরে থাকে। এই ত্রিমুখী আঁতাত মিলে মূলত আধুনিক ডিপ স্টেটের সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ এবং ভয়ংকর রূপটি দাঁড় করায়। তারা রাষ্ট্রের সমস্ত লাভজনক খাত নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেয়। বড় বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি, মেগা প্রকল্পের দরপত্র বা শেয়ারবাজারের নিয়ন্ত্রণ – সবকিছুই এই মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের ইশারাতে চলে। যদি কোনো সৎ রাজনীতিবিদ বা আমলা এই চক্রের বাইরে গিয়ে সাধারণ মানুষের পক্ষে কোনো কাজ করতে চান, তবে তাকে খুব দ্রুতই নানা রকম মিথ্যা অভিযোগে সরিয়ে দেওয়া হয়। এই নব্য এলিট শ্রেণি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কোনো ভেদাভেদ দেখে না। তারা ক্ষমতাসীন দলের পাশাপাশি বিরোধী দলেও নিজেদের বিনিয়োগ বজায় রাখে, যাতে ক্ষমতার পালাবদল হলেও তাদের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যে কোনো আঁচড় না লাগে। সাধারণ মানুষ হয়তো মনে করে তারা ভোট দিয়ে দেশের নীতি পরিবর্তন করছে, কিন্তু পর্দার আড়ালে অর্থনীতি এবং রাজনীতির আসল নাটাই থাকে এই কর্পোরেট সিন্ডিকেটের হাতে। এটি মূলত গণতন্ত্রের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে লুটেপুটে খাওয়ার এক সুসংগঠিত ব্যবস্থা। পররাষ্ট্রনীতিতে অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ ও ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য গভীর রাষ্ট্রের সবচেয়ে স্পর্শকাতর এবং জটিল ভূমিকাটি পালন করতে হয় পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে। অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে রাজনৈতিক দলগুলো অনেক সময় সাধারণ মানুষের মন জয় করার জন্য বা সস্তা হাততালি পাওয়ার আশায় আবেগপূর্ণ কথা বলে থাকে। নির্বাচনের মাঠে বিরোধী পক্ষের ভোট টানার জন্য হয়তো প্রতিবেশী দেশ বা পরাশক্তির বিরুদ্ধে তীব্র ভাষায় বক্তৃতা দেওয়া হয়। রাজনৈতিক নেতারা সাধারণত পাঁচ বছরের মেয়াদ নিয়ে চিন্তা করেন। তাদের কাছে পরবর্তী নির্বাচনে জয়লাভ করাই থাকে প্রধান লক্ষ্য। কিন্তু রাষ্ট্রের ভেতরের অদৃশ্য কাঠামোটি এই পাঁচ বছরের মাপে চিন্তা করে না। তারা ভাবে আগামী পঞ্চাশ বছর পর রাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান কেমন হবে। তারা খুব ভালো করেই জানে, সাধারণ মানুষের আবেগের ওপর ভিত্তি করে কোনো দেশের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করলে তা দেশের অর্থনীতির জন্য চরম আত্মঘাতী হবে। তাই তারা বহির্বিশ্বের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক ধরনের কাঠামোগত ধারাবাহিকতা বজায় রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে। রাজনৈতিক মঞ্চে যতই উত্তেজনা থাকুক না কেন, এই অদৃশ্য কাঠামোটি নিশ্চিত করে যেন রাষ্ট্রের মূল বৈদেশিক সম্পর্কগুলো কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। পর্দার আড়ালে গোয়েন্দা প্রধান, সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্তা এবং জ্যেষ্ঠ কূটনীতিকরা নিয়মিত পরাশক্তি এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেন। একে কূটনীতির ভাষায় ব্যাক-চ্যানেল নেগোসিয়েশন বা পেছনের দরজার আলোচনা বলা হয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তাত্ত্বিক রবার্ট পুটনাম (Robert Putnam) তাঁর দ্বি-স্তর বিশিষ্ট খেলা (Two-Level Game) তত্ত্বে এই পরিস্থিতিটি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন (Putnam, 1988)। দৃশ্যমান রাজনীতিবিদেরা দেশের ভেতরের টেবিলে খেলেন, আর অদৃশ্য রাষ্ট্র খেলে আন্তর্জাতিক টেবিলে। সরকারপ্রধান হয়তো প্রকাশ্যে কোনো একটি বিদেশি চুক্তির তীব্র সমালোচনা করছেন। ঠিক সেই সময়েই গোয়েন্দা পর্যায় থেকে ওই বিদেশি রাষ্ট্রটিকে আশ্বস্ত করা হয় যে, এই রাজনৈতিক বক্তৃতার কারণে কৌশলগত সম্পর্কে কোনো প্রভাব পড়বে না। এই দ্বিমুখী নীতি বজায় রাখাটা রাষ্ট্রীয় অস্তিত্ব রক্ষার জন্য অপরিহার্য। ডিপ স্টেট মূলত রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির একটি শক অ্যাবজর্বার বা আঘাত প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে। তারা আবেগতাড়িত এবং ক্ষণস্থায়ী রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোকে ছেঁকে নিয়ে কেবল নিরেট জাতীয় স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে পলিসিগুলোকে সামনের দিকে এগিয়ে নেয়। এই ব্যবস্থার একটি বড় সমালোচনা হলো, এখানে সাধারণ মানুষের বা সংসদের কোনো জবাবদিহিতা থাকে না। কোন দেশের সাথে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের চুক্তি হবে, ভারতের সাথে ট্রানজিটের শর্ত কী হবে বা চীনের কাছ থেকে কী ধরনের সাবমেরিন কেনা হবে – এই অতি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সিদ্ধান্তগুলো মূলত গুটিকয়েক আমলা এবং সামরিক কর্তাই চূড়ান্ত করেন। গণতান্ত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি চরম আপত্তিজনক হলেও, বাস্তববাদী বিশ্বরাজনীতিতে এর অনেক উপযোগিতা রয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অনেক গোপন তথ্য এবং দরকষাকষির বিষয় সব সময় জনসমক্ষে প্রকাশ করা সম্ভব হয় না। প্রকাশ্য বিতর্কে গেলে অনেক লাভজনক ভূ-রাজনৈতিক সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার শঙ্কা থাকে। ডিপ স্টেট এই গোপনীয়তার সুযোগ নিয়ে রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্বার্থকে আগলে রাখে। তারা বারবার প্রমাণ করে দেয়, একটি রাষ্ট্রের সফল পররাষ্ট্রনীতি কেবল আলোকিত সংবাদ সম্মেলনের ওপর নির্ভর করে না। এটি মূলত নেপথ্যের সেই ধীরস্থির এবং নিঃশব্দ কারিগরদের অসীম প্রজ্ঞার ওপর ভর করেই টিকে থাকে, যারা রাজনৈতিক ঝড়ের মধ্যেও রাষ্ট্রের মূল নোঙরটি শক্ত করে ধরে রাখেন। যুক্ত পাকিস্তানের পতনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস (Brief history of events leading to disintegration of United Pakistan) ভৌগোলিক অসংলগ্নতা এবং একটি বিচিত্র রাষ্ট্রের জন্ম ১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে সীমানা নির্ধারণ করে ব্রিটিশরা ভারতবর্ষ ছেড়ে চলে যায়। এর মধ্য দিয়ে মানচিত্রে পাকিস্তান নামের একটি বিচিত্র রাষ্ট্রের জন্ম হয়। বিচিত্র বলার কারণ হলো, পৃথিবীর ইতিহাসে ভৌগোলিকভাবে এত দূরবর্তী দুটি ভূখণ্ড নিয়ে একটি মাত্র রাষ্ট্র গঠনের আর কোনো দ্বিতীয় উদাহরণ নেই। পূর্ব এবং পশ্চিম পাকিস্তানের মাঝে দূরত্ব ছিল হাজার মাইলেরও বেশি। মাঝখানে বিশাল এবং অনেকাংশেই বৈরী প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত। একটি রাষ্ট্রের টিকে থাকার জন্য ভৌগোলিক সংলগ্নতা (Geographical Contiguity) খুব সাধারণ একটি শর্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। দুটি আলাদা ভূখণ্ড, যাদের মধ্যে সড়কপথে যোগাযোগের সরাসরি কোনো ব্যবস্থা নেই, তাদের নিয়ে একটি কার্যকর কেন্দ্রীয় প্রশাসন চালানো এমনিতেই এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। শুরু থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী এই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। তাদের ধারণা ছিল, শুধু ধর্মের বাঁধন দিয়ে হাজার মাইলের এই ভৌগোলিক দূরত্ব সহজেই জয় করা সম্ভব। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, কেবল একটি মাত্র সাধারণ পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে কোনো আধুনিক রাষ্ট্র দীর্ঘকাল টিকে থাকতে পারে না। পূর্ব এবং পশ্চিম পাকিস্তানের মানুষের ভাষা, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক, এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রার মধ্যে বিস্তর ফারাক ছিল। সিন্ধু নদের তীরের রুক্ষ শুষ্ক পরিবেশের মানুষের সাথে পদ্মার তীরের পলল ভূমির মানুষের মানসিকতার খুব একটা মিল থাকার কথাও নয়। এই দুই অংশের মানুষের মধ্যে মেলবন্ধনের ভিত্তি ছিল অত্যন্ত নড়বড়ে। ভৌগোলিক এই অসংলগ্নতার পাশাপাশি মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বও শুরু থেকেই প্রকট হতে থাকে। পাকিস্তানের ভিত্তি হিসেবে যে দ্বিজাতি তত্ত্ব (Two-Nation Theory) দাঁড় করানো হয়েছিল, তা মূলত উত্তর ভারতের মুসলিম অভিজাত শ্রেণির রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার একটি হাতিয়ার ছিল। এই তত্ত্বের প্রবক্তারা মনে করতেন যে, ভারতের মুসলিমরা হিন্দু সমাজের আধিপত্য থেকে মুক্ত হয়ে নিজেদের জন্য একটি আলাদা আবাসভূমি তৈরি করবে। কিন্তু সমস্যা হলো, এই আলাদা আবাসভূমির নেতৃত্ব মূলত পাঞ্জাবি এবং উর্দুভাষী মোহাজির বা অভিবাসীদের হাতে কুক্ষিগত হয়ে পড়ে। বাঙালি মুসলিমরা, যারা জনসংখ্যার দিক থেকে পুরো পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল, তারা শুরু থেকেই ক্ষমতার এই সমীকরণে ব্রাত্য হয়ে যায়। পশ্চিম পাকিস্তানের নেতারা পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে পুরোপুরি নিজেদের সমকক্ষ মনে করতেন না। তাদের চোখে বাঙালিরা ছিল সাংস্কৃতিকভাবে একটু নিচু স্তরের এবং অনেক বেশি হিন্দুভাবাপন্ন। এই সাংস্কৃতিক অহমিকা এবং অবজ্ঞার বিষয়টি দুই অংশের মধ্যে একটি অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করে দেয়। একটি নতুন রাষ্ট্র গড়ে তোলার জন্য যে পারস্পরিক সম্মান এবং আস্থার প্রয়োজন হয়, যুক্ত পাকিস্তানের প্রথম দিন থেকেই তার দারুণ অভাব ছিল। ফলে ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে যে উচ্ছ্বাস নিয়ে রাষ্ট্রটির যাত্রা শুরু হয়েছিল, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সেই উচ্ছ্বাসের জায়গা দখল করে নেয় গভীর অবিশ্বাস এবং সন্দেহ (Sayeed, 1967)। ভাষার ওপর আঘাত এবং সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা নতুন রাষ্ট্রের যাত্রা শুরু হতে না হতেই সবচেয়ে বড় আঘাতটি আসে ভাষার ওপর। ভাষা কেবল কিছু শব্দের সমষ্টি নয়, এটি একটি জাতির আত্মপরিচয় এবং চিন্তার বাহন। পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫৪ শতাংশের মাতৃভাষা ছিল বাংলা। অন্যদিকে উর্দু মাতৃভাষা ছিল মাত্র ৭ শতাংশের কাছাকাছি মানুষের। তারপরও পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী সিদ্ধান্ত নেয় যে রাষ্ট্রভাষা হবে কেবল উর্দু। ১৯৪৮ সালে স্বয়ং মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে দাঁড়িয়ে এই ঘোষণা দেন। এর পেছনের রাজনীতিটি ছিল খুব পরিষ্কার। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক শ্রেণি বুঝতে পেরেছিল, বাঙালিদের হাতে যদি ভাষার অধিকার থাকে, তবে প্রশাসন এবং রাজনীতিতে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে আধিপত্য বিস্তার করবে। উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার মূল উদ্দেশ্য ছিল একটি সুপরিকল্পিত সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ (Cultural Imperialism) প্রতিষ্ঠা করা। বাঙালি শিক্ষিত সমাজকে সরকারি চাকরি, প্রশাসন এবং নীতিনির্ধারণী জায়গা থেকে দূরে রাখার জন্য এটি ছিল একটি মোক্ষম অস্ত্র। কারণ রাষ্ট্রীয় ভাষা উর্দু হলে বাঙালিদের নতুন করে সেই ভাষা শিখতে হবে, যা তাদের পিছিয়ে দেবে। এই অদূরদর্শী সিদ্ধান্তটি পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ এবং ছাত্রসমাজ মেনে নিতে পারেনি। তারা বুঝতে পেরেছিল যে, মাতৃভাষা কেড়ে নেয়ার মানে হলো তাদের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক অধিকারের দরজা চিরতরে বন্ধ করে দেয়া। এই ক্ষোভের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। পুলিশের গুলিতে ছাত্রদের প্রাণহানির ঘটনা পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মনস্তত্ত্বে বিশাল এক পরিবর্তন নিয়ে আসে। তারা প্রথমবারের মতো খুব গভীরভাবে উপলব্ধি করে যে, ধর্মের দোহাই দিয়ে তাদের যে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে রাখা হয়েছে, সেখানে তাদের আপন বলতে কিছুই নেই। ভাষা আন্দোলন কেবল রাষ্ট্রভাষা প্রতিষ্ঠার কোনো সাধারণ দাবি ছিল না। এটি ছিল মূলত একটি ধর্মনিরপেক্ষ এবং জাতিভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদ (Bengali Nationalism)-এর প্রথম স্পষ্ট স্ফুরণ। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই বাঙালি সমাজ তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক শেকড়ের দিকে ফিরে তাকাতে শুরু করে। পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে তাদের যে আদর্শিক দূরত্ব, সেটি এই ঘটনার পর থেকে আর কখনো ঘোচেনি। ভাষা আন্দোলনের পর থেকে বাঙালিরা সাহিত্য, গান, নাটক এবং শিল্পের অন্যান্য শাখায় নিজেদের স্বকীয়তাকে অনেক বেশি জোরালোভাবে তুলে ধরতে শুরু করে। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকরা এই সাংস্কৃতিক জাগরণকে সবসময় সন্দেহের চোখে দেখেছে। তারা রবীন্দ্রসংগীত সম্প্রচার নিষিদ্ধ করার চেষ্টা করেছে, বাংলা হরফ পরিবর্তন করে রোমান বা আরবি হরফ প্রবর্তনের হাস্যকর উদ্যোগ নিয়েছে। এই ধরনের প্রতিটি পদক্ষেপ বাঙালিদের মনে এই বিশ্বাসটি আরও দৃঢ় করেছে যে, তারা একটি স্বাধীন দেশে বাস করছে না, বরং তারা নতুন এক ধরনের উপনিবেশের শিকার হয়েছে (Umar, 2004)। অর্থনৈতিক বৈষম্য ও অভ্যন্তরীণ উপনিবেশবাদ যুক্ত পাকিস্তানের পতনের পেছনে সবচেয়ে বড় নিয়ামক শক্তি হিসেবে কাজ করেছে দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক শোষণ। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এবং অর্থনীতিবিদরা এই শোষণ প্রক্রিয়াটিকে ব্যাখ্যা করার জন্য দুই অর্থনীতি তত্ত্ব (Two-Economy Theory) সামনে নিয়ে আসেন। এই তত্ত্বের মূল কথা হলো, কাগজে-কলমে পাকিস্তান একটি রাষ্ট্র হলেও বাস্তবে এর ভেতরে সম্পূর্ণ আলাদা দুটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কাজ করছিল। রাষ্ট্রের আয় এবং ব্যয়ের হিসাব করলে দেখা যায়, পূর্ব পাকিস্তান থেকে অর্জিত বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা খুব সুকৌশলে পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার করে দেয়া হতো। পূর্ব পাকিস্তানে উৎপাদিত পাট ছিল সেই সময়ের সবচেয়ে বড় রপ্তানি পণ্য। অথচ এই পাট বিক্রির টাকা দিয়ে করাচি, লাহোর আর ইসলামাবাদে গড়ে উঠছিল বড় বড় শিল্পকারখানা, রাস্তাঘাট এবং সুরম্য ভবন। অন্যদিকে পূর্ব পাকিস্তান রয়ে যাচ্ছিল সেই আগের মতোই অবহেলিত এবং অনুন্নত। পশ্চিম পাকিস্তানে শিল্পের কাঁচামাল কেনার জন্য পূর্ব পাকিস্তানের কৃষকদের সস্তায় তাদের পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য করা হতো। কেন্দ্রীয় সরকারের বাজেটের একটি বিশাল অংশ ব্যয় হতো প্রতিরক্ষা এবং বেসামরিক প্রশাসনের পেছনে, যার সিংহভাগই ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে অবস্থিত। ফলে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ তাদের নিজেদের উপার্জিত সম্পদের কোনো সুফল ভোগ করতে পারছিল না। এই ভয়াবহ বৈষম্যমূলক পরিস্থিতিকে অনেক গবেষক অভ্যন্তরীণ উপনিবেশবাদ (Internal Colonialism) বলে আখ্যায়িত করেছেন। ব্রিটিশরা যেমন ভারতবর্ষ থেকে সম্পদ লুটে নিয়ে ব্রিটেনে শিল্পবিপ্লব ঘটিয়েছিল, পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীও ঠিক একই কায়দায় পূর্ব পাকিস্তানকে নিজেদের একটি কাঁচামাল সরবরাহের বাজার হিসেবে ব্যবহার করছিল। ব্যাংকিং খাত, বীমা কোম্পানি থেকে শুরু করে বড় বড় সমস্ত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিকানা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানিদের হাতে। পূর্ব পাকিস্তানের কোনো ব্যবসায়ী চাইলেও সহজে ব্যাংক থেকে ঋণ পেতেন না। বৈদেশিক সাহায্যের যে টাকা আসত, তারও বেশিরভাগ খরচ করা হতো পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়নে। পূর্ব পাকিস্তানে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান দিন দিন নিচে নামছিল। জিনিসপত্রের দাম ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় অনেক বেশি। চাল, আটা থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রতিটি পণ্যের জন্য পূর্ব পাকিস্তানকে পশ্চিম পাকিস্তানের ওপর নির্ভর করতে হতো। অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান তাঁর বিভিন্ন গবেষণায় খুব পরিষ্কারভাবে দেখিয়েছেন যে, কীভাবে পরিকল্পনা কমিশনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয়ভাবে এই বৈষম্যগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া হয়েছিল (Sobhan, 1992)। পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনীতিবিদরা বারবার এই বৈষম্যের কথা তুলে ধরেছেন, কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার সবসময় এসব দাবিকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা বা বিচ্ছিন্নতাবাদ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। এই সীমাহীন অর্থনৈতিক বঞ্চনা সাধারণ মানুষের মনে পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতি চরম ঘৃণার জন্ম দেয়। রাজনৈতিক বঞ্চনা ও সামরিক-আমলাতান্ত্রিক বলয় অর্থনৈতিক শোষণের পাশাপাশি পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক বঞ্চনার ইতিহাসও ছিল সমান দীর্ঘ। একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের হাতেই রাষ্ট্রের শাসনভার থাকার কথা। পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি বাঙালি হওয়া সত্ত্বেও তারা কখনোই রাষ্ট্র পরিচালনায় নিজেদের ন্যায্য অধিকার পায়নি। পাকিস্তানের জন্ম হওয়ার পর একটি সংবিধান তৈরি করতে সময় লেগে যায় দীর্ঘ নয় বছর। এর মূল কারণ ছিল, পশ্চিম পাকিস্তানি নেতারা এমন একটি কাঠামো দাঁড় করাতে চাইছিলেন যেখানে বাঙালিরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়েও ক্ষমতায় বসতে পারবে না। তারা বিভিন্ন রকম রাজনৈতিক কূটচালের মাধ্যমে একের পর এক সরকার পরিবর্তন ঘটাতে থাকে। এই রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে রাষ্ট্রের ক্ষমতা ধীরে ধীরে সামরিক বাহিনী এবং উচ্চপদস্থ আমলাদের হাতে চলে যায়। এই সামরিক-আমলাতান্ত্রিক বলয় (Military-Bureaucratic Oligarchy) ছিল মূলত পাঞ্জাবি এবং মোহাজিরদের একটি একচেটিয়া ক্লাব। সেখানে বাঙালিদের কোনো উল্লেখযোগ্য প্রতিনিধিত্ব ছিল না। সেনাবাহিনী বা সিভিল সার্ভিসের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে বাঙালির সংখ্যা ছিল একেবারেই হাতে গোনা। ফলে রাষ্ট্রীয় কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাঙালিদের মতামত নেয়ার কোনো সুযোগই রাখা হয়নি। ১৯৫৮ সালে জেনারেল আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারির মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। তিনি গণতান্ত্রিক কাঠামোকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়ে মৌলিক গণতন্ত্র (Basic Democracy) নামের একটি প্রহসনমূলক ব্যবস্থা চালু করেন। এই ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেয়া হয়। কয়েক হাজার নির্বাচিত ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বা ‘মৌলিক গণতন্ত্রী’র হাতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ক্ষমতা তুলে দেয়া হয়। সরকারি সুযোগ-সুবিধা এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে এই ক্ষুদ্র গোষ্ঠীকে খুব সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা যেত। আইয়ুব খানের এই পুরো দশ বছরের শাসনামল ছিল পূর্ব পাকিস্তানের জন্য চরম দমবন্ধ করা এক সময়। রাজনৈতিক নেতাদের নির্বিচারে জেলে ঢোকানো হয়, সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ করা হয়। রওনক জাহান তাঁর সুবিখ্যাত গ্রন্থ পাকিস্তান: ফেইলিউর ইন ন্যাশনাল ইন্টিগ্রেশন (Pakistan: Failure in National Integration)-এ খুব সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেছেন যে, আইয়ুব খান কীভাবে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে বাঙালিদের অংশীদারিত্বকে সুপরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করেছিলেন (Jahan, 1972)। রাষ্ট্র যখন তার সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে জোরপূর্বক বাইরে রাখে, তখন সেই রাষ্ট্রের টিকে থাকার কোনো আইনি বা নৈতিক ভিত্তি অবশিষ্ট থাকে না। পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ বুঝতে পারে যে, নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির মাধ্যমে পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক জান্তার কাছ থেকে অধিকার আদায় করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। স্বায়ত্তশাসনের দাবি এবং ছয় দফা আন্দোলন ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধ পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের রাজনৈতিক চিন্তাধারায় একটি বিশাল পরিবর্তন নিয়ে আসে। সতেরো দিনের এই যুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তান ছিল সম্পূর্ণ অরক্ষিত। ভারতের বিশাল সামরিক বাহিনীর সামনে পূর্ব পাকিস্তানকে রক্ষা করার জন্য নামমাত্র কিছু সৈন্য মোতায়েন ছিল। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকরা সেসময় দম্ভ করে বলেছিল যে, পশ্চিম পাকিস্তান থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করা হবে। এই যুদ্ধ প্রমাণ করে দেয় যে, বিপদের সময় পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তানের সুরক্ষার জন্য সামান্যতম চিন্তাও করে না। এই চরম নিরাপত্তাহীনতার বোধ থেকেই ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবি পেশ করেন। ছয় দফা ছিল মূলত বাঙালি জাতির বাঁচার দাবি। এই দফার মূল কথা ছিল, দেশরক্ষা এবং পররাষ্ট্রনীতি ছাড়া রাষ্ট্রের বাকি সব ক্ষমতা প্রদেশের হাতে ছেড়ে দিতে হবে। দুটি অঞ্চলের জন্য আলাদা কিন্তু সহজে বিনিময়যোগ্য মুদ্রাব্যবস্থা থাকবে এবং প্রদেশগুলো নিজেদের ইচ্ছেমতো কর আদায় ও বৈদেশিক বাণিজ্য করতে পারবে। ছয় দফা কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদের দাবি ছিল না, এটি ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন (Provincial Autonomy)-এর রূপরেখা। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী এই দাবিকে পাকিস্তানের অখণ্ডতার জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবে ধরে নেয়। ছয় দফার কারণে শেখ মুজিবুর রহমান রাতারাতি পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত হন। সাধারণ মানুষ এই দাবিগুলোকে নিজেদের মুক্তি সনদ হিসেবে গ্রহণ করে। ভীত সামরিক জান্তা শেখ মুজিবকে রাজনীতি থেকে চিরতরে সরিয়ে দেয়ার জন্য ১৯৬৮ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে। তাঁকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে ফাঁসি দেয়ার চক্রান্ত করা হয়। কিন্তু এই মামলা হিতে বিপরীত ফল বয়ে আনে। পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র-জনতা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। ১৯৬৯ সালে সারা দেশে এক অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানের সৃষ্টি হয়। রাজপথের লাগাতার আন্দোলনের মুখে আইয়ুব খান ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন এবং মামলা প্রত্যাহার করে শেখ মুজিবকে মুক্তি দেয়া হয়। এই গণঅভ্যুত্থান বাঙালি সমাজকে মানসিকভাবে এমন একটি জায়গায় নিয়ে যায়, যেখান থেকে আর পেছনে ফেরার কোনো পথ ছিল না। তারা নিজেদের রাজনৈতিক শক্তি সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন হয়ে ওঠে। নতুন সামরিক শাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খান বাধ্য হয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে সাধারণ নির্বাচন দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। ততদিনে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মনের ভেতরে স্বাধিকার (Self-determination)-এর বীজ খুব শক্তভাবে প্রোথিত হয়ে গেছে। তারা বুঝতে পেরেছে, নিজেদের ভাগ্য নিজেদেরই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, অন্যথায় শোষণের এই জাঁতাকল থেকে মুক্তির কোনো উপায় নেই। সত্তরের নির্বাচন এবং ক্ষমতা হস্তান্তরের টানাপোড়েন ১৯৭০ সালের শেষ দিকে পূর্ব পাকিস্তানের উপকূলীয় অঞ্চলে এক প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। লাখ লাখ মানুষ প্রাণ হারায় এবং বিস্তীর্ণ এলাকা বিরানভূমিতে পরিণত হয়। এমন একটি ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের সময়ও কেন্দ্রীয় সরকারের চরম নির্লিপ্ততা পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে হতবাক করে দেয়। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে কোনো বড় নেতা বা সরকারি কর্মকর্তা দুর্গত মানুষদের পাশে এসে দাঁড়াননি। ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রেও দেখা যায় চরম অবহেলা। এই ঘটনাটি বাঙালিদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, পশ্চিম পাকিস্তানের কাছে তারা কতটা মূল্যহীন। এই তীব্র ক্ষোভ এবং হতাশার পটভূমিতেই ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে তাদের চূড়ান্ত রায় প্রদান করে। শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। গণতান্ত্রিক নিয়মানুযায়ী শেখ মুজিবুর রহমানেরই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কথা। এটি ছিল পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের জন্য একটি বিরাট মানসিক বিজয়। তারা ভেবেছিল, ব্যালট পেপারের মাধ্যমেই হয়তো দীর্ঘ তেইশ বছরের শোষণ এবং বঞ্চনার অবসান ঘটতে যাচ্ছে। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র এবং রাজনৈতিক নেতারা কোনোভাবেই একজন বাঙালির হাতে পুরো পাকিস্তানের ক্ষমতা ছেড়ে দিতে রাজি ছিলেন না। পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো এবং সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান মিলে ক্ষমতা হস্তান্তর না করার জন্য নানা রকম ষড়যন্ত্র শুরু করেন। তারা বারবার জাতীয় পরিষদের অধিবেশন পেছাতে থাকেন এবং শেখ মুজিবের ওপর নানা রকম অযৌক্তিক শর্ত চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন। এই টালবাহানা পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে চরমভাবে ক্ষুব্ধ করে তোলে। ১৯৭১ সালের ১লা মার্চ যখন ইয়াহিয়া খান অনির্দিষ্টকালের জন্য জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন, তখন পুরো পূর্ব পাকিস্তান বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। এই আন্দোলনের মাধ্যমে শেখ মুজিবুর রহমান মূলত পুরো পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়ে নেন। কোর্ট-কাচারি, অফিস-আদালত, ব্যাংক-বীমা সবকিছু তাঁর নির্দেশে চলতে থাকে। কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণই আর পূর্ব পাকিস্তানে অবশিষ্ট ছিল না। একটি রাষ্ট্রের ভেতরে এই ধরনের দ্বৈত শাসন (Dual Power) বেশিদিন চলতে পারে না। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকরা বুঝতে পারে যে, রাজনৈতিকভাবে বাঙালিদের আর দাবিয়ে রাখা সম্ভব নয়। তারা তখন সমস্যা সমাধানের জন্য সবচেয়ে নিষ্ঠুর এবং ভয়াবহ পথটি বেছে নেয়, যার পরিণতি ছিল যুক্ত পাকিস্তানের অনিবার্য মৃত্যু। চূড়ান্ত আঘাত এবং একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের সেই উত্তাল দিনগুলোতে আলোচনার নামে মূলত সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছিল। ইয়াহিয়া খান একদিকে শেখ মুজিবের সাথে লোক দেখানো বৈঠক করছিলেন, অন্যদিকে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে জাহাজে করে ভারী অস্ত্রশস্ত্র এবং সৈন্য নিয়ে আসছিলেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল সামরিক শক্তির মাধ্যমে বাঙালিদের চিরতরে স্তব্ধ করে দেয়া। ২৫শে মার্চ গভীর রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঘুমন্ত এবং নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। শুরু হয় ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ এক গণহত্যা, যার সাংকেতিক নাম ছিল ‘অপারেশন সার্চলাইট’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পিলখানা, রাজারবাগ পুলিশ লাইনসহ সারা শহরে একযোগে আক্রমণ চালানো হয়। এই রাতের বর্বরোচিত হামলা যুক্ত পাকিস্তানের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেয়। যে রাষ্ট্র তার নিজের নাগরিকদের ওপর ট্যাংকার এবং মেশিনগান নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে, সেই রাষ্ট্রের প্রতি ন্যূনতম আনুগত্য রাখার কোনো কারণ আর অবশিষ্ট থাকে না। ২৫শে মার্চের এই ভয়াবহ ক্র্যাকডাউনের মধ্য দিয়েই যুক্ত পাকিস্তানের ধারণাটি চিরতরে সমাপ্ত হয় (Baxter, 1997)। শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতারের প্রাক্কালে পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত এক সশস্ত্র সংঘর্ষের দিকে গড়িয়ে পড়ে। এরপর শুরু হয় নয় মাসের এক রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র সংগ্রাম। সাধারণ কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র এবং সামরিক-আধাসামরিক বাহিনীর বাঙালি সদস্যরা মিলে গড়ে তোলে প্রতিরোধ। যে রাষ্ট্রটিকে ধর্মের দোহাই দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল, মাত্র চব্বিশ বছরের মাথায় সেই রাষ্ট্রের দুই অংশ একে অপরের দিকে বন্দুক তাক করে দাঁড়ায়। যুক্ত পাকিস্তানের পতন কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা ছিল না। এটি ছিল দীর্ঘ দুই দশকের ধারাবাহিক শোষণ, বঞ্চনা, অহমিকা এবং অবিচারের এক অনিবার্য পরিণতি। একটি রাষ্ট্র যখন তার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা, সংস্কৃতি এবং অর্থনৈতিক অধিকারকে পদদলিত করে, তখন সেই রাষ্ট্র তাসের ঘরের মতোই ভেঙে পড়তে বাধ্য। পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ অনেক ধৈর্য ধরে নিয়মতান্ত্রিকভাবে নিজেদের অধিকার আদায়ের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু বুলেট দিয়ে যখন ব্যালটকে অস্বীকার করা হলো, তখন প্রতিরোধ ছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিল না। পৃথিবীর মানচিত্র থেকে যুক্ত পাকিস্তান নামের সেই বিচিত্র রাষ্ট্রটির মুছে যাওয়া মূলত ইতিহাসের এক অমোচনীয় সত্যকেই প্রমাণ করে – জোর করে চাপিয়ে দেয়া কোনো পরিচয় দিয়ে কখনো একটি স্বাধীন এবং আত্মমর্যাদাসম্পন্ন জাতিকে চিরকাল দাবিয়ে রাখা যায় না। স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্ম (Birth of Bangladesh as an independent country) স্নায়ুযুদ্ধের চরম মেরুকরণ এবং ভূ-রাজনৈতিক দাবার চাল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ কোনো সাধারণ আঞ্চলিক সংঘাত ছিল না। এটি ছিল স্নায়ুযুদ্ধের চরম মেরুকরণের এক নিখুঁত এবং ভয়াবহ রণক্ষেত্র। আন্তর্জাতিক রাজনীতির দাবার বোর্ডে এই ভূখণ্ডের সাধারণ মানুষের রক্ত এবং জীবন অনেক সময় নিছকই কিছু পরিসংখ্যান হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। সেই উত্তাল সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন তাদের নিজেদের কৌশলগত স্বার্থে পাকিস্তানের সামরিক জান্তাকে পূর্ণাঙ্গ সমর্থন দিয়েছিল। এই দুই পরাশক্তির মধ্যে তখন একটি অত্যন্ত গোপন এবং অভাবনীয় আঁতাত তৈরি হচ্ছিল, যেখানে পাকিস্তান কাজ করছিল একটি বিশ্বস্ত সংযোগকারী সেতু হিসেবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এবং তাঁর উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার বেইজিংয়ের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য এতটাই মরিয়া ছিলেন যে, পূর্ব পাকিস্তানে হওয়া ভয়াবহ গণহত্যাকে তারা সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন। তাদের চোখে মানুষের প্রাণের চেয়ে ভূ-রাজনৈতিক দাবার চাল অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। পরাশক্তিগুলোর এই নির্লিপ্ততা এবং স্বার্থপরতা প্রমাণ করে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ময়দানে দুর্বল বা রাষ্ট্রহীন মানুষের পক্ষে কথা বলার মতো কেউ থাকে না। প্রতিটি পরাশক্তি কেবল নিজেদের সর্বোচ্চ ফায়দা লোটার জন্যই ছক কষে। অন্যদিকে, দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন ও চীনা প্রভাব ঠেকানোর জন্য সোভিয়েত ইউনিয়ন একটি বড় সুযোগ খুঁজছিল। তারা বুঝতে পেরেছিল, পাকিস্তানকে দ্বিখণ্ডিত করতে পারলে এই অঞ্চলে তাদের মিত্র ভারতের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হবে। এই হিসাব-নিকাশ থেকেই সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতের সাথে ঐতিহাসিক শান্তি ও মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ হয়। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে তারা বারবার তাদের ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করে যুক্তরাষ্ট্রের আনা যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবগুলো আটকে দেয়। এই ভেটোগুলো মূলত যৌথ বাহিনীকে ঢাকা দখলের জন্য প্রয়োজনীয় অমূল্য সময়টুকু কিনে দিয়েছিল। তাত্ত্বিক জন মেয়ারশাইমার (John Mearsheimer) তাঁর আক্রমণাত্মক বাস্তববাদ (Offensive Realism) তত্ত্বে খুব পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, পরাশক্তিগুলো সব সময় অন্য অঞ্চলে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ খোঁজে এবং ছোট রাষ্ট্রগুলোকে সেই ক্ষমতার খেলায় গুটি হিসেবে ব্যবহার করে। মুক্তিযুদ্ধের এই চরম ক্রান্তিলগ্নে পরাশক্তিগুলোর এই ভূ-রাজনৈতিক চালগুলোই মূলত নতুন রাষ্ট্রের জন্মের গতিপথ চিরতরে নির্ধারণ করে দিয়েছিল। সদ্য স্বাধীন হওয়া একটি রাষ্ট্র জন্মলগ্ন থেকেই বুঝতে শেখে যে, বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিশ্রুতি অনেক সময় ফাঁকা বুলির মতো এবং নিজ দেশের সুরক্ষায় নিজেদেরই প্রস্তুত থাকতে হয়। বিশ্বরাজনীতির দাবার ছক এবং পরাশক্তির মেরুকরণ পৃথিবীর মানচিত্র বদলে যাওয়ার ঘটনা খুব বেশি ঘটে না। একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হওয়া মানে হলো আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পুরনো অনেক হিসাব-নিকাশ পুরোপুরি উল্টে যাওয়া। ১৯৭১ সালের ঘটনাপ্রবাহকে অনেকেই শুধু একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতার লড়াই হিসেবে দেখেন। ব্যাপারটা আসলে এতটা সরল নয়। এই যুদ্ধটি নিছক কোনো স্থানীয় সংঘাত ছিল না, বরং এটি ছিল স্নায়ুযুদ্ধ (Cold War) চলাকালীন সময়ের অন্যতম বড় একটি ভূ-রাজনৈতিক ঘটনা। পুরো পৃথিবী তখন সমাজতান্ত্রিক এবং পুঁজিবাদী – এই দুই স্পষ্ট শিবিরে বিভক্ত। আন্তর্জাতিক রাজনীতির এই দ্বিমেরু বিশ্ব (Bipolar World) ব্যবস্থায় প্রতিটি রাষ্ট্রই কোনো না কোনো পরাশক্তির ছাতার নিচে অবস্থান করছিল। পাকিস্তান শুরু থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে কাজ করে আসছিল। তারা সেন্টো এবং সিয়াটোর মতো সামরিক জোটের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিল। অন্যদিকে ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে জোটনিরপেক্ষ থাকলেও তাদের কৌশলগত ঝোঁক ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে। ফলে পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের স্বাধিকার আদায়ের এই সংগ্রাম খুব দ্রুতই পরাশক্তিগুলোর ক্ষমতার লড়াইয়ের একটি প্রধান রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। রিচার্ড সিসন এবং লিও রোজ তাদের বিখ্যাত গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, কীভাবে ওয়াশিংটন, মস্কো এবং বেইজিংয়ের নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্তগুলো সরাসরি এই যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করে দিয়েছিল (Sisson & Rose, 1990)। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন সরাসরি পাকিস্তানের সামরিক জান্তার পক্ষে অবস্থান নেয়, আর ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়ন দাঁড়ায় পূর্ব পাকিস্তানের মুক্তিকামী মানুষের পাশে। পরাশক্তিগুলোর এই মেরুকরণ নতুন জন্ম নিতে যাওয়া রাষ্ট্রটির ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতির একটি অলিখিত রূপরেখা তৈরি করে দেয়। পরাশক্তিগুলোর এই মেরুকরণের পেছনে আদর্শের চেয়েও বড় ভূমিকা পালন করেছিল নিখাদ বাস্তববাদ এবং নিজ নিজ কৌশলগত স্বার্থ। সেই সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এবং তাঁর নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার চীনের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য গোপন কূটনীতি চালাচ্ছিলেন। এই গোপন যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম বা সেতু হিসেবে কাজ করছিল পাকিস্তান। মার্কিন প্রশাসনের কাছে তখন পাকিস্তানের সামরিক শাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খানকে খুশি রাখাটা যেকোনো মূল্যে জরুরি ছিল। পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানি বাহিনী যে ভয়াবহ গণহত্যা চালাচ্ছিল, ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকরা সেটিকে পুরোপুরি উপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন। তাদের চোখে মানুষের প্রাণের চেয়ে ভূ-রাজনৈতিক দাবার চাল অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন ও চীনা প্রভাব খর্ব করার জন্য একটি মোক্ষম সুযোগ খুঁজছিল। তারা বুঝতে পেরেছিল যে, পাকিস্তানকে ভেঙে দুই টুকরো করতে পারলে এই অঞ্চলে তাদের সবচেয়ে বড় মিত্র ভারতের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হবে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির এই নিষ্ঠুর এবং স্বার্থান্ধ সমীকরণের মাঝে পড়েই পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ মানুষকে স্বাধীনতার জন্য চড়া মূল্য চোকাতে হয়। এই রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম প্রমাণ করে যে, বিশ্বমঞ্চে দুর্বল বা রাষ্ট্রহীন মানুষের পক্ষে কথা বলার মতো কেউ থাকে না; প্রতিটি পরাশক্তি কেবল নিজেদের জাতীয় স্বার্থ (National Interest) নিশ্চিত করার জন্যই ছক কষে। ভারতের কৌশলগত হিসাব-নিকাশ ও হস্তক্ষেপ যেকোনো দেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রধানতম লক্ষ্য থাকে নিজের সীমানা এবং অর্থনীতিকে সুরক্ষিত রাখা। ১৯৭১ সালে ভারতের সামনে ঠিক এই সংকটটিই সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছিল। পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর লাখ লাখ নিরীহ মানুষ প্রাণ বাঁচাতে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আশ্রয় নিতে শুরু করে। কয়েক মাসের মধ্যেই এই শরণার্থীর সংখ্যা প্রায় এক কোটিতে গিয়ে দাঁড়ায়। ভারতের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য এত বিপুল সংখ্যক মানুষের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা ছিল এক অসম্ভব অর্থনৈতিক চাপ। পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয় এবং ত্রিপুরার মতো সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে স্থানীয় জনসংখ্যার চেয়ে শরণার্থীর সংখ্যা বেশি হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়, যা ভারতের অভ্যন্তরীণ সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের হুমকি তৈরি করে। এই বিপুল সংখ্যক শরণার্থীকে দেশে ফেরত পাঠানোর একটাই উপায় ছিল, আর তা হলো পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন করা। এই মানবিক সংকটের পাশাপাশি ভারতের নিজস্ব ভূ-রাজনীতি (Geopolitics) এবং দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তার একটি বড় হিসাব-নিকাশ কাজ করছিল। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর থেকেই ভারতকে তার পূর্ব এবং পশ্চিম – উভয় সীমান্তে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মোকাবেলা করতে হতো। ভারতের নীতিনির্ধারকরা বুঝতে পেরেছিলেন যে, পাকিস্তানকে ভেঙে দ্বিখণ্ডিত করতে পারলে তাদের পূর্ব সীমান্তের সামরিক হুমকি চিরতরে দূর হয়ে যাবে। শ্রিনাথ রাঘবন তাঁর ১৯৭১: আ গ্লোবাল হিস্ট্রি অফ দ্য ক্রিয়েশন অফ বাংলাদেশ (1971: A Global History of the Creation of Bangladesh) বইয়ে খুব পরিষ্কারভাবে তুলে ধরেছেন যে, ভারতের এই হস্তক্ষেপ কেবল মানবিক কারণে ছিল না, এর পেছনে কাজ করেছিল সুদূরপ্রসারী কৌশলগত সমীকরণ (Raghavan, 2013)। শরণার্থী সংকটের সুযোগ নিয়ে ভারত অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে সামরিক এবং কূটনৈতিক প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী খুব ভালো করেই জানতেন যে, সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ করলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ভারতকে আক্রমণকারী হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে। একারণে তিনি প্রথমে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক কূটনৈতিক সফর করেন। তিনি পশ্চিমা দেশগুলোর সরকারপ্রধানদের কাছে গিয়ে শরণার্থী সংকটের ভয়াবহতা তুলে ধরেন এবং তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, পাকিস্তান যদি এই সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান না করে, তবে ভারতের সামনে সামরিক ব্যবস্থা নেয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকবে না। এর পাশাপাশি ভারতের সামরিক বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ ছাত্র-জনতাকে নিয়ে গঠিত মুক্তি বাহিনীকে প্রশিক্ষণ এবং অস্ত্র সরবরাহ করতে শুরু করে। ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল স্যাম মানেকশ সামরিক অভিযানের জন্য শীতকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন। এর পেছনেও ছিল চমৎকার এক সামরিক কৌশল (Military Strategy)। শীতকালে হিমালয়ের পাহাড়ি পথগুলো বরফে ঢাকা পড়ে যায়, ফলে চীনের পক্ষে ওই পথ পেরিয়ে পাকিস্তানের সাহায্যে সেনা পাঠানো প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। ভারত খুব ধৈর্য ধরে সেই সময়ের জন্য অপেক্ষা করে। ভারতের এই পুরো পরিকল্পনাটি ছিল আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং সামরিক কূটনীতির একটি নিখুঁত উদাহরণ, যেখানে আবেগ সরিয়ে রেখে সম্পূর্ণ বাস্তবতার নিরিখে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি এবং জাতিসংঘের কূটনৈতিক যুদ্ধ সামরিক প্রস্তুতির পাশাপাশি ভারতকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য একটি শক্ত কূটনৈতিক ঢালের প্রয়োজন ছিল। যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের সম্ভাব্য আক্রমণ ঠেকানোর জন্য ভারত ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষর করে। বিশ বছর মেয়াদী এই চুক্তিটির নাম ছিল ইন্দো-সোভিয়েত শান্তি, মৈত্রী ও সহযোগিতা চুক্তি (Indo-Soviet Treaty of Peace, Friendship and Cooperation)। এই চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারাটি ছিল, যদি কোনো দেশ ভারত বা সোভিয়েত ইউনিয়নকে আক্রমণ করে, তবে দুই দেশ মিলে সেই আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এই একটি মাত্র চুক্তি যুদ্ধের পুরো সমীকরণকে আমূল বদলে দেয়। চীন বা যুক্তরাষ্ট্র যদি পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে সরাসরি ভারতের ওপর হামলা করত, তবে এই চুক্তির বলে সোভিয়েত ইউনিয়নও যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ত। ফলে পুরো বিষয়টি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে রূপ নেয়ার একটি বাস্তব শঙ্কা তৈরি হয়। পরাশক্তিগুলো এই ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত ছিল না। সোভিয়েত ইউনিয়নের এই পারমাণবিক ছাতার নিচে দাঁড়িয়ে ভারত অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসের সাথে তাদের সামরিক পরিকল্পনা নিয়ে সামনে এগোতে সক্ষম হয়। গ্যারি ব্যাস তাঁর বিখ্যাত বই দ্য ব্লাড টেলিগ্রাম (The Blood Telegram)-এ বিস্তারিত আলোচনা করেছেন কীভাবে এই চুক্তিটি মার্কিন প্রশাসনের ওপর চরম মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করেছিল (Bass, 2013)। যুদ্ধের ময়দানের পাশাপাশি আরেকটি বড় যুদ্ধ চলছিল নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের গোল টেবিলে। ডিসেম্বর মাসের শুরুতে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর, যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তা পরিষদে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব নিয়ে আসে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধ থামিয়ে দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা। এখানে রক্ষাকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয় সোভিয়েত ইউনিয়ন। তারা নিরাপত্তা পরিষদে তাদের ভেটো ক্ষমতা (Veto Power) প্রয়োগ করে যুক্তরাষ্ট্রের আনা একের পর এক যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব বাতিল করে দেয়। ডিসেম্বরের ৪, ৫ এবং ১৩ তারিখে সোভিয়েত ইউনিয়ন মোট তিনবার ভেটো প্রয়োগ করে। এই ভেটোগুলো মূলত যৌথ বাহিনীকে ঢাকা দখল করার জন্য প্রয়োজনীয় সময়টুকু কিনে দিয়েছিল। জাতিসংঘে নিযুক্ত সোভিয়েত প্রতিনিধি জ্যাকব মালিক স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান ছাড়া কোনো যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব মস্কো মেনে নেবে না। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার এই সর্বোচ্চ ফোরামে সোভিয়েত ইউনিয়নের এই দৃঢ় অবস্থান না থাকলে হয়তো যুদ্ধের পরিণতি অন্যরকম হতে পারত। কূটনীতির এই দাবার চালে সোভিয়েত ইউনিয়ন বুঝিয়ে দিয়েছিল যে, তারা দক্ষিণ এশিয়ায় তাদের মিত্রদের স্বার্থ রক্ষায় যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত। গানবোট কূটনীতি এবং ওয়াশিংটন-বেইজিং অক্ষ জাতিসংঘে কূটনৈতিকভাবে ব্যর্থ হওয়ার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পেশিশক্তি প্রদর্শনের সিদ্ধান্ত নেয়। প্রেসিডেন্ট নিক্সন সপ্তম নৌবহরের একটি টাস্কফোর্সকে বঙ্গোপসাগরের দিকে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দেন। এই টাস্কফোর্স ৭৪-এর নেতৃত্বে ছিল বিশ্বের তৎকালীন সর্ববৃহৎ পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস এন্টারপ্রাইজ। এই পদক্ষেপটি ছিল আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসে গানবোট কূটনীতি (Gunboat Diplomacy)-এর একটি ধ্রুপদী উদাহরণ। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ভারতের ওপর প্রচণ্ড মানসিক চাপ সৃষ্টি করা, যাতে তারা ঢাকা দখলের পরিকল্পনা থেকে পিছিয়ে আসে এবং একই সাথে পূর্ব পাকিস্তানে অবরুদ্ধ পাকিস্তানি বাহিনীর মনোবল চাঙ্গা করা। বিশাল এই নৌবহরটি যখন মালাক্কা প্রণালী পার হয়ে বঙ্গোপসাগরের দিকে এগোচ্ছিল, তখন পুরো অঞ্চলে চরম যুদ্ধাবস্থা তৈরি হয়। যুক্তরাষ্ট্রের এই আগ্রাসী পদক্ষেপের জবাবে সোভিয়েত ইউনিয়নও বসে থাকেনি। তারা প্রশান্ত মহাসাগরীয় নৌবহরের সদর দপ্তর ভ্লাদিভস্তক থেকে পারমাণবিক মিসাইলবাহী ক্রুজার এবং সাবমেরিন বঙ্গোপসাগরের দিকে পাঠিয়ে দেয়। সোভিয়েত নৌবাহিনীর এই উপস্থিতির কারণে মার্কিন সপ্তম নৌবহর আর সরাসরি হস্তক্ষেপ করার সাহস পায়নি। হেনরি কিসিঞ্জার পরবর্তীতে তাঁর আত্মজীবনী হোয়াইট হাউস ইয়ারস (White House Years)-এ স্বীকার করেছেন যে, এই নৌবহর পাঠানোর সিদ্ধান্তটি মূলত চীনের কাছে প্রমাণ করার জন্য নেয়া হয়েছিল যে, যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের বিপদের সময় পাশে থাকে (Kissinger, 1979)। এই পুরো সময়টাতে চীনের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত রহস্যময় এবং দ্বিমুখী। তারা মুখে পাকিস্তানের পক্ষে জোরালো বক্তব্য দিচ্ছিল এবং জাতিসংঘে ভারতের চরম সমালোচনা করছিল। কিন্তু বাস্তবে তারা সামরিকভাবে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এর পেছনে দুটি প্রধান কারণ ছিল। প্রথমত, সোভিয়েত ইউনিয়ন চীনের উত্তর সীমান্তে বিপুল সংখ্যক সৈন্য সমাবেশ করে রেখেছিল। চীন যদি ভারতের ওপর হামলা করত, তবে সোভিয়েত ইউনিয়ন নিশ্চিতভাবেই চীনের ওপর পাল্টা আক্রমণ চালাত। দ্বিতীয়ত, ডিসেম্বরের তীব্র শীতের কারণে হিমালয়ের গিরিপথগুলো বরফে ঢাকা থাকায় সেনা পরিবহন বস্তুগতভাবেই প্রায় অসম্ভব ছিল। ফলে ওয়াশিংটন এবং বেইজিংয়ের মধ্যে একটি অঘোষিত অক্ষ তৈরি হওয়া সত্ত্বেও, তারা কেউই সরাসরি যুদ্ধের ময়দানে অবতীর্ণ হয়নি। এই ঘটনাগুলো সদ্য স্বাধীন হতে যাওয়া একটি দেশকে বিশ্বরাজনীতির নিষ্ঠুর বাস্তবতার সাথে খুব ভালোভাবে পরিচয় করিয়ে দেয়। তারা বুঝতে পারে যে, বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিশ্রুতি অনেক সময় ফাঁকা বুলির মতো। নিজ দেশের প্রতিরক্ষায় নিজেদেরই সক্ষম হতে হয়, বাইরের কোনো দেশের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করা আত্মঘাতী হতে পারে। গানবোট কূটনীতির এই ব্যর্থতা পরাশক্তিগুলোর অহংকারে একটি বড় আঘাত হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। অসম যুদ্ধ এবং অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধের স্বরূপ পরাশক্তিগুলোর কূটনীতির বাইরে যুদ্ধের ময়দানে আসল লড়াইটা লড়ছিল সাধারণ মানুষ। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ছিল পুরোপুরি একটি প্রথাগত বা কনভেনশনাল বাহিনী। তারা মূলত সমতল ভূমি এবং মরুভূমিতে যুদ্ধ করার প্রশিক্ষণ পেয়েছিল। অন্যদিকে পূর্ব পাকিস্তান হলো নদীমাতৃক এক বিশাল বদ্বীপ। এখানকার নরম কাদা, অসংখ্য খাল-বিল এবং দুর্গম গ্রামীণ পথঘাট পাকিস্তানি সেনাদের জন্য এক অচেনা এবং ভয়ঙ্কর রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এই ভৌগোলিক বাস্তবতাকে কাজে লাগিয়ে মুক্তি বাহিনী শুরু করে অসম যুদ্ধ (Asymmetric Warfare)। তাদের মূল কৌশল ছিল সরাসরি কোনো সম্মুখ সমরে না গিয়ে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে অতর্কিত হামলা চালানো। এই গেরিলা কৌশল (Guerrilla Tactics) পাকিস্তানি বাহিনীকে মানসিকভাবে পুরোপুরি বিপর্যস্ত করে ফেলে। মুক্তিযোদ্ধারা নদীর ওপরের ব্রিজ উড়িয়ে দিত, যোগাযোগের তার কেটে দিত এবং ছোট ছোট সেনা টহল দলের ওপর গুপ্ত হামলা চালাত। বিশাল অস্ত্রভাণ্ডার থাকার পরও পাকিস্তানি বাহিনী এই অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে পেরে উঠছিল না। তারা কখনোই বুঝতে পারত না যে কোথা থেকে গুলি আসবে। জে. এফ. আর. জেকব তাঁর সারেন্ডার অ্যাট ঢাকা (Surrender at Dacca) বইয়ে উল্লেখ করেছেন যে, এই গেরিলা যুদ্ধের কারণেই পাকিস্তানি বাহিনীর লজিস্টিক এবং সাপ্লাই চেইন পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিল, যা যৌথ বাহিনীর চূড়ান্ত বিজয়কে ত্বরান্বিত করে (Jacob, 1997)। এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল এটি একটি সর্বাত্মক জনযুদ্ধ। আধুনিক যুগে কোনো পেশাদার সেনাবাহিনী যদি স্থানীয় জনগণের সমর্থন হারায়, তবে তাদের পক্ষে বেশিদিন টিকে থাকা সম্ভব হয় না। পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিটি গ্রাম ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের একেকটি দুর্গের মতো। সাধারণ কৃষাণ-কৃষাণী, জেলে বা মজুর – যারা হয়তো জীবনে কোনোদিন বন্দুক হাতে নেয়নি, তারাও মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার দিয়ে, আশ্রয় দিয়ে এবং পাকিস্তানি বাহিনীর গতিবিধি সম্পর্কে গোপন তথ্য দিয়ে সাহায্য করত। এই গোয়েন্দা তথ্যের অভাবেই পাকিস্তানি বাহিনী বারবার ভুল জায়গায় অভিযান চালাত এবং চোরাগোপ্তা হামলার শিকার হতো। স্থানীয় জনগণের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রীয় কাঠামো যখন জোর করে চাপিয়ে দেয়া হয়, তখন সাধারণ মানুষ যেকোনো মূল্যে তা থেকে বের হয়ে আসার চেষ্টা করে। পেশাদার সামরিক বাহিনীর অস্ত্র এবং শৃঙ্খলার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের এই মরণপণ লড়াই সামরিক ইতিহাসের অনেক পুরনো তত্ত্বকে ভুল প্রমাণ করে দেয়। একটি দেশের মাটি এবং মানুষের সাথে যার নাড়ির সম্পর্ক নেই, শুধু বন্দুকের নলের জোরে সে কখনোই সেই ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারে না। এই অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধই মূলত স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্মের সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। আন্তর্জাতিক জনমত এবং বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা সরকারগুলোর বাইরেও একটি বিশাল পৃথিবী আছে, যা মূলত সাধারণ মানুষ এবং নাগরিক সমাজের সমন্বয়ে গঠিত। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পশ্চিমা দেশের সরকারগুলো পাকিস্তানের পক্ষ নিলেও, সে সব দেশের সাধারণ মানুষ এবং মিডিয়া কিন্তু সরাসরি বাংলাদেশের মানুষের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের এই সাহসী ভূমিকা যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে বিশাল অবদান রাখে। পাকিস্তানি বাহিনীর চালানো নির্মম গণহত্যার খবর প্রথম বিশ্ববাসীর সামনে নিয়ে আসেন সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস। লন্ডনের সানডে টাইমস পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর সেই দীর্ঘ প্রতিবেদনটি পুরো বিশ্বকে স্তম্ভিত করে দেয়। মানুষ বুঝতে পারে যে পূর্ব পাকিস্তানে ঠিক কী ধরনের মানবিক বিপর্যয় ঘটছে। এই জনমতের চাপের কারণেই অনেক পশ্চিমা দেশের সরকারের পক্ষে প্রকাশ্যে পাকিস্তানকে অস্ত্র সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ঢাকা থেকে মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাড তাঁর নিজস্ব প্রশাসনের নীতির বিরুদ্ধে গিয়ে যে বিখ্যাত ‘ব্লাড টেলিগ্রাম’ পাঠিয়েছিলেন, তা প্রমাণ করে যে রাষ্ট্রীয় নীতির বাইরেও মানুষের ব্যক্তিগত বিবেক অনেক বড় একটি শক্তি হিসেবে কাজ করে। সিডনি শ্যানবার্গ তাঁর বিভিন্ন লেখায় দেখিয়েছেন কীভাবে আন্তর্জাতিক মিডিয়ার রিপোর্টিং হোয়াইট হাউসের ওপর চরম রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছিল (Schanberg, 2010)। জনমত তৈরির এই প্রক্রিয়ায় শিল্পী এবং বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা ছিল অভাবনীয়। পপসম্রাট জর্জ হ্যারিসন এবং সেতারবাদক পণ্ডিত রবিশঙ্করের উদ্যোগে নিউ ইয়র্কের ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে আয়োজিত ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। এটি ছিল বিশ্বের প্রথম কোনো বড় পরিসরের চ্যারিটি কনসার্ট, যেখানে শিল্পের সাথে মানবিক কূটনীতি (Humanitarian Diplomacy)-এর এক অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটেছিল। এই কনসার্টের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ সরাসরি শরণার্থীদের সাহায্যার্থে জাতিসংঘের ইউনিসেফ তহবিলে জমা দেয়া হয়। এর চেয়েও বড় কথা হলো, এই আয়োজনের কারণে লাখ লাখ পশ্চিমা তরুণ পূর্ব পাকিস্তানের নাম জানতে পারে এবং সেখানে ঘটে যাওয়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়। ফরাসি দার্শনিক অঁদ্রে মালরো থেকে শুরু করে বিশ্বের অনেক নামিদামি লেখক ও বুদ্ধিজীবী বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে বিবৃতি দেন। এটি পরিষ্কারভাবে প্রমাণ করে যে, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কেবল রাষ্ট্র বা সরকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এখানে অ-রাষ্ট্রীয় সত্তা (Non-state Actors) এবং নাগরিক সমাজের প্রভাবও অপরিসীম। বিশ্ব জনমতের এই নিরঙ্কুশ সমর্থন না পেলে একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্য আন্তর্জাতিক বৈধতা অর্জন করাটা অনেক বেশি কঠিন এবং দীর্ঘমেয়াদী হতো। নতুন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় এবং আগামী দিনের পররাষ্ট্রনীতি নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, লাখো প্রাণের আত্মত্যাগ এবং অসংখ্য ধ্বংসযজ্ঞের পর অবশেষে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর আসে সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে প্রায় তিরানব্বই হাজার পাকিস্তানি সেনার নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর মানচিত্রে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের জন্ম হয়। কিন্তু এই জন্ম খুব একটা সুখকর ছিল না। বিদায় নেয়ার আগে পাকিস্তানি বাহিনী দেশের রাস্তাঘাট, ব্রিজ, বন্দর এবং শিল্পকারখানাগুলো পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়ে যায়। ১৪ই ডিসেম্বর তারা সুপরিকল্পিতভাবে দেশের শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে, যাতে নতুন রাষ্ট্রটি বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে পঙ্গু হয়ে পড়ে। এই ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে একটি রাষ্ট্রকে শূন্য থেকে যাত্রা শুরু করতে হয়। স্বাধীনতা অর্জন করার পর এই নতুন রাষ্ট্রের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেয় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে স্বীকৃতি আদায় করা। জন্মলগ্নে পরাশক্তিগুলোর যে সমীকরণ তৈরি হয়েছিল, তার প্রভাব নতুন দেশের কূটনীতিতে অত্যন্ত প্রবলভাবে পড়ে। যেহেতু ভারত এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের সরাসরি সাহায্যে দেশটি স্বাধীন হয়েছিল, তাই স্বাভাবিকভাবেই নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতিতে এই দুই দেশের প্রতি একটি দৃশ্যমান নির্ভরতা এবং কৃতজ্ঞতা ছিল। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন যেহেতু স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, তাই তাদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করাটা শুরুতে বেশ জটিল এবং সময়সাপেক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা প্রথম দিন থেকেই বুঝতে পেরেছিলেন যে, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে টিকে থাকতে হলে তাদের একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। কাগজে-কলমে দেশটি জোটনিরপেক্ষতা (Non-alignment)-এর নীতি গ্রহণ করে এবং ঘোষণা দেয় যে সবার সাথে বন্ধুত্ব বজায় রাখাই হবে তাদের মূল লক্ষ্য। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি তাদের বাধ্য করে একটি নির্দিষ্ট মেরুর দিকে ঝুঁকে থাকতে। যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠনের জন্য প্রচুর বৈদেশিক সাহায্যের প্রয়োজন ছিল। একই সাথে জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করার জন্য নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন দরকার ছিল, যেখানে চীন বারবার ভেটো প্রয়োগ করে নতুন এই রাষ্ট্রের প্রবেশ আটকে দিচ্ছিল। এই কঠিন ভূ-রাজনৈতিক গোলকধাঁধায় পড়ে রাষ্ট্রটিকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে প্রতিটি পদক্ষেপ নিতে হয়। একদিকে প্রতিবেশী বিশাল ভারতের প্রভাব বলয় থেকে নিজেদের স্বাধীন পরিচয় বজায় রাখা, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলো এবং পশ্চিমা বিশ্বের সাথে ধীরে ধীরে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা চালানো – এই সবকিছু মিলিয়েই রচিত হয় নতুন রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির প্রাথমিক ভিত্তি। স্নায়ুযুদ্ধের চরম উত্তেজনার মাঝে জন্ম নেয়া এই রাষ্ট্রটি প্রমাণ করে যে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নিষ্ঠুর দাবার বোর্ডে টিকে থাকতে হলে কেবল আবেগ দিয়ে কাজ হয় না, প্রয়োজন হয় চরম কৌশলগত প্রজ্ঞা এবং ধূর্ততার। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি (Bangladesh foreign policy) জন্মলগ্নের বাস্তবতা এবং পররাষ্ট্রনীতির মূলমন্ত্র যেকোনো সদ্য জন্ম নেওয়া রাষ্ট্রের প্রথম এবং প্রধানতম লক্ষ্য থাকে বিশ্বমঞ্চে নিজের অস্তিত্বের জানান দেওয়া। একটি দীর্ঘ এবং রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ভেতর দিয়ে যে ভূখণ্ডটি স্বাধীন হলো, তার অবস্থা ছিল আক্ষরিক অর্থেই একটি ধ্বংসস্তূপের মতো। রাষ্ট্রীয় কোষাগার পুরোপুরি শূন্য, রাস্তাঘাট এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত এবং লাখ লাখ মানুষ গৃহহীন ও ক্ষুধার্ত। এমন একটি চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতে একটি রাষ্ট্রকে তার পররাষ্ট্রনীতির প্রথম রূপরেখা তৈরি করতে হয়। আবেগের কোনো স্থান আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নেই, সেখানে টিকে থাকতে হয় নিরেট বাস্তবতার ওপর ভর করে। সদ্য স্বাধীন হওয়া একটি দেশের জন্য অন্য কোনো দেশের সাথে শত্রুতা করার মতো বিলাসিতা দেখানোর কোনো সুযোগ থাকে না। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ইমাজউদ্দীন আহমেদ (Emajuddin Ahamed) তাঁর গবেষণায় খুব স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন যে, একটি ক্ষুদ্র এবং অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্যগুলো প্রথম থেকেই ছিল অত্যন্ত সীমিত এবং টিকে থাকার সংগ্রামের সাথে সরাসরি যুক্ত (Ahmed, 1984)। এই কারণেই রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা প্রথম দিন থেকেই “সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়” (Friendship to all, malice towards none) নীতিটিকে নিজেদের মূলমন্ত্র হিসেবে গ্রহণ করেন। এটি কোনো দার্শনিক বা আদর্শিক অবস্থান ছিল না, বরং এটি ছিল একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দরিদ্র দেশের জন্য বেঁচে থাকার সবচেয়ে বাস্তবসম্মত কৌশল। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে এই নীতিটির পেছনের গভীর কারণটি আরও পরিষ্কার হয়। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সব রাষ্ট্র সমান ক্ষমতাবান নয়। প্রখ্যাত তাত্ত্বিক হ্যান্স মরগেনথাউ (Hans Morgenthau) তাঁর বাস্তববাদ (Realism) তত্ত্বে উল্লেখ করেছেন যে, প্রতিটি রাষ্ট্র তার নিজস্ব ক্ষমতা অনুযায়ী আন্তর্জাতিক মঞ্চে আচরণ করে। ক্ষমতাবান রাষ্ট্রগুলো অন্য রাষ্ট্রের ওপর নিজেদের ইচ্ছা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে, অন্যদিকে দুর্বল রাষ্ট্রগুলো মূলত নিজেদের নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্য পরাশক্তিগুলোর সাথে আপস করে চলে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ঠিক এমনটাই ঘটেছিল। দেশের মানুষের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার জন্য, ধ্বংসপ্রাপ্ত শিল্পকারখানা পুনরায় চালু করার জন্য এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের দরজা খোলার জন্য প্রচুর পরিমাণ বৈদেশিক সাহায্য ও ঋণের প্রয়োজন ছিল। এমন একটি নাজুক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ব্লকের সাথে শত্রুতা করার অর্থ হতো নিজেদের পায়ে কুড়াল মারা। ফলে রাষ্ট্রটি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এমন একটি পররাষ্ট্রনীতি সাজানোর চেষ্টা করে, যেখানে প্রাচ্য বা পাশ্চাত্য – কোনো পক্ষের সাথেই সরাসরি কোনো সংঘাত তৈরি না হয়। তারা বুঝতে পেরেছিল, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং বৈদেশিক অনুদান নিশ্চিত করতে হলে বিশ্বমঞ্চে একটি নিরপেক্ষ এবং বন্ধুভাবাপন্ন রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি গড়ে তোলা অপরিহার্য। সময়ের সাথে সাথে রাষ্ট্রের এই প্রতিরক্ষামূলক প্রকৃতিতে বেশ বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে শুরু করে। প্রথম দিকের সাহায্যনির্ভরতা কাটিয়ে ওঠার পর রাষ্ট্রটি ধীরে ধীরে বাণিজ্যের দিকে গভীর মনোযোগ দেয়। বর্তমান সময়ে পররাষ্ট্রনীতির মূল উদ্দেশ্য হলো অর্থনৈতিক কূটনীতির মাধ্যমে দেশের তৈরি পোশাকের জন্য নতুন বাজার খোঁজা, প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য লাভজনক শ্রমবাজার উন্মুক্ত রাখা এবং ব্যাপক হারে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা। ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে ঘোরার গ্লানি মুছে ফেলে একটি বাণিজ্যনির্ভর এবং আত্মমর্যাদাসম্পন্ন জাতি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করার এই তাড়না কূটনীতির প্রতিটি স্তরে দৃশ্যমান। এখন আর বিদেশের মাটিতে থাকা দূতাবাসগুলোর প্রধান কাজ শুধু রাজনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা নয়। তাদের এখন মূল দায়িত্ব হলো দেশের পণ্যের ব্র্যান্ডিং করা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জটিল শর্তগুলো নিয়ে দরকষাকষি করা। অর্থাৎ, সাহায্য থেকে বাণিজ্যে উত্তরণের এই যে দীর্ঘ এবং কণ্টকাকীর্ণ যাত্রা, এটিই মূলত বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির আসল প্রকৃতি এবং চূড়ান্ত উদ্দেশ্য। জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন এবং পরাশক্তির মেরুকরণ সত্তরের দশকের শুরুতে পৃথিবীর রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল চরমভাবে বিভক্ত। একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদী বলয়, অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বলয়। এই দ্বিমেরু বিশ্ব (Bipolar World) ব্যবস্থায় প্রতিটি রাষ্ট্রকেই কোনো না কোনো পরাশক্তির ছাতার নিচে অবস্থান নিতে বাধ্য করা হতো। বাংলাদেশের জন্মের সাথে এই পরাশক্তিগুলোর সরাসরি সংযোগ ছিল। জন্মলগ্নে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ভারত সরাসরি সাহায্য করেছিল, অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন সরাসরি বিরোধিতা করেছিল। স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেওয়া হয়েছিল যে নতুন রাষ্ট্রটি পুরোপুরি সোভিয়েত ব্লকের দিকেই ঝুঁকে পড়বে। বাস্তবে কিন্তু রাষ্ট্রটি সেই পথে হাঁটেনি। কারণ নীতিনির্ধারকরা খুব ভালো করেই জানতেন যে, সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছ থেকে রাজনৈতিক সমর্থন পাওয়া গেলেও, দেশের অর্থনীতি পুনর্গঠনের জন্য যে বিপুল পরিমাণ অর্থ এবং খাদ্য সাহায্য প্রয়োজন, তা কেবল পশ্চিমা বিশ্বই দিতে পারবে। এই চরম সংকটময় মুহূর্তে বাংলাদেশ অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন (Non-Aligned Movement)-এ যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এই আন্দোলনের মূল কথা ছিল কোনো নির্দিষ্ট পরাশক্তির সামরিক বা রাজনৈতিক জোটে যোগ না দিয়ে নিজেদের স্বাধীন অবস্থান বজায় রাখা। এই স্বাধীন অবস্থান বজায় রাখার প্রক্রিয়াটি মোটেও সহজ কাজ ছিল না। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রখ্যাত পণ্ডিত কেনেথ ওয়াল্টজ (Kenneth Waltz) তাঁর নয়া-বাস্তববাদ (Neo-realism) তত্ত্বে রাষ্ট্রগুলোর ভারসাম্য রক্ষা (Balancing) করার যে কৌশলের কথা বলেছেন, বাংলাদেশ মূলত সেই কৌশলটিই অত্যন্ত সাবধানে প্রয়োগ করার চেষ্টা করে। একদিকে তারা ভারতের সাথে দীর্ঘমেয়াদী মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষর করে নিজেদের সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। অন্যদিকে তারা খুব দ্রুত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করে, যাতে দেশে জরুরি খাদ্য সহায়তা এসে পৌঁছায়। আবার জাতিসংঘের সদস্যপদ পাওয়ার জন্য চীনের ভেটো এড়াতে তাদের সাথেও পর্দার আড়ালে দেনদরবার চালাতে থাকে। একটি সদ্য স্বাধীন এবং দরিদ্র দেশের জন্য পরাশক্তিগুলোর এই রেষারেষির মাঝে দাঁড়িয়ে সবার সাথে হাসিমুখে সম্পর্ক বজায় রাখাটা ছিল আক্ষরিক অর্থেই শূন্যে দড়াবাজির মতো একটি কাজ। একটু ভুল পদক্ষেপের কারণে যেকোনো সময় বড় ধরনের ভূ-রাজনৈতিক বিপর্যয় নেমে আসার শঙ্কা ছিল। তারপরও অভাবনীয় ধৈর্যের সাথে রাষ্ট্রটি এই কঠিন কূটনৈতিক বৈতরণী পার হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যায়, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল কারো পুতুল না হয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের একটি সম্মানজনক এবং স্বাধীন পরিচয় তৈরি করা। মুসলিম বিশ্বের সাথে সম্পর্ক এবং পরিচয়ের রাজনীতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বৈধতা অর্জনের পথে বাংলাদেশের সামনে একটি বড় বাধা ছিল মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো। ১৯৭১ সালের যুদ্ধের সময় পাকিস্তান এই দেশগুলোর কাছে এমন একটি বয়ান বা ন্যারেটিভ দাঁড় করিয়েছিল যে, একটি হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের সহায়তায় পাকিস্তানকে ভেঙে দুই টুকরো করা হয়েছে। এই প্রচারণার কারণে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ দেশ সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রটিকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানায়। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য এই দেশগুলোর সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন করাটা ছিল অস্তিত্বের প্রশ্ন। কারণ একদিকে যেমন আন্তর্জাতিক ফোরামে তাদের সমর্থন দরকার ছিল, অন্যদিকে দেশের বিশাল বেকার জনগোষ্ঠীর জন্য একটি কর্মসংস্থানের বাজার খোঁজাটাও ছিল সমান জরুরি। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য রাষ্ট্রটিকে তার আন্তর্জাতিক পরিচয়ে কিছুটা পরিবর্তন আনতে হয়। তাত্ত্বিক আলেকজান্ডার ওয়েন্ট (Alexander Wendt) তাঁর গঠনবাদ (Constructivism) তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কে রাষ্ট্রের পরিচয় এবং স্বার্থ স্থির কিছু নয়, বরং পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির সাথে সাথে এটি বদলাতে থাকে। বাংলাদেশও ঠিক এই তাত্ত্বিক কাঠামোর আদলে নিজেদের একটি নতুন পরিচয় বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার চেষ্টা করে। তারা প্রমাণ করার চেষ্টা করে যে ধর্মীয় পরিচয়ের বাইরেও রাষ্ট্রের একটি নিজস্ব ধর্মনিরপেক্ষ এবং স্বাধীন সত্তা রয়েছে, যা কারো জন্য হুমকিস্বরূপ নয়। এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টার সবচেয়ে বড় সাফল্যটি আসে ১৯৭৪ সালে, যখন পাকিস্তানের লাহোরে অনুষ্ঠিত অর্গানাইজেশন অফ ইসলামিক কোঅপারেশন (ওআইসি)-এর শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশ অংশগ্রহণ করে। এই সম্মেলনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে রাষ্ট্রটি মূলত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে এই বার্তা দেয় যে, ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার দিক থেকে তাদের সাথে এই ভূখণ্ডের মানুষের একটি ঐতিহাসিক সংযোগ রয়েছে। এই কৌশলটি অসাধারণভাবে কাজ করে এবং ধীরে ধীরে আরব বিশ্ব তাদের আগের কঠোর অবস্থান থেকে সরে আসতে শুরু করে। পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সৌদি আরবসহ অন্যান্য দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি প্রদান করে। এই স্বীকৃতি কেবল একটি রাজনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা ছিল না। এর ফলে বাংলাদেশের সামনে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারের বিশাল দরজা উন্মুক্ত হয়, যা পরবর্তী কয়েক দশকে দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। অর্থাৎ, শুধুমাত্র একটি পরিচয়ের পুনর্গঠন এবং বাস্তববাদী কূটনীতির মাধ্যমে একটি রাষ্ট্র তার সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সংকটের একটি দীর্ঘমেয়াদী সমাধান খুঁজে বের করতে সক্ষম হয়। এখানে কোনো আদর্শ বা আবেগের জয় হয়নি, জয় হয়েছে নিখাদ রাষ্ট্রীয় স্বার্থের। পরিচয়ের পুনর্গঠন এবং অর্থনৈতিক কূটনীতির সফল প্রয়োগ মুক্তিযুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর স্বীকৃতি আদায় করাটা ছিল নতুন এই রাষ্ট্রের জন্য রীতিমতো অস্তিত্বের প্রশ্ন। পাকিস্তান সেই সময় আরব বিশ্বে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে একটি প্রোপাগান্ডা চালিয়েছিল যে, একটি ইসলামি রাষ্ট্রকে ভেঙে ধর্মনিরপেক্ষ একটি সত্তা তৈরি করা হয়েছে। এই প্রচারণার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো শুরুতে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। তাত্ত্বিক আলেকজান্ডার ওয়েন্ট (Alexander Wendt)-এর গঠনবাদ (Constructivism) তত্ত্ব অনুযায়ী, রাষ্ট্রগুলো আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজেদের পরিচয় এবং স্বার্থ প্রতিনিয়ত নতুন করে তৈরি করতে পারে। এই তাত্ত্বিক কাঠামোর আদলেই রাষ্ট্রটি বিশ্বমঞ্চে তার ধর্মনিরপেক্ষ পরিচয়ের পাশাপাশি একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হিসেবে নিজের পরিচয়কে নতুন করে তুলে ধরার চেষ্টা করে। ১৯৭৪ সালে পাকিস্তানের লাহোরে অনুষ্ঠিত ওআইসি সম্মেলনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে রাষ্ট্রটি মূলত আরব বিশ্বের সাথে সম্পর্কের জমে থাকা বরফ গলাতে পুরোপুরি সক্ষম হয়। এই কূটনৈতিক পদক্ষেপের সুফল ছিল সুদূরপ্রসারী এবং অভাবনীয়। মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার দেশের লাখ লাখ বেকার তরুণের জন্য উন্মুক্ত হয়, যা পরবর্তীতে রেমিট্যান্সের মাধ্যমে দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুরোপুরি বদলে দেয়। ধর্মীয় পরিচয়ের বাইরে গিয়ে ফিলিস্তিনের ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামের পক্ষে অত্যন্ত জোরালো সমর্থন এবং ওআইসির ফোরামে সক্রিয় ভূমিকার মাধ্যমে রাষ্ট্রটি ইসলামি বিশ্বের সাথে একটি অত্যন্ত টেকসই সম্পর্ক তৈরি করেছে। এটি মূলত নিখাদ অর্থনৈতিক কূটনীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, যেখানে পরিচয়কে পুঁজি করে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করা হয়েছে। আরব দেশগুলো থেকে আসা আর্থিক অনুদান এবং বিনিয়োগ দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে বড় ধরনের ভূমিকা রেখেছে। মতাদর্শ বা আবেগের চেয়ে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ যে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ, মধ্যপ্রাচ্যের সাথে সম্পর্কের এই বিবর্তন মূলত সেই ধ্রুব সত্যটিকেই বারবার প্রমাণ করে। অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং সাহায্যনির্ভরতা থেকে উত্তরণ যেকোনো রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি সময়ের সাথে সাথে বিবর্তিত হয়। প্রথম দিকে বাংলাদেশের কূটনীতি ছিল মূলত সাহায্য এবং ঋণ জোগাড় করার কূটনীতি। পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে গিয়ে হাত পাতা ছাড়া তখন আর কোনো উপায় ছিল না। স্বয়ং মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার এই ভূখণ্ডকে একটি ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। কিন্তু আশি এবং নব্বইয়ের দশকে এসে এই পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে। রাষ্ট্রটি বুঝতে পারে যে চিরকাল অন্যের দয়ার ওপর নির্ভর করে টিকে থাকা সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এই নিষ্ঠুর সমীকরণটি রাউল প্রেবিশ (Raul Prebisch) তাঁর বিখ্যাত নির্ভরশীলতা তত্ত্ব (Dependency Theory)-এর মাধ্যমে খুব চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে দুর্বল দেশগুলো যদি কেবল কাঁচামাল রপ্তানি করে এবং উন্নত দেশগুলো থেকে শিল্পপণ্য আমদানি করে, তবে তারা চিরকাল একটি শোষণের বৃত্তে আটকা পড়ে থাকবে। এই বৃত্ত থেকে বের হওয়ার জন্য বাংলাদেশ তার কূটনীতির মূল ফোকাস পরিবর্তন করে বাণিজ্যের দিকে নিয়ে আসে, যাকে আধুনিক পরিভাষায় বলা হয় অর্থনৈতিক কূটনীতি (Economic Diplomacy)। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে এখন থেকে কূটনীতিকদের প্রধান কাজ হবে বহির্বিশ্বে দেশের জন্য নতুন বাজার খুঁজে বের করা এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা। এই অর্থনৈতিক কূটনীতির সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হয়ে ওঠে তৈরি পোশাক শিল্প এবং প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স। সস্তায় শ্রম দেওয়ার এই সুযোগটিকে কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্রটি পশ্চিমা দেশগুলোর বড় বড় ব্র্যান্ডের সাথে বাণিজ্য শুরু করে। কূটনীতিকরা ইউরোপ এবং আমেরিকায় গিয়ে দেশের তৈরি পোশাকের জন্য শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার আদায় করার লক্ষ্যে কঠিন দরকষাকষি শুরু করেন। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা বা ডব্লিউটিও (WTO)-এর মতো আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর অধিকার আদায়ের ব্যাপারে বাংলাদেশ একটি সোচ্চার কণ্ঠস্বর হিসেবে আবির্ভূত হয়। এই রূপান্তরটি মোটেও সহজ ছিল না। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা থাকে এবং উন্নত দেশগুলো তাদের নিজেদের স্বার্থ ছাড়তে নারাজ থাকে। তারপরও নিরবচ্ছিন্ন কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফলে রাষ্ট্রটি ধীরে ধীরে একটি সাহায্যনির্ভর অর্থনীতি থেকে একটি বাণিজ্যনির্ভর অর্থনীতিতে পরিণত হতে সক্ষম হয়। এখন আর বিদেশি রাষ্ট্রদূতরা এসে শুধু ত্রাণের কথা বলেন না, তারা বাণিজ্য ঘাটতি কমানো এবং বিনিয়োগের পরিবেশ নিয়ে আলোচনা করেন। একটি রাষ্ট্রের জন্য মাত্র কয়েক দশকের ব্যবধানে এই ধরনের অর্থনৈতিক কাঠামোগত পরিবর্তন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসে এক বিরল এবং বাস্তববাদী সাফল্যের উদাহরণ। অপ্রতিসম ক্ষমতা সম্পর্ক এবং প্রতিবেশীদের সাথে ভূ-রাজনীতি ভৌগোলিক নৈকট্য অনেক সময় রাষ্ট্রের জন্য আশীর্বাদ হয়, আবার অনেক সময় এটি সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা হলো এর তিন দিক বিশাল প্রতিবেশী ভারত দ্বারা পরিবেষ্টিত। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় একটি ছোট রাষ্ট্রের সাথে বিশাল এবং শক্তিশালী রাষ্ট্রের এই ধরনের সম্পর্ককে বলা হয় অপ্রতিসম ক্ষমতা সম্পর্ক (Asymmetric Power Relations)। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের বিশাল অবদান থাকা সত্ত্বেও, একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে নিজের সার্বভৌমত্ব বজায় রেখে এই বিশাল প্রতিবেশীর সাথে দরকষাকষি করাটা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে জটিল এবং স্থায়ী একটি চ্যালেঞ্জ। সীমানা বিরোধ, সীমান্ত হত্যা, বাণিজ্য ঘাটতি এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ – ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন নিয়ে প্রতিনিয়ত পর্দার আড়ালে তীব্র স্নায়ুযুদ্ধ চলতে থাকে। এখানে আবেগ বা ঐতিহাসিক বন্ধুত্বের চেয়ে রাষ্ট্রীয় স্বার্থই বড় হয়ে দেখা দেয়। তাত্ত্বিক রবার্ট কিওহ্যান (Robert Keohane) তাঁর নয়া-উদারনীতিবাদ (Neo-liberalism) ধারণায় পারস্পরিক নির্ভরশীলতার কথা বললেও, বাস্তবে ক্ষমতার এই বিশাল পার্থক্যের কারণে দরকষাকষির টেবিলে ছোট রাষ্ট্রটিকে সবসময় এক ধরনের অদৃশ্য চাপের মুখে থাকতে হয়। তারপরও ছিটমহল বিনিময় বা সমুদ্রসীমা নির্ধারণের মতো বিষয়গুলোতে আইনি এবং কূটনৈতিক পথে হেঁটে বাংলাদেশ প্রমাণ করেছে যে, পেশিশক্তিই আন্তর্জাতিক সম্পর্কে শেষ কথা নয়। অন্যদিকে, পূর্ব দিকের প্রতিবেশী মিয়ানমার সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের একটি সংকট তৈরি করেছে। দশকের পর দশক ধরে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা তাদের নিজস্ব নাগরিকদের ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতন চালিয়ে লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য করেছে। একটি ঘনবসতিপূর্ণ এবং উন্নয়নশীল দেশের জন্য এত বিপুল সংখ্যক মানুষের বোঝা বহন করা অর্থনীতি এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য এক ভয়াবহ হুমকি। মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের সরাসরি কোনো সামরিক বা বড় ধরনের বাণিজ্যিক সংঘাত না থাকলেও, এই শরণার্থী সংকট দুই দেশের সম্পর্ককে তলানিতে নিয়ে গেছে। দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে বাংলাদেশ বারবার মিয়ানমারের কূটচালের শিকার হয়েছে। মিয়ানমার চুক্তি করে কিন্তু সেই চুক্তি বাস্তবায়ন করে না। বাধ্য হয়ে বাংলাদেশকে এই সমস্যাটি আন্তর্জাতিকীকরণ করতে হয়েছে। জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক বিচার আদালত এবং বিশ্বের অন্যান্য পরাশক্তির দরজায় কড়া নেড়ে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করার এক দীর্ঘ এবং ক্লান্তিকর কূটনৈতিক লড়াই চালিয়ে যেতে হচ্ছে। প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সাথে এই যে জটিল এবং বহুমাত্রিক টানাপোড়েন, এটি সামলানোই মূলত বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির দৈনন্দিন এবং সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতা। বহুপাক্ষিক কূটনীতি এবং বৈশ্বিক মঞ্চে অবস্থান পারস্পরিক দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় ছোট রাষ্ট্রগুলোর গলার স্বর খুব একটা জোরে শোনা যায় না। বিশাল পরাশক্তিগুলোর সামনে বসে নিজেদের দাবি আদায় করা তাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। এই সীমাবদ্ধতা কাটানোর জন্য বাংলাদেশ শুরু থেকেই বহুপাক্ষিক কূটনীতি (Multilateral Diplomacy)-এর ওপর অত্যন্ত জোর দিয়ে আসছে। জাতিসংঘ বা অন্যান্য বড় আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে যখন সব দেশ একসাথে বসে, তখন প্রতিটি দেশের একটি করে ভোটের মূল্য থাকে। এই ফোরামগুলোকে ব্যবহার করে ছোট রাষ্ট্রগুলো নিজেদের মধ্যে জোট বেঁধে বড় শক্তিগুলোর ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করার পর থেকে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক আইন এবং সনদের প্রতি অবিচল আস্থা দেখিয়ে আসছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জন রাগি (John Ruggie) তাঁর তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে, বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় এক ধরনের নিয়মতান্ত্রিক শৃঙ্খলা তৈরি করে, যা মূলত দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর টিকে থাকার প্রধান রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে (Ruggie, 1993)। বাংলাদেশ এই নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার একজন কট্টর সমর্থক হিসেবে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছে। পরিবেশ রক্ষা থেকে শুরু করে বৈশ্বিক নিরস্ত্রীকরণ – প্রায় প্রতিটি আন্তর্জাতিক চুক্তিতে বাংলাদেশ অত্যন্ত সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছে। এই বহুপাক্ষিক কূটনীতির সবচেয়ে সফল এবং দৃশ্যমান দিকটি হলো জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ। আশি এবং নব্বইয়ের দশক থেকে শুরু করে বাংলাদেশ বিশ্বের বিভিন্ন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে হাজার হাজার সেনা এবং পুলিশ সদস্য পাঠিয়েছে। আফ্রিকার গহীন জঙ্গল থেকে শুরু করে হাইতির ভূমিকম্প বিধ্বস্ত এলাকায় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা নিজেদের পেশাদারিত্বের চরম প্রমাণ দিয়েছে। এই অংশগ্রহণের পেছনে বিশাল একটি কৌশলগত এবং অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশ কাজ করে। শান্তিরক্ষা মিশন থেকে রাষ্ট্র বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে, যা সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়নে বড় ভূমিকা রাখে। এর চেয়েও বড় কথা হলো, এই মিশনগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশ বৈশ্বিক অঙ্গনে এক ধরনের মৃদু ক্ষমতা (Soft Power) অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। হার্ভার্ডের অধ্যাপক জোসেফ নাই (Joseph Nye) এই ধারণার প্রবর্তন করে বলেছিলেন যে, জোর করে নয়, বরং নিজের ইতিবাচক কাজের মাধ্যমে অন্যকে আকৃষ্ট করার ক্ষমতাই হলো সফট পাওয়ার (Nye, 1990)। শান্তিরক্ষীদের এই ইতিবাচক ভাবমূর্তি আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের কূটনীতিকদের কথা বলার জোর বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। একটি ছোট রাষ্ট্র কীভাবে সামরিক শক্তি প্রয়োগ না করেও বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় বড় ধরনের অবদান রাখতে পারে, এটি তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সমুদ্র কূটনীতি এবং ভবিষ্যতের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ একবিংশ শতাব্দীতে এসে পৃথিবীর রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ভরকেন্দ্র আটলান্টিক মহাসাগর থেকে সরে গিয়ে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে থিতু হয়েছে। বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত হওয়ার কারণে বাংলাদেশ হঠাৎ করেই বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর এক বিরাট ভূ-রাজনৈতিক দাবা খেলার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সমুদ্রসীমা নিয়ে প্রতিবেশী ভারত এবং মিয়ানমারের সাথে দীর্ঘদিনের যে বিরোধ ছিল, আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে সেই বিরোধের নিষ্পত্তি করা বাংলাদেশের সমুদ্র কূটনীতির এক বিশাল বিজয়। এর ফলে বঙ্গোপসাগরের বুকে বিশাল এক অর্থনৈতিক এলাকার ওপর রাষ্ট্রের একচ্ছত্র অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই বিশাল জলরাশিতে থাকা মৎস্যসম্পদ এবং খনিজ তেল বা গ্যাস আহরণ এখন দেশের আগামী দিনের অর্থনীতির অন্যতম বড় একটি স্বপ্ন। কিন্তু এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথটি মোটেই নিষ্কণ্টক নয়। যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং ভারতের মতো বৃহৎ শক্তিগুলো এই বঙ্গোপসাগরে নিজেদের সামরিক এবং বাণিজ্যিক আধিপত্য বিস্তারের জন্য প্রতিনিয়ত নতুন নতুন কৌশল গ্রহণ করছে। এই পরাশক্তিগুলোর টানাপোড়েনের মাঝে পড়ে বাংলাদেশকে এখন অত্যন্ত সূক্ষ্ম একটি ভারসাম্য রক্ষার খেলা খেলতে হচ্ছে। একদিকে চীন তাদের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI)-এর অধীনে বিশাল অঙ্কের ঋণ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রস্তাব নিয়ে হাজির হচ্ছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্ররা ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি (IPS)-এর মাধ্যমে এই অঞ্চলে চীনের প্রভাব খর্ব করার চেষ্টা চালাচ্ছে। এই দুই বিপরীতমুখী স্রোতের মাঝে নিজেদের জাতীয় স্বার্থ ঠিক রেখে এগিয়ে চলাটা বর্তমান সময়ের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। কোনো একটি পক্ষের দিকে একটু বেশি হেলে পড়লেই অন্য পক্ষ রুষ্ট হবে এবং নানা রকম অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করতে শুরু করবে। আবার অতিরিক্ত ঋণ নিয়ে উন্নয়নের ফাঁদে পা দিলে শ্রীলঙ্কার মতো অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের শঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এই ধরনের জটিল এবং পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থায় কোনো স্থির বা লিখিত নিয়ম মেনে চলা সম্ভব নয়। রাষ্ট্রকে প্রতিনিয়ত নতুন পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে হয়। আগামী দিনের পৃথিবীতে টিকে থাকতে হলে কেবল অতীত ইতিহাসের ওপর নির্ভর করলে চলবে না, বরং ভূ-রাজনীতির এই নির্মম এবং স্বার্থান্ধ সমীকরণগুলো অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় হিসাব করে সামনের দিকে পা ফেলতে হবে। এই ভূখণ্ডের পররাষ্ট্রনীতির আসল পরীক্ষাটি মূলত এখনই শুরু হয়েছে। জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন (NAM) ও ওআইসি (OIC)-তে ভূখণ্ডের কৌশলগত অবস্থান স্নায়ুযুদ্ধের চরম মেরুকরণ এবং জোটনিরপেক্ষতার অমোচনীয় তাগিদ পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী এবং ধ্বংসাত্মক সময়গুলোর একটি হলো স্নায়ুযুদ্ধের যুগ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পুরো পৃথিবী খুব স্পষ্টভাবে দুটি প্রবল এবং বিপরীতমুখী শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। একদিকে ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদী বলয়, আর অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বলয়। এই দুই পরাশক্তির মধ্যে সরাসরি কোনো যুদ্ধ না হলেও, সারা পৃথিবীতে প্রভাব বিস্তারের জন্য তারা এক নীরব এবং ভয়ংকর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত ছিল। ঠিক এমনই একটি চরম মেরুকৃত এবং উত্তাল বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে মানচিত্রে জন্ম নেয় নতুন একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। দীর্ঘ নয় মাসের এক ভয়াবহ সশস্ত্র সংগ্রামের পর যে ভূখণ্ডটি স্বাধীনতা লাভ করে, তার অবস্থা ছিল আক্ষরিক অর্থেই এক বিশাল ধ্বংসস্তূপের মতো। রাষ্ট্রীয় কোষাগার পুরোপুরি শূন্য, যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত, শিল্পকারখানাগুলো অচল এবং লাখ লাখ মানুষ গৃহহীন ও ক্ষুধার্ত। এমন একটি চরম প্রতিকূল এবং নাজুক পরিস্থিতিতে নতুন রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের সামনে সবচেয়ে বড় এবং প্রথম চ্যালেঞ্জ ছিল বিশ্বমঞ্চে নিজেদের জন্য একটি নিরাপদ অবস্থান খুঁজে বের করা। এই বিশাল দুই পরাশক্তির যেকোনো একটির ছাতার নিচে আশ্রয় নেওয়াটা আপাতদৃষ্টিতে খুব সহজ এবং লোভনীয় মনে হতে পারত। একটি নির্দিষ্ট পরাশক্তির ব্লকে যোগ দিলে রাতারাতি হয়তো প্রচুর সামরিক এবং অর্থনৈতিক সাহায্য পাওয়া যেত। কিন্তু নীতিনির্ধারকরা খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছিলেন, আন্তর্জাতিক রাজনীতির দাবার বোর্ডে কোনো সাহায্যই বিনা শর্তে আসে না। কোনো একটি নির্দিষ্ট পরাশক্তির পক্ষে সরাসরি অবস্থান নেওয়ার অর্থ হলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে অপর পরাশক্তিকে নিজের চিরশত্রুতে পরিণত করা। সদ্য স্বাধীন এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের জন্য এত বড় শত্রুতা কাঁধে নেওয়ার মতো আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত আর কিছু হতে পারত না। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রখ্যাত তাত্ত্বিক হ্যান্স মরগেনথাউ (Hans Morgenthau) তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ পলিটিক্স অ্যামাং নেশনস (Politics Among Nations)-এ অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে দেখিয়েছেন, রাষ্ট্রগুলো আন্তর্জাতিক মঞ্চে কেবল নিজেদের স্বার্থ আদায়ের জন্যই কাজ করে এবং এখানে কোনো নিঃস্বার্থ বন্ধুত্বের স্থান নেই। এই বাস্তববাদ (Realism) তত্ত্বের আলোকেই বদ্বীপের এই রাষ্ট্রটি তার প্রাথমিক পররাষ্ট্রনীতির ছক কষতে শুরু করে। তাদের সামনে প্রধান এবং একমাত্র জাতীয় স্বার্থ ছিল যেকোনো মূল্যে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এবং সাধারণ মানুষের মুখে খাবার তুলে দেওয়া। এই চরম অস্তিত্বের সংকটে দাঁড়িয়ে আদর্শিক কোনো বিলাসিতার সুযোগ তাদের হাতে ছিল না। তারা খুব দ্রুত অনুধাবন করে, পরাশক্তিগুলোর এই রেষারেষি বা প্রভাব বিস্তারের নোংরা খেলায় অংশ নিলে রাষ্ট্রের স্বাধীনতা একটি কাগুজে দলিলে পরিণত হবে। তাই তারা অত্যন্ত সুচিন্তিত এবং সচেতনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে, তারা কোনো সামরিক বা রাজনৈতিক জোটের অংশ হবে না। জোটনিরপেক্ষ থাকার এই সিদ্ধান্তটি কেবল একটি দার্শনিক বা নৈতিক অবস্থান ছিল না, এটি ছিল মূলত একটি দুর্বল রাষ্ট্রের বেঁচে থাকার এবং নিজেদের সীমিত স্বাধীনতাটুকু রক্ষা করার সবচেয়ে বাস্তবসম্মত এবং কঠিন কৌশল। পরাশক্তির রেষারেষি বনাম স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির উন্মেষ জোটনিরপেক্ষ থাকার সিদ্ধান্ত নেওয়াটা মুখে বলা যতটা সহজ, বাস্তবে তা প্রয়োগ করা ছিল তার চেয়েও কয়েকগুণ বেশি কঠিন। স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন সরাসরি এই ভূখণ্ডের মুক্তিকামী মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিল এবং আন্তর্জাতিক ফোরামে তাদের পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছিল। অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেই সময় সরাসরি বিরোধিতা করেছিল এবং প্রতিপক্ষকে সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে মদদ জুগিয়েছিল। ফলে স্বাভাবিকভাবেই একটি ঐতিহাসিক কৃতজ্ঞতাবোধ থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে রাষ্ট্রের এক ধরনের মানসিক ঝোঁক ছিল। পরাশক্তিগুলোও আশা করেছিল, সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রটি খুব সহজেই সমাজতান্ত্রিক ব্লকের একটি অনুগত সদস্যে পরিণত হবে। কিন্তু রূঢ় বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সোভিয়েত ইউনিয়ন রাজনৈতিক সমর্থন দিতে পারলেও, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের কোটি কোটি ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় লাখ লাখ টন গম এবং বিপুল পরিমাণ আর্থিক সাহায্য দেওয়ার সামর্থ্য তাদের ছিল না। সেই বিপুল আর্থিক সক্ষমতা এবং খাদ্যভাণ্ডার ছিল পশ্চিমা বিশ্বের, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে। দেশের সাধারণ মানুষকে দুর্ভিক্ষের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য পশ্চিমা দেশগুলোর অর্থনৈতিক সাহায্য রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল। এই চরম সংকটে পড়ে রাষ্ট্রটিকে এক অদ্ভুত এবং জটিল কূটনৈতিক খেলায় অবতীর্ণ হতে হয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তাত্ত্বিক কেনেথ ওয়াল্টজ (Kenneth Waltz) তাঁর নয়া-বাস্তববাদ (Neo-realism) তত্ত্বে ব্যাখ্যা করেছেন, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নৈরাজ্যকর কাঠামোর কারণে রাষ্ট্রগুলো সব সময় এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে এবং টিকে থাকার জন্য প্রতিনিয়ত ভারসাম্য রক্ষা (Balancing) করার চেষ্টা করে। বদ্বীপের এই রাষ্ট্রটিও ঠিক সেই ভারসাম্য রক্ষার কৌশলটিই অত্যন্ত দক্ষতার সাথে প্রয়োগ করে। তারা একদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে উষ্ণ এবং বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখে, আবার একই সাথে পশ্চিমা বিশ্বের সাথে দ্রুত কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে সাহায্য আনার পথ সুগম করে। তারা পরাশক্তিগুলোকে এই বার্তাটি খুব স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেয় যে, সাহায্য নেওয়ার অর্থ এই নয় যে তারা নিজেদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কারও কাছে বিকিয়ে দেবে। এটি ছিল এক ধরনের স্নায়ুক্ষয়ী দড়াবাজি। একদিকে একটু বেশি হেলে পড়লেই অন্য পক্ষ থেকে সাহায্য আসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিশাল ঝুঁকি ছিল। পশ্চিমা বিশ্বকে সন্তুষ্ট করতে গিয়ে আবার সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো পরীক্ষিত বন্ধুকে রাগিয়ে দেবার ঝুঁকিও সমানে কাজ করছিল। এই দুই প্রবল বিপরীতমুখী স্রোতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে নিজস্ব একটি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির উন্মেষ ঘটানো মূলত রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকদের এক অসামান্য বুদ্ধিবৃত্তিক এবং কূটনৈতিক বিজয় ছিল। জোটনিরপেক্ষতা নামক এই কৌশলগত বর্মটি ব্যবহার করেই তারা পরাশক্তিগুলোর ক্রমাগত চাপ এবং খবরদারি থেকে নিজেদের রাষ্ট্রকে একটি নিরাপদ দূরত্বে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনে প্রবেশ এবং বহুপাক্ষিক কূটনীতির সূচনা নিজেদের স্বাধীন অবস্থানটি পুরো বিশ্ববাসীর সামনে আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরার জন্য একটি বড় এবং উপযুক্ত মঞ্চের প্রয়োজন ছিল। সেই সুযোগটি আসে ১৯৭৩ সালে আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিত জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের (NAM) শীর্ষ সম্মেলনের মাধ্যমে। সদ্য স্বাধীন হওয়া একটি দেশের শীর্ষ নেতার এই সম্মেলনে অংশগ্রহণ করাটা ছিল আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক বিশাল এবং ঐতিহাসিক ঘটনা। সেখানে উপস্থিত ছিলেন ফিদেল কাস্ত্রো, জোসিপ ব্রোজ টিটো, আনোয়ার সাদাত এবং বাদশাহ ফয়সালের মতো বিশ্ববরেণ্য নেতারা, যারা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর অবিসংবাদিত কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এই বাঘা বাঘা নেতাদের পাশে দাঁড়িয়ে বদ্বীপ রাষ্ট্রের নেতা যখন বিশ্বের শোষিত এবং বঞ্চিত মানুষের পক্ষে অত্যন্ত জোরালো ভাষায় বক্তৃতা দিলেন, তখন পুরো বিশ্বের সামনে এই নতুন রাষ্ট্রের একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং শক্তিশালী ভাবমূর্তি তৈরি হলো। রাষ্ট্রটি প্রমাণ করতে সক্ষম হলো, তারা কেবল একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত এবং সাহায্যপ্রার্থী দেশ নয়, বরং বিশ্বমঞ্চে ন্যায়বিচার এবং সমতার পক্ষে কথা বলার মতো একটি আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠস্বর। জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনে এই যোগদানের মাধ্যমে রাষ্ট্রটি মূলত পশ্চিমা এবং সমাজতান্ত্রিক – উভয় ব্লকের বাইরে গিয়ে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর সাথে একটি নতুন রাজনৈতিক এবং মনস্তাত্ত্বিক মেলবন্ধন তৈরি করে। এই ফোরামে যুক্ত হওয়ার বিষয়টি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা ছিল না, এর পেছনে ছিল গভীর কৌশলগত হিসাব-নিকাশ। তাত্ত্বিক রবার্ট কিওহ্যান (Robert Keohane) তাঁর প্রাতিষ্ঠানিকতাবাদ (Institutionalism)-এর আলোচনায় দেখিয়েছেন, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত দুর্বল রাষ্ট্রগুলোকে এমন একটি মঞ্চ প্রদান করে, যেখানে তারা বড় শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে নিজেদের দাবি আদায় করতে পারে। একা কোনো পরাশক্তির সাথে দরকষাকষি করা একটি ছোট রাষ্ট্রের পক্ষে প্রায় অসম্ভব, কিন্তু অনেকগুলো সমমনা রাষ্ট্র যখন একসাথে হয়ে একটি জোট হিসেবে কথা বলে, তখন পরাশক্তিগুলোও সেই সম্মিলিত কণ্ঠস্বরকে সহজে অগ্রাহ্য করতে পারে না। বদ্বীপের এই রাষ্ট্রটিও ঠিক সেই বহুপাক্ষিক কূটনীতি (Multilateral Diplomacy)-এর পথটি অত্যন্ত সুকৌশলে বেছে নেয়। জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের সদস্য হওয়ার কারণে তারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রচুর নতুন বন্ধু রাষ্ট্র পেয়ে যায়। এই বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর সম্মিলিত সমর্থন এবং কূটনৈতিক চাপের কারণেই মূলত পরবর্তী সময়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে এই রাষ্ট্রের সদস্যপদ লাভের পথ সুগম হয়, যা এর আগে পরাশক্তির ভেটোর কারণে বারবার আটকে যাচ্ছিল। অর্থাৎ, জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনে যোগদান মূলত রাষ্ট্রটিকে আন্তর্জাতিক বৈধতা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষার এক অটুট এবং শক্তিশালী ঢাল প্রদান করে, যা দ্বিপাক্ষিক কূটনীতি দিয়ে কোনোভাবেই অর্জন করা সম্ভব হতো না। পরিচয়ের পুনর্গঠন এবং মুসলিম বিশ্বের সাথে সম্পর্কের নতুন সমীকরণ জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি হলেও, রাষ্ট্রের সামনে একটি বিশাল এবং অস্বস্তিকর কূটনৈতিক বাধা রয়ে গিয়েছিল। সেই বাধাটি ছিল মধ্যপ্রাচ্য এবং আরব বিশ্বের দেশগুলোর সাথে সম্পর্কের চরম শূন্যতা। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় প্রতিপক্ষ শক্তি আরব বিশ্বে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে একটি নেতিবাচক প্রচারণা চালিয়েছিল। তারা বোঝানোর চেষ্টা করেছিল যে, একটি বৃহৎ হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সহায়তায় মূলত একটি ইসলামি রাষ্ট্রকে ভেঙে দুই টুকরো করা হয়েছে। এই গভীর এবং মিথ্যা প্রোপাগান্ডার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ দেশ এই সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রটিকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানায়। তারা এই রাষ্ট্রটিকে মূলত ইসলামি সংহতি বিনষ্টকারী একটি ধর্মনিরপেক্ষ এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী সত্তা হিসেবেই দেখত। একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হওয়া সত্ত্বেও আরব বিশ্বের কাছ থেকে এই ধরনের চরম অবজ্ঞা এবং কূটনৈতিক বর্জন রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত পীড়াদায়ক ছিল। কেবল আবেগের জায়গা থেকেই নয়, অর্থনীতি পুনর্গঠনের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর আর্থিক সাহায্য এবং স্বীকৃতি আদায় করাটা সেই মুহূর্তে রাষ্ট্রের টিকে থাকার জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল। এই বিশাল রাজনৈতিক এবং মনস্তাত্ত্বিক দেয়াল ভাঙার জন্য রাষ্ট্রকে সম্পূর্ণ নতুন একটি কৌশল নিয়ে ভাবতে হয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অন্যতম প্রধান তাত্ত্বিক আলেকজান্ডার ওয়েন্ট (Alexander Wendt) তাঁর যুগান্তকারী গঠনবাদ (Constructivism) তত্ত্বে দেখিয়েছেন, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রগুলোর পরিচয় এবং তাদের জাতীয় স্বার্থ কোনো স্থির বা জন্মগত বিষয় নয়; এগুলো মূলত সামাজিক মিথস্ক্রিয়া এবং পরিস্থিতির মাধ্যমে প্রতিনিয়ত নতুন করে তৈরি হয়। এই তাত্ত্বিক কাঠামোর আদলেই বদ্বীপের এই রাষ্ট্রটি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের পরিচয় পুনর্গঠনের কাজ শুরু করে। সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ এবং অসাম্প্রদায়িক মূলনীতিগুলো অক্ষুণ্ণ রেখেই তারা আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হিসেবে নিজেদের অবস্থানটি ধীরে ধীরে সামনে আনতে থাকে। আরব দেশগুলোর মন জয় করার জন্য তারা ফিলিস্তিনের ন্যায়সঙ্গত স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে অত্যন্ত জোরালো এবং শর্তহীন সমর্থন প্রদান শুরু করে। এমনকি আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় তারা চিকিৎসা দল এবং চা পাঠিয়ে আরব ভাইদের প্রতি নিজেদের অকৃত্রিম সংহতি প্রকাশ করে। এই পদক্ষেপগুলো ছিল অত্যন্ত সুচিন্তিত। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রটি আরব বিশ্বকে এই বার্তা দিতে সক্ষম হয় যে, তারা ইসলামি সংহতির পরিপন্থী কোনো শক্তি নয়, বরং বৃহত্তর মুসলিম উম্মাহর একটি অবিচ্ছেদ্য এবং বিশ্বস্ত অংশ। নিজেদের পরিচয়ের এই সুকৌশল এবং বাস্তবমুখী পুনর্গঠন মূলত মধ্যপ্রাচ্যের সাথে সম্পর্কের জমে থাকা বরফ গলাতে জাদুর মতো কাজ করে। ওআইসি-তে ঐতিহাসিক যোগদান এবং কূটনৈতিক মাস্টারস্ট্রোক আরব বিশ্বের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের এই ধারাবাহিক প্রচেষ্টার সবচেয়ে চূড়ান্ত এবং নাটকীয় পরিণতিটি ঘটে ১৯৭৪ সালে। ওই বছর পাকিস্তানের লাহোরে অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কোঅপারেশন বা ওআইসি (OIC)-এর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য বদ্বীপ রাষ্ট্রটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়, যা ছিল আরব বিশ্বের পক্ষ থেকে বরফ গলার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। কিন্তু রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকরা অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে জানিয়ে দেন, যে দেশ তাদের ওপর গণহত্যা চালিয়েছে, সেই পাকিস্তানের মাটিতে পা রাখার আগে তাদের অবশ্যই আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিতে হবে। এই দাবিটি ছিল অত্যন্ত জোরালো এবং আত্মমর্যাদাপূর্ণ। শেষ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী দেশগুলোর প্রবল কূটনৈতিক চাপের মুখে পাকিস্তান বাধ্য হয়ে সম্মেলন শুরুর ঠিক আগ মুহূর্তে এই রাষ্ট্রটিকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান করে। এরপর শীর্ষ নেতার লাহোর সফরে যাওয়া এবং সেখানে সমবেত মুসলিম বিশ্বের নেতাদের সাথে একই সারিতে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করার দৃশ্যটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বিশাল আলোড়ন সৃষ্টি করে। এটি কেবল একটি সাধারণ বিদেশ সফর ছিল না, এটি ছিল রাষ্ট্রের কূটনীতির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এবং অভাবনীয় বিজয়গুলোর একটি। এই একটি মাত্র কূটনৈতিক পদক্ষেপের মাধ্যমে রাষ্ট্রটি একসাথে অনেকগুলো বিশাল লক্ষ্য অর্জন করতে সক্ষম হয়। প্রথমত, তারা তাদের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কাছ থেকে নিজেদের সার্বভৌমত্বের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি আদায় করে নেয়। দ্বিতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মনে তাদের নিয়ে যে দীর্ঘদিনের সংশয় এবং ভ্রান্ত ধারণা ছিল, তার চিরতরে অবসান ঘটে। সমাজবিজ্ঞানী এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পণ্ডিত স্টিভেন ডেভিড (Steven David) এই ধরনের জটিল রাষ্ট্রীয় কৌশলকে ব্যাখ্যা করার জন্য সর্বনাশা ভারসাম্য (Omnibalancing) তত্ত্বের অবতারণা করেছেন। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, উন্নয়নশীল দেশগুলোর নেতারা মূলত তাদের রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ এবং বাহ্যিক – উভয় ধরনের হুমকিকে একসাথে সামাল দেওয়ার জন্য বিশেষ ধরনের কৌশল গ্রহণ করেন। ওআইসিতে যোগদান করাটা ঠিক তেমনই একটি অমনিব্যালেন্সিং কৌশল ছিল। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে দেশের ভেতরের ডানপন্থী এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ সম্পন্ন একটি বড় অংশকে যেমন মানসিকভাবে শান্ত করা সম্ভব হয়েছিল, তেমনি বহির্বিশ্বে আরব দেশগুলোর বৈরিতাকেও চিরতরে মুছে ফেলা সম্ভব হয়েছিল। আরব বিশ্ব যখন দেখল যে এই রাষ্ট্রটি ফিলিস্তিনের পক্ষে এবং ওআইসির মঞ্চে অত্যন্ত সোচ্চার, তখন তারা দ্রুত স্বীকৃতি প্রদান এবং আর্থিক সাহায্য নিয়ে এগিয়ে আসে। এটি ছিল এক নিখুঁত কূটনৈতিক মাস্টারস্ট্রোক, যা রাষ্ট্রের গতিপথ পুরোপুরি বদলে দেয়। মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার এবং অর্থনৈতিক কূটনীতির অভাবনীয় সাফল্য ওআইসির সদস্যপদ লাভ এবং আরব বিশ্বের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার বিষয়টি কেবল রাজনৈতিক কাগজপত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এর সুফল রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে এক বিশাল এবং জাদুকরী রূপান্তর নিয়ে আসে। সত্তরের দশকে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়তে থাকায় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর হাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা হতে শুরু করে। তারা তাদের দেশে বিশাল বিশাল রাস্তাঘাট, বিমানবন্দর, হাসপাতাল এবং অত্যাধুনিক শহর নির্মাণের জন্য মেগা প্রকল্প হাতে নেয়। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সামাল দেওয়ার জন্য তাদের প্রচুর পরিমাণ সস্তা এবং পরিশ্রমী শ্রমিকের প্রয়োজন দেখা দেয়। ওআইসিতে যোগদানের ফলে তৈরি হওয়া ‘ভ্রাতৃপ্রতিম’ সম্পর্কের সুযোগ নিয়ে বদ্বীপের এই রাষ্ট্রটি তাদের দেশের লাখ লাখ বেকার এবং কর্মক্ষম তরুণকে মধ্যপ্রাচ্যের এই শ্রমবাজারে পাঠানোর এক বিশাল উদ্যোগ গ্রহণ করে। শুরু হয় মানবসম্পদ রপ্তানির এক নতুন এবং অভাবনীয় যুগ। এটি কোনো সাধারণ ঘটনা ছিল না, এটি ছিল মূলত রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কূটনীতি (Economic Diplomacy)-এর সবচেয়ে সফল এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রয়োগ। কূটনীতিকদের কাজ এখন আর কেবল রাজনৈতিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ রইল না, তাদের প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়াল বিদেশের মাটিতে নিজেদের দেশের মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা। মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়া এই লাখ লাখ প্রবাসী শ্রমিক প্রতি মাসে যে বৈদেশিক মুদ্রা বা রেমিট্যান্স দেশে পাঠাতে শুরু করেন, তা ধীরে ধীরে দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়। সাহায্যনির্ভর এবং ভঙ্গুর একটি অর্থনীতি এই রেমিট্যান্সের ওপর ভর করেই মূলত নিজের পায়ে দাঁড়ানোর শক্তি সঞ্চয় করে। তাত্ত্বিক রবার্ট কিওহ্যান (Robert Keohane) এবং জোসেফ নাই (Joseph Nye) তাঁদের গবেষণায় জটিল পারস্পরিক নির্ভরশীলতা (Complex Interdependence)-এর যে ধারণা দিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সাথে এই রাষ্ট্রের সম্পর্ক মূলত সেই তত্ত্বেরই এক চমৎকার ব্যবহারিক রূপ। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো তাদের অবকাঠামো নির্মাণের জন্য এই রাষ্ট্রের সস্তা শ্রমের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, আর এই রাষ্ট্রটি নিজেদের অর্থনীতি সচল রাখার জন্য মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল থাকে। এই পারস্পরিক নির্ভরশীলতা দুই অঞ্চলের মধ্যে এমন একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক সেতুবন্ধন তৈরি করে, যা যেকোনো রাজনৈতিক মতবিরোধের চেয়ে অনেক বেশি টেকসই। ওআইসির মঞ্চ ব্যবহার করে অর্জিত এই শ্রমবাজার মূলত দেশের লাখ লাখ গ্রামীণ পরিবারের ভাগ্য বদলে দেয় এবং দারিদ্র্য বিমোচনে এক নীরব বিপ্লব সাধন করে। কূটনীতি কীভাবে সরাসরি সাধারণ মানুষের ভাতের প্লেট নিশ্চিত করতে পারে, এটি তারই এক ঐতিহাসিক এবং অনবদ্য দৃষ্টান্ত। মতাদর্শিক ভারসাম্য ও আধুনিক ভূ-রাজনীতিতে জোটগুলোর প্রাসঙ্গিকতা স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হওয়ার সাথে সাথে বিশ্বরাজনীতির পুরো সমীকরণ আবার নতুন করে বদলে গেছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটেছে এবং পৃথিবী বহুমেরুকেন্দ্রিক এক নতুন কাঠামোর দিকে এগোচ্ছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন বা ওআইসির মতো পুরনো জোটগুলোর কি এখনো কোনো প্রাসঙ্গিকতা আছে? প্রথম দৃষ্টিতে এগুলোকে হয়তো অতীতের কিছু নস্টালজিক প্রতিষ্ঠান বলে মনে হতে পারে, কিন্তু একটি উন্নয়নশীল এবং বাণিজ্যনির্ভর রাষ্ট্রের জন্য এই ফোরামগুলো এখনো অত্যন্ত শক্তিশালী কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। বিশ্ব এখন আর কেবল সামরিক ব্লকে বিভক্ত নয়, কিন্তু বাণিজ্য যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং মানবাধিকারের মতো বিষয়গুলোতে উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে এক ধরনের নীরব স্নায়ুযুদ্ধ ঠিকই চলমান রয়েছে। এই নতুন ধরনের চাপ মোকাবেলা করার জন্য রাষ্ট্রকে এখনো সেই পুরনো বহুপাক্ষিকতাবাদ (Multilateralism)-এর ওপরই নির্ভর করতে হয়। জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন এখনো গ্লোবাল সাউথ বা দক্ষিণের দেশগুলোর জন্য এমন একটি মঞ্চ হিসেবে কাজ করে, যেখানে দাঁড়িয়ে তারা বিশ্ব বাণিজ্যের বৈষম্য বা জলবায়ু তহবিলের ন্যায্য হিস্যা নিয়ে উন্নত বিশ্বের সাথে সমানে সমানে দরকষাকষি করতে পারে। একা কথা বলার চেয়ে এই জোটের মঞ্চ থেকে কথা বললে তার ওজন সব সময়ই অনেক বেশি থাকে। অন্যদিকে, ওআইসি এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে সম্পর্কের গুরুত্ব আধুনিক ভূ-রাজনীতিতে আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। রাষ্ট্রটি এখন অত্যন্ত সুকৌশলে একটি হেজিং (Hedging) নীতি অনুসরণ করে চলছে। পশ্চিমা বিশ্বের সাথে তারা মূলত তৈরি পোশাক রপ্তানি এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতার সম্পর্ক বজায় রাখছে, যা দেশের শিল্পের জন্য অপরিহার্য। কিন্তু পশ্চিমা বিশ্ব যখন মানবাধিকার বা অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করে, তখন রাষ্ট্রটি ভারসাম্য রক্ষার জন্য মধ্যপ্রাচ্যের দিকে তাকায়। তারা ওআইসির দেশগুলো থেকে বিশাল অঙ্কের সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) আকর্ষণ করার চেষ্টা করে এবং তাদের জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করে। এর ফলে পশ্চিমা বিশ্বের ওপর রাষ্ট্রের একচেটিয়া নির্ভরশীলতা অনেকখানি কমে যায়। অর্থাৎ, সত্তর দশকে অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদ থেকে যে জোটনিরপেক্ষতা এবং পরিচয়ের পুনর্গঠন শুরু হয়েছিল, তা আজ একবিংশ শতাব্দীতে এসে একটি অত্যন্ত পরিণত এবং সুচারু ভূ-রাজনৈতিক দড়াবাজিতে রূপান্তরিত হয়েছে। এই ফোরামগুলোকে দক্ষতার সাথে ব্যবহার করার মাধ্যমেই মূলত রাষ্ট্রটি প্রমাণ করে চলেছে যে, সঠিক কূটনৈতিক প্রজ্ঞা এবং দূরদৃষ্টি থাকলে একটি ছোট দেশও বিশ্বরাজনীতির নিষ্ঠুর দাবার বোর্ডে নিজের সম্মানজনক স্থানটি যুগের পর যুগ ধরে অক্ষুণ্ণ রাখতে পারে। জাতিসংঘ ও শান্তিরক্ষা মিশনে ভূমিকা (UNO and UN Peace Keeping Missions) আন্তর্জাতিক বৈধতা এবং বহুপাক্ষিকতাবাদের নির্ভরতা পৃথিবীর মানচিত্রে একটি ছোট বা নবীন রাষ্ট্রের টিকে থাকার লড়াই বেশ কঠিন। বড় রাষ্ট্রগুলোর পেশিশক্তি আর অর্থনৈতিক দাপটের সামনে ছোট রাষ্ট্রগুলো প্রায়শই নিজেদের খুব অসহায় আবিষ্কার করে। এই কাঠামোগত দুর্বলতা কাটানোর জন্য তাদের একটি বড় ছাতার প্রয়োজন হয়। সেই বিশাল ছাতাটির নাম হলো জাতিসংঘ বা ইউনাইটেড নেশনস। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের পরিচয় পাকাপোক্ত করার জন্য জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করাটা যেকোনো ভূখণ্ডের জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বিজয়। ১৯৭৪ সালে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে, পরাশক্তিগুলোর ভেটো আর কূটচালের বাধা পার হয়ে বদ্বীপের এই রাষ্ট্রটি যখন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে নিজেদের আসন নিশ্চিত করে, সেটি ছিল মূলত আন্তর্জাতিক বৈধতা আদায়ের এক চূড়ান্ত স্বীকৃতি। এই সদস্যপদ পাওয়ার অর্থ হলো, পৃথিবীর অন্য সব স্বাধীন দেশের মতো এই দেশটিও সমান আইনি মর্যাদার অধিকারী। পরাশক্তিগুলো চাইলেই আর এই রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক নিয়মের বাইরে গিয়ে অবজ্ঞা করতে পারবে না। এই আত্মবিশ্বাস থেকেই মূলত বিশ্বমঞ্চে নতুন রাষ্ট্রের পদচারণা শুরু হয়। আন্তর্জাতিক ফোরামে দাঁড়িয়ে কথা বলার সুযোগ ছোট দেশগুলোকে এক ধরনের মানসিক প্রশান্তি দেয়। এই যে সবাই মিলে একটি নিয়ম মেনে চলার চেষ্টা, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় একে বহুপাক্ষিকতাবাদ (Multilateralism) বলা হয়। প্রখ্যাত তাত্ত্বিক জন রাগি (John Ruggie) তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, শক্তিশালী দেশগুলোর স্বেচ্ছাচারিতা কমানোর জন্য এই ধরনের আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো এক ধরনের নিয়মতান্ত্রিক বেড়াজাল তৈরি করে (Ruggie, 1992)। একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্র হয়তো দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় কোনো পরাশক্তির সাথে পেরে ওঠে না। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গিয়ে কিন্তু প্রতিটি দেশের ভোটের মান সমান হয়ে যায়। এই গাণিতিক সমতার সুযোগ নিয়ে ছোট রাষ্ট্রগুলো নিজেদের দাবিদাওয়াগুলো খুব সহজেই বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে পারে। বদ্বীপের এই রাষ্ট্রটিও শুরু থেকেই জাতিসংঘের এই মঞ্চটিকে অত্যন্ত সুকৌশলে ব্যবহার করে আসছে। পরিবেশ রক্ষা থেকে শুরু করে মানবাধিকার কিংবা নিরস্ত্রীকরণ – প্রায় প্রতিটি বৈশ্বিক চুক্তিতে তারা নিজেদের জোরালো উপস্থিতি জানান দিয়েছে। এই বহুপাক্ষিক ফোরামগুলোর মাধ্যমে তারা মূলত পরাশক্তিগুলোকে বোঝানোর চেষ্টা করে যে, বিশ্বব্যবস্থায় নিয়মকানুন বলে কিছু একটা আছে এবং সবাইকে সেই নিয়ম মেনেই চলতে হবে। জাতিসংঘের বিভিন্ন অঙ্গসংস্থায় সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকার কারণে দেশের ভেতরের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগুলোও অনেক বেশি আধুনিক হওয়ার সুযোগ পায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ বা খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মতো প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের ভেতরে নানা রকম উন্নয়ন প্রকল্পে সরাসরি কারিগরি এবং আর্থিক সহায়তা প্রদান করে। এই সহায়তাগুলো মূলত একটি উন্নয়নশীল দেশের ভেতরের দুর্বল অর্থনীতিকে দাঁড় করাতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখে। কূটনীতিকরা খুব ভালো করেই জানেন, জাতিসংঘের সদর দপ্তরে বসে থাকা মানে পুরো বিশ্বের নাড়ির স্পন্দন বুঝতে পারা। সেখানে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন জোট তৈরি হয়, পুরনো জোট ভাঙে। এই পরিবর্তনশীল স্রোতের মাঝে নিজেদের ভাসিয়ে রেখে ফায়দা লুটতে হয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তাত্ত্বিক রবার্ট কিওহ্যান (Robert Keohane) তাঁর প্রাতিষ্ঠানিকতাবাদ (Institutionalism) ধারণায় উল্লেখ করেছেন, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আস্থার সংকট কমিয়ে সহযোগিতার পথ সুগম করে (Keohane, 1989)। বদ্বীপের এই রাষ্ট্রটিও মূলত সেই প্রাতিষ্ঠানিক আস্থার ওপর ভর করেই নিজেদের আন্তর্জাতিক অবস্থানকে ধীরে ধীরে সংহত করেছে। এটি কেবল একটি ফোরামে যোগ দেওয়ার গল্প নয়, এটি মূলত নিয়মের শক্তি দিয়ে পেশিশক্তিকে মোকাবেলার এক নিরন্তর কৌশল। শান্তিরক্ষা মিশনের পটভূমি ও সামরিক কূটনীতির বিবর্তন জাতিসংঘের সবচেয়ে দৃশ্যমান এবং আলোচিত কাজগুলোর একটি হলো বিশ্বের সংঘাতপূর্ণ এলাকাগুলোতে শান্তি ফিরিয়ে আনা। এই কাজের জন্য তাদের কোনো নিজস্ব সেনাবাহিনী নেই। সদস্য দেশগুলোর পাঠানো সামরিক বাহিনীর সদস্যদের নিয়েই গঠিত হয় জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন, যাদের মাথায় থাকে নীল রঙের হেলমেট। আশির দশকের শেষভাগ থেকে শুরু করে বদ্বীপ অঞ্চলের এই রাষ্ট্রটি জাতিসংঘের এই ব্লু হেলমেট মিশনে নিজেদের এক অপরিহার্য অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। প্রথম দিকে গুটিকয়েক সেনা দিয়ে শুরু হলেও, সময়ের সাথে সাথে সৈন্য পাঠানোর এই সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। বিশ্বের প্রায় প্রতিটি যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে, তা আফ্রিকার গহীন জঙ্গল হোক বা মধ্যপ্রাচ্যের রুক্ষ মরুভূমি, এখানকার শান্তিরক্ষীরা নিজেদের পেশাদারিত্বের প্রমাণ রেখেছেন। এই অংশগ্রহণ কেবল একটি গতানুগতিক রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন নয়। এটি মূলত রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির সাথে সামরিক বাহিনীকে যুক্ত করার এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ, যাকে আধুনিক পরিভাষায় সামরিক কূটনীতি (Military Diplomacy) বলা হয়। একটি দেশের সামরিক বাহিনী সাধারণত দেশের সীমানা রক্ষার জন্য তৈরি হয়। তাদের প্রশিক্ষণ এবং মনস্তত্ত্ব থাকে শত্রুকে ধ্বংস করার জন্য। কিন্তু শান্তিরক্ষা মিশনের কাজ পুরোপুরি ভিন্ন। সেখানে গিয়ে সরাসরি যুদ্ধ করার চেয়ে দুই বিবদমান পক্ষের মধ্যে একটি বাফার জোন বা নিরাপদ দেয়াল তৈরি করে রাখাই থাকে প্রধান কাজ। এই কাজের জন্য চরম ধৈর্য, মানবিকতা এবং ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের সাথে মিশে যাওয়ার মানসিকতা প্রয়োজন হয়। এই ভূখণ্ডের সামরিক বাহিনী খুব দ্রুতই নিজেদের এই নতুন এবং চ্যালেঞ্জিং ভূমিকার সাথে মানিয়ে নিতে সক্ষম হয়। তারা কেবল টহল দিয়েই দায়িত্ব শেষ করে না, যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকার সাধারণ মানুষের জন্য স্কুল তৈরি করে, রাস্তাঘাট বানায় এবং চিকিৎসাসেবা প্রদান করে। এই মানবিক কাজগুলোর কারণে স্থানীয় মানুষের মনে তাদের প্রতি এক ধরনের গভীর শ্রদ্ধাবোধ জন্ম নেয়। অনেক সময় দেখা যায়, স্থানীয় বিবদমান সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো পশ্চিমা দেশের সেনাদের ওপর হামলা করলেও, এই ভূখণ্ডের শান্তিরক্ষীদের তারা সমীহ করে চলে। এটি সামরিক বাহিনীর সদস্যদের এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক বিজয়, যা প্রথাগত অস্ত্র দিয়ে অর্জন করা সম্ভব নয়। শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণের এই ধারাবাহিকতা রাষ্ট্রের নিজস্ব প্রতিরক্ষা কাঠামোতেও বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। বিদেশের মাটিতে কাজ করতে গিয়ে সামরিক বাহিনীর সদস্যরা বিশ্বের উন্নত দেশের সেনাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার সুযোগ পান। এর ফলে তাদের আভিযানিক দক্ষতা, কৌশলগত চিন্তাভাবনা এবং নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। বিভিন্ন দেশের বাহিনীর সাথে এই যে নিয়মিত যোগাযোগ এবং অভিজ্ঞতা বিনিময়, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তাত্ত্বিকরা একে নিরাপত্তা সম্প্রদায় (Security Community) গঠনের প্রাথমিক ধাপ হিসেবে দেখেন। এই ধরনের যৌথ কাজের ফলে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির শঙ্কা কমে আসে। দেশে ফিরে আসার পর এই সেনারাই নিজেদের বাহিনীর আধুনিকায়নে বড় ধরনের ভূমিকা রাখেন। অর্থাৎ, বিদেশের মাটিতে শান্তি রক্ষার পাশাপাশি তারা মূলত নিজেদের দেশের সামরিক ভিত্তিকে আরও বেশি পেশাদার এবং আন্তর্জাতিক মানের করে তুলছেন। এটি একটি বহুমুখী লাভজনক প্রক্রিয়া, যেখানে রাষ্ট্র বিশ্বশান্তিতে অবদান রাখার পাশাপাশি নিজেদের প্রতিষ্ঠানকেও ভেতর থেকে শক্তিশালী করার সুযোগ পাচ্ছে। অর্থনৈতিক প্রণোদনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক আধুনিকায়ন শান্তিরক্ষা মিশনে বিপুল সংখ্যক সেনা পাঠানোর পেছনে কেবল বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার মহান ব্রত কাজ করে, এমনটা ভাবলে ভুল হবে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তবতায় প্রতিটি পদক্ষেপের পেছনেই কিছু নিখাদ লাভ-ক্ষতির হিসাব থাকে। গবেষক পল ডাইহল (Paul Diehl) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ইন্টারন্যাশনাল পিসকিপিং (International Peacekeeping)-এ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন, উন্নয়নশীল দেশগুলো মূলত দুটি কারণে এই মিশনগুলোতে সবচেয়ে বেশি সৈন্য পাঠায় – একটি হলো অর্থনৈতিক লাভ, অন্যটি সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়ন (Diehl, 1993)। একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য বিশাল আকারের সামরিক বাহিনী বসিয়ে বসিয়ে পোষা এবং তাদের জন্য প্রতিনিয়ত আধুনিক অস্ত্র কেনা অর্থনীতির জন্য বিরাট এক বোঝা। শান্তিরক্ষা মিশনে সৈন্য পাঠালে সেই বোঝার একটি বড় অংশ জাতিসংঘের কাঁধে চলে যায়। জাতিসংঘ প্রতিটি সৈন্যের জন্য সংশ্লিষ্ট দেশকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ প্রদান করে। এই অর্থ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি সামরিক বাজেটের ওপর চাপ অনেকখানি কমিয়ে দেয়। অর্থনৈতিক এই প্রণোদনা কেবল রাষ্ট্রীয় কোষাগারেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এটি সামরিক বাহিনীর সদস্যদের ব্যক্তিগত অর্থনীতিতেও বড় ধরনের স্বস্তি নিয়ে আসে। মিশনে কাজ করার জন্য তারা যে বাড়তি ভাতা পান, তা দেশে ফিরে তাদের পরিবারের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সাহায্য করে। এর চেয়েও বড় সুবিধাটি আসে সামরিক সরঞ্জাম বা লজিস্টিকসের ক্ষেত্রে। জাতিসংঘ সাধারণত মিশনে ব্যবহৃত সামরিক সরঞ্জাম, যেমন – সাঁজোয়া যান, হেলিকপ্টার বা যোগাযোগের আধুনিক যন্ত্রপাতির জন্য সংশ্লিষ্ট দেশকে ভাড়া প্রদান করে। অনেক সময় মিশন শেষ হওয়ার পর সেই আধুনিক যন্ত্রপাতিগুলো দেশের সামরিক বাহিনীর নিজস্ব সম্পদে পরিণত হয়। এর ফলে রাষ্ট্রকে নিজেদের পকেটের টাকা খরচ করে আধুনিক সমরাস্ত্র কিনতে হয় না। অর্থাৎ, শান্তিরক্ষা মিশনগুলো মূলত একটি উন্নয়নশীল দেশের সামরিক বাহিনীকে আধুনিকায়ন করার সবচেয়ে কার্যকর এবং সাশ্রয়ী মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। তাত্ত্বিক পরিভাষায় একে অনেক সময় ভাড়াটে নির্ভরতা (Rentier Dependency)-এর একটি পরোক্ষ রূপ হিসেবে সমালোচনা করা হলেও, বাস্তবতার নিরিখে এটি একটি অত্যন্ত সফল রাষ্ট্রীয় কৌশল। এই অর্থনৈতিক সুবিধাগুলোর কারণে রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকরা সব সময় চেষ্টা করেন জাতিসংঘের সাথে সম্পর্কটি সর্বোচ্চ পর্যায়ে ভালো রাখতে। নিউ ইয়র্কে বসে থাকা কূটনীতিকদের নিয়মিত দেনদরবার করতে হয় যেন মিশনগুলোতে দেশের কোটা কোনোভাবেই কমে না যায়। অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলোও এই অর্থনৈতিক সুবিধার ভাগ নিতে চায়, ফলে সৈন্য পাঠানোর ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এক ধরনের নীরব প্রতিযোগিতা চলে। এই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য রাষ্ট্রকে প্রতিনিয়ত নিজেদের বাহিনীর মান উন্নত করতে হয়, জাতিসংঘের নতুন নতুন শর্ত পূরণের প্রস্তুতি নিতে হয়। নারী শান্তিরক্ষী পাঠানোর ক্ষেত্রে জাতিসংঘের যে নতুন তাগিদ রয়েছে, রাষ্ট্রটি সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিপুল সংখ্যক নারী পুলিশ এবং সেনা সদস্য প্রেরণ করছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক ফোরামে দেশের ভাবমূর্তি যেমন উজ্জ্বল হচ্ছে, তেমনি অর্থনৈতিক ফায়দাও নিশ্চিত হচ্ছে। রাজনীতি এবং অর্থনীতির এই চমৎকার মেলবন্ধন মূলত শান্তিরক্ষা মিশনগুলোকে রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভে পরিণত করেছে। মৃদু ক্ষমতার বিস্তার ও বিশ্বমঞ্চে ভাবমূর্তি গঠন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি দেশের পরিচয় কেবল তার জিডিপির আকার বা সামরিক বাহিনীর লোকবল দিয়ে নির্ধারিত হয় না। অনেক সময় একটি দেশের সাধারণ মানুষের আচরণ বা তাদের মানবিক কাজগুলো দেশের জন্য সবচেয়ে বড় পরিচয় হিসেবে কাজ করে। হার্ভার্ডের অধ্যাপক জোসেফ নাই (Joseph Nye) এই অদৃশ্য শক্তির নাম দিয়েছেন মৃদু ক্ষমতা (Soft Power) (Nye, 1990)। তাঁর মতে, জোর করে নয়, বরং নিজের ইতিবাচক কাজের মাধ্যমে অন্যকে আকৃষ্ট করার ক্ষমতাই হলো একটি রাষ্ট্রের আসল শক্তির জায়গা। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে কাজ করতে গিয়ে এই ভূখণ্ডের সেনাসদস্যরা মূলত রাষ্ট্রের সেই সফট পাওয়ার বা মৃদু ক্ষমতারই সর্বোচ্চ চর্চা করে চলেছেন। আফ্রিকার কোনো এক প্রত্যন্ত গ্রামে যখন এই দেশের একজন সেনা সদস্য নিজের রেশনের খাবার স্থানীয় ক্ষুধার্ত শিশুদের মাঝে বিলিয়ে দেন, তখন সেই গ্রামের মানুষের মনে এই দেশ সম্পর্কে এক গভীর শ্রদ্ধাবোধ তৈরি হয়। এই শ্রদ্ধাবোধ কোনো চুক্তি বা অর্থ দিয়ে কেনা যায় না। এটি মূলত মানবিকতার এক সর্বজনীন ভাষা, যা খুব সহজেই ভিনদেশি মানুষের মন জয় করে নিতে পারে। এই যে ইতিবাচক ভাবমূর্তি, এটি কূটনীতির টেবিলে এক জাদুকরী অস্ত্র হিসেবে কাজ করে। বিদেশের মাটিতে বা জাতিসংঘের সদর দপ্তরে বদ্বীপ রাষ্ট্রের কোনো কূটনীতিক যখন কথা বলতে দাঁড়ান, তখন তার কথার পেছনে এই হাজার হাজার শান্তিরক্ষীর আত্মত্যাগের ভার কাজ করে। অন্য দেশের প্রতিনিধিরা জানেন যে, এই দেশটি বিশ্বশান্তির জন্য নিজেদের নাগরিকদের জীবন বিপন্ন করতে পিছপা হয় না। এই সম্মানজনক অবস্থান থেকে কথা বলার কারণে আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে ছোট একটি দেশ হওয়া সত্ত্বেও তারা অনেক বেশি সমীহ আদায় করে নিতে পারে। তাত্ত্বিক আলেকজান্ডার ওয়েন্ট (Alexander Wendt) তাঁর গঠনবাদ (Constructivism) তত্ত্বে উল্লেখ করেছেন, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রগুলোর পরিচয় তাদের কাজের মাধ্যমেই নির্মিত হয়। শান্তিরক্ষী পাঠানোর এই ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্রটি বিশ্বমঞ্চে নিজেদের একটি ‘দায়িত্বশীল এবং শান্তিকামী’ রাষ্ট্র হিসেবে পুনর্গঠিত করেছে। সাহায্যনির্ভর একটি দেশের তকমা সরিয়ে তারা এখন বিশ্বকে সাহায্য প্রদানকারী একটি গর্বিত জাতি হিসেবে নিজেদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে। সফট পাওয়ারের এই প্রভাব অনেক সময় দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। যেসব দেশে শান্তিরক্ষীরা কাজ করেছেন, সেসব দেশের সাথে পরবর্তী সময়ে বাণিজ্যিক এবং রাজনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করা অনেক সহজ হয়ে যায়। আফ্রিকান অনেক দেশের নেতারা প্রকাশ্যেই এই ভূখণ্ডের শান্তিরক্ষীদের অবদানের কথা স্বীকার করেন এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে এই দেশের পক্ষে নিজেদের সমর্থন ব্যক্ত করেন। অর্থাৎ, সামরিক বাহিনী দিয়ে শুরু হওয়া একটি সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত একটি দীর্ঘমেয়াদী কূটনৈতিক বিনিয়োগে পরিণত হয়। এটি মূলত প্রথাগত কূটনীতির বাইরে গিয়ে সাধারণ মানুষের সাথে সাধারণ মানুষের সংযোগ স্থাপনের এক অনবদ্য প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রের কোনো বাড়তি খরচ নেই, কিন্তু এর মাধ্যমে অর্জিত সম্মান এবং কূটনৈতিক সুবিধা যেকোনো বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগের চেয়েও অনেক বেশি মূল্যবান। একটি ছোট রাষ্ট্র কীভাবে বুদ্ধি এবং মানবিকতা দিয়ে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের অপরিহার্যতা প্রমাণ করতে পারে, এটি তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। শান্তিরক্ষীদের পেশাদারিত্ব ও পরাশক্তির মনস্তাত্ত্বিক সমীকরণ জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনগুলোর ভেতরের অর্থনীতি এবং রাজনীতি বিশ্লেষণ করলে এক অদ্ভুত সমীকরণ চোখে পড়ে। এই মিশনগুলোর সিংহভাগ খরচ বহন করে মূলত পশ্চিমা পরাশক্তিগুলো। কিন্তু যখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাঠে নামার প্রশ্ন আসে, তখন সেই পরাশক্তিগুলো নিজেদের দেশের সেনাদের পাঠাতে তীব্র অনীহা প্রকাশ করে। তারা চায় না তৃতীয় বিশ্বের কোনো গোলমালে জড়িয়ে তাদের দেশের সেনাদের প্রাণহানি ঘটুক, কারণ এর ফলে তাদের দেশের ভেতরে তীব্র রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে। এই শূন্যস্থান পূরণের জন্যই তারা উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর নির্ভর করে। বদ্বীপের এই রাষ্ট্রটি সেই নির্ভরতার জায়গাটিতে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে নিজেদের অপরিহার্য করে তুলেছে। এই পরিস্থিতি পরাশক্তি এবং উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে এক ধরনের প্রচ্ছন্ন মনস্তাত্ত্বিক ভারসাম্য তৈরি করে। পরাশক্তিগুলো হয়তো আর্থিক অনুদান দিয়ে জাতিসংঘের ওপর খবরদারি করতে চায়, কিন্তু তারা খুব ভালো করেই জানে যে, মাঠ পর্যায়ে কাজ করার জন্য এই উন্নয়নশীল দেশগুলোর পদাতিক বাহিনীর বিকল্প তাদের হাতে নেই। এই নীরব নির্ভরতা কূটনীতির টেবিলে একটি ছোট দেশকে অনেক বড় ধরনের মনস্তাত্ত্বিক জোর এনে দেয়। শান্তিরক্ষীদের এই পেশাদারিত্ব পরাশক্তিগুলোকে এক ধরনের শ্রদ্ধামিশ্রিত সমীহ করতে বাধ্য করে। অনেক সময় দেখা যায়, অত্যন্ত বৈরী এবং বিপজ্জনক পরিবেশে পশ্চিমা বাহিনীর সেনারা কাজ করতে অস্বীকৃতি জানায়, কিন্তু এই ভূখণ্ডের সেনারা চরম সাহসিকতার সাথে সেই পরিস্থিতি সামাল দেয়। এই ধরনের ঘটনাগুলো পরাশক্তিগুলোর সামরিক নেতৃত্বকেও অবাক করে। তারা বুঝতে পারে, কেবল আধুনিক অস্ত্র থাকলেই হয় না, কঠিন পরিস্থিতিতে টিকে থাকার জন্য এক ধরনের জন্মগত লড়াকু মানসিকতা প্রয়োজন। তাত্ত্বিক রবার্ট পুটনাম (Robert Putnam)-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দরকষাকষিতে এই ধরনের নির্ভরতাগুলো ছোট রাষ্ট্রগুলোর হাতে এক ধরনের ‘লিভারেজ’ বা বাড়তি সুবিধা তুলে দেয়। পরাশক্তিগুলো যখন মানবাধিকার বা অন্যান্য রাজনৈতিক ইস্যুতে এই রাষ্ট্রের ওপর কোনো চাপ প্রয়োগ করার চেষ্টা করে, তখন তারা অবচেতনভাবেই এই শান্তিরক্ষা মিশনে রাষ্ট্রটির অবদানের কথা মাথায় রাখে। তারা জানে যে, এই দেশটিকে বেশি কোণঠাসা করলে জাতিসংঘের মিশনগুলো সৈন্য সংকটে পড়তে পারে, যা শেষ পর্যন্ত বৈশ্বিক স্থিতিশীলতাকেই নষ্ট করবে। এই মনস্তাত্ত্বিক সমীকরণটি রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের অত্যন্ত সচেতনভাবে ব্যবহার করতে হয়। তারা খুব সুকৌশলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আলোচনায় বিশ্বশান্তিতে তাদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। মিশনে গিয়ে এ পর্যন্ত অসংখ্য সেনা প্রাণ হারিয়েছেন। এই লাশের মিছিল মূলত বিশ্বমঞ্চে রাষ্ট্রের একটি নৈতিক উচ্চাসন তৈরি করে দেয়। পরাশক্তিগুলো যখন বড় বড় নৈতিকতার কথা বলে, তখন এই আত্মত্যাগের উদাহরণ দিয়ে তাদের চুপ করিয়ে দেওয়া সহজ হয়। এটি মূলত আন্তর্জাতিক রাজনীতির দাবার বোর্ডে রক্ত এবং ঘাম দিয়ে কেনা এক ধরনের কূটনৈতিক ছাড়পত্র। এই ছাড়পত্র ব্যবহার করে রাষ্ট্র অনেক সময় পরাশক্তিগুলোর অন্যায় আবদার এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়। একটি উন্নয়নশীল দেশের সামরিক বাহিনী কীভাবে নিজেদের জীবন বাজি রেখে পরাশক্তিগুলোর ভূ-রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশে সূক্ষ্ম পরিবর্তন আনতে পারে, শান্তিরক্ষা মিশনের এই ইতিহাস মূলত সেই নীরব ক্ষমতারই গল্প বলে। পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থা এবং জাতিসংঘে আগামীর কৌশল সময় বদলানোর সাথে সাথে বিশ্বরাজনীতি এবং সংঘাতের ধরনও পাল্টে যাচ্ছে। আগেকার দিনের যুদ্ধগুলো হতো মূলত দুটি নির্দিষ্ট দেশের নিয়মিত বাহিনীর মধ্যে। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীরা সেই দুই বাহিনীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে শান্তি বজায় রাখার চেষ্টা করতেন। এখনকার পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। বর্তমান সংঘাতগুলো মূলত রাষ্ট্রের ভেতরেই ঘটছে। বিভিন্ন সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক এবং চোরাকারবারিদের সাথে শান্তিরক্ষীদের লড়তে হচ্ছে। মালি, সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক বা কঙ্গোর মতো দেশগুলোতে শান্তিরক্ষীদের ওপর প্রতিনিয়ত চোরাগোপ্তা হামলা চালানো হচ্ছে। রাস্তার নিচে পুঁতে রাখা ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (IED) বা আত্মঘাতী হামলার শিকার হয়ে অনেক শান্তিরক্ষী প্রাণ হারাচ্ছেন। এই নতুন ধরনের সংঘাতকে সামরিক পরিভাষায় অসম যুদ্ধ (Asymmetric Warfare) বলা হয়। এই অদেখা শত্রুদের মোকাবেলা করা প্রথাগত শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন এবং ঝুঁকিপূর্ণ। এই পরিবর্তনশীল এবং ভয়ংকর বাস্তবতায় রাষ্ট্রকে এখন তাদের শান্তিরক্ষা কৌশল নিয়ে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। ভবিষ্যতের মিশনগুলোতে কেবল পদাতিক সেনা পাঠিয়ে কাজ হবে না। এখন প্রয়োজন হবে অনেক বেশি প্রযুক্তিনির্ভর এবং গোয়েন্দাভিত্তিক অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা। সাইবার নিরাপত্তা, ড্রোন প্রযুক্তি এবং ইন্টেলিজেন্স গ্যাদারিং বা তথ্য সংগ্রহের কাজে শান্তিরক্ষীদের আরও বেশি দক্ষ করে তুলতে হবে। তাত্ত্বিক জন মেয়ারশাইমার (John Mearsheimer) যেমনটি বলেছেন, রাষ্ট্রগুলোকে সব সময় পরিবর্তিত নিরাপত্তা পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে হয়। বদ্বীপের এই রাষ্ট্রটিও সেই পরিবর্তনের সাথে তাল মেলাতে শুরু করেছে। তারা এখন সাধারণ সেনার পাশাপাশি স্পেশাল ফোর্সেস, ইঞ্জিনিয়ারিং কোর এবং মেডিকেল টিম পাঠানোর ওপর বেশি জোর দিচ্ছে। জাতিসংঘে এখন শুধু সৈন্য সরবরাহকারী দেশ হিসেবে বসে থাকলে চলবে না। নীতিনির্ধারকরা এখন জোরালো দাবি তুলছেন যেন মিশনগুলোর নেতৃত্ব বা ফোর্স কমান্ডারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে এই দেশের সামরিক কর্মকর্তাদের বেশি করে নিয়োগ দেওয়া হয়। যারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি নিয়ে মাঠে কাজ করবে, নীতিনির্ধারণী টেবিলেও তাদের সমান কণ্ঠস্বর থাকতে হবে – এই যৌক্তিক দাবিটি এখন আন্তর্জাতিক ফোরামে অত্যন্ত শক্তভাবে তোলা হচ্ছে। জাতিসংঘের কাঠামোগত সংস্কারের প্রশ্নটিও এখন সামনে চলে এসেছে। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের একচেটিয়া ভেটো ক্ষমতার কারণে অনেক সময়ই বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার কাজ বাধাগ্রস্ত হয়। ছোট রাষ্ট্রগুলো এই অগণতান্ত্রিক কাঠামোর পরিবর্তন চাইছে। আগামী দিনের কূটনীতিতে এই রাষ্ট্রটিকে সমমনা দেশগুলোর সাথে নিয়ে জাতিসংঘের সংস্কারের পক্ষে আরও সোচ্চার হতে হবে। বহুপাক্ষিক ফোরামগুলোতে নিজেদের প্রভাব ধরে রাখার জন্য কেবল অতীত অর্জনের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় নতুন নতুন সংকট, যেমন – জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সংঘাত বা সাইবার স্পেসের নিয়মকানুন নির্ধারণের মতো বিষয়গুলোতেও নেতৃত্ব দেওয়ার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। জাতিসংঘ মূলত একটি দর্পণ, যেখানে প্রতিটি রাষ্ট্র তার নিজস্ব সক্ষমতা এবং প্রজ্ঞার প্রতিফলন দেখতে পায়। এই দর্পণে নিজেদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল রাখার জন্য রাষ্ট্রটিকে প্রতিনিয়ত উদ্ভাবনী কূটনীতি এবং অসীম সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে যেতে হবে। বিশ্বশান্তির এই মঞ্চে টিকে থাকার লড়াই মূলত একটি রাষ্ট্রের অনন্ত যাত্রারই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। পররাষ্ট্রনীতির নির্ধারকসমূহ (Determining factors of foreign policy) ভৌগোলিক অবস্থান ও ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা কোথাও কোনো দেশের পররাষ্ট্রনীতি হঠাৎ করে শূন্য থেকে তৈরি হয় না। রাষ্ট্র পরিচালনার সাথে যুক্ত নীতিনির্ধারকরা চাইলেই নিজেদের খেয়ালখুশিমতো বাইরের পৃথিবীর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে পারেন না। এর পেছনে সব সময় কিছু অদৃশ্য শেকল কাজ করে, যেগুলোকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় নির্ধারক (Determinant) বলা হয়। একটি বদ্বীপ অঞ্চলের রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় নির্ধারক হলো এর ভূগোল। পৃথিবীর মানচিত্রে এর অবস্থানটি বেশ সংবেদনশীল। তিন দিক থেকে বিশাল এক প্রতিবেশী রাষ্ট্র দ্বারা ভূখণ্ডটি পরিবেষ্টিত। অন্যদিকে রয়েছে মিয়ানমারের সাথে ছোট একটি সীমান্ত এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলরাশি। একজন সাধারণ মানুষের যেমন প্রতিবেশী নির্বাচনের কোনো সুযোগ থাকে না, রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও বিষয়টি পুরোপুরি সত্য। প্রতিবেশীর সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা ছাড়া এই ভৌগোলিক বাস্তবতায় টিকে থাকার দ্বিতীয় কোনো সহজ পথ খোলা নেই। দেলোয়ার হোসেন তাঁর গবেষণায় খুব স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন যে, এই ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই আন্তর্জাতিক মঞ্চে রাষ্ট্রটিকে অনেক সময় আপস করতে বাধ্য হতে হয় (Hossain, 2014)। তিন দিক থেকে একটি বড় শক্তির প্রভাব বলয়ের মধ্যে আটকে থাকার কারণে স্বাধীনভাবে যেকোনো ভূ-রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়াটা বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। সীমানা ব্যবস্থাপনা, ছিটমহল সমস্যা কিংবা অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন – প্রতিটি বিষয় এই ভূগোলের সুতোর সাথেই আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা। ফলে চাইলেও অনেক সময় এই রাষ্ট্রের পক্ষে পরাশক্তিগুলোর কোনো জোটে সরাসরি গিয়ে যোগ দেয়া সম্ভব হয় না। প্রতিবেশীর নিরাপত্তা উদ্বেগকে সব সময় হিসাবে রেখেই নিজস্ব সামরিক ও বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তগুলো গ্রহণ করতে হয়। ভূগোলের এই প্রভাব আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তাত্ত্বিক আলোচনায় অনেক আগে থেকেই গুরুত্ব পেয়ে আসছে। প্রখ্যাত ভূ-রাজনীতিবিদ নিকোলাস স্পাইকম্যান (Nicholas Spykman) তাঁর রিমল্যান্ড তত্ত্ব (Rimland Theory)-এ দেখিয়েছেন যে, সমুদ্র তীরবর্তী প্রান্তিক অঞ্চলগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা বিশ্বরাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তারের জন্য কতটা জরুরি। বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত হওয়ার কারণে এই ভূখণ্ডটি স্বভাবতই বৃহৎ শক্তিগুলোর নজরে রয়েছে। বিশেষ করে ভারত মহাসাগর এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সংযোগস্থলে এর অবস্থান হওয়ায় এর কৌশলগত গুরুত্ব অনেক বেড়ে গেছে। ভূগোল একদিকে যেমন রাষ্ট্রটিকে কিছুটা কোণঠাসা করে রেখেছে, অন্যদিকে আবার এটিই রাষ্ট্রটিকে আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠার সুযোগ করে দিয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগানোর জন্য দরকার হয় খুব ধীরস্থির এবং বাস্তবসম্মত কূটনীতির। দেশের নীতিনির্ধারকরা খুব ভালো করেই জানেন যে, বিশাল প্রতিবেশীর সাথে সরাসরি বৈরিতা তৈরি হলে দেশের অর্থনীতি এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মুখে পড়বে। তাই কোনো উসকানিতে পা না দিয়ে আলোচনার টেবিলে বসে সমস্যা সমাধানের পথ খোঁজাটাই এখানকার পররাষ্ট্রনীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি ছোট ভূখণ্ডের চারপাশে বিশাল আয়তনের ভিন্ন রাষ্ট্রের উপস্থিতি মনস্তাত্ত্বিকভাবেই এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দেয়। এই মনস্তাত্ত্বিক চাপ সামলে নিয়ে বহির্বিশ্বের সাথে লাভজনক বাণিজ্যিক সম্পর্ক তৈরি করা মোটেও সহজ কাজ নয়। তারপরও রাষ্ট্রীয় অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার তাগিদে এই ভূগোলের সীমাবদ্ধতার ভেতরে থেকেই কূটনীতির নতুন নতুন পথ আবিষ্কার করতে হয়। ভূগোল কীভাবে একটি রাষ্ট্রের মনস্তত্ত্ব গড়ে দেয়, তা বুঝতে হলে সীমান্ত এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার দিকে তাকাতে হয়। হাজার হাজার মাইলের বিশাল সীমান্তরেখা পাহারা দেয়া যেকোনো উন্নয়নশীল দেশের জন্যই এক বিশাল অর্থনৈতিক বোঝা। চোরাচালান, অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রতিবেশীর সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ও সহযোগিতা অপরিহার্য হয়ে পড়ে। অনেক সময় দেখা যায়, দেশের ভেতরের সাধারণ মানুষ কোনো একটি নির্দিষ্ট ঘটনায় প্রতিবেশীর ওপর দারুণভাবে ক্ষুব্ধ। তারা হয়তো রাজপথে নেমে প্রতিবাদ করছে। কিন্তু সরকার সেই আবেগের বশবর্তী হয়ে হুট করে কোনো কড়া সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। কারণ সরকারকে পুরো দেশের দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তার কথা ভাবতে হয়। এই যে অভ্যন্তরীণ আবেগ এবং ভৌগোলিক বাস্তবতার মধ্যকার দ্বন্দ্ব, এটি পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে সব সময় এক বিরাট দ্বিধার জন্ম দেয়। ভূগোলের এই বন্দিদশা থেকে মুক্তির কোনো উপায় নেই। তাই রাষ্ট্রকে বাধ্য হয়েই এমন কিছু কৌশল উদ্ভাবন করতে হয়, যাতে প্রতিবেশীর সাথে ভারসাম্য বজায় রাখার পাশাপাশি দূরবর্তী পরাশক্তিগুলোর সাথেও লাভজনক সম্পর্ক স্থাপন করা যায়। অর্থাৎ, মানচিত্রের রেখাগুলোই নির্ধারণ করে দিচ্ছে আন্তর্জাতিক দাবার বোর্ডে এই রাষ্ট্রের গুটিগুলো কীভাবে চালিত হবে। ঔপনিবেশিক অতীত ও ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার ভৌগোলিক বাস্তবতার ঠিক পরেই যে বিষয়টি একটি রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করে, তা হলো এর ইতিহাস। শত শত বছর ধরে এই অঞ্চলটি বিভিন্ন বিদেশি শক্তির দ্বারা শাসিত ও শোষিত হয়েছে। প্রথমে ব্রিটিশদের দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসন, এরপর ধর্মের ভিত্তিতে তৈরি হওয়া একটি বিচিত্র রাষ্ট্রকাঠামোর ভেতরে অভ্যন্তরীণ উপনিবেশবাদের শিকার হওয়া – এই পুরো ঐতিহাসিক পরিক্রমা এখানকার মানুষের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ছাপ ফেলে গেছে। স্বাধীন হওয়ার পর তাই স্বাভাবিকভাবেই বহির্বিশ্বের যেকোনো ধরনের খবরদারি বা আধিপত্য বিস্তারের প্রচেষ্টাকে এই রাষ্ট্র সব সময় চরম সন্দেহের চোখে দেখে। এই সন্দেহপ্রবণ মানসিকতা মূলত ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার (Historical Legacy)-এরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মোহাম্মদ আইয়ুব (Mohammed Ayoob) তাঁর সাবল্টার্ন রিয়েলিজম (Subaltern Realism) ধারণায় দেখিয়েছেন যে, তৃতীয় বিশ্বের সদ্য স্বাধীন হওয়া রাষ্ট্রগুলোর প্রধান মনোযোগ থাকে নিজেদের দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোকে রক্ষা করা এবং বাইরের হস্তক্ষেপ ঠেকানোর দিকে। ঔপনিবেশিক শোষণের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে এই রাষ্ট্রগুলো শেখে যে, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় কেউ কারো নিঃস্বার্থ বন্ধু হয় না। ফলে বাইরের কোনো দেশ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেও রাষ্ট্রকে অনেক হিসাব-নিকাশ করে সেই সাহায্য গ্রহণ করতে হয়। ইতিহাসের এই বোঝা পররাষ্ট্রনীতির প্রতিটি সিদ্ধান্তে এক ধরনের অদৃশ্য সতর্কতা তৈরি করে দেয়। বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্ব বা সাবেক ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর সাথে সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে এই সতর্কতা সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয়। পশ্চিমা বিশ্ব মানবাধিকার, গণতন্ত্র বা সুশাসনের নামে দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মন্তব্য করতে এলে সরকার এবং সাধারণ মানুষ উভয়ের মাঝেই এক ধরনের তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। এই প্রতিক্রিয়াটি মূলত দীর্ঘদিনের অবদমিত ক্ষোভ এবং আত্মমর্যাদাবোধের প্রকাশ। আফ্রিকান চিন্তাবিদ ফ্রানৎস ফানো (Frantz Fanon) তাঁর সুবিখ্যাত গ্রন্থ দ্য রেচেড অফ দ্য আর্থ (The Wretched of the Earth)-এ উপনিবেশ-পরবর্তী সমাজের এই মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন খুব নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর মতে, স্বাধীন হওয়ার পরও প্রাক্তন উপনিবেশগুলো মানসিকভাবে এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। তারা প্রমাণ করতে চায় যে তারা এখন আর কারো অধীনস্থ নয়। এই আত্মমর্যাদার লড়াই আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতেও স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনে যোগ দেয়া বা বিভিন্ন বৈশ্বিক জোটে সক্রিয় ভূমিকা পালনের পেছনে এই ঐতিহাসিক বঞ্চনা থেকে মুক্তি পাওয়ার এক প্রচ্ছন্ন বাসনা কাজ করে। রাষ্ট্র চায় বিশ্বমঞ্চে এমন একটি অবস্থান তৈরি করতে, যেখানে কেউ আর তাকে অবজ্ঞা করতে পারবে না। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়েই রাষ্ট্র তার ভবিষ্যৎ মিত্র নির্বাচন করে। মুক্তিযুদ্ধের সময় যেসব দেশ এই ভূখণ্ডের মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিল, তাদের প্রতি এক ধরনের ঐতিহাসিক কৃতজ্ঞতা রাষ্ট্রের নীতিতে সব সময় থেকে যায়। আবার যারা বিরোধিতা করেছিল, তাদের সাথে নতুন করে সম্পর্ক স্থাপন করতে গিয়ে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। সময়ের সাথে সাথে বাস্তবতার খাতিরে এই সমীকরণগুলোতে কিছুটা পরিবর্তন আসে ঠিকই, কিন্তু ইতিহাসের মূল পাঠ কখনো পুরোপুরি মুছে যায় না। দেশের ভেতরের রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের স্বার্থে এই ঐতিহাসিক আখ্যানগুলোকে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে ব্যবহার করে। এক দল হয়তো একটি নির্দিষ্ট পরাশক্তির সাথে ঐতিহাসিক বন্ধুত্বের কথা বলে তাদের সাথে সম্পর্ক আরও গভীর করতে চায়। অন্যদিকে আরেক দল হয়তো একই পরাশক্তির অতীত ভূমিকার সমালোচনা করে তাদের থেকে দূরে থাকার পক্ষে জনমত তৈরি করে। দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির এই ঐতিহাসিক বিভাজন অনেক সময় সুসংহত এবং ধারাবাহিক পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এরপরও, দীর্ঘ পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে বেরিয়ে আসার এই গর্বিত ইতিহাসই শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রটিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর প্রেরণা জোগায়। জনসংখ্যা, জনমিতি এবং মানবসম্পদ কোনো রাষ্ট্রের শক্তি বা দুর্বলতা মাপার অন্যতম প্রধান মাপকাঠি হলো তার জনসংখ্যা। ছোট একটি আয়তনের দেশে এত বিপুল সংখ্যক মানুষের বসবাস একদিকে যেমন বিরাট চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে এটি এক বিশাল সম্ভাবনারও দুয়ার খুলে দেয়। দেশের ভেতরে সম্পদ সীমিত, কর্মসংস্থানের সুযোগও চাহিদার তুলনায় অনেক কম। ফলে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের বাধ্য হয়েই দেশের সীমানার বাইরে তাকাতে হয়। বিশাল এই জনগোষ্ঠীকে খাওয়ানো, পরানো এবং তাদের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি করা পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান একটি লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। এই তাগিদ থেকেই শ্রম রপ্তানি এবং রেমিট্যান্স কূটনীতি এই রাষ্ট্রের বৈদেশিক সম্পর্কের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে ইউরোপ বা আমেরিকার বিভিন্ন দেশে লাখ লাখ মানুষ কাজের সন্ধানে পাড়ি জমাচ্ছে। এই বিশাল প্রবাসী জনগোষ্ঠী শুধু দেশে বৈদেশিক মুদ্রাই পাঠাচ্ছে না, তারা বহির্বিশ্বে রাষ্ট্রের একটি অনানুষ্ঠানিক দূত হিসেবেও কাজ করছে। অর্থনীতিবিদরা এই বিশাল কর্মক্ষম যুবসমাজকে জনমিতিক লভ্যাংশ (Demographic Dividend) বলে আখ্যায়িত করেন। এই লভ্যাংশকে ঠিকমতো কাজে লাগাতে পারলে যেকোনো দেশের চেহারাই বদলে দেয়া সম্ভব। বিপুল জনসংখ্যার এই চাপ কূটনৈতিক পর্যায়ে প্রতিনিয়ত এক ধরনের তাগিদ সৃষ্টি করে রাখে। বিভিন্ন দেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় শ্রমবাজার উন্মুক্ত রাখা বা নতুন শ্রমবাজার খোঁজার বিষয়টি সব সময় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়। প্রবাসী শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা করতে গিয়ে বা তাদের ওপর কোনো অন্যায় আচরণের প্রতিবাদ করতে গিয়ে রাষ্ট্রকে অনেক কঠিন কূটনৈতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। আবার যে দেশগুলোতে সবচেয়ে বেশি শ্রমিক কাজ করে, সেই দেশগুলোর অনেক অন্যায় আবদার বা রাজনৈতিক নীতির প্রকাশ্য সমালোচনা করাও এই রাষ্ট্রের পক্ষে সম্ভব হয় না। কারণ এতে করে শ্রমিকদের ফেরত পাঠিয়ে দেয়ার হুমকি তৈরি হতে পারে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য এক ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে। সমাজবিজ্ঞানী উইলিয়াম রবিনসন (William Robinson) তাঁর গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম (Global Capitalism) তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে, বিশ্বায়নের যুগে সস্তা শ্রমের সন্ধানে পুঁজি এক দেশ থেকে আরেক দেশে ছুটে বেড়ায় এবং শ্রমনির্ভর দেশগুলোকে এই কাঠামোর ভেতরেই আপস করে চলতে হয়। ফলে রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি অনেক সময় তার নিজস্ব ইচ্ছার চেয়েও এই বৈশ্বিক বাজারের চাহিদার ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এই বিশাল জনসংখ্যা সব সময় কেবল বোঝাই নয়, এটি অনেক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক দরকষাকষির একটি বড় হাতিয়ার হিসেবেও কাজ করে। বিশ্বের অনেক বড় বড় বহুজাতিক কোম্পানির কাছেই এত বিপুল মানুষের বাজার বেশ আকর্ষণীয়। তারা এখানে তাদের পণ্য বিক্রি করতে চায়, এখানে কারখানা স্থাপন করতে চায়। এই বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজারের লোভ দেখিয়ে রাষ্ট্র অনেক সময় বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অনুকূল শর্ত আদায় করে নিতে সক্ষম হয়। তাছাড়া, আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে এত বড় একটি জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি হিসেবে কোনো নেতা কথা বললে তার কথার ওজনও অনেক বেশি থাকে। জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলোতে এই রাষ্ট্র এত জোরালোভাবে কথা বলতে পারে, তার অন্যতম কারণ হলো এর পেছনে থাকা কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকার প্রশ্ন। বিশাল জনসংখ্যার এই অন্তর্নিহিত শক্তিকে সঠিক শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করা গেলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাষ্ট্রের অবস্থান আরও অনেক বেশি শক্তিশালী হওয়া সম্ভব। আপাতত এই বিপুল মানুষের চাপ সামলাতে গিয়ে কূটনীতিকে অনেক সময় খাবি খেতে হলেও, দীর্ঘমেয়াদে এটিই রাষ্ট্রের টিকে থাকার অন্যতম বড় হাতিয়ার। দুর্বল অর্থনীতি এবং অর্থনৈতিক কূটনীতি পররাষ্ট্রনীতির রূপরেখা নির্ধারণে অর্থনীতির ভূমিকা জাদুর কাঠির মতো কাজ করে। একটি দেশের পকেটে টাকা না থাকলে বিশ্বমঞ্চে তার গলার আওয়াজ স্বভাবতই নিচু থাকে। স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় ধরে এই ভূখণ্ডটি ছিল মূলত বিদেশি সাহায্য এবং অনুদাননির্ভর। বাজেটের একটি বিশাল অংশ আসত বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ বা বিভিন্ন দাতা সংস্থার কাছ থেকে। এমন একটি দুর্বল অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে স্বাধীন এবং সার্বভৌম সিদ্ধান্ত নেয়াটা প্রায় অসম্ভব একটি ব্যাপার ছিল। দাতা সংস্থাগুলো ঋণ দেয়ার সময় তার সাথে জুড়ে দিত নানা রকম কঠিন শর্ত। অর্থনীতিবিদ আমর্ত্য সেন (Amartya Sen) তাঁর বিভিন্ন লেখায় দেখিয়েছেন যে, কীভাবে এই ধরনের কাঠামোগত সমন্বয় কর্মসূচিগুলো অনেক সময় উন্নয়নশীল দেশগুলোর সাধারণ মানুষের ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলে। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা বাধ্য হতেন সেই শর্তগুলো মেনে নিতে, কারণ দেশের মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য সেই অর্থের কোনো বিকল্প ছিল না। এই সাহায্যনির্ভরতার কারণে আন্তর্জাতিক ফোরামে অনেক সময় প্রভাবশালী দাতা দেশগুলোর পক্ষে ভোট দিতে হতো বা তাদের নীতির প্রতি নীরব সমর্থন জানাতে হতো। এটি ছিল দুর্বল অর্থনীতির এক অনিবার্য এবং করুণ পরিণতি। সময়ের সাথে সাথে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। সাহায্যনির্ভরতার বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসে রাষ্ট্রটি ধীরে ধীরে বাণিজ্যের দিকে মনোযোগ দেয়। তৈরি পোশাক শিল্পের মতো রপ্তানিমুখী খাতগুলোর অভাবনীয় সাফল্যের কারণে বিশ্ববাজারে এই রাষ্ট্রের একটি নতুন পরিচয় গড়ে ওঠে। এই পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে কূটনীতির সংজ্ঞাও পাল্টে যায়। রাজনৈতিক কূটনীতির জায়গা দখল করে নেয় অর্থনৈতিক কূটনীতি (Economic Diplomacy)। এখন আর বিদেশের মাটিতে দূতাবাসগুলোর প্রধান কাজ শুধু রাজনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা নয়। তাদের এখন মূল দায়িত্ব হলো দেশের পণ্যের জন্য নতুন বাজার খোঁজা, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করা এবং রপ্তানি বাণিজ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা আদায় করা। এই বাণিজ্যনির্ভরতা রাষ্ট্রকে আগের চেয়ে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে ঠিকই, কিন্তু এর সাথে সাথে যুক্ত হয়েছে নতুন ধরনের ঝুঁকি। পশ্চিমা দেশগুলো এখন আর সরাসরি রাজনৈতিক চাপ দেয় না, তারা এখন পোশাক আমদানির ওপর শর্ত জুড়ে দিয়ে বা জিএসপি সুবিধা বাতিলের ভয় দেখিয়ে নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিল করার চেষ্টা করে। বিশ্ব বাণিজ্যের এই জটিল জালে আটকা পড়ে রাষ্ট্রকে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন কৌশল উদ্ভাবন করতে হচ্ছে। অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির সাথে সাথে প্রতিবেশীদের সাথে সম্পর্কের ধরনও পাল্টেছে। আগে যেখানে শুধু ট্রানজিট বা পানিবণ্টন নিয়ে কথা হতো, এখন সেখানে কানেক্টিভিটি, বিদ্যুৎ আমদানি এবং যৌথ বিনিয়োগের মতো বিষয়গুলো অনেক বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। রাষ্ট্র বুঝতে পেরেছে যে, বিচ্ছিন্নভাবে একা উন্নয়ন করা সম্ভব নয়। আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমেই কেবল দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করা যেতে পারে। তাত্ত্বিক রবার্ট গিলপিন (Robert Gilpin) তাঁর গ্লোবাল পলিটিক্যাল ইকোনমি (Global Political Economy) বইয়ে দেখিয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং অর্থনীতি একে অপরের পরিপূরক। অর্থ ছাড়া রাজনীতি পঙ্গু, আবার সঠিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছাড়া অর্থনীতির চাকা ঘোরানো অসম্ভব। এই উপলব্ধির কারণেই বর্তমান পররাষ্ট্রনীতিতে যেকোনো রাজনৈতিক চুক্তির আগে তার অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতির হিসাবটি সবচেয়ে বেশি কষে দেখা হয়। অর্থনীতি এখন আর শুধু দেশের ভেতরের বিষয় নয়, এটিই এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাষ্ট্রের অবস্থান নির্ধারণের সবচেয়ে শক্তিশালী মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি দুর্বল অর্থনীতি যেমন রাষ্ট্রকে আপস করতে বাধ্য করে, তেমনি একটি শক্তিশালী অর্থনীতি রাষ্ট্রকে বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে কথা বলার সাহস জোগায়। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গতিশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো যেকোনো দেশের ভেতরের রাজনৈতিক পরিবেশ বাইরের পৃথিবীর সাথে তার সম্পর্ককে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। একটি দেশের ভেতরে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকলে সেই দেশের সরকার অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসের সাথে আন্তর্জাতিক মঞ্চে দরকষাকষি করতে পারে। বিপরীতভাবে, রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত এবং অস্থিতিশীল একটি সমাজ বাইরের শক্তিগুলোর জন্য হস্তক্ষেপের এক দারুণ সুযোগ তৈরি করে দেয়। এই রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরেই চরমভাবে মেরুকৃত। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থার তীব্র অভাব রয়েছে। এই বিভাজনের সুযোগ নিয়ে বিদেশি কূটনীতিকরা অনেক সময় দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নাক গলানোর সাহস পান। তাত্ত্বিক রবার্ট পুটনাম (Robert Putnam) তাঁর বিখ্যাত টু-লেভেল গেম (Two-Level Game) তত্ত্বে চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন যে, একজন রাষ্ট্রনেতাকে একই সাথে দুটি ভিন্ন টেবিলে খেলতে হয়। একটি হলো আন্তর্জাতিক টেবিল, যেখানে সে অন্য রাষ্ট্রের সাথে দরকষাকষি করে। আরেকটি হলো দেশীয় টেবিল, যেখানে সে বিরোধী দল বা সাধারণ মানুষের কাছে সেই চুক্তির ন্যায্যতা প্রমাণ করে। দেশের ভেতরের রাজনৈতিক পরিবেশ উত্তপ্ত থাকলে আন্তর্জাতিক টেবিলে কোনো শক্ত সিদ্ধান্ত নেয়া নেতার পক্ষে সম্ভব হয় না। দেশের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগুলোর দুর্বলতাও পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি করে। একটি কার্যকর পররাষ্ট্রনীতি তৈরি করার জন্য প্রয়োজন দক্ষ আমলাতন্ত্র, শক্তিশালী থিংক ট্যাংক এবং স্বাধীন গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠান। অনেক সময়ই দেখা যায়, দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত পরিকল্পনার চেয়ে তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের দিকেই বেশি নজর দেয়া হচ্ছে। রাজনৈতিক সরকারগুলোর স্বল্পমেয়াদী চিন্তাভাবনা অনেক সময় রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থের সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ায়। কোনো একটি নির্দিষ্ট দল ক্ষমতায় এসে হয়তো একটি দেশের সাথে খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করল। পরবর্তীতে অন্য দল ক্ষমতায় এসে সেই চুক্তিগুলো বাতিল করে দিল বা সেই দেশের সাথে দূরত্ব তৈরি করল। এই ধরনের ধারাবাহিকতার অভাব বহির্বিশ্বে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তিকে চরমভাবে ক্ষুণ্ণ করে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বা বন্ধু রাষ্ট্রগুলো দীর্ঘমেয়াদী কোনো পরিকল্পনা করতে ভয় পায়, কারণ তারা জানে না যে সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে নীতি কতটা বদলে যাবে। অভ্যন্তরীণ রাজনীতির এই অস্থিরতা মূলত রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক দরকষাকষির ক্ষমতাকে ভেতর থেকেই দুর্বল করে দেয়। নাগরিক সমাজ বা সুশীল সমাজের ভূমিকাও এখানে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক যুগে পররাষ্ট্রনীতি কেবল সরকারি আমলাদের বদ্ধ কামরায় সীমাবদ্ধ নেই। মিডিয়ার অবাধ প্রবাহ এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কারণে সাধারণ মানুষ এখন বৈশ্বিক বিষয়গুলো নিয়ে অনেক বেশি সচেতন। ফিলিস্তিন সংকট থেকে শুরু করে রোহিঙ্গা ইস্যু – যেকোনো আন্তর্জাতিক ঘটনায় দেশের মানুষ খুব দ্রুত নিজেদের মতামত প্রকাশ করে। সরকার অনেক সময় সাধারণ মানুষের এই তীব্র আবেগকে অগ্রাহ্য করে বাস্তববাদী কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। দেশের ভেতরে জনরোষ তৈরি হওয়ার ভয়ে অনেক লাভজনক চুক্তি থেকেও সরকারকে পিছিয়ে আসতে হয়। সমাজবিজ্ঞানী ইয়ুর্গেন হাবারমাস (Jürgen Habermas) তাঁর পাবলিক স্ফিয়ার (Public Sphere) ধারণায় দেখিয়েছেন যে, সাধারণ মানুষের এই উন্মুক্ত আলোচনা কীভাবে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। একটি নিখুঁত পররাষ্ট্রনীতি তৈরি করার জন্য সরকারের ভেতরে বসে থাকা বিশেষজ্ঞদের যেমন প্রয়োজন, তেমনি সাধারণ মানুষের পালস বা নাড়ির স্পন্দন বোঝারও সমান প্রয়োজন রয়েছে। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মতৈক্য ছাড়া আন্তর্জাতিক মঞ্চে কোনো রাষ্ট্রই শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারে না। সামরিক শক্তি ও কৌশলগত বাধ্যবাধকতা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তববাদী দুনিয়ায় সবচেয়ে বেশি কদর পেশিশক্তির। যার হাতে অস্ত্র আছে, যে সামরিকভাবে শক্তিশালী, বিশ্বমঞ্চে তার কথাই শেষ কথা হিসেবে অনেক সময় ধরে নেয়া হয়। এই ভূখণ্ডের সামরিক শক্তি বৈশ্বিক বা আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর তুলনায় একেবারেই নগণ্য। একটি ছোট অর্থনীতি এবং বিশাল জনসংখ্যার দেশে সামরিক খাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। সরাসরি যুদ্ধ বা সামরিক হুমকির মাধ্যমে অন্য কোনো দেশের কাছ থেকে নিজেদের দাবি আদায় করার কোনো সুযোগ এই রাষ্ট্রের হাতে নেই। এই কৌশলগত দুর্বলতা রাষ্ট্রটিকে বাধ্য করে সব সময় শান্তিপূর্ণ এবং কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজতে। তাত্ত্বিক জোসেফ নাই (Joseph Nye) তাঁর সফট পাওয়ার (Soft Power) ধারণায় বলেছেন যে, সামরিক শক্তি ছাড়াও একটি রাষ্ট্র তার সংস্কৃতি, আদর্শ এবং নিয়মতান্ত্রিক আচরণের মাধ্যমে অন্যকে প্রভাবিত করতে পারে। সামরিক পেশিশক্তির অভাবে এই রাষ্ট্র মূলত সেই সফট পাওয়ারের ওপরই বেশি নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক আইন কানুন মেনে চলা এবং বিভিন্ন বৈশ্বিক ফোরামে সক্রিয় থাকার মাধ্যমে তারা নিজেদের এই ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করে। সামরিকভাবে দুর্বল হলেও রাষ্ট্রটি বেশ সুকৌশলে নিজেদের সামরিক বাহিনীকে আন্তর্জাতিক কূটনীতির একটি বড় হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তুলেছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে নিয়মিত বিপুল সংখ্যক সেনা পাঠানোর মাধ্যমে তারা বিশ্বশান্তি রক্ষায় একটি বড় ভূমিকা পালন করছে। এটি মূলত কোনো দাতব্য কাজ নয়, এর পেছনে রয়েছে গভীর কৌশলগত হিসাব-নিকাশ। এর মাধ্যমে বিশাল সামরিক বাহিনীর জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক সরঞ্জাম কেনা এবং তাদের প্রশিক্ষণের ব্যয়ভার মেটানো সম্ভব হচ্ছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের সামরিক বাহিনীর একটি যথেষ্ট ইতিবাচক এবং পেশাদার ভাবমূর্তি তৈরি হচ্ছে। এই ইতিবাচক ভাবমূর্তির কারণে বড় বড় সামরিক শক্তিগুলোও এই রাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সাথে যৌথ মহড়া এবং প্রশিক্ষণ বিনিময় কর্মসূচিতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। এর ফলে সরাসরি কোনো সামরিক জোটে যোগ না দিয়েও রাষ্ট্রটি পরোক্ষভাবে পরাশক্তিগুলোর সাথে এক ধরনের পেশাদার সামরিক সম্পর্ক বজায় রাখতে সক্ষম হয়। এটি দুর্বল রাষ্ট্রের টিকে থাকার এক চমৎকার কৌশল, যেখানে নিজের দুর্বলতাকেই শক্তিতে পরিণত করার চেষ্টা করা হয়। কৌশলগত এই বাধ্যবাধকতা অনেক সময় চরম অস্বস্তিরও জন্ম দেয়। প্রতিবেশী দেশে কোনো সামরিক অভ্যুত্থান ঘটলে বা সীমান্তে বিনা প্ররোচনায় গুলি চললে দেশের সাধারণ মানুষ চরম ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। তারা দাবি করে যে রাষ্ট্র যেন এর একটি শক্ত সামরিক জবাব দেয়। নীতিনির্ধারকরা জানেন যে, সামরিক সংঘাতে জড়ালে তা দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতির জন্য কত বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে। অনেক উসকানির মুখেও সামরিক বাহিনীকে ব্যারাকে আটকে রেখে কেবল কড়া প্রতিবাদলিপি পাঠানোর মধ্যেই রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া সীমাবদ্ধ রাখতে হয়। এই পরিস্থিতি সাধারণ মানুষের মনে এক ধরনের হতাশার জন্ম দেয় ঠিকই, কিন্তু বৃহত্তর রাষ্ট্রীয় স্বার্থের কথা চিন্তা করে এই চরম ধৈর্য ধারণ করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। রিচার্ড রোজক্রান্স তাঁর লেখায় দেখিয়েছেন যে, আধুনিক বিশ্বে ট্রেডিং স্টেট বা বাণিজ্যনির্ভর রাষ্ট্রগুলো সাধারণত সামরিক সংঘাত এড়িয়ে চলে, কারণ যুদ্ধ বাণিজ্যের সবচেয়ে বড় শত্রু (Rosecrance, 1986)। এই রাষ্ট্রটিও মূলত একটি ট্রেডিং স্টেটের ভূমিকাই পালন করে যাচ্ছে, যেখানে সামরিক শৌর্যবীর্যের চেয়ে অর্থনৈতিক নিরাপত্তাই বেশি প্রাধান্য পায়। পরাশক্তির মেরুকরণ এবং পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থা পররাষ্ট্রনীতির নির্ধারকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পরিবর্তনশীল এবং অণুমেয় বিষয়টি হলো বৈশ্বিক বিশ্বব্যবস্থা। বিশ্বরাজনীতি কোনো স্থির বিষয় নয়, এটি প্রতিনিয়ত রূপ বদলায়। স্নায়ুযুদ্ধের সময় এক ধরনের সমীকরণ ছিল, আর এখনকার বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বে সমীকরণ সম্পূর্ণ ভিন্ন। চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে এক নীরব স্নায়ুযুদ্ধ চলছে, তার ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে এই বদ্বীপের তীরেও। চীন তার বিপুল পরিমাণ উদ্বৃত্ত পুঁজি নিয়ে এই অঞ্চলে বিশাল সব অবকাঠামোগত প্রকল্পে বিনিয়োগ করছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্ররা চীনের এই ক্রমবর্ধমান প্রভাব ঠেকানোর জন্য নানা ধরনের কৌশলগত উদ্যোগ নিচ্ছে। এই দুই বিশাল হাতির লড়াইয়ের মাঝখানে পড়ে ছোট রাষ্ট্রগুলোর অবস্থা অনেক সময় ঘাসের মতো হয়ে যায়। তাত্ত্বিক জন মেয়ারশাইমার (John Mearsheimer) তাঁর আক্রমণাত্মক বাস্তববাদ (Offensive Realism) তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে, পরাশক্তিগুলো সব সময় অন্য অঞ্চলে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করে এবং ছোট রাষ্ট্রগুলোকে সেই ক্ষমতার খেলায় গুটি হিসেবে ব্যবহার করে। এই ভূখণ্ডটিও এখন সেই বৈশ্বিক দাবার বোর্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ গুটিতে পরিণত হয়েছে। এই প্রবল বৈশ্বিক মেরুকরণের মাঝে টিকে থাকার জন্য রাষ্ট্রটিকে প্রতিনিয়ত হেজিং (Hedging) কৌশল ব্যবহার করতে হচ্ছে। এর মানে হলো, কোনো একটি পক্ষের সাথে পুরোপুরি জোট না বেঁধে সবার সাথে একটি ভারসাম্যপূর্ণ দূরত্ব বজায় রাখা। চীনের কাছ থেকে সেতু বা টানেল বানানোর জন্য ঋণ নেয়া হচ্ছে, আবার একই সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্যের পরিমাণ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। রাশিয়ার সহযোগিতায় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি হচ্ছে, আবার ভারতের সাথেও কানেক্টিভিটি বাড়ানোর প্রকল্প চলছে। সবার সাথে একসাথে তাল মিলিয়ে চলার এই চেষ্টা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ একটি কাজ। যেকোনো এক পক্ষের সামান্য সন্দেহই বড় ধরনের ভূ-রাজনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। পরাশক্তিগুলো সব সময় চায় যে ছোট রাষ্ট্রগুলো প্রকাশ্যে তাদের পক্ষ নিক। তারা নানা রকম অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে ছোট রাষ্ট্রগুলোকে নিজেদের বলয়ে ঢোকানোর চেষ্টা করে। নীতিনির্ধারকরা জানেন যে, একবার কারো ব্লকে ঢুকে পড়লে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা চিরতরে হারিয়ে যাবে। আগামী দিনের বিশ্বব্যবস্থা হয়তো আরও অনেক বেশি জটিল আকার ধারণ করবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো নতুন নতুন ইস্যুগুলো বৈশ্বিক সমীকরণকে প্রতিনিয়ত নতুন করে সংজ্ঞায়িত করছে। এই দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা ধরে রাখাটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। অতীতের কোনো বাধা ধরা নিয়ম দিয়ে এখন আর পররাষ্ট্রনীতি চালানো সম্ভব নয়। রাষ্ট্রকে যথেষ্ট নমনীয় হতে হবে এবং পরিস্থিতির সাথে সাথে দ্রুত নিজেদের কৌশল পরিবর্তন করার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। এতসব সীমাবদ্ধতা এবং চাপের মুখেও এই ভূখণ্ডটি যেভাবে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের একটি স্থান করে নিয়েছে, তা সত্যিই বিষ্ময়কর। বিশাল জনসংখ্যা, দুর্বল অর্থনীতি এবং ভূগোলের বন্দিদশাকে নিয়তি হিসেবে মেনে না নিয়ে, সেগুলোর ভেতরে থেকেই টিকে থাকার নতুন নতুন পথ খোঁজার এই নিরন্তর সংগ্রামই মূলত এখানকার পররাষ্ট্রনীতির আসল সৌন্দর্য। বাণিজ্যনির্ভরতা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মেরুকরণ যেকোনো দেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি শক্ত অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক ভিত্তি থাকে। একটি দালান যেমন তার পিলারের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, কূটনীতিও তেমনি তার অভ্যন্তরীণ সক্ষমতার ওপর ভর করে বিশ্বমঞ্চে কথা বলে। এই ভূখণ্ডের পররাষ্ট্রনীতির অর্থনৈতিক ভিত্তি মূলত তৈরি পোশাক রপ্তানি এবং লাখ লাখ প্রবাসী শ্রমিকের পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপর শক্তভাবে দাঁড়িয়ে আছে। তাত্ত্বিক রবার্ট গিলপিন (Robert Gilpin) তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ গ্লোবাল পলিটিক্যাল ইকোনমি (Global Political Economy)-এ বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং অর্থনীতি একে অপরের সম্পূর্ণ পরিপূরক। অর্থনীতির চাকা সচল রাখার জন্যই রাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে শ্রমবাজার নিয়ে এবং পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে শুল্কমুক্ত বাণিজ্য নিয়ে প্রতিনিয়ত স্নায়ুক্ষয়ী দরকষাকষি করতে হয়। এই দুটি খাতের ওপর রাষ্ট্র এতটাই নির্ভরশীল যে, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে সামান্য কোনো মন্দা দেখা দিলে দেশের ভেতরের সামাজিক কাঠামোতে বড় ধরনের ফাটল ধরার শঙ্কা তৈরি হয়। অন্যদিকে, পররাষ্ট্রনীতির রাজনৈতিক ভিত্তিটি দেশের অভ্যন্তরীণ মেরুকরণের কারণে বেশ নাজুক এবং ভঙ্গুর। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থার তীব্র অভাবের কারণে অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা ভীষণ কঠিন হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক সরকারের পালাবদল হলে অনেক সময় পররাষ্ট্রনীতিতেও এক ধরনের দৃশ্যমান এবং আকস্মিক পরিবর্তন আসে। এক দল ক্ষমতায় এসে হয়তো কোনো নির্দিষ্ট পরাশক্তির সাথে খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করল। পরবর্তীতে অন্য দল ক্ষমতায় এসে সেই চুক্তিগুলো বাতিল করে দিল বা সেই দেশের সাথে এক ধরনের কূটনৈতিক দূরত্ব তৈরি করল। এই ধরনের ধারাবাহিকতার অভাব বহির্বিশ্বে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তিকে চরমভাবে ক্ষুণ্ণ করে। একটি স্থিতিশীল এবং ঐকমত্যভিত্তিক রাজনৈতিক কাঠামো ছাড়া আন্তর্জাতিক ফোরামে জোরালো অবস্থান তৈরি করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। দেশের ভেতরের এই রাজনৈতিক বিভাজন অনেক সময় বিদেশি কূটনীতিকদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার এক অনাকাঙ্ক্ষিত সুযোগ তৈরি করে দেয়, যা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে পরোক্ষভাবে দুর্বল করে। পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া (Foreign policy formulation process) আমলাতন্ত্র ও নীতি নির্ধারণের জটিল রসায়ন একটি রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ঠিক কীভাবে তৈরি হয়, সেই প্রশ্নটি অনেকের মনেই জাগতে পারে। বাইরে থেকে তাকালে পুরো বিষয়টিকে বেশ সরল মনে হওয়াটা স্বাভাবিক। সাধারণ চোখে মনে হতে পারে, দেশের শীর্ষ নেতারা হয়তো কোনো এক সকালে ঘুম থেকে উঠে স্থির করলেন আজ থেকে অমুক দেশের সাথে সম্পর্ক ভালো করা হবে। বাস্তবে রাষ্ট্র পরিচালনার হিসাব-নিকাশ এত সহজ বা সরলরৈখিক পথে হাঁটে না। পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন মূলত একটি দীর্ঘমেয়াদী এবং বহুমাত্রিক আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে সাধারণত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবস্থান করে, তবে তারা একা কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে প্রতিনিয়ত আসা তথ্যের ভিত্তিতে একটি নীতির প্রাথমিক খসড়া তৈরি করা হয়। প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী গ্রাহাম অ্যালিসন (Graham Allison) তাঁর আলোড়ন সৃষ্টিকারী গ্রন্থ এসেন্স অফ ডিসিশন (Essence of Decision)-এ দেখিয়েছেন, রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তগুলো কোনো একক ব্যক্তির চিন্তার ফসল নয়। এগুলো মূলত বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের মধ্যকার দীর্ঘ দরকষাকষি এবং ছাড় দেওয়ার চূড়ান্ত রূপ (Allison, 1971)। তিনি এই কাঠামোটিকে আমলাতান্ত্রিক রাজনীতি মডেল (Bureaucratic Politics Model) হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। যেকোনো চুক্তি স্বাক্ষরের আগে আমলারা এর আইনি, অর্থনৈতিক এবং নিরাপত্তা বিষয়ক ঝুঁকিগুলো চুলচেরা বিশ্লেষণ করেন। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে অনেক সময় মতবিরোধ দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় হয়তো কোনো একটি দেশের সাথে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির পক্ষে শক্ত অবস্থান নিল। অন্যদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো হয়তো ওই একই দেশের সাথে ভিসামুক্ত চলাচলের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার কারণে বাধা হয়ে দাঁড়াল। এই ধরনের আন্তঃমন্ত্রণালয় দ্বন্দ্ব নিরসন করে একটি অভিন্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে যথেষ্ট সময় ও কাঠখড় পোড়াতে হয়। এই আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় তথ্যের প্রবাহ অনেক বড় একটি ভূমিকা রাখে। বিদেশের মাটিতে থাকা দূতাবাসগুলো থেকে প্রতিনিয়ত যে গোপন তারবার্তা বা রিপোর্ট আসে, তার ওপর ভিত্তি করেই মূলত নীতির খসড়াগুলো তৈরি হয়। রাষ্ট্রদূতরা কেবল দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন না, তারা রাষ্ট্রের চোখ এবং কান হিসেবেও কাজ করেন। তাদের পাঠানো বিশ্লেষণ কোনো কারণে ভুল বা পক্ষপাতদুষ্ট হলে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তও ভুল পথে এগোতে বাধ্য। তাত্ত্বিক রবার্ট পুটনাম (Robert Putnam) তাঁর দ্বি-স্তর বিশিষ্ট খেলা (Two-Level Game) তত্ত্বে ব্যাখ্যা করেছেন, একজন নীতিনির্ধারককে একই সাথে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক ফ্রন্টে ভারসাম্য রক্ষা করে চলতে হয়। আমলাতন্ত্রের কাজ হলো সেই ভারসাম্যের বাস্তবসম্মত রূপরেখাটি তৈরি করে দেওয়া। অনেক সময় দেখা যায়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষজ্ঞরা কোনো একটি দেশের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী ছক তৈরি করেছেন। সাময়িক রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে সেই ছক বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না। পেশাদার কূটনীতিকদের চিন্তাভাবনার সাথে রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার এই সংঘাত উন্নয়নশীল দেশগুলোর পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নের একটি সাধারণ দৃশ্য। এরপরও, যেকোনো আন্তর্জাতিক চুক্তির খসড়া তৈরি থেকে শুরু করে তা চূড়ান্ত স্বাক্ষর হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে আমলাতান্ত্রিক দক্ষতার কোনো বিকল্প নেই। আমলারাই মূলত রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থের প্রাতিষ্ঠানিক পাহারাদার হিসেবে কাজ করেন। শীর্ষ নেতৃত্ব এবং রাজনৈতিক দর্শনের প্রভাব আমলাতন্ত্র যতই শক্তিশালী হোক না কেন, যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক নীতির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাবিকাঠি থাকে রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতৃত্বের হাতে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর চেয়ে সরকারপ্রধানের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক দর্শন এবং পছন্দ-অপছন্দ অনেক বেশি প্রভাব বিস্তার করে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মার্গারেট হারম্যান (Margaret Hermann) তাঁর বিভিন্ন গবেষণায় দেখিয়েছেন, একজন নেতার মনস্তত্ত্ব, তার অতীত অভিজ্ঞতা এবং তার বিশ্ববোধ কীভাবে একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতিকে পুরোপুরি পাল্টে দিতে পারে (Hermann, 1980)। একজন নেতা জন্মগতভাবে সন্দেহপ্রবণ হলে তিনি প্রতিবেশী বা পরাশক্তিগুলোর যেকোনো প্রস্তাবকেই ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখবেন। বিপরীতভাবে, একজন নেতা মুক্ত বাণিজ্যে বিশ্বাসী হলে তিনি ঝুঁকি নিয়ে হলেও নতুন নতুন দেশের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের উদ্যোগ নেবেন। বদ্বীপ অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোর ক্ষেত্রেও সরকারপ্রধানের ভূমিকা বেশ নির্ণায়ক। প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর কার্যালয়ই মূলত পররাষ্ট্রনীতির গতিপথ নির্ধারণের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। অনেক সময় এমনও দেখা যায়, কোনো গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে পুরো মন্ত্রিসভার মতামতের চেয়েও প্রধানমন্ত্রীর দু-একজন ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টার পরামর্শ বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। এই ধরনের কেন্দ্রীভূত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অনেক সময় দ্রুত কাজ হয়। দীর্ঘমেয়াদে এতে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা তৈরি হওয়ার একটা শঙ্কা থেকে যায়। নেতৃত্বের এই প্রভাবটি সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয় সংকটকালীন মুহূর্তে। কোনো আন্তর্জাতিক সম্মেলন বা দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে সরকারপ্রধানের শারীরিক উপস্থিতি এবং শারীরিক ভাষা অনেক সময় বড় বড় চুক্তির ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়। একজন ক্যারিশম্যাটিক নেতা ব্যক্তিগত সম্পর্কের জাদুতে এমন অনেক সুবিধা আদায় করে নিতে পারেন, যা সাধারণ আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বছরের পর বছর ঝুলে থাকত। তবে এই ব্যক্তি-কেন্দ্রিক নীতির কিছু নেতিবাচক দিকও রয়েছে। সরকার পরিবর্তন হলে আগের সরকারের নেওয়া অনেক ভালো কূটনৈতিক উদ্যোগও অনেক সময় স্রেফ রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে বাতিল হয়ে যায়। তাত্ত্বিক পরিভাষায় একে নীতির ধারাবাহিকতার অভাব (Lack of Policy Continuity) বলা হয়। একটি নতুন রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসার পর তারা তাদের নিজেদের ইশতেহার অনুযায়ী পররাষ্ট্রনীতি ঢেলে সাজানোর চেষ্টা করে। তারা আগের সরকারের মিত্র দেশগুলোর সাথে দূরত্ব তৈরি করে সম্পূর্ণ নতুন কোনো জোটের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে। এই ধরনের ঘন ঘন নীতি বদলের কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাষ্ট্রটি তার বিশ্বাসযোগ্যতা হারাতে থাকে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ করতে ভয় পান, কারণ পরবর্তী সরকারের নীতি কী হবে তা নিয়ে তাদের মনে ধোঁয়াশা থাকে। তাই একটি পরিণত এবং সফল পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নের জন্য শীর্ষ নেতৃত্বের ইচ্ছার পাশাপাশি একটি শক্তিশালী এবং স্বাধীন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভারসাম্য থাকা জরুরি। আইনসভার ভূমিকা এবং জবাবদিহিতার ঘাটতি একটি আদর্শ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের যেকোনো বড় সিদ্ধান্তে আইনসভার বা সংসদের একটি শক্তিশালী ভূমিকা থাকার কথা। অন্য কোনো দেশের সাথে কোনো গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষর, সামরিক জোটে অংশগ্রহণ বা যুদ্ধ ঘোষণার মতো বিষয়গুলোতে সংসদের অনুমোদন নেওয়াটা অলিখিত নিয়ম হিসেবে ধরা হয়। বদ্বীপের বাস্তবতায় পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে আইনসভার ভূমিকা বেশ সীমিত এবং অনেকাংশেই আনুষ্ঠানিক। তাত্ত্বিক কেনেথ ওয়াল্টজ (Kenneth Waltz) তাঁর বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন, আন্তর্জাতিক রাজনীতির নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির কারণে রাষ্ট্রগুলো সাধারণত পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে নির্বাহী বিভাগকে অনেক বেশি ক্ষমতা দিয়ে রাখে (Waltz, 1979)। সংকটকালীন মুহূর্তে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে, আর সংসদে লম্বা বিতর্কের জন্য সেই সময় সবসময় পাওয়া যায় না। তারপরও, উন্নত গণতন্ত্রগুলোতে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো সরকারের বৈদেশিক নীতির ওপর কড়া নজরদারি রাখে। তারা প্রয়োজনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বা রাষ্ট্রদূতদের তলব করে বিভিন্ন চুক্তির বিস্তারিত জানতে চায়। এখানকার সংসদীয় কমিটিগুলোর সেই ধরনের কার্যকর ক্ষমতা বা সদিচ্ছা কোনোটিই খুব একটা চোখে পড়ে না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, সরকার কোনো চুক্তি সই করে ফেলার পর সংসদে তা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এই জবাবদিহিতার ঘাটতির একটি বড় কারণ হলো রাজনৈতিক দলের ভেতরের সংস্কৃতির অভাব। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকার কারণে সরকারি দল যেকোনো চুক্তি সহজেই পাস করিয়ে নিতে পারে। বিরোধী দলগুলো চুক্তির খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ না করেই কেবল বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা করে। তারা রাজপথে নেমে চুক্তি বাতিলের দাবিতে স্লোগান দেয়, কিন্তু সংসদে দাঁড়িয়ে তথ্য ও যুক্তিনির্ভর কোনো বিকল্প প্রস্তাব হাজির করতে ব্যর্থ হয়। এর ফলে পররাষ্ট্রনীতির মতো একটি স্পর্শকাতর বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে কোনো অর্থবহ বিতর্ক তৈরি হয় না। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জেমস ফিয়ারন (James Fearon) তাঁর অডিয়েন্স কস্ট (Audience Cost) তত্ত্বে উল্লেখ করেছেন, দেশের ভেতরের সাধারণ মানুষ বা আইনসভার চাপ কীভাবে আন্তর্জাতিক দরকষাকষিতে নেতার ক্ষমতা বাড়ায় বা কমায় (Fearon, 1994)। সংসদে কোনো চুক্তির ব্যাপারে শক্তিশালী আপত্তি থাকলে, নেতা সেই আপত্তির কথা বলে বিদেশি রাষ্ট্রের কাছ থেকে বাড়তি সুবিধা আদায় করে নিতে পারেন। আইনসভা রাবার স্ট্যাম্পের মতো কাজ করলে নেতার সেই দরকষাকষির সুবিধাটি আর থাকে না। পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে আইনসভাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার এই প্রবণতা রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত স্বার্থকেই দুর্বল করে দেয়। এতে নীতির পেছনে ব্যাপকভিত্তিক জাতীয় ঐকমত্য তৈরি হওয়ার সুযোগ নষ্ট হয়। বুদ্ধিবৃত্তিক রসদ এবং থিংক ট্যাংকের ক্রমবর্ধমান প্রভাব একটা সময় ছিল, পররাষ্ট্রনীতি তৈরি হতো কেবল মন্ত্রণালয়ের চার দেয়ালের ভেতরে বসে থাকা কয়েকজন কর্মকর্তার মস্তিষ্কপ্রসূত ধারণা থেকে। আধুনিক বিশ্ব অনেক বেশি জটিল এবং বহুমাত্রিক। জলবায়ু পরিবর্তন, সাইবার নিরাপত্তা বা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মতো বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করার জন্য গভীর জ্ঞান এবং গবেষণার প্রয়োজন হয়। সাধারণ আমলাদের কাছে সবসময় সেই বিশেষায়িত জ্ঞান থাকে না। এই শূন্যতা পূরণের জন্যই মূলত থিংক ট্যাংক বা গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্ভব হয়েছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (BIISS)-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো নীতি নির্ধারণে একটি বড় ভূমিকা পালন করতে শুরু করেছে। সমাজবিজ্ঞানী ইয়ুর্গেন হাবারমাস (Jürgen Habermas) তাঁর পাবলিক স্ফিয়ার (Public Sphere) ধারণায় দেখিয়েছেন, স্বাধীন বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা কীভাবে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। থিংক ট্যাংকগুলো সেই স্বাধীন আলোচনার একটি আধুনিক রূপ। তারা বিভিন্ন দেশের সাথে সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি, নতুন বাজারের সম্ভাবনা এবং ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি নিয়ে নিয়মিত গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সরকারের নীতিনির্ধারকরা অনেক সময় সরাসরি এই প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে পরামর্শ গ্রহণ করেন বা তাদের সুপারিশের ভিত্তিতে নতুন কোনো নীতির খসড়া তৈরি করেন। এই গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি বড় সুবিধা হলো, এরা সরকারের সরাসরি অংশ না হওয়ায় অনেক বেশি স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারে। আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্য থেকে মুক্ত থেকে দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত পরিকল্পনা তৈরি করা তাদের পক্ষে সহজ হয়। সরকার অনেক সময় প্রতিবেশী কোনো দেশের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য ‘ট্র্যাক টু’ (Track II) বা অনানুষ্ঠানিক কূটনীতির আশ্রয় নেয়। এই ট্র্যাক টু কূটনীতিতে সাধারণত সাবেক কূটনীতিক, অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা এবং থিংক ট্যাংকের গবেষকরা অংশ নেন। তারা পর্দার আড়ালে বসে কঠিন সমস্যাগুলোর একটি সম্ভাব্য সমাধান খোঁজার চেষ্টা করেন। তাদের সেই অনানুষ্ঠানিক আলোচনার ওপর ভিত্তি করেই পরে আনুষ্ঠানিক চুক্তিগুলো হয়। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে থিংক ট্যাংকগুলোর নিজস্ব কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই এরা ফান্ডের জন্য সরকার বা বিদেশি দাতা সংস্থাগুলোর ওপর নির্ভরশীল থাকে। তাত্ত্বিক রবার্ট কক্স (Robert Cox) তাঁর সমালোচনামূলক তত্ত্ব (Critical Theory)-এ দেখিয়েছেন, জ্ঞান সবসময়ই কারো না কারো স্বার্থে তৈরি হয়। একটি থিংক ট্যাংক পুরোপুরি সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকলে তারা স্বাধীন গবেষণার বদলে কেবল সরকারের নেওয়া নীতিগুলোর যৌক্তিকতা প্রমাণের কাজেই বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ে। পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নের মতো একটি জটিল প্রক্রিয়ায় কেবল আমলাদের ওপর নির্ভর না করে বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়ার এই সংস্কৃতি রাষ্ট্রের জন্য একটি ইতিবাচক পরিবর্তন। অভ্যন্তরীণ জনমত এবং গণমাধ্যমের প্রভাব গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষের মতামত বা জনমতের একটি বিশাল শক্তি থাকে। এই শক্তি অনেক সময় সরকারের যেকোনো সুপরিকল্পিত নীতিকেও উল্টে দিতে পারে। বিশেষ করে পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে, কোনো একটি দেশের প্রতি সাধারণ মানুষের আবেগ বা ক্ষোভ তীব্র হলে সরকার সেই আবেগকে পাশ কাটিয়ে সহজে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক নির্ধারণের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্ব একটি বড় নির্ধারক হিসেবে কাজ করে। সীমান্তে কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটলে বা নদীর পানিবণ্টন নিয়ে কোনো সমস্যা তৈরি হলে দেশের ভেতরে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। সাংবাদিক এবং তাত্ত্বিক ওয়াল্টার লিপম্যান (Walter Lippmann) অনেক আগেই দেখিয়েছেন, সাধারণ মানুষ সরাসরি ঘটনাগুলো দেখে না। তারা মিডিয়ার তৈরি করা ‘পিকচারস ইন আওয়ার হেডস’ বা কাল্পনিক চিত্রের ওপর ভিত্তি করে নিজেদের মতামত তৈরি করে। বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং চব্বিশ ঘণ্টার সংবাদ চ্যানেলগুলো এই জনমত তৈরির প্রক্রিয়াটিকে আরও অনেক বেশি গতিশীল এবং শক্তিশালী করে তুলেছে। একটি ছোট ঘটনাও মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে গিয়ে সরকারের ওপর বিশাল এক মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করতে পারে। সরকার অনেক সময় এই জনমতের ভয়ে বাস্তবসম্মত কোনো কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে পিছিয়ে আসে। কোনো একটি দেশের সাথে ট্রানজিট চুক্তি করাটা অর্থনীতির জন্য লাভজনক হলেও, বিরোধী দলগুলো মিডিয়ার মাধ্যমে প্রচার করতে পারে যে এই চুক্তি দেশের সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দেবে। সাধারণ মানুষ সেই প্রচারে প্রভাবিত হয়ে গেলে সরকার ভোটের হিসাব কষে সেই চুক্তি আর সই করার সাহস পায় না। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিভাষায় একে জনতুষ্টিবাদ (Populism)-এর প্রভাব বলা যেতে পারে। রাজনৈতিক নেতারা নিজেরাই ইচ্ছে করে কোনো দেশের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক কথা বলে সস্তা জনপ্রিয়তা আদায়ের চেষ্টা করেন। এটি পরে দীর্ঘমেয়াদী কূটনীতির জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়ায়। আবার এর উল্টো দিকও আছে। সরকার নিজেই মিডিয়া ব্যবহার করে কোনো একটি চুক্তির পক্ষে জনমত তৈরি করার চেষ্টা করে। তারা বিভিন্ন টক শো বা প্রবন্ধের মাধ্যমে বোঝানোর চেষ্টা করে, তাদের নেওয়া সিদ্ধান্তটিই দেশের জন্য সবচেয়ে সেরা। আধুনিক যুগে পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন প্রক্রিয়াটি আর কেবল আমলাদের ফাইলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি মূলত গণমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষের আবেগ নিয়ন্ত্রণের এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। অর্থনৈতিক স্বার্থগোষ্ঠী এবং কর্পোরেট প্রভাব অর্থনীতি এবং কূটনীতি একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে আর কেবল রাজনৈতিক বা সামরিক হিসাব-নিকাশ কাজ করে না। এর সাথে খুব গভীরভাবে যুক্ত থাকে বড় বড় ব্যবসায়ী এবং কর্পোরেট গোষ্ঠীগুলোর স্বার্থ। এই ভূখণ্ডের অর্থনীতি মূলত তৈরি পোশাক রপ্তানির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এই খাতের ব্যবসায়ীদের একটি বিশাল প্রভাব রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে রয়েছে। তাত্ত্বিক উইলিয়াম রবিনসন (William Robinson) তাঁর গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম (Global Capitalism) তত্ত্বে দেখিয়েছেন, বহুজাতিক পুঁজি এবং স্থানীয় পুঁজিপতিরা কীভাবে রাষ্ট্রের নীতিগুলোকে নিজেদের অনুকূলে ঘুরিয়ে নেয় (Robinson, 2004)। দেশের সরকার বিদেশের কোনো বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার আদায়ের জন্য আলোচনা করতে গেলে পর্দার আড়ালে মূলত এই ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলোই কলকাঠি নাড়ে। তারা সরকারকে চাপ দেয় নির্দিষ্ট কিছু দেশের সাথে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) স্বাক্ষর করার জন্য। এতে তাদের কাঁচামাল আমদানি এবং পণ্য রপ্তানি করতে সুবিধা হয়। অনেক সময় দেখা যায়, সরকারের বাণিজ্য প্রতিনিধিদলে মন্ত্রীদের চেয়েও ব্যবসায়ীদের সংখ্যা এবং প্রভাব অনেক বেশি থাকে। এটি মূলত একটি বাণিজ্যনির্ভর রাষ্ট্রের অনিবার্য নিয়তি। এই অর্থনৈতিক স্বার্থগোষ্ঠীগুলোর প্রভাব সবসময় কেবল ইতিবাচক হয় না। তাদের একচেটিয়া আধিপত্যের কারণে রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থ অনেক সময় ক্ষুণ্ণ হয়। কোনো একটি দেশের সাথে এমন কোনো চুক্তি করা প্রয়োজন যা সাধারণ ভোক্তাদের জন্য লাভজনক। কিছু স্থানীয় শিল্পপতির ব্যবসার ক্ষতি হবে বলে তারা সেই চুক্তির তীব্র বিরোধিতা শুরু করতে পারে। তাদের রাজনৈতিক এবং আর্থিক পেশিশক্তির কারণে সরকার সেই চুক্তি থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়। বিভিন্ন দেশের সাথে বড় বড় মেগা প্রকল্প বা অবকাঠামো নির্মাণের চুক্তির ক্ষেত্রেও অনেক সময় অস্বচ্ছতা দেখা যায়। বিদেশি কোম্পানিগুলো স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোর সাথে আঁতাত করে এমন সব শর্তে কাজ বাগিয়ে নেয়, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। রাষ্ট্রীয় নীতির ওপর ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থের প্রচ্ছন্ন আধিপত্যকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তাত্ত্বিকরা কর্পোরেট দখল (Corporate Capture) বলে আখ্যায়িত করেন। একটি সফল এবং জনকল্যাণমুখী পররাষ্ট্রনীতি তৈরি করতে হলে সরকারকে এই অর্থনৈতিক স্বার্থগোষ্ঠীগুলোর প্রভাব থেকে নিজেকে কিছুটা হলেও স্বাধীন রাখতে হয়। তা না হলে রাষ্ট্রের কূটনীতি মূলত গুটিকয়েক ব্যবসায়ীর মুনাফা অর্জনের হাতিয়ারে পরিণত হবে। জাতীয় ক্ষমতার উপাদানসমূহ (Factors of National Power) ভূগোল এবং ভূ-রাজনৈতিক কৌশলগত সুবিধা বিশ্বরাজনীতির দাবার বোর্ডে কোনো রাষ্ট্র কোথায় বসবে, তা অনেকখানি নির্ভর করে তার ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর। একটি দেশের মানচিত্রের দিকে তাকালে তার ভবিষ্যৎ ক্ষমতার অনেক কিছুই আঁচ করা যায়। বদ্বীপ অঞ্চলের এই ভূখণ্ডের দৃশ্যমান ক্ষমতার সবচেয়ে বড় এবং অপরিবর্তনীয় উপাদান হলো এর ভূগোল। দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ঠিক মাঝখানে একটি সংযোগকারী সেতু হিসেবে এর অবস্থান। একপাশে রয়েছে বিশাল স্থলভাগ, আর অন্যদিকে বঙ্গোপসাগরের উন্মুক্ত জলরাশি। এই অনন্য অবস্থানের কারণে পরাশক্তিগুলোর কাছে ভূখণ্ডটির কৌশলগত কদর দিন দিন বাড়ছে। প্রখ্যাত সামরিক কৌশলবিদ আলফ্রেড থায়ার মাহান (Alfred Thayer Mahan) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ দ্য ইনফ্লুয়েন্স অফ সি পাওয়ার আপন হিস্ট্রি (The Influence of Sea Power upon History)-এ দেখিয়েছেন, সমুদ্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারাই হলো বিশ্বরাজনীতিতে ক্ষমতা বিস্তারের মূল চাবিকাঠি (Mahan, 1890)। বঙ্গোপসাগরের তীরের এই ভূখণ্ডটি প্রাকৃতিকভাবেই সেই সামুদ্রিক ক্ষমতার এক বিরাট অংশীদার হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। এশিয়ার উঠতি অর্থনৈতিক শক্তিগুলোর পণ্য পরিবহনের প্রধান রুটগুলো এই সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক দরকষাকষির টেবিলে এই ভৌগোলিক অবস্থানই রাষ্ট্রটিকে বাড়তি সুবিধা এনে দেয়। পরাশক্তিগুলো চাইলেও এই ভূখণ্ডকে পাশ কাটিয়ে এই অঞ্চলে নিজেদের নিরঙ্কুশ আধিপত্য কায়েম করতে পারে না। ভূগোলের এই আশীর্বাদ অনেক সময় আবার বড় ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপেরও জন্ম দেয়। তিন দিক থেকে একটি বিশাল প্রতিবেশী রাষ্ট্র দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকার কারণে সব সময় এক ধরনের সতর্কতা বজায় রাখতে হয়। তাত্ত্বিক নিকোলাস স্পাইকম্যান (Nicholas Spykman) তাঁর রিমল্যান্ড তত্ত্ব (Rimland Theory)-এ ব্যাখ্যা করেছেন, সমুদ্র তীরবর্তী প্রান্তিক অঞ্চলগুলোই মূলত বিশ্বরাজনীতির আসল নিয়ন্ত্রক (Spykman, 1944)। এই রিমল্যান্ড বা প্রান্তিক অঞ্চলে অবস্থান করার কারণেই রাষ্ট্রটি বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। চীন, যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতের মতো দেশগুলো এই অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের জন্য নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এই ত্রিমুখী আকর্ষণের কেন্দ্রে থাকার কারণে রাষ্ট্রটি কোনো সামরিক জোটের অংশ না হয়েও বিশ্বরাজনীতিতে ব্যাপক গুরুত্ব লাভ করে। সহজ করে বললে, ভূখণ্ডটি তার নিজের জায়গা থেকে এক ইঞ্চিও নড়তে পারে না ঠিকই, কিন্তু এই স্থির অবস্থানটাই তার সবচেয়ে বড় শক্তি। নিজেদের ভৌগোলিক দুর্বলতাকে কীভাবে কূটনৈতিক শক্তিতে পরিণত করতে হয়, সেটি এই রাষ্ট্রের টিকে থাকার ইতিহাসের সবচেয়ে শিক্ষণীয় দিক। ট্রানজিট, বন্দর সুবিধা কিংবা গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের মতো বিষয়গুলো মূলত এই ভৌগোলিক ক্ষমতারই একেকটি সফল ব্যবহার। একটি কার্যকর পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারকদের সব সময় এই ভূগোলের কথা মাথায় রাখতে হয়। অন্য অনেক সম্পদ হয়তো সময়ের সাথে সাথে ফুরিয়ে যায়, কিন্তু ভূগোল কখনো বদলায় না। বিশাল প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা এবং একই সাথে সমুদ্রপথের সুবিধা কাজে লাগিয়ে দূরবর্তী দেশগুলোর সাথে বাণিজ্যের বিস্তার ঘটানো – এই দুইয়ের মধ্যে চমৎকার ভারসাম্য রক্ষা করতে হয়। এই ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই রাষ্ট্রটিকে আন্তর্জাতিক কানেক্টিভিটি বা সংযুক্তির রাজনীতিতে একটি অপরিহার্য খেলোয়াড় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এশিয়ান হাইওয়ে বা আঞ্চলিক রেল যোগাযোগের যেকোনো বড় প্রকল্পের নকশা করতে গেলে এই ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে রেখা টানতেই হয়। এই অপরিহার্যতাই হলো জাতীয় ক্ষমতার এক নীরব কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর উপাদান। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় পরাশক্তিগুলোকে এই ভূগোলের বাস্তবতা মেনেই হিসাব মেলাতে হয়। অর্থাৎ, সমরাস্ত্র বা বিপুল অর্থের অভাব থাকলেও, কেবল মানচিত্রের সঠিক জায়গায় জন্ম নেওয়ার কারণে একটি রাষ্ট্র বিশ্বমঞ্চে কতটা শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারে, এটি তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বিশাল জনসংখ্যা ও জনমিতিক লভ্যাংশের শক্তি জনসংখ্যা একটি রাষ্ট্রের জন্য আশীর্বাদ নাকি অভিশাপ, এই বিতর্ক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জগতে বহু পুরোনো। ছোট একটি আয়তনের দেশে বিপুল সংখ্যক মানুষের বসবাস প্রথম দৃষ্টিতে বিশাল এক বোঝা মনে হতে পারে। বাস্তবে এই বিশাল জনশক্তিই একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় দৃশ্যমান ক্ষমতার উৎস হয়ে দাঁড়াতে পারে। এই ভূখণ্ডের কোটি কোটি কর্মক্ষম মানুষকে যদি কারিগরি দক্ষতায় গড়ে তোলা যায়, তবে অর্থনীতিবিদরা একে জনমিতিক লভ্যাংশ (Demographic Dividend) বলে আখ্যায়িত করেন। এই বিপুল সংখ্যক তরুণ এবং কর্মক্ষম মানুষের কারণেই বিশ্ববাজারে রাষ্ট্রটি এক অভাবনীয় প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা অর্জন করেছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রখ্যাত তাত্ত্বিক হ্যান্স মরগেনথাউ (Hans Morgenthau) তাঁর কালজয়ী বই পলিটিক্স অ্যামাং নেশনস (Politics Among Nations)-এ জাতীয় ক্ষমতার উপাদানগুলো বিশ্লেষণ করতে গিয়ে জনসংখ্যাকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন (Morgenthau, 1948)। তাঁর মতে, কেবল সংখ্যায় বেশি হলেই হয় না, সেই মানুষের গুণগত মান এবং তাদের উৎপাদনশীলতা রাষ্ট্রের ক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এই দেশের সস্তা এবং পরিশ্রমী শ্রমশক্তির কারণেই আজ বিশ্বের বড় বড় ব্র্যান্ডগুলো এখানে ছুটে আসতে বাধ্য হচ্ছে। তৈরি পোশাক খাতে বিশ্ববাজারে যে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি হয়েছে, তার মূল কারিগর এই সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষগুলোই। দেশের সীমানা পেরিয়ে এই জনসংখ্যার শক্তি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। লাখ লাখ তরুণ মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে কাজ নিয়ে পাড়ি জমাচ্ছে। এই বিশাল প্রবাসী জনগোষ্ঠী মূলত বিদেশের মাটিতে রাষ্ট্রের একেকজন অনানুষ্ঠানিক দূত হিসেবে কাজ করে। তারা প্রতি বছর যে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠায়, তা দেশের অর্থনীতিকে যেকোনো বড় ধরনের বৈশ্বিক ধাক্কা সামলাতে সাহায্য করে। শ্রম রপ্তানির এই বাজার টিকিয়ে রাখার জন্য রাষ্ট্রের কূটনীতিকে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন কৌশল উদ্ভাবন করতে হয়। বিশাল জনসংখ্যার কারণে আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতেও রাষ্ট্রটি খুব সহজেই সবার মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিপূরণ আদায় বা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার কোনো বৈঠকে যখন এই দেশের প্রতিনিধিরা কথা বলেন, তখন তাদের পেছনে থাকা কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকার প্রশ্নটি পরাশক্তিগুলোকে ভাবতে বাধ্য করে। একটি ছোট দেশের নেতার কথার ওজন অনেক সময় এই বিশাল জনসংখ্যার কারণেই বহুগুণ বেড়ে যায়। অর্থাৎ, জনসংখ্যা কেবল পরিসংখ্যানের খাতায় থাকা কিছু সংখ্যা নয়, এটি আন্তর্জাতিক দরকষাকষির এক বিশাল হাতিয়ার। জনমিতিক এই সুবিধা সব সময় স্থায়ী হয় না। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর এই কর্মক্ষম মানুষের বয়স বাড়তে থাকে এবং তখন তারা আবার রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। তাই এই নির্দিষ্ট সময়টুকুর সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করা যেকোনো রাষ্ট্রের জন্য জীবন-মরণের প্রশ্ন। বিশাল এই জনগোষ্ঠীকে যদি সঠিক শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দেওয়া যায়, তবে তারা রাষ্ট্রের ক্ষমতার গ্রাফটিকে অনায়াসে ওপরের দিকে নিয়ে যেতে পারে। বিপরীতভাবে, এই মানুষগুলো বেকার এবং হতাশ হয়ে পড়লে দেশের ভেতরে ভয়াবহ সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হয়। সেই অস্থিরতা সামাল দিতে গিয়ে রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়। একারণে পররাষ্ট্রনীতির একটি বড় অংশ ব্যয় হয় এই মানুষগুলোর জন্য বিদেশের বাজারে কাজের সুযোগ তৈরি করা এবং বিদেশি বিনিয়োগ দেশে নিয়ে আসার পেছনে। বিশ্বায়নের এই যুগে সস্তা শ্রমের সন্ধানে বহুজাতিক পুঁজি প্রতিনিয়ত এক দেশ থেকে আরেক দেশে ছুটে বেড়ায়। সেই পুঁজিকে নিজেদের দেশে আটকে রাখার জন্য বিশাল এবং পরিশ্রমী জনসংখ্যার চেয়ে বড় কোনো ফাঁদ আর নেই। এই সাধারণ মানুষগুলোর ঘাম এবং শ্রমই মূলত বিশ্বমঞ্চে রাষ্ট্রের ক্ষমতার ভিত্তিপ্রস্তর শক্ত করে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বিশ্ববাজারে তুলনামূলক সুবিধা আধুনিক বিশ্বে ক্ষমতার সংজ্ঞায় বিশাল পরিবর্তন এসেছে। এখন আর কোনো দেশ তার সেনাবাহিনীর আকার দিয়ে অন্য দেশকে ভয় দেখাতে পারে না। এখনকার পৃথিবীতে আসল ক্ষমতা হলো অর্থনীতি। যে দেশের অর্থনীতি যত শক্তিশালী, আন্তর্জাতিক টেবিলে তার বসার চেয়ারটি তত বেশি মজবুত। স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় সাহায্যনির্ভর থাকা একটি দেশের জন্য এই অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জন করাটা ছিল বিশাল এক চ্যালেঞ্জ। ধীরে ধীরে সেই সাহায্যনির্ভরতার বৃত্ত ভেঙে রাষ্ট্রটি বাণিজ্যের দিকে মনোযোগ দেয়। অর্থনীতিবিদ ডেভিড রিকার্ডো (David Ricardo) তাঁর বিখ্যাত তুলনামূলক সুবিধা তত্ত্ব (Comparative Advantage Theory)-এ ব্যাখ্যা করেছেন, একটি দেশের উচিত সেই পণ্যটিতেই মনোযোগ দেওয়া যা সে অন্য দেশের চেয়ে সবচেয়ে কম খরচে উৎপাদন করতে পারে (Ricardo, 1817)। এই তত্ত্বের সফল প্রয়োগ ঘটিয়ে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক শিল্পে বিশ্বজুড়ে একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করেছে। পশ্চিমা দেশগুলো এখন আর রাজনৈতিক কারণে এই দেশটিকে অবজ্ঞা করতে পারে না, কারণ তাদের নিজেদের বাজারের একটি বিশাল অংশ এই ভূখণ্ড থেকে যাওয়া পণ্যের ওপর নির্ভরশীল। এই বাণিজ্যিক শক্তি রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিকে এক নতুন আত্মবিশ্বাস এনে দিয়েছে। অর্থনৈতিক কূটনীতির এই সফলতার কারণে বাংলাদেশ এখন আর কেবল দাতাগোষ্ঠীর মুখাপেক্ষী হয়ে থাকে না। তারা এখন সমানে সমানে বাণিজ্য চুক্তির দরকষাকষি করে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা থেকে শুরু করে নতুন নতুন দেশে রপ্তানি বাজার তৈরি করা – সবকিছুই এই অর্থনৈতিক সক্ষমতার ফল। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষকরা একে মূলত অর্থনৈতিক রাষ্ট্রকৌশল (Economic Statecraft) হিসেবে দেখেন। একটি শক্তিশালী অর্থনীতি দেশকে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা দেয়। যখন দেশের পকেটে নিজস্ব অর্থ থাকে, তখন পরাশক্তিগুলোর অন্যায় কোনো রাজনৈতিক আবদার খুব সহজেই ফিরিয়ে দেওয়া যায়। মেগা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের জন্য এখন আর কেবল একটি নির্দিষ্ট দাতা সংস্থার ওপর নির্ভর করতে হয় না। নিজস্ব অর্থায়নে বড় বড় সেতু বা অবকাঠামো নির্মাণের সাহস রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এখন এই দেশে আসে লাভজনক ব্যবসার খোঁজে, কোনো ত্রাণের টাকা হাতে নিয়ে নয়। এই রূপান্তরটি প্রমাণ করে যে, সঠিক অর্থনৈতিক নীতি কীভাবে একটি দুর্বল রাষ্ট্রকে বিশ্বমঞ্চে শক্তিশালী খেলোয়াড়ে পরিণত করতে পারে। অর্থনৈতিক এই ক্ষমতার একটি বড় অংশ আসে আঞ্চলিক এবং উপ-আঞ্চলিক সংযুক্তির মাধ্যমে। বাণিজ্যের চাকা সচল রাখার জন্য প্রতিবেশীদের সাথে কানেক্টিভিটি বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। শুল্ক বাধা কমানো, সরাসরি বন্দর ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করা এবং জ্বালানি বাণিজ্যের চুক্তিগুলো মূলত রাষ্ট্রের অর্থনীতির পরিধিকে দেশের সীমানার বাইরে বিস্তৃত করছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) মতো ফোরামগুলোতে স্বল্পোন্নত দেশের কাতার থেকে বেরিয়ে আসার প্রস্তুতি চলছে। এই উত্তরণের ফলে কিছু বাণিজ্য সুবিধা হারাতে হলেও, দীর্ঘমেয়াদে এটি রাষ্ট্রের আত্মমর্যাদা এবং বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। আন্তর্জাতিক রেটিং এজেন্সিগুলো যখন দেশের অর্থনীতির ইতিবাচক সূচক প্রকাশ করে, তখন তা কূটনীতিকদের জন্য সবচেয়ে বড় অস্ত্র হিসেবে কাজ করে। যেকোনো দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় তারা এই সূচকগুলো দেখিয়ে প্রমাণ করতে পারেন যে, তাদের দেশ একটি অত্যন্ত লাভজনক এবং নির্ভরযোগ্য অংশীদার। পরিশেষে, আধুনিক কূটনীতিতে বন্দুকের নলের চেয়ে ডলারের হিসাব অনেক বেশি কার্যকরী। নিজের দেশের ভেতরে উৎপাদন বাড়িয়ে এবং বিদেশের বাজারে তা সফলভাবে বিক্রি করেই মূলত রাষ্ট্র বিশ্বরাজনীতিতে তার নিজস্ব ক্ষমতার হিস্যা আদায় করে নিচ্ছে। মৃদু ক্ষমতা বা সফট পাওয়ারের নীরব প্রভাব ক্ষমতা মানেই শুধু অস্ত্রের ঝনঝনানি বা বিশাল ব্যাংক ব্যালেন্স নয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জগতে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ধরনের ক্ষমতার অস্তিত্ব রয়েছে, যা কোনো জোরজুলুম ছাড়াই অন্যকে প্রলুব্ধ করতে পারে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত অধ্যাপক জোসেফ নাই (Joseph Nye) এই বিশেষ ক্ষমতাটির নাম দিয়েছেন মৃদু ক্ষমতা (Soft Power)। তাঁর সাড়া জাগানো গ্রন্থ বাউন্ড টু লিড (Bound to Lead)-এ তিনি দেখিয়েছেন, একটি রাষ্ট্রের সংস্কৃতি, রাজনৈতিক মূল্যবোধ এবং গঠনমূলক নীতি কীভাবে অন্য দেশের মানুষের মন জয় করতে পারে (Nye, 1990)। এই ভূখণ্ডের রাষ্ট্রটি সামরিক বা অর্থনৈতিকভাবে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয়দের কেউ না হলেও, সফট পাওয়ারের দিক থেকে তারা বিশ্বমঞ্চে দারুণ একটি অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্রঋণ বা মাইক্রোক্রেডিট এবং এনজিও মডেলের বৈশ্বিক সফলতার কারণে সারা বিশ্বে এই দেশের নাম এক ইতিবাচক আলোয় উচ্চারিত হয়। দারিদ্র্য বিমোচন এবং নারীর ক্ষমতায়নের এই স্থানীয় মডেলগুলো আজ আফ্রিকা থেকে শুরু করে ল্যাটিন আমেরিকার অনেক দেশে পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত। এই নীরব সাফল্যগুলো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তিকে অত্যন্ত উজ্জ্বল করে তোলে, যা প্রথাগত কূটনীতি দিয়ে সহজে অর্জন করা সম্ভব নয়। সফট পাওয়ারের আরেকটি বিশাল উৎস হলো বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রের অবদান। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনগুলোতে নিয়মিত এবং বিপুল সংখ্যক সেনা পাঠানোর মাধ্যমে এই রাষ্ট্র সারা বিশ্বে এক মানবিক এবং পেশাদার ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলোতে গিয়ে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কারণে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এই দেশের সামরিক বাহিনী এবং নাগরিকদের প্রতি এক ধরনের গভীর শ্রদ্ধাবোধ তৈরি হয়েছে। এটি মূলত এমন এক ধরনের ক্ষমতা, যা অন্য দেশগুলোকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বন্ধু হতে বাধ্য করে। জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বৈশ্বিক সংকটগুলোতেও রাষ্ট্রটি নিজেদের বিপন্নতার কথা তুলে ধরার পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষার লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছে। ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরামের মতো মঞ্চগুলোতে তাদের এই সোচ্চার ভূমিকা বিশ্বনেতাদের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তাত্ত্বিকরা এই ধরনের কাজকে মানবিক কূটনীতি (Humanitarian Diplomacy) হিসেবে আখ্যায়িত করেন। একটি ছোট দেশ যখন বৈশ্বিক মঙ্গলের জন্য এত বড় ভূমিকা পালন করে, তখন পরাশক্তিগুলোও যেকোনো রাজনৈতিক আলোচনায় তাদের আলাদা সম্মান দিতে বাধ্য হয়। এই অদৃশ্য ক্ষমতার একটি বড় অংশ আসে রাষ্ট্রের সমৃদ্ধ সংস্কৃতি এবং ইতিহাস থেকে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি আদায়ের মাধ্যমে রাষ্ট্রটি সারা বিশ্বের ভাষাবৈচিত্র্য রক্ষার এক বিশাল প্রতীক হয়ে উঠেছে। সাহিত্য, শিল্পকলা এবং সাধারণ মানুষের আতিথেয়তার গল্পগুলো বিদেশের মাটিতে খুব ইতিবাচক একটি বার্তা ছড়িয়ে দেয়। সমাজবিজ্ঞানী এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পণ্ডিতরা মনে করেন, এই আধুনিক যুগে অ-রাষ্ট্রীয় সত্তা (Non-state Actors)-দের ভূমিকা অনেক বেশি। দেশের খেলোয়াড়, বিজ্ঞানী, শিল্পী বা প্রবাসী শ্রমিকরা যখন বিদেশে কোনো ভালো কাজ করেন, তখন তা সরাসরি রাষ্ট্রের সফট পাওয়ার হিসেবে যুক্ত হয়। এই ক্ষমতা প্রয়োগের জন্য কোনো বাজেট বা সামরিক মহড়ার প্রয়োজন হয় না। এটি মানুষের মনস্তত্ত্বে কাজ করে। কূটনীতির টেবিলে বসে যখন কোনো দেশের সাথে দরকষাকষি করা হয়, তখন এই সফট পাওয়ার একটি অদৃশ্য ঢাল হিসেবে কাজ করে। যে দেশের প্রতি বিশ্ববাসীর এক ধরনের প্রাকৃতিক সহানুভূতি এবং শ্রদ্ধা থাকে, সেই দেশের ওপর অন্যায়ভাবে কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া বড় রাষ্ট্রগুলোর জন্যও বেশ অস্বস্তিকর হয়ে দাঁড়ায়। এটি মূলত সমরাস্ত্রের অভাবকে বুদ্ধিবৃত্তিক এবং মানবিক উপায় দিয়ে পুষিয়ে নেওয়ার এক অনবদ্য কৌশল। সামরিক সক্ষমতা এবং প্রথাগত প্রতিরক্ষার হিসাব-নিকাশ বিশ্বরাজনীতিতে শেষ পর্যন্ত পেশিশক্তির একটা আলাদা কদর সব সময় থেকে যায়। একটি রাষ্ট্র অর্থনীতি বা সংস্কৃতিতে যতই উন্নত হোক না কেন, তার যদি নিজের সীমানা রক্ষা করার মতো ন্যূনতম সামরিক শক্তি না থাকে, তবে পদে পদে তাকে অপদস্থ হতে হয়। বদ্বীপের এই রাষ্ট্রটি বিশাল কোনো সামরিক পরাশক্তি নয়। তাছাড়া, চারপাশের ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে সরাসরি কোনো যুদ্ধ জয় করে অন্য দেশ দখল করার কোনো স্বপ্ন বা সামর্থ্য তাদের নেই। তারপরও রাষ্ট্রের বাজেটের একটি বড় অংশ ব্যয় হয় সামরিক বাহিনীকে আধুনিক এবং সুসজ্জিত করার পেছনে। এই ব্যয়ের মূল উদ্দেশ্য অন্যকে আক্রমণ করা নয়, বরং নিজের প্রতিরক্ষাকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যাতে কেউ সহজে আক্রমণ করার সাহস না পায়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তাত্ত্বিক কেনেথ ওয়াল্টজ (Kenneth Waltz) তাঁর বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক কাঠামোর কারণেই রাষ্ট্রগুলো সব সময় এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে এবং নিজেদের রক্ষায় কঠিন ক্ষমতা (Hard Power) সঞ্চয় করতে বাধ্য হয়। সামরিক বাহিনীর এই প্রস্তুতি মূলত প্রতিবেশীদের প্রতি এক ধরনের কৌশলগত বার্তা বা ডিটারেন্স হিসেবে কাজ করে। এই সামরিক সক্ষমতার একটি বড় অংশ ব্যয় হয় সমুদ্রসীমা সুরক্ষার কাজে। বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলরাশির ওপর আইনি অধিকার পাওয়ার পর সেখানে নৌবাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানো অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। ব্লু ইকোনমি বা সামুদ্রিক অর্থনীতির বিশাল সম্পদ পাহারা দেওয়ার জন্য সাবমেরিন, আধুনিক ফ্রিগেট এবং রাডার ব্যবস্থা কেনা হচ্ছে। এই সামরিক আধুনিকায়ন অনেক সময় প্রতিবেশী দেশগুলোর মনে কিছুটা সন্দেহের জন্ম দিলেও, জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে রাষ্ট্র এ বিষয়ে আপস করতে রাজি নয়। তাত্ত্বিক পরিভাষায় একে অনেক সময় ভারসাম্য রক্ষা (Balancing)-এর অংশ হিসেবেও দেখা হয়। বিশাল প্রতিবেশীর পাশে টিকে থাকার জন্য নিজের সামরিক সক্ষমতাকে একটা সম্মানজনক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। তাছাড়া, দেশের ভেতরে যেকোনো বড় ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয় বা জরুরি অবস্থা মোকাবেলা করার জন্য সামরিক বাহিনীর সুশৃঙ্খল কাঠামোর ওপর রাষ্ট্রকে নির্ভর করতে হয়। অর্থাৎ, সামরিক বাহিনী কেবল বাইরের শত্রুর জন্য নয়, ভেতরের স্থিতিশীলতা রক্ষারও এক বড় হাতিয়ার। প্রথাগত প্রতিরক্ষার হিসাব-নিকাশে সামরিক কূটনীতি বা মিলিটারি ডিপ্লোম্যাসির একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। বিভিন্ন দেশের সামরিক বাহিনীর সাথে যৌথ মহড়া, প্রশিক্ষণ বিনিময় এবং গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগি করার মাধ্যমে রাষ্ট্র মূলত পরাশক্তিগুলোর সাথে এক ধরনের আস্থার সম্পর্ক তৈরি করে। চীনের কাছ থেকে সমরাস্ত্র কেনা, আবার যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সামরিক সংলাপে বসার এই দ্বিমুখী কৌশলটি মূলত ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার এক নিখুঁত চেষ্টা। শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে সামরিক বাহিনী যে বিশ্বমানের অভিজ্ঞতা অর্জন করে, তা দেশের নিজস্ব প্রতিরক্ষা কাঠামোকে আরও বেশি পরিণত করে। একটি দুর্বল অর্থনীতি এবং ছোট ভূখণ্ডের দেশে বিশাল সেনাবাহিনী পোষা কঠিন হলেও, পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় ন্যূনতম এই সামরিক সক্ষমতাটুকু ধরে রাখা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। কূটনীতির টেবিলে কূটনীতিকরা যতই সুন্দর কথা বলুন না কেন, পেছনে যদি একটি সুসজ্জিত এবং পেশাদার বাহিনীর সমর্থন না থাকে, তবে আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় সেই কথার ওজন খুব একটা থাকে না। সামরিক শক্তি মূলত রাষ্ট্রের সেই শেষ বর্ম, যা অন্য সব কূটনীতি ব্যর্থ হলেও দেশের সার্বভৌমত্বকে আগলে রাখে। নেতৃত্বের মনস্তত্ত্ব এবং জাতীয় ঐক্যের অদৃশ্য শক্তি জাতীয় ক্ষমতার সবটুকুই কেবল চোখে দেখা যায় না বা পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা যায় না। এর একটি বিশাল মনস্তাত্ত্বিক দিক রয়েছে, যা অনেক সময় ট্যাংক বা মিসাইলের চেয়েও বেশি কার্যকরী হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো রাজনৈতিক নেতৃত্ব। একজন নেতার বিশ্ববোধ, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং সাহসিকতা একটি রাষ্ট্রের ভাগ্য পুরোপুরি পাল্টে দিতে পারে। তাত্ত্বিক আলোচনায় একে প্রায়শই নেতৃত্বের কূটনীতি (Diplomacy of Leadership) বলা হয়। সংকটকালীন মুহূর্তে যখন পুরো জাতি দিকভ্রান্ত হয়ে পড়ে, তখন নেতার একটি সঠিক সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রকে খাদের কিনারা থেকে তুলে আনতে পারে। আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে যখন একজন প্রজ্ঞাবান এবং ক্যারিশম্যাটিক নেতা দেশের হয়ে কথা বলেন, তখন পরাশক্তিগুলোও তাঁকে আলাদা গুরুত্ব দিতে বাধ্য হয়। নেতার এই ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি অনেক সময় রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাগুলোকে ঢেকে দেয়। বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানের সাথে মতবিরোধের পরও নিজস্ব অর্থায়নে দেশের সবচেয়ে বড় সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্তটি মূলত এই নেতৃত্বের শক্তিরই এক চরম বহিঃপ্রকাশ। এই ধরনের আত্মবিশ্বাসী সিদ্ধান্ত দেশের সাধারণ মানুষের মনে এক অভাবনীয় শক্তির সঞ্চার করে। নেতৃত্বের পাশাপাশি জাতীয় ক্ষমতার আরেকটি বড় অদৃশ্য উপাদান হলো জাতীয় চরিত্র এবং মনোবল। একটি দেশের মানুষ যখন যেকোনো সংকটে ভেদাভেদ ভুলে এক হয়ে দাঁড়ায়, তখন সেই ঐক্যবদ্ধ শক্তিকে বাইরের কোনো দেশ সহজে পরাস্ত করতে পারে না। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষকরা একে জাতীয় ঐকমত্য (National Consensus) হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেন। দুর্ভাগ্যবশত, এই ভূখণ্ডের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি অত্যন্ত মেরুকৃত হওয়ায় এই ঐক্যের জায়গায় প্রায়শই ঘাটতি দেখা যায়। রাজনৈতিক দলগুলো যদি রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তার মতো মৌলিক বিষয়গুলোতে একমত হতে পারত, তবে আন্তর্জাতিক দরকষাকষিতে দেশের ক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে যেত। তারপরও, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামের মতো ইতিহাস প্রমাণ করে যে, এই ভূখণ্ডের মানুষ চরম বিপদের সময় নিজেদের মধ্যে এক অবিশ্বাস্য ঐক্য তৈরি করতে পারে। এই ঐতিহাসিক লড়াকু মানসিকতা মূলত রাষ্ট্রের এক স্থায়ী মনস্তাত্ত্বিক সম্পদ। কোনো পরাশক্তি যদি কখনো অন্যায়ভাবে এই ভূখণ্ডের ওপর কিছু চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে, তবে সাধারণ মানুষের এই অন্তর্নিহিত প্রতিরোধ ক্ষমতাই রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ঢাল হিসেবে কাজ করে। কূটনীতিকদের পেশাদারিত্ব এবং মেধা এই অদৃশ্য ক্ষমতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিদেশের মাটিতে বসে যারা দেশের হয়ে প্রতিনিয়ত দরকষাকষি করছেন, তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে। আন্তর্জাতিক আইনের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে সমুদ্রসীমা জয় করা কিংবা জলবায়ু সম্মেলনে ক্ষতিপূরণ আদায়ের মতো অর্জনগুলো মূলত এই পেশাদার কূটনীতিকদের মেধারই ফসল। একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রযন্ত্র তৈরি করার জন্য কেবল অর্থ বা অস্ত্র থাকলেই চলে না, প্রয়োজন হয় সেই অর্থ এবং অস্ত্রকে সঠিক পথে পরিচালনা করার মতো কিছু চৌকস মস্তিষ্ক। আধুনিক বিশ্বে জ্ঞান এবং তথ্যই হলো আসল ক্ষমতা। যে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা যত দ্রুত বিশ্বের পরিবর্তনশীল সমীকরণগুলো বুঝতে পারেন এবং সেই অনুযায়ী নিজেদের কৌশল সাজাতে পারেন, বিশ্বমঞ্চে তারাই শেষ পর্যন্ত জয়ী হন। নেতৃত্বের প্রজ্ঞা, সাধারণ মানুষের ঐক্য এবং কূটনীতিকদের মেধা – এই তিনটি অদৃশ্য উপাদান যখন এক বিন্দুতে মিলিত হয়, তখন একটি ছোট এবং উন্নয়নশীল রাষ্ট্রও বিশ্বরাজনীতির দাবার বোর্ডে সবচেয়ে শক্তিশালী গুটিগুলোকে অনায়াসে কিস্তিমাত করতে পারে। প্রযুক্তিগত অভিযোজন এবং ভবিষ্যতের ক্ষমতার মানদণ্ড আগামী দিনের পৃথিবীতে ক্ষমতার মাপকাঠি আরও একবার বদলে যাচ্ছে। এখন আর কেবল ভৌগোলিক সীমানা বা কারখানার ধোঁয়া দিয়ে রাষ্ট্রের ক্ষমতা মাপা হবে না। আগামী বিশ্বের নিয়ন্ত্রক হবে প্রযুক্তি। যে রাষ্ট্র প্রযুক্তিতে যত বেশি উন্নত হবে, আন্তর্জাতিক টেবিলে তার বসার জায়গাটি ততটাই সামনের সারিতে থাকবে। সমাজবিজ্ঞানী মানুয়েল কাস্তেলজ (Manuel Castells) তাঁর যুগান্তকারী গ্রন্থ দ্য রাইজ অফ দ্য নেটওয়ার্ক সোসাইটি (The Rise of the Network Society)-এ দেখিয়েছেন, তথ্য এবং যোগাযোগের নেটওয়ার্ক কীভাবে আধুনিক সমাজ ও রাষ্ট্রের মূল ভিত্তিকে নতুন করে সাজাচ্ছে (Castells, 1996)। এই ডিজিটাল যুগে তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং প্রযুক্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে কোনো রাষ্ট্রই তার জাতীয় ক্ষমতা ধরে রাখতে পারবে না। এই ভূখণ্ডের রাষ্ট্রটিও দ্রুত প্রযুক্তিগত অভিযোজনের দিকে এগোচ্ছে। ডিজিটাল অর্থনীতি, আউটসোর্সিং এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে লাখ লাখ তরুণের অংশগ্রহণ মূলত আগামী দিনের অর্থনীতির শক্ত ভিত তৈরি করছে। এই প্রযুক্তিগত সক্ষমতা রাষ্ট্রের একটি নতুন ক্ষমতায়ন, যা কোনো ভৌগোলিক সীমানা মানে না। বিদেশের মাটিতে বসে কাজ না করেও দেশের তরুণেরা কেবল ইন্টারনেটের মাধ্যমে রেমিট্যান্স আনছেন, এটি বিশ্বায়নের এক নতুন রূপ। এই প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সাথে সাথে জাতীয় নিরাপত্তার ধারণাতেও যুক্ত হয়েছে নতুন এক মাত্রা। এখন প্রথাগত সামরিক বাহিনীর চেয়ে সাইবার নিরাপত্তা (Cyber Security) অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একটি দেশের ব্যাংক ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ গ্রিড বা সরকারি তথ্যভান্ডার যদি সাইবার আক্রমণের শিকার হয়, তবে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র মুহূর্তের মধ্যে অচল হয়ে যেতে পারে। তাই নিজেদের সাইবার স্পেসকে সুরক্ষিত রাখা এখন জাতীয় ক্ষমতার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকদের এখন কেবল সীমানার পিলারের দিকে নজর রাখলে চলে না, তাদের নজর রাখতে হয় ফাইবার অপটিক কেবল এবং সার্ভারগুলোর দিকে। সাইবার জগতে দক্ষ জনবল তৈরি করা এবং আন্তর্জাতিক সাইবার আইনের সাথে নিজেদের মানিয়ে নেওয়া বর্তমান কূটনীতির এক বড় চ্যালেঞ্জ। পরাশক্তিগুলো ইতিমধ্যেই সাইবার যুদ্ধে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করছে। এই অসম প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য ছোট রাষ্ট্রগুলোকেও নিজেদের প্রযুক্তিগত ঢাল শক্ত করতে হচ্ছে। ভবিষ্যতের ক্ষমতা নির্ধারণে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো বিষয়গুলো বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করবে। এই নতুন প্রযুক্তিগুলোর সাথে তাল মেলাতে না পারলে রাষ্ট্র আবার সেই পুরনো আমলের পরনির্ভরশীলতার যুগে ফিরে যাবে। প্রযুক্তি হস্তান্তরের জন্য উন্নত দেশগুলোর সাথে দরকষাকষি করা এবং দেশের ভেতরে গবেষণার পরিবেশ তৈরি করা এখন পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম অগ্রাধিকার। যে দেশ বিশ্বের বুকে নিজেদের একটি আধুনিক এবং প্রযুক্তিবান্ধব রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরতে পারবে, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সেখানেই সবচেয়ে বেশি ভিড় জমাবে। অর্থাৎ, প্রযুক্তি এখন আর কেবল জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের হাতিয়ার নয়, এটি বিশ্বমঞ্চে রাষ্ট্রের সম্মান, নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতা প্রমাণের সবচেয়ে বড় মাধ্যম। এই পরিবর্তনশীল বিশ্বে দ্রুত নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা বা অ্যাডাপটাবিলিটিই হলো একটি রাষ্ট্রের টিকে থাকার সবচেয়ে বড় জাদুকরী শক্তি। এই বদ্বীপের মানুষ আবহমান কাল ধরেই প্রকৃতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে জানে, এখন তাদের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো এই ডিজিটাল এবং প্রযুক্তিগত বিশ্বের সাথে নিজেদের খাপ খাইয়ে নেওয়া। পররাষ্ট্রনীতির গতিপ্রকৃতি (Direction of foreign policy) সত্তরের দশকের আদর্শবাদ এবং প্রাথমিক রূপরেখা যেকোনো নতুন রাষ্ট্রের প্রথম দিকের দিনগুলো বেশ অদ্ভুত এক ঘোরের মধ্যে কাটে। যুদ্ধ বা প্রবল রক্তপাতের পর যারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেন, তাদের চোখে এক ধরনের স্বপ্নীল চশমা থাকে। তারা ধরে নেন, নিজেদের রক্ত দিয়ে যে স্বাধীনতা তারা অর্জন করেছেন, পুরো বিশ্ব তার কদর করবে। এই ভূখণ্ডের ক্ষেত্রেও শুরুর দিকের পররাষ্ট্রনীতি ঠিক এই আবেগের ওপর ভিত্তি করেই দাঁড়িয়েছিল। প্রথম দিককার নীতিনির্ধারকরা আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে দেখতেন আদর্শবাদ (Idealism)-এর লেন্স দিয়ে। এই তাত্ত্বিক কাঠামোর মূল কথা হলো, রাষ্ট্রগুলো একে অপরের সাথে সংঘাতের বদলে সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করতে পারে এবং আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে নৈতিকতার একটি বড় স্থান রয়েছে। সদ্য স্বাধীন হওয়া একটি দেশ স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বের শোষিত এবং বঞ্চিত মানুষদের পক্ষে কথা বলার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা বর্ণবাদ, সাম্রাজ্যবাদ এবং যেকোনো ধরনের উপনিবেশবাদের কট্টর বিরোধিতা শুরু করে। বিশ্বমঞ্চে নিজেদের একটি উচ্চ নৈতিক অবস্থান তৈরি করাই ছিল সেই সময়কার কূটনীতির প্রধান লক্ষ্য। এই নীতিগত অবস্থান কোনো ভান ছিল না, বাস্তবে এটি ছিল দীর্ঘদিনের বঞ্চনা থেকে জন্ম নেওয়া এক নিখাদ রাজনৈতিক বিশ্বাস। এই আদর্শিক অবস্থানের পাশাপাশি রাষ্ট্রটিকে অত্যন্ত রূঢ় একটি বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। চারদিকের ধ্বংসস্তূপ, শূন্য রাজকোষ এবং লাখ লাখ ক্ষুধার্ত মানুষের হাহাকার রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকদের দ্রুতই মাটিতে নামিয়ে আনে। এই চরম সংকটময় মুহূর্তে তারা বুঝতে পারেন যে, কেবল বড় বড় আদর্শের কথা বলে পেট ভরবে না। টিকে থাকার জন্য প্রয়োজন বিশ্ব সম্প্রদায়ের স্বীকৃতি এবং বিপুল পরিমাণ আর্থিক সহায়তা। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রখ্যাত গবেষক ইমাজউদ্দীন আহমেদ (Emajuddin Ahamed) তাঁর গবেষণায় উল্লেখ করেছেন যে, এই সময়কার পররাষ্ট্রনীতির মূলমন্ত্র ছিল “সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়” (Ahmed, 1984)। এই নীতিটি কোনো গভীর দার্শনিক চিন্তার ফসল ছিল না। এটি ছিল মূলত একটি দুর্বল এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্রের বেঁচে থাকার সবচেয়ে নিরাপদ কৌশল। কোনো পরাশক্তির বিরাগভাজন হওয়ার মতো সামর্থ্য এই ভূখণ্ডের ছিল না। তাই তারা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পূর্ব এবং পশ্চিম – উভয় ব্লকের সাথেই সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করে। বিশ্ব রাজনীতির চরম মেরুকরণের সেই দিনগুলোতে একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখা ছাড়া আর কোনো বিকল্প পথ খোলা ছিল না। স্নায়ুযুদ্ধের সেই উত্তাল সময়ে জোট নিরপেক্ষ থাকাই ছিল সবচেয়ে বড় আদর্শিক পরীক্ষা। রাষ্ট্রটি অত্যন্ত সুচিন্তিতভাবে জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন (Non-Aligned Movement)-এ যোগদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এর মাধ্যমে তারা বিশ্বমঞ্চে এই বার্তাটি পরিষ্কার করে দেয় যে, তারা স্বাধীনভাবে নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরা নেবে। কিন্তু আন্তর্জাতিক কূটনীতির ময়দান খুব নির্মম। পরাশক্তিগুলো সব সময় দুর্বল রাষ্ট্রগুলোকে নিজেদের বলয়ে টেনে নেওয়ার জন্য নানামুখী চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। এই ভূখণ্ডটিকেও সেই চাপের মুখে পড়তে হয়েছিল। একদিকে মুক্তিযুদ্ধের মিত্র দেশগুলোর প্রতি এক ধরনের ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা ছিল, অন্যদিকে পশ্চিমা বিশ্বের আর্থিক সাহায্যের ওপর বেঁচে থাকার বাধ্যবাধকতা ছিল। এই দুই বিপরীতমুখী স্রোতের মাঝে দাঁড়িয়ে ভারসাম্য রক্ষা করাটা ছিল আক্ষরিক অর্থেই শূন্যে হাঁটার মতো। রাষ্ট্রটি এই কঠিন পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয় এবং ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করে যে, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আদর্শের চেয়ে স্বার্থের ওজন অনেক বেশি। এই উপলব্ধিটিই পরবর্তীতে তাদের পররাষ্ট্রনীতির গতিপথ পুরোপুরি বদলে দেওয়ার পটভূমি তৈরি করে। আদর্শবাদ থেকে বাস্তববাদের দিকে পটপরিবর্তন সত্তরের দশকের শেষার্ধ এবং আশির দশকের শুরুতে এই ভূখণ্ডের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় ধরনের পালাবদল ঘটে। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে নতুন নেতৃত্বের আগমনের সাথে সাথে পররাষ্ট্রনীতিতেও এক দৃশ্যমান পরিবর্তন আসতে শুরু করে। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা আদর্শের খোলস ছেড়ে পুরোপুরি বাস্তববাদ (Realism)-এর চর্চা শুরু করেন। এই তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গির মূল প্রবক্তা হ্যান্স মরগেনথাউ (Hans Morgenthau) তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ পলিটিক্স অ্যামাং নেশনস (Politics Among Nations)-এ দেখিয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক রাজনীতি মূলত ক্ষমতার এক অন্তহীন লড়াই এবং এখানে নৈতিকতার কোনো স্থায়ী আসন নেই। প্রতিটি রাষ্ট্র তার সর্বোচ্চ জাতীয় স্বার্থ আদায় করতে চায়। এই নতুন বাস্তববাদী চিন্তাধারার আলোকে রাষ্ট্রটি তার মিত্র নির্বাচনের কৌশল ঢেলে সাজায়। তারা বুঝতে পারে যে, আবেগের বশবর্তী হয়ে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ব্লকের সাথে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা দেশের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। ফলে অতীত ইতিহাস বা আদর্শিক ভিন্নতাকে একপাশে সরিয়ে রেখে তারা পশ্চিমা বিশ্ব এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করে। এই পটপরিবর্তনের সবচেয়ে বড় কারণ ছিল রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড সোজা করার তাগিদ। মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোতে তখন ব্যাপক কর্মযজ্ঞ চলছিল এবং সেখানে প্রচুর সস্তা শ্রমিকের প্রয়োজন ছিল। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, দেশের বিশাল বেকার যুবসমাজকে এই দেশগুলোতে পাঠানো হবে। এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে মুসলিম দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক স্থাপন পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়ায়। আগে যেসব দেশের সাথে রাজনৈতিক দূরত্বের কারণে সম্পর্ক শীতল ছিল, রূঢ় অর্থনৈতিক প্রয়োজনে সেই শীতলতা কাটিয়ে ওঠা অপরিহার্য হয়ে পড়ে। কূটনীতির টেবিলে এখন আর আদর্শের বড় বড় বক্তৃতা শোনা যেত না, সেখানে আলোচনা হতো ভিসা কোটা, শ্রমবাজার এবং বৈদেশিক অনুদান নিয়ে। এই যে মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর, এটি একটি সদ্য স্বাধীন দেশের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তারা প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রীয় স্বার্থের প্রয়োজনে তারা যেকোনো পুরনো সমীকরণ ভেঙে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে প্রস্তুত। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ময়দানে এটিই হলো টিকে থাকার সবচেয়ে বড় এবং কার্যকরী অস্ত্র। বাস্তববাদের এই যুগে প্রতিবেশীদের সাথে সম্পর্কের ধরনও পাল্টাতে শুরু করে। আগে যেখানে অটুট বন্ধুত্বের কথা বলা হতো, সেখানে রাষ্ট্রীয় স্বার্থের সংঘাতগুলো ক্রমশ স্পষ্ট হতে থাকে। সীমানা, পানিবণ্টন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোতে রাষ্ট্র অনেক বেশি দরকষাকষির পথে হাঁটা শুরু করে। তাত্ত্বিক নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি (Niccolo Machiavelli) শত শত বছর আগে তাঁর দ্য প্রিন্স (The Prince) বইয়ে শাসকের যে নির্মোহ এবং ধূর্ত চরিত্রের কথা বলেছিলেন, আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে রাষ্ট্রগুলো মূলত সেই চরিত্রটিই ধারণ করে। কোনো দেশই বিনা স্বার্থে অন্য দেশকে ছাড় দেয় না। এই ভূখণ্ডের কূটনীতিকরাও সেই সত্যটি খুব দ্রুত অনুধাবন করতে সক্ষম হন। তারা বুঝতে পারেন যে, আন্তর্জাতিক ফোরামে নিজেদের দাবি আদায় করতে হলে কেবল যুক্তির ওপর নির্ভর করলে চলবে না, সমমনা দেশগুলোর সাথে শক্তিশালী জোট তৈরি করতে হবে। আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নতুন নতুন জোট গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই সব কিছুর পেছনে একটি মাত্র লক্ষ্য কাজ করছিল – যেকোনো মূল্যে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা। আদর্শবাদের রোমান্টিক যুগ পেরিয়ে রাষ্ট্রটি মূলত একটি পরিণত এবং হিসেবি সত্তায় রূপান্তরিত হতে শুরু করে। নব্বইয়ের দশক ও অর্থনৈতিক কূটনীতির উত্থান নব্বইয়ের দশক পুরো পৃথিবীর জন্যই একটি যুগান্তকারী পরিবর্তনের সময় ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের স্নায়ুযুদ্ধের অবসান ঘটে। পৃথিবী প্রবেশ করে বিশ্বায়ন (Globalization)-এর এক নতুন যুগে। এই নতুন বিশ্বব্যবস্থায় অস্ত্রের ঝনঝনানির চেয়ে বাণিজ্য চুক্তির আওয়াজ অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে তাল মিলিয়ে রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতেও এক বিশাল কাঠামোগত পরিবর্তন আসে। নীতিনির্ধারকরা অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারেন যে, রাজনৈতিক কূটনীতির দিন ফুরিয়ে আসছে। আগামী দিনের পৃথিবীতে টিকে থাকতে হলে কূটনীতির মূল চালিকাশক্তি হতে হবে অর্থনীতি। এই নতুন ধারণাকেই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় অর্থনৈতিক কূটনীতি (Economic Diplomacy) বলা হয়। বিদেশের মাটিতে থাকা দূতাবাসগুলোর কাজের ধরনে আমূল পরিবর্তন আনা হয়। রাষ্ট্রদূতদের এখন আর শুধু রাজনৈতিক সম্পর্ক রক্ষার দায়িত্ব দিলে চলে না। তাদের প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়ায় দেশের পণ্যের জন্য নতুন বাজার খুঁজে বের করা, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জটিল শর্তগুলো নিয়ে দরকষাকষি করা। এই সময়ে তৈরি পোশাক শিল্পের মতো রপ্তানিমুখী খাতগুলোর অভাবনীয় উত্থান ঘটে। সস্তা শ্রমকে পুঁজি করে রাষ্ট্রটি বিশ্ববাজারে নিজেদের একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করার চেষ্টা শুরু করে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রখ্যাত তাত্ত্বিক রবার্ট কিওহ্যান (Robert Keohane) তাঁর জটিল পারস্পরিক নির্ভরশীলতা (Complex Interdependence) তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে, আধুনিক রাষ্ট্রগুলো বাণিজ্যের কারণে একে অপরের সাথে এত গভীরভাবে যুক্ত থাকে যে, সরাসরি সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা অনেক কমে যায়। এই ভূখণ্ডটিও বিশ্বায়নের এই সুযোগটি পুরোপুরি কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেয়। তারা পশ্চিমা দেশগুলোর বিশাল বাজারে নিজেদের পণ্যের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার জন্য সর্বাত্মক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালায়। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ফোরামগুলোতে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর অধিকার আদায়ের পক্ষে তারা অত্যন্ত জোরালো অবস্থান গ্রহণ করে। কূটনীতির টেবিলে এখন আলোচনার প্রধান বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়ায় ট্যারিফ, কোটা, অ্যান্টি-ডাম্পিং ডিউটি এবং সাপ্লাই চেইন। এটি ছিল রাষ্ট্রের চিন্তাধারায় এক বিশাল উল্লম্ফন। তারা প্রমাণ করে যে, ছোট দেশ হলেও অর্থনৈতিক কৌশলের মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের একটি সম্মানজনক জায়গা করে নেওয়া সম্ভব। অর্থনৈতিক কূটনীতির এই উত্থানের সাথে সাথে দেশের ভেতরের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগুলোতেও পরিবর্তন আসতে বাধ্য হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বিনিয়োগ বোর্ড এবং ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নির্ধারণে বড় ধরনের প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর কর্তাব্যক্তিরা অনেক সময় বিদেশি কূটনীতিকদের চেয়েও বেশি ক্ষমতাধর হয়ে ওঠেন। রাষ্ট্রীয় সফরে সরকারপ্রধানের সাথে বিশাল ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল যাওয়াটা একটি সাধারণ রেওয়াজে পরিণত হয়। সমাজবিজ্ঞানী উইলিয়াম রবিনসন (William Robinson) তাঁর গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম (Global Capitalism) তত্ত্বে বহুজাতিক পুঁজির যে অবাধ বিস্তারের কথা বলেছেন, এই ভূখণ্ডটি সেই বৈশ্বিক পুঁজিবাদের একটি সক্রিয় অংশে পরিণত হয়। রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তগুলো এখন আর শুধু রাজনৈতিক বিবেচনায় নেওয়া হয় না, এর পেছনে বড় বড় কর্পোরেট স্বার্থও কাজ করতে শুরু করে। সহজ করে বললে, নব্বইয়ের দশকে এসে রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি মূলত একটি বিশাল বাণিজ্যিক এন্টারপ্রাইজের মতো আচরণ করতে শুরু করে, যার একমাত্র লক্ষ্য হলো বিশ্ববাজার থেকে সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক ফায়দা লুটে নেওয়া। সাহায্যনির্ভরতা থেকে বাণিজ্যনির্ভরতায় উত্তরণ একটি রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় আত্মমর্যাদার জায়গা হলো অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা। দীর্ঘ সময় ধরে এই ভূখণ্ডটি বহির্বিশ্বের কাছে সাহায্য এবং ঋণের জন্য হাত পাততে বাধ্য ছিল। বিদেশি সাহায্যদাতা সংস্থাগুলোর ওপর এই চরম নির্ভরশীলতা রাষ্ট্রের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে দারুণভাবে ক্ষুণ্ণ করত। দাতারা ঋণ দেওয়ার সময় এমন সব কঠিন শর্ত জুড়ে দিত, যা অনেক সময় দেশের সাধারণ মানুষের স্বার্থের সম্পূর্ণ পরিপন্থী হতো। এই অপমানজনক পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এক দৃঢ় প্রত্যয় তৈরি হয়। তারা সিদ্ধান্ত নেয় যে, ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে ঘোরার দিন শেষ করতে হবে। এর বদলে তারা বাণিজ্যের মাধ্যমে নিজেদের পাওনা আদায় করে নেবে। তাত্ত্বিক ইমানুয়েল ওয়ালারস্টেইন (Immanuel Wallerstein) তাঁর বিশ্ব ব্যবস্থা তত্ত্ব (World-Systems Theory)-এ পুরো পৃথিবীকে কেন্দ্র, আধা-প্রান্তিক এবং প্রান্তিক – এই তিন ভাগে ভাগ করেছেন। এই রাষ্ট্রটি মূলত সেই প্রান্তিক অবস্থান থেকে নিজেদের টেনে তুলে আধা-প্রান্তিক বা তার চেয়েও উন্নত কোনো অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার জন্য এক মরিয়া লড়াই শুরু করে। এই লড়াইয়ের প্রধান হাতিয়ার ছিল রপ্তানি বাণিজ্য। সাহায্যনির্ভরতা থেকে এই উত্তরণের পথটি মোটেও মসৃণ ছিল না। আন্তর্জাতিক বাজার অত্যন্ত নিষ্ঠুর এবং প্রতিযোগিতাপূর্ণ। উন্নত দেশগুলো মুখে মুক্ত বাণিজ্যের কথা বললেও বাস্তবে তারা নিজেদের বাজার রক্ষা করার জন্য নানা রকম দৃশ্যমান এবং অদৃশ্য বাধা তৈরি করে রাখে। এই বাধাগুলো টপকে যাওয়ার জন্য রাষ্ট্রের কূটনীতিকদের প্রচুর ঘাম ঝরাতে হয়। ইউরোপ এবং আমেরিকার বাজারে জিএসপি (GSP) বা শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার আদায় করাটা ছিল অর্থনৈতিক কূটনীতির অন্যতম বড় একটি অর্জন। এই সুবিধা আদায় করার জন্য দেশের ভেতরের কারখানার পরিবেশ, শ্রমিকের অধিকার এবং অন্যান্য কমপ্লায়েন্স ইস্যুতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ করতে হয়। অর্থাৎ, বিদেশের বাজারে পণ্য বিক্রির শর্ত হিসেবে দেশের ভেতরের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগুলোকেও সংস্কার করতে রাষ্ট্র বাধ্য হয়। এই পরিবর্তনগুলো প্রমাণ করে যে, আধুনিক যুগে কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নীতি এবং পররাষ্ট্রনীতির মধ্যে আর কোনো বিভাজন রেখা অবশিষ্ট নেই। বাইরের বাজারের চাহিদা প্রতিনিয়ত ভেতরের নীতিকে প্রভাবিত করছে এবং বদলে দিচ্ছে। বাণিজ্যনির্ভর এই পররাষ্ট্রনীতি রাষ্ট্রের মনস্তত্ত্বে এক বিশাল পরিবর্তন নিয়ে আসে। কূটনীতিকরা এখন আর দাতা সংস্থাগুলোর অফিসে গিয়ে বিনীতভাবে বসে থাকেন না। তারা এখন ক্রেতাদের সাথে সমানে সমানে দরকষাকষি করেন। বাণিজ্যের এই শক্তি রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক ফোরামে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে। কোনো শক্তিশালী দেশ যদি অন্যায়ভাবে রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করার চেষ্টা করে, তবে রাষ্ট্র এখন নিজের অর্থনৈতিক সক্ষমতার জোরে সেই চাপ কিছুটা হলেও প্রতিহত করার সাহস দেখাতে পারে। সাহায্য থেকে বাণিজ্যে এই রূপান্তর কেবল একটি অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানের পরিবর্তন নয়। এটি মূলত একটি রাষ্ট্রের হীনমন্যতা থেকে বেরিয়ে এসে আত্মমর্যাদাবোধ নিয়ে দাঁড়ানোর এক অবিস্মরণীয় যাত্রা। এই যাত্রাপথে রাষ্ট্র অনেক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে, অনেক চড়াই-উতরাই পার হয়েছে। তারপরও শেষ পর্যন্ত তারা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে যে, দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা এবং বাস্তববাদী কূটনীতির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করা সম্ভব। একুশ শতকের বহুমুখী কূটনীতি এবং ভূ-কৌশলগত ভারসাম্য একুশ শতকে পা দেওয়ার পর বিশ্বরাজনীতির পুরো সমীকরণ আবার নতুন করে বদলাতে শুরু করে। আটলান্টিক মহাসাগর থেকে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু ধীরে ধীরে এশিয়া এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দিকে সরে আসতে থাকে। চীনের অভাবনীয় অর্থনৈতিক উত্থান এবং বৈশ্বিক পরাশক্তি হিসেবে তাদের আত্মপ্রকাশ পুরো বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক দৃশ্যপট পাল্টে দেয়। এর পাশাপাশি ভারতও একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করে। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে চীনের প্রভাব ঠেকানোর জন্য নতুন নতুন কৌশল গ্রহণ করতে শুরু করে। এই বিশাল পরাশক্তিগুলোর টানাপোড়েনের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত হওয়ার কারণে এই ভূখণ্ডটি হঠাৎ করেই চরম কৌশলগত গুরুত্ব লাভ করে। এই নতুন এবং অত্যন্ত জটিল পরিস্থিতিতে কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশের ওপর নির্ভর করে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করা আত্মঘাতী সিদ্ধান্তে পরিণত হয়। রাষ্ট্রকে বাধ্য হয়েই বহুমুখী কূটনীতি (Multilateral Diplomacy) এবং হেজিং (Hedging)-এর মতো অত্যন্ত সূক্ষ্ম কৌশল অবলম্বন করতে হয়। হেজিং মানে হলো, কোনো একটি পক্ষের সাথে স্থায়ী জোট না বেঁধে সবার সাথে একটি লাভজনক এবং ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা। এই কৌশলগত ভারসাম্যের খেলাটি আক্ষরিক অর্থেই দড়ির ওপর হাঁটার মতো। রাষ্ট্র একদিকে চীনের কাছ থেকে বিশাল বিশাল সেতু, টানেল এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য ঋণ গ্রহণ করে। কারণ দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য এই বিপুল পরিমাণ অর্থের কোনো বিকল্প নেই। একই সাথে রাষ্ট্রকে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হয় যাতে চীন এই ঋণের ফাঁদে ফেলে দেশের কোনো কৌশলগত সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ নিতে না পারে। অন্যদিকে, দেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপ। এই পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক যেকোনো মূল্যে টিকিয়ে রাখতে হয়। এর ওপর আবার প্রতিবেশী বিশাল ভারতের সাথে সম্পর্ক। ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং কানেক্টিভিটির অনেক কিছুই এই ভূখণ্ডের ওপর নির্ভরশীল। ফলে ভারতের কোনো কৌশলগত উদ্বেগকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া রাষ্ট্রের পক্ষে সম্ভব হয় না। তাত্ত্বিক জন মেয়ারশাইমার (John Mearsheimer) তাঁর আক্রমণাত্মক বাস্তববাদ (Offensive Realism) তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে, পরাশক্তিগুলো সব সময় ছোট রাষ্ট্রগুলোকে নিজেদের প্রভাব বলয়ে টেনে নিতে চায়। এই তিনটি প্রবল পরাশক্তির পরস্পরবিরোধী স্বার্থের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রটি অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় নিজেদের জাতীয় স্বার্থ আদায়ের চেষ্টা করে যাচ্ছে। এই বহুমুখী কূটনীতির আরেকটি বড় দিক হলো আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে নিজেদের সক্রিয় উপস্থিতি জানান দেওয়া। সরাসরি সামরিক বা অর্থনৈতিক শক্তি না থাকায় রাষ্ট্র মূলত নিয়মতান্ত্রিক কূটনীতির ওপর বেশি জোর দেয়। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে নিয়মিত বিপুল সংখ্যক সেনা পাঠানোর মাধ্যমে তারা বিশ্বমঞ্চে নিজেদের একটি অপরিহার্য রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বিভিন্ন বৈশ্বিক জোটে, বিশেষ করে জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর ফোরামে নেতৃত্ব দেওয়ার মাধ্যমে তারা প্রমাণ করেছে যে, ছোট রাষ্ট্র হলেও বৈশ্বিক নীতি নির্ধারণে তারা বড় ভূমিকা রাখতে সক্ষম। এই ধরনের কূটনৈতিক তৎপরতা মূলত রাষ্ট্রের জন্য এক ধরনের প্রতিরক্ষামূলক ঢাল হিসেবে কাজ করে। কোনো পরাশক্তি চাইলেই সহজে এই ধরনের একটি আন্তর্জাতিকভাবে সক্রিয় এবং দায়িত্বশীল রাষ্ট্রকে একঘরে করে রাখতে পারে না। একুশ শতকের এই জটিল এবং বহুমেরু বিশ্বে টিকে থাকার জন্য কোনো নির্দিষ্ট ফর্মুলা নেই। প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিয়ে তাৎক্ষণিক কিন্তু সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাই হলো বর্তমান পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এবং একই সাথে সবচেয়ে বড় শক্তি। ভবিষ্যৎ গতিপথ এবং পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক সমীকরণ আগামী দিনের পৃথিবীতে পররাষ্ট্রনীতির রূপরেখা কী হবে, তা নির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল। বিশ্ব প্রতিনিয়ত পাল্টাচ্ছে। প্রথাগত সামরিক হুমকির বাইরে এখন নতুন নতুন সংকট রাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সংকটটি হলো জলবায়ু পরিবর্তন। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, চরম ভাবাপন্ন আবহাওয়া এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ এই বদ্বীপ অঞ্চলের জন্য এক ভয়াবহ অস্তিত্বের সংকট তৈরি করেছে। এই ধরনের সংকটগুলো কোনো দেশের সীমানা মেনে চলে না এবং একা কোনো রাষ্ট্রের পক্ষে এগুলো মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। তাত্ত্বিক পরিভাষায় এই নতুন ধরনের হুমকিগুলোকে অ-প্রথাগত নিরাপত্তা (Non-traditional Security) বলা হয়। ভবিষ্যৎ কূটনীতির একটি বিশাল অংশ জুড়ে থাকবে এই জলবায়ু পরিবর্তন। ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক তহবিল আদায় করা, কার্বন নিঃসরণ কমানোর জন্য উন্নত দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করা এবং পরিবেশগত অভিবাসীদের অধিকার নিশ্চিত করা – এগুলোই হবে আগামী দিনের কূটনীতিকদের প্রধান কাজ। পরিবেশ কূটনীতি এখন আর কোনো বিলাসী আলোচনা নয়, এটি আক্ষরিক অর্থেই রাষ্ট্রের টিকে থাকার সংগ্রাম। এর পাশাপাশি প্রযুক্তির অভাবনীয় বিকাশ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পুরো ধরনটাই পাল্টে দিচ্ছে। সাইবার নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ডেটা নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়গুলো আগামী দিনের ভূ-রাজনীতির মূল নিয়ামক হয়ে উঠবে। যে দেশ প্রযুক্তিতে যত উন্নত হবে, আন্তর্জাতিক টেবিলে তার ক্ষমতা তত বেশি হবে। এই প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সাথে তাল মেলাতে না পারলে রাষ্ট্র আবার সেই পুরনো সাহায্যনির্ভর বা পরনির্ভরশীল যুগে ফিরে যেতে বাধ্য হবে। ডিজিটাল অর্থনীতিতে নিজেদের অবস্থান মজবুত করার জন্য পররাষ্ট্রনীতিকে নতুন করে সাজাতে হবে। প্রযুক্তি হস্তান্তর, সাইবার জোট গঠন এবং ডিজিটাল বাণিজ্যের নিয়মকানুন নিয়ে দরকষাকষি করা ভবিষ্যতের কূটনীতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হবে। সেই সাথে প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে অপ্রতিসম সম্পর্কগুলো সামলানোর চ্যালেঞ্জ তো থাকছেই। বিশাল জনসংখ্যার চাপ এবং সীমিত সম্পদের এই ভূখণ্ডকে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন উদ্ভাবনী চিন্তার মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা প্রমাণ করতে হবে। সত্তরের দশকের সেই আবেগতাড়িত এবং আদর্শবাদী যাত্রা থেকে শুরু করে আজকের এই চরম বাস্তববাদী এবং হিসেবি কূটনীতিতে পৌঁছানো মোটেও সহজ কোনো কাজ ছিল না। এটি হলো একটি রাষ্ট্রের ধীরে ধীরে পরিণত হওয়ার গল্প। তারা শিখেছে কীভাবে পরাশক্তিগুলোর চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে হয়, কীভাবে নিজেদের দুর্বলতাকে শক্তিতে পরিণত করতে হয় এবং কীভাবে চরম প্রতিকূলতার মাঝেও নিজের স্বার্থটুকু আদায় করে নিতে হয়। আগামী দিনের পৃথিবী হয়তো আরও অনেক বেশি রূঢ় এবং স্বার্থপর হবে। সেখানে টিকে থাকার জন্য আবেগ বা আদর্শের কোনো মূল্য থাকবে না। এই পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক সমীকরণে নিজেদের শেকড় শক্ত রেখে, জাতীয় স্বার্থকে ধ্রুবতারা মেনে পথ চলতে পারাই হবে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সফলতা। পররাষ্ট্রনীতির এই চলমান নদীর কোনো শেষ গন্তব্য নেই; এটি কেবল সময়ের সাথে সাথে নতুন নতুন বাঁক নেয় এবং নতুন ভূদৃশ্যের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে নিরন্তর বয়ে চলে। আঞ্চলিক শক্তির প্রতি ক্ষুদ্র দেশগুলোর কৌশল (Strategy of small countries towards regional power) ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের মনস্তত্ত্ব ও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার রূঢ় বাস্তবতা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দুনিয়ায় কোনো নির্দিষ্ট বিচারক বা আদালত নেই, যার কাছে গিয়ে দুর্বল রাষ্ট্রগুলো নিজেদের প্রতি হওয়া অন্যায়ের বিচার চাইতে পারে। পৃথিবীর মানচিত্রে যে রাষ্ট্রগুলোর আকার ছোট এবং যাদের অর্থনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতা একেবারেই সীমিত, তাদের জন্য এই অভিভাবকহীন বিশ্বব্যবস্থা অত্যন্ত ভীতিকর। একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্র যখন দেখে যে তার ঠিক পাশেই একটি বিশাল আঞ্চলিক পরাশক্তি অবস্থান করছে, তখন সেই ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের ভেতরে জন্মগতভাবেই এক ধরনের গভীর মনস্তাত্ত্বিক নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়। এই নিরাপত্তাহীনতার কারণ খুব সহজ। আঞ্চলিক শক্তিটির হয়তো আজ কোনো খারাপ উদ্দেশ্য নেই, কিন্তু আগামী দশ বা বিশ বছর পর তাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব বদলে গেলে কী হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের এই নৈরাজ্যকর এবং বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিকে তাত্ত্বিকরা সাধারণত রাষ্ট্রীয় আচরণের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করেন। একটি বিশাল হাতির পাশে ঘুমিয়ে থাকা ইঁদুরের মতো ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোকে প্রতিনিয়ত সজাগ থাকতে হয়, কারণ হাতিটি ঘুমের ঘোরে পাশ ফিরলেই ইঁদুরের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাওয়ার শঙ্কা থাকে। এই কাঠামোগত ভীতিই মূলত ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর পররাষ্ট্রনীতির প্রতিটি পদক্ষেপকে নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত করে। এই চরম বাস্তববাদী পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করার জন্য প্রখ্যাত গবেষক স্টিফেন ওয়াল্ট (Stephen Walt) একটি চমৎকার তাত্ত্বিক কাঠামো দাঁড় করিয়েছেন, যার নাম হুমকির ভারসাম্য তত্ত্ব (Balance of Threat Theory)। তাঁর বিখ্যাত বই দ্য অরিজিনস অফ অ্যালায়েন্সেস (The Origins of Alliances)-এ তিনি দেখিয়েছেন যে, রাষ্ট্রগুলো কেবল অন্য কোনো রাষ্ট্রের বিশাল সামরিক বা অর্থনৈতিক ক্ষমতা দেখেই ভয় পায় না, বরং তারা সেই ক্ষমতা ব্যবহারের পেছনের উদ্দেশ্য বা হুমকিকে মূল্যায়ন করে (Walt, 1987)। বিশাল প্রতিবেশী রাষ্ট্রটি যদি আক্রমণাত্মক আচরণ করে, সীমান্তে প্রতিনিয়ত সামরিক মহড়া চালায় বা অর্থনৈতিক অবরোধের হুমকি দেয়, তবে ক্ষুদ্র রাষ্ট্রটি সেই আচরণকে নিজের অস্তিত্বের জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবে ধরে নেয়। এই হুমকির মাত্রা যত বাড়ে, ক্ষুদ্র রাষ্ট্রটির টিকে থাকার কৌশলও তত বেশি মরিয়া এবং বহুমুখী হতে শুরু করে। তারা বুঝতে পারে যে, এককভাবে এই বিশাল শক্তির মোকাবেলা করা তাদের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়ালে তাদের পরাজয় একেবারেই অবধারিত। একারণে তারা প্রথাগত সামরিক প্রতিযোগিতার বাইরে গিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের কিছু কৌশলগত পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়। আন্তর্জাতিক দাবার বোর্ডে ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর এই টিকে থাকার নিরন্তর সংগ্রাম মূলত বুদ্ধিবৃত্তিক কূটনীতি এবং ভূ-রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের এক চরম উৎকর্ষের নিদর্শন। ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের মনস্তত্ত্বে আরেকটি বড় সংকট হলো নিজস্ব স্বকীয়তা বা পরিচয় মুছে যাওয়ার ভয়। বিশাল আঞ্চলিক শক্তিগুলো সাধারণত তাদের প্রভাব বলয়ের ভেতরে থাকা ছোট রাষ্ট্রগুলোর ওপর এক ধরনের সাংস্কৃতিক এবং আদর্শিক আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করে। তারা চায় ছোট রাষ্ট্রগুলোর রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সমাজব্যবস্থা তাদের নিজেদের ছাঁচে গড়ে উঠুক। ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর নীতিনির্ধারকরা এই সাংস্কৃতিক আগ্রাসন সম্পর্কে খুব ভালোভাবেই অবগত থাকেন। তারা জানেন যে, একবার যদি তারা আঞ্চলিক শক্তির কাছে মানসিকভাবে আত্মসমর্পণ করে ফেলেন, তবে তাদের রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক সার্বভৌমত্ব একটি কাগুজে দলিলে পরিণত হবে। ফলস্বরূপ, দেশের ভেতরে সব সময় এক ধরনের উগ্র জাতীয়তাবাদী চেতনার চর্চা জিইয়ে রাখা হয়, যা মূলত ওই বৃহৎ শক্তির সাংস্কৃতিক আধিপত্য প্রতিরোধের একটি অদৃশ্য দেয়াল হিসেবে কাজ করে। সাধারণ নাগরিকদের মনস্তত্ত্বে প্রতিবেশীর প্রতি এক ধরনের চাপা ক্ষোভ বা সন্দেহের বীজ বপন করে দেওয়া হয়। এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের রাজনৈতিক এলিটদের একটি সুপরিকল্পিত কৌশল। নিজেদের স্বাধীন সত্তা টিকিয়ে রাখার জন্য এবং বৃহৎ শক্তির চাপ মোকাবেলায় দেশের ভেতরে একটি ঐক্যবদ্ধ জনমত তৈরি করার জন্য এই ধরনের মনস্তাত্ত্বিক কৌশল অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে। ব্যালেন্সিং বা ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার কৌশল আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বেঁচে থাকার সবচেয়ে প্রাচীন এবং পরীক্ষিত কৌশলটির নাম হলো ভারসাম্য রক্ষা (Balancing)। সহজ কথায়, আপনার শত্রু যদি অনেক বেশি শক্তিশালী হয়, তবে এমন কারো সাথে হাত মেলান, যে আপনার শত্রুর সমান বা তার চেয়েও বেশি শক্তিশালী। ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলো তাদের বিশাল প্রতিবেশীর একচ্ছত্র আধিপত্য খর্ব করার জন্য মূলত বাইরের কোনো পরাশক্তিকে নিজেদের অঞ্চলে ডেকে নিয়ে আসে। এটি একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক কিন্তু প্রয়োজনীয় ভূ-রাজনৈতিক খেলা। আঞ্চলিক শক্তি সব সময় চায় তার বাড়ির আঙিনায় অন্য কোনো বৈশ্বিক পরাশক্তি যেন নাক না গলায়। অন্যদিকে ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্যই থাকে দূরবর্তী কোনো পরাশক্তির সাথে সামরিক বা কৌশলগত চুক্তি স্বাক্ষর করে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ঐতিহাসিকভাবে দেখা গেছে, দুর্বল রাষ্ট্রগুলো পরাশক্তিগুলোর নৌঘাঁটি বা সামরিক রাডার স্থাপনের জন্য নিজেদের ভূখণ্ড ছেড়ে দিয়েছে, কেবল আঞ্চলিক শত্রুর হাত থেকে বাঁচার তাগিদে। তবে আধুনিক যুগে সরাসরি সামরিক জোট গঠন করা বেশ কঠিন এবং তা অনেক সময় হিতে বিপরীত ফল বয়ে আনে। আঞ্চলিক শক্তি যদি বুঝতে পারে যে ক্ষুদ্র রাষ্ট্রটি সরাসরি তার বিরুদ্ধে সামরিক জোট করছে, তবে তারা আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারে। এই সমস্যা এড়ানোর জন্য বর্তমান সময়ের রাষ্ট্রগুলো অনেক বেশি সূক্ষ্ম একটি পথের আশ্রয় নেয়, যাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় সফট ব্যালেন্সিং (Soft Balancing) বলা হয়। প্রখ্যাত গবেষক রবার্ট পেপ (Robert Pape) তাঁর গবেষণায় এই নতুন ধারার কৌশলটি খুব সুন্দরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন (Pape, 2005)। সফট ব্যালেন্সিং হলো সরাসরি অস্ত্র হাতে তুলে না নিয়ে অর্থনৈতিক চুক্তি, কূটনৈতিক জোট এবং আন্তর্জাতিক নিয়মকানুনের মাধ্যমে শক্তিশালী রাষ্ট্রের প্রভাব কমানোর চেষ্টা করা। ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলো বাইরের পরাশক্তিগুলোর সাথে যৌথ সামরিক মহড়া করে, বিশাল অঙ্কের অস্ত্র কেনে এবং তাদের সাথে গভীর বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। এই পদক্ষেপগুলো দৃশ্যত কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে ঘোষণা করে করা হয় না, কিন্তু এর পেছনের মূল বার্তাটি আঞ্চলিক শক্তির কাছে খুব পরিষ্কারভাবেই পৌঁছে যায়। বার্তাটি হলো – “আমরা একা নই, আমাদের ওপর হাত দিলে তোমাদেরও চরম ভূ-রাজনৈতিক মূল্য চোকাতে হবে।” বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশ এই সফট ব্যালেন্সিং কৌশলটির অত্যন্ত সফল প্রয়োগ করে আসছে। তারা একদিকে যেমন বিশাল প্রতিবেশীর সাথে অমীমাংসিত সমস্যাগুলো নিয়ে টেবিলে আলোচনা চালিয়ে যায়, অন্যদিকে আবার দূরবর্তী অন্যান্য বৃহৎ শক্তির সাথে প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করে নিজেদের অবস্থান সংহত করার চেষ্টা করে। ভারসাম্য রক্ষার এই কৌশলটি বাস্তবায়নের জন্য ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোকে অত্যন্ত ধীরস্থির এবং হিসাব-নিকাশ করে পা ফেলতে হয়। একটু ভুল হলেই পুরো কৌশল ভেস্তে গিয়ে রাষ্ট্রের ওপর চরম বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। তাত্ত্বিকরা মনে করেন, ব্যালেন্সিং মূলত একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা। এর উদ্দেশ্য যুদ্ধ করা নয়, বরং যুদ্ধকে ঠেকিয়ে রাখা। আঞ্চলিক শক্তিকে একটি অদৃশ্য সীমারেখা বুঝিয়ে দেওয়া হয়, যার বাইরে তারা যেন ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার সাহস না দেখায়। অনেক সময় দেখা যায়, ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলো ইচ্ছে করেই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে নিজেদের সামরিক কেনাকাটার খবর ফলাও করে প্রচার করে। এর উদ্দেশ্য হলো প্রতিবেশীকে নিজেদের সামরিক সক্ষমতার প্রচ্ছন্ন বার্তা দেওয়া। এই পুরো প্রক্রিয়াটি এক ধরনের স্নায়ুযুদ্ধ, যেখানে সরাসরি কোনো গুলি বিনিময় হয় না, কিন্তু কূটনীতির টেবিলে প্রতিনিয়ত চরম উত্তেজনা বিরাজ করে। পরাশক্তিগুলোকে নিজেদের অঞ্চলে আমন্ত্রণ জানানোর এই কৌশল ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোকে কিছুটা শ্বাস ফেলার সুযোগ দেয় ঠিকই, কিন্তু একই সাথে এটি পুরো অঞ্চলকে বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রভাব বিস্তারের একটি স্থায়ী রণক্ষেত্রেও পরিণত করে। ব্যান্ডওয়াগনিং বনাম হেজিং: টিকে থাকার দ্বিধা ভারসাম্য রক্ষার ঠিক বিপরীত একটি কৌশল রয়েছে, যাকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তত্ত্বে ব্যান্ডওয়াগনিং (Bandwagoning) বলা হয়। এর মানে হলো, হুমকির বিরুদ্ধে লড়াই না করে সেই হুমকির সামনে বিনাশর্তে আত্মসমর্পণ করা এবং শক্তিশালী রাষ্ট্রের ছত্রছায়ায় আশ্রয় নেওয়া। অনেক সময় ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলো বুঝতে পারে যে, আঞ্চলিক শক্তির সাথে লড়াই করে টিকে থাকা তাদের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। অর্থনীতি, সামরিক শক্তি এবং ভৌগোলিক অবস্থান – সবকিছুতেই তারা এত বেশি পিছিয়ে থাকে যে, প্রতিরোধের কোনো সুযোগই অবশিষ্ট থাকে না। এমন পরিস্থিতিতে তারা বিশাল প্রতিবেশীর বশ্যতা মেনে নেয় এবং তাদের পররাষ্ট্রনীতিকে পুরোপুরি প্রতিবেশীর ইচ্ছার সাথে মিলিয়ে ফেলে। এর বিনিময়ে তারা আশা করে যে আঞ্চলিক শক্তিটি তাদের আর নতুন করে আক্রমণ করবে না এবং তাদের অর্থনৈতিক সুবিধা দেবে। কিন্তু বাস্তববাদী তাত্ত্বিকরা এই কৌশলটিকে চরম আত্মঘাতী বলে মনে করেন। কারণ একবার যদি কোনো রাষ্ট্র তার নিজের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা অন্য কারো হাতে তুলে দেয়, তবে সেই ক্ষমতা আর কখনো ফিরে পাওয়া যায় না। শক্তিশালী রাষ্ট্রটি তখন ওই ক্ষুদ্র রাষ্ট্রকে নিজের একটি উপনিবেশ বা সেবাদাস হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। ব্যান্ডওয়াগনিং-এর এই ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সচেতন থাকার কারণে আধুনিক রাষ্ট্রগুলো সাধারণত এই পথে হাঁটতে চায় না। দেশের ভেতরের সাধারণ মানুষ এবং রাজনৈতিক এলিটরাও বশ্যতা স্বীকার করার এই নীতিকে চরম অবমাননাকর বলে মনে করে। তাই তারা সম্পূর্ণ নতুন একটি মাঝামাঝি কৌশল উদ্ভাবন করেছে, যার নাম হেজিং (Hedging)। গবেষক কুইক চেং-চুই (Kuik Cheng-Chwee) তাঁর বিভিন্ন বিশ্লেষণে এই কৌশলটিকে ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর জন্য সবচেয়ে আদর্শ পথ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন (Kuik, 2008)। হেজিং হলো মূলত একটি বীমা পলিসি বা রিস্ক ম্যানেজমেন্টের মতো বিষয়। ক্ষুদ্র রাষ্ট্রটি আঞ্চলিক শক্তির সাথে অত্যন্ত সুসম্পর্ক বজায় রাখে, তাদের সাথে শীর্ষ পর্যায়ে নিয়মিত বৈঠক করে এবং তাদের অনেক অর্থনৈতিক দাবিদাওয়া হাসিমুখে মেনে নেয়। কিন্তু একই সাথে, সম্পূর্ণ গোপনে বা খুব সূক্ষ্মভাবে তারা অন্যান্য বৈশ্বিক শক্তির সাথেও কৌশলগত সম্পর্ক গভীর করতে থাকে। তারা সব ডিম এক ঝুড়িতে রাখে না। তারা আঞ্চলিক শক্তিকে এই বিশ্বাসে রাখে যে তারা অত্যন্ত অনুগত, কিন্তু বাস্তবে তারা নিজেদের বাঁচার জন্য বিকল্প পথ সব সময় খোলা রাখে। এটি এক ধরনের কূটনৈতিক দ্বৈত নীতি, যা টিকে থাকার জন্য অত্যন্ত জরুরি। হেজিং কৌশলটি প্রয়োগ করতে প্রচুর কূটনৈতিক দক্ষতার প্রয়োজন হয়। ক্ষুদ্র রাষ্ট্রটিকে সব সময় দুই নৌকায় পা দিয়ে চলতে হয়। তারা এমন কোনো জোটে যোগ দেয় না, যা আঞ্চলিক শক্তিকে সরাসরি খেপিয়ে তুলবে। আবার তারা আঞ্চলিক শক্তির কোনো আধিপত্যবাদী নীতিকেও প্রকাশ্যে পূর্ণাঙ্গ সমর্থন দেয় না। তারা সব সময় একটি ধূসর বা অস্পষ্ট অবস্থানে থাকার চেষ্টা করে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো আঞ্চলিক পরাশক্তি হয়তো ক্ষুদ্র রাষ্ট্রটিকে তাদের নিজেদের তৈরি করা একটি নির্দিষ্ট সামরিক জোটে যোগ দেওয়ার জন্য প্রবল চাপ দিচ্ছে। ক্ষুদ্র রাষ্ট্রটি তখন সরাসরি “না” বলে না। তারা হয়তো বলে যে তাদের দেশের সংবিধান অনুযায়ী কোনো সামরিক জোটে যোগ দেওয়ার সুযোগ নেই, অথবা তারা বিষয়টি নিয়ে দেশের ভেতরে দীর্ঘমেয়াদী পর্যালোচনার ভান করে বছরের পর বছর সময়ক্ষেপণ করতে থাকে। এইভাবে তারা আঞ্চলিক শক্তিকে সরাসরি অগ্রাহ্য করার ঝুঁকি এড়িয়ে যায়, আবার নিজেদের স্বাধীন সত্তাকেও রক্ষা করে। হেজিং মূলত সময় কেনার একটি চমৎকার খেলা। এই সময়ের মধ্যে ক্ষুদ্র রাষ্ট্রটি নিজেদের অর্থনৈতিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে, যেখানে তাদের ওপর জোর করে কিছু চাপিয়ে দেওয়া আর সম্ভব হয় না। ভূ-রাজনৈতিক দড়াবাজি ও বহুপাক্ষিক কূটনীতি দ্বিপাক্ষিক আলোচনার টেবিলে একটি বিশাল শক্তির সামনে একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের অবস্থান সব সময়ই অত্যন্ত নাজুক থাকে। সেখানে যুক্তির চেয়ে ক্ষমতার দম্ভ অনেক বেশি কথা বলে। বিশাল রাষ্ট্রটি টেবিলের এক প্রান্তে বসে তার নিজস্ব শর্তগুলো একে একে চাপিয়ে দেয়, আর ক্ষুদ্র রাষ্ট্রটিকে বাধ্য হয়ে অনেক কিছু মেনে নিতে হয়। এই কাঠামোগত বৈষম্য থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলো সাধারণত দ্বিপাক্ষিক আলোচনা এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে। এর বদলে তারা সব সমস্যাকে আন্তর্জাতিকীকরণ করতে চায়। তারা দ্বিপাক্ষিক সমস্যাগুলোকে টেনে নিয়ে যায় জাতিসংঘ, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা বা বিভিন্ন আঞ্চলিক ফোরামের মতো বড় মঞ্চে। এই কৌশলটিকে বলা হয় বহুপাক্ষিক কূটনীতি (Multilateral Diplomacy)। তাত্ত্বিক রবার্ট কিওহ্যান (Robert Keohane) তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এবং চুক্তিগুলো শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর ওপর এক ধরনের নিয়মতান্ত্রিক শৃঙ্খলা আরোপ করে (Keohane, 1984)। যখন পঞ্চাশ বা একশটি দেশ একসাথে বসে কোনো নিয়ম তৈরি করে, তখন একটি বিশাল পরাশক্তির পক্ষেও সহজে সেই নিয়ম ভেঙে ফেলা সম্ভব হয় না। ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলো মূলত আন্তর্জাতিক আইন এবং সনদের এই সুরক্ষাকবচটিকেই নিজেদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থাগুলোও ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর জন্য একটি বড় অস্ত্র হিসেবে কাজ করে। দক্ষিণ এশিয়ায় সার্ক বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আসিয়ানের মতো সংগঠনগুলো মূলত ছোট দেশগুলোর সম্মিলিত কণ্ঠস্বর হিসেবে তৈরি হয়েছিল। একটি ছোট দেশের কথার হয়তো কোনো ওজন নেই, কিন্তু পাঁচটি ছোট দেশ যখন একসাথে হয়ে একটি আঞ্চলিক ব্লকের মাধ্যমে কথা বলে, তখন বড় শক্তিগুলো তাদের কথা শুনতে বাধ্য হয়। এই ফোরামগুলোতে প্রতিটি দেশের একটি করে ভোট থাকে, ফলে ক্ষমতার প্রথাগত পার্থক্য এখানে কিছুটা হলেও কমে আসে। আঞ্চলিক পরাশক্তিরা সব সময় এই ধরনের বহুপাক্ষিক ফোরামগুলোকে এড়িয়ে চলতে চায় এবং দ্বিপাক্ষিক আলোচনার ওপর জোর দেয়, যাতে তারা ছোট দেশগুলোকে আলাদা আলাদাভাবে নিজেদের সুবিধামতো চাপ দিতে পারে। অন্যদিকে ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলো যেকোনো মূল্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে তাদের সমস্যাগুলোর সাথে যুক্ত রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে। তারা মানবাধিকার, পরিবেশ রক্ষা বা মুক্ত বাণিজ্যের মতো আন্তর্জাতিক মানদণ্ডগুলোকে সামনে নিয়ে আসে, যাতে আঞ্চলিক শক্তিকে বিশ্ব জনমতের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যায়। বহুপাক্ষিক কূটনীতির আরেকটি বড় সুবিধা হলো, এটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোকে বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তের দেশগুলোর সাথে সংযোগ স্থাপনের সুযোগ করে দেয়। তারা আফ্রিকা বা ল্যাটিন আমেরিকার সমমনা দেশগুলোর সাথে জোট বাঁধে। এই বৈশ্বিক নেটওয়ার্কিং আঞ্চলিক শক্তির মনস্তত্ত্বের ওপর একটি প্রচ্ছন্ন চাপ সৃষ্টি করে। আঞ্চলিক শক্তি বুঝতে পারে যে, তারা যদি ক্ষুদ্র রাষ্ট্রটির ওপর কোনো অন্যায় সামরিক বা অর্থনৈতিক আগ্রাসন চালায়, তবে আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে তাদের নিজেদের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ণ হবে। এটি তাদের বৈশ্বিক পরাশক্তি হওয়ার পথে একটি বড় বাধা হিসেবে কাজ করবে। ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলো খুব সুকৌশলে আঞ্চলিক শক্তির এই ‘পরাশক্তি হওয়ার আকাঙ্ক্ষা’-কে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে। তারা আঞ্চলিক শক্তিকে বোঝানোর চেষ্টা করে যে, একজন দায়িত্বশীল বৈশ্বিক নেতা হতে হলে আগে নিজের প্রতিবেশীদের সাথে ন্যায়সংগত এবং উদার আচরণ করতে হবে। আন্তর্জাতিক আইনের দোহাই দিয়ে এবং বহুপাক্ষিক ফোরামের ছাতা ব্যবহার করে, ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলো মূলত আঞ্চলিক শক্তির পেশিশক্তিকে একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির ভেতরে আটকে রাখার নিরন্তর এক ভূ-রাজনৈতিক দড়াবাজি চালিয়ে যায়। অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা হ্রাস এবং বিকল্পের সন্ধান আধুনিক পৃথিবীতে কোনো দেশকে ঘায়েল করার জন্য সৈন্য বা ট্যাংক পাঠানোর প্রয়োজন পড়ে না। অর্থনীতির চাকা বন্ধ করে দেওয়াই হলো সবচেয়ে মোক্ষম অস্ত্র। আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলো সাধারণত ভৌগোলিক সুবিধার কারণে তাদের ছোট প্রতিবেশীদের অর্থনীতির ওপর এক ধরনের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে ফেলে। ট্রানজিট রুট, নদীপথ, সমুদ্রবন্দর এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার – প্রায় সবকিছুর জন্যই ক্ষুদ্র রাষ্ট্রকে ওই বিশাল প্রতিবেশীর ওপর নির্ভর করতে হয়। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ আলবার্ট হার্শম্যান (Albert Hirschman) তাঁর যুগান্তকারী গ্রন্থ ন্যাশনাল পাওয়ার অ্যান্ড দ্য স্ট্রাকচার অফ ফরেন ট্রেড (National Power and the Structure of Foreign Trade)-এ দেখিয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কীভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বিস্তারের একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয় (Hirschman, 1945)। যখন একটি ছোট দেশের মোট বাণিজ্যের সিংহভাগ একটি বড় দেশের সাথে যুক্ত থাকে, তখন ওই ছোট দেশটির রাজনৈতিক স্বাধীনতা বলে আর কিছু অবশিষ্ট থাকে না। বড় দেশ চাইলেই সীমান্ত বন্ধ করে দিয়ে ছোট দেশে চরম মূল্যস্ফীতি বা খাদ্যসংকট তৈরি করতে পারে। এই ভয়াবহ অর্থনৈতিক জিম্মিদশা থেকে বাঁচার জন্য ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলো মরিয়া হয়ে বিকল্প পথ খুঁজতে থাকে। অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা কমানোর এই প্রক্রিয়ায় ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলো তাদের বাণিজ্যের বহুমুখীকরণ বা ডাইভারসিফিকেশনের ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেয়। তারা বুঝতে পারে যে, একটি মাত্র দেশের বাজারের ওপর নির্ভর করে থাকাটা নিজেদের গলায় নিজেরাই ফাঁসির দড়ি পরানোর সমান। তাই তারা পৃথিবীর অন্য প্রান্তের দেশগুলোর সাথে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) করার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে। তারা নিজেদের দেশের ভেতর বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করার জন্য নানা রকম কর ছাড় এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি করে। সবচেয়ে বড় চেষ্টাটি থাকে যোগাযোগ অবকাঠামোর ক্ষেত্রে। আঞ্চলিক শক্তির ওপর ট্রানজিটের নির্ভরতা কমানোর জন্য তারা নিজেদের খরচে বা বাইরের কোনো পরাশক্তির ঋণে গভীর সমুদ্রবন্দর তৈরি করে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জাহাজগুলো আর প্রতিবেশীর বন্দরের ওপর নির্ভর না করে সরাসরি তাদের দেশে এসে ভিড়তে পারে। এই অবকাঠামোগত স্বাধীনতা মূলত তাদের পররাষ্ট্রনীতিকে এক বিশাল মুক্তি এনে দেয়। তারা তখন আঞ্চলিক শক্তির যেকোনো অর্থনৈতিক অবরোধের হুমকিকে থোড়াই কেয়ার করার সাহস দেখাতে পারে। বিকল্প খোঁজার এই লড়াইটি অত্যন্ত কঠিন এবং সময়সাপেক্ষ। আঞ্চলিক পরাশক্তি কখনোই চায় না যে তার প্রভাব বলয় থেকে কোনো দেশ অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন হয়ে যাক। তারা নানা রকম কূটকৌশল ব্যবহার করে বিকল্প বাজার বা বন্দর তৈরির প্রকল্পগুলোতে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে। তারা অনেক সময় তাদের নিজস্ব গোয়েন্দা সংস্থা বা মিডিয়া ব্যবহার করে ওই প্রকল্পগুলোর বিরুদ্ধে ছোট দেশের ভেতরেই পরিবেশবাদী বা রাজনৈতিক আন্দোলন উসকে দেয়। এই ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের চরম ধৈর্য এবং দূরদৃষ্টির পরিচয় দিতে হয়। তাদের দেশের সাধারণ মানুষকে বোঝাতে হয় যে, সাময়িক কিছু অর্থনৈতিক কষ্ট বা পরিবেশগত ক্ষতি মেনে নিয়ে হলেও দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত স্বাধীনতার জন্য এই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা অপরিহার্য। অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতার এই শেকল ভাঙতে না পারলে কোনো হেজিং বা ব্যালেন্সিং কৌশলই শেষ পর্যন্ত কার্যকর হয় না। কারণ পেটে ক্ষুধা থাকলে আন্তর্জাতিক দাবার বোর্ডে কোনো চতুর চালই কাজে আসে না। তাই নিজেদের অর্থনীতিকে আঞ্চলিক শক্তির বলয় থেকে বের করে একটি বৈশ্বিক কাঠামোর সাথে যুক্ত করাই ক্ষুদ্র দেশগুলোর সবচেয়ে বড় কৌশলগত বিজয়। দক্ষিণ এশিয়ার বাস্তবতা ও শক্তির সমীকরণ তাত্ত্বিক আলোচনাগুলো বাস্তবে কীভাবে কাজ করে, তা বোঝার জন্য একটি নির্দিষ্ট ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রের দিকে তাকানো যেতে পারে। আমাদের এই দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলটি এর একটি ধ্রুপদী উদাহরণ। এই অঞ্চলের মানচিত্রটি অত্যন্ত অদ্ভুত। মাঝখানে একটি বিশাল আয়তন এবং বিপুল জনসংখ্যার দেশ, আর তার চারপাশ ঘিরে রয়েছে বেশ কয়েকটি ছোট ছোট দেশ। এই ছোট দেশগুলোর নিজেদের মধ্যে সরাসরি কোনো ভৌগোলিক সংযোগ নেই, তাদের সবার সীমান্ত গিয়ে মিশেছে ওই মাঝখানের বিশাল দেশটির সাথে। এটিকে তাত্ত্বিকরা সাধারণত ‘হাব অ্যান্ড স্পোক’ বা চাকার কেন্দ্রের সাথে স্পোকের সম্পর্কের মতো একটি মডেল বলে থাকেন। এই ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে বিশাল দেশটিকে প্রাকৃতিকভাবেই এই অঞ্চলের একচ্ছত্র অধিপতি হিসেবে ধরে নেওয়া হতো। দশকের পর দশক ধরে ছোট দেশগুলো এই বলয়ের ভেতরে আটকা পড়ে ছিল এবং তাদের পররাষ্ট্রনীতির খুব একটা স্বাধীন কোনো গতিপথ ছিল না। তারা মূলত ওই আঞ্চলিক শক্তির ইচ্ছা এবং অনিচ্ছার ওপর নির্ভর করেই তাদের রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তগুলো গ্রহণ করত। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই পুরো দৃশ্যপট নাটকীয়ভাবে পাল্টে গেছে। এই পরিবর্তনের মূল কারণ হলো এশিয়ার আরেক প্রান্তে থাকা এক বিশাল অর্থনৈতিক এবং সামরিক শক্তির অভাবনীয় উত্থান। সেই নতুন পরাশক্তিটি তার উদ্বৃত্ত পুঁজি এবং বিপুল প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নিয়ে এই অঞ্চলে প্রবেশ করেছে। তারা ছোট দেশগুলোকে বিশাল বিশাল অবকাঠামো নির্মাণের প্রস্তাব দিচ্ছে এবং তার জন্য অঢেল ঋণ সরবরাহ করছে। এই নতুন শক্তির প্রবেশ ছোট দেশগুলোর জন্য যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচার একটি সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। তারা অবশেষে তাদের সেই বহু আকাঙ্ক্ষিত ‘বিকল্প’ বা হেজিং করার মতো একটি শক্ত খুঁটি খুঁজে পেয়েছে। এখন আর ছোট দেশগুলোকে আগের মতো আঞ্চলিক শক্তির রক্তচক্ষুকে ভয় পেতে হয় না। তারা খুব সহজেই এক পরাশক্তিকে আরেক পরাশক্তির ভয় দেখিয়ে নিজেদের ফায়দা লুটে নেওয়ার খেলা শুরু করেছে। তারা একদিকে আঞ্চলিক শক্তির সাথে কানেক্টিভিটি বাড়ানোর চুক্তি করছে, অন্যদিকে নতুন পরাশক্তির কাছ থেকে সামরিক সরঞ্জাম বা সাবমেরিন কিনে নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করছে। এই ভূ-রাজনৈতিক কৌশলটি ছোট দেশগুলোকে অভূতপূর্ব একটি দরকষাকষির ক্ষমতা এনে দিয়েছে। তবে এই খেলাটি মোটেও বিপদমুক্ত নয়। দুই বিশাল হাতির লড়াইয়ের মাঝখানে পড়ে ছোট দেশগুলোর পিষ্ট হওয়ার একটি বড় শঙ্কা সব সময়ই থেকে যায়। নতুন পরাশক্তির কাছ থেকে অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ করে অনেক দেশ ইতিমধ্যেই ভয়াবহ অর্থনৈতিক ফাঁদে আটকা পড়েছে এবং তাদের কৌশলগত বন্দরগুলোর নিয়ন্ত্রণ হারাতে বসেছে। অন্যদিকে, পুরনো আঞ্চলিক শক্তিও তাদের হারানো প্রভাব ফিরে পাওয়ার জন্য নতুন নতুন চাপ প্রয়োগের কৌশল অবলম্বন করছে। ছোট দেশগুলোর রাজনৈতিক নেতৃত্বকে এখন অত্যন্ত সাবধানে এই দুই শক্তির মধ্যকার ভারসাম্য রক্ষা করে চলতে হচ্ছে। একটু বেশি ঝুঁকে পড়লেই তারা ঋণখেলাপি হয়ে সার্বভৌমত্ব হারাতে পারে, আবার একটু বেশি দূরে সরে গেলে আঞ্চলিক শক্তির রোষানলে পড়ে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মুখে পড়তে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার এই পরিবর্তিত শক্তির সমীকরণ প্রমাণ করে যে, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলো কখনোই কেবল নীরব দর্শক নয়। সঠিক কৌশল এবং ধূর্ততার মাধ্যমে তারা নিজেদের নিয়তি নিজেরাই নির্ধারণ করতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন হয় আবেগহীন বাস্তববাদ এবং চরম নিখুঁত ভূ-রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক (Relations with countries in South Asia) দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও কাঠামোগত অসংলগ্নতা বিশ্বের মানচিত্রের দিকে তাকালে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলটিকে খুব সহজেই একটি একক ভৌগোলিক খণ্ড হিসেবে আলাদা করা যায়। উত্তরে বিশাল হিমালয় পর্বতমালা আর দক্ষিণে ভারত মহাসাগর এই অঞ্চলটিকে পৃথিবীর বাকি অংশ থেকে প্রাকৃতিকভাবেই বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। হাজার বছর ধরে এই ভূখণ্ডের মানুষের ইতিহাস, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাত্রার মধ্যে এক বিস্ময়কর মিল রয়ে গেছে। এত বেশি মিল থাকার পরও, আধুনিক আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিসংখ্যানে দক্ষিণ এশিয়া হলো বিশ্বের অন্যতম কম সংযুক্ত বা লিস্ট ইন্টিগ্রেটেড একটি অঞ্চল। আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্য, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং পারস্পরিক আস্থার দিক থেকে এই অঞ্চলের দেশগুলো একে অপরের থেকে যোজন যোজন দূরে অবস্থান করছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন বা আসিয়ানের মতো জোটগুলো যেখানে নিজেদের ভেতরের সীমান্তগুলোকে প্রায় অদৃশ্য করে ফেলেছে, সেখানে দক্ষিণ এশিয়ার সীমান্তগুলো দিন দিন আরও বেশি দুর্ভেদ্য এবং কাঁটাতারে ঘেরা হচ্ছে। তাত্ত্বিক আর্নস্ট হাস (Ernst Haas) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ দ্য ইউনাইটিং অফ ইউরোপ (The Uniting of Europe)-এ নব্য-ক্রিয়াবাদ (Neo-functionalism) তত্ত্বের মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে, ছোট ছোট অর্থনৈতিক সহযোগিতার মাধ্যমে কীভাবে রাষ্ট্রগুলো রাজনৈতিকভাবেও একীভূত হতে পারে (Haas, 1958)। ইউরোপ যদি কয়লা এবং ইস্পাতের ব্যবসার ওপর ভিত্তি করে এক হতে পারে, তবে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো কেন নদী, সড়ক বা অভিন্ন সংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করে এক হতে পারছে না – এই প্রশ্নটি কূটনীতিবিদদের প্রতিনিয়ত ভাবায়। বাস্তবে এই অঞ্চলের কাঠামোগত অসংলগ্নতার শেকড় অনেক গভীরে প্রোথিত, যা মূলত দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক অবিশ্বাসের ফসল। এই অঞ্চলের কাঠামোগত দুর্বলতার পেছনে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব রয়ে গেছে। ব্রিটিশরা বিদায় নেওয়ার সময় মানচিত্রে যে রেখাগুলো টেনে দিয়েছিল, তা কেবল ভৌগোলিক সীমারেখাই ছিল না, সেগুলো ছিল মানুষের মনের ভেতরে তৈরি করে দেওয়া স্থায়ী বিভেদের দেয়াল। এই দেয়ালগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যে, একটি দেশের সাথে অন্য দেশের সব সময় কোনো না কোনো অমীমাংসিত বিরোধ থেকেই যায়। ফলে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে যাত্রা শুরু করার পর থেকেই প্রতিটি দেশ তার প্রতিবেশীকে বন্ধু ভাবার বদলে সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে দেখতে শুরু করে। এই মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বের কারণে এই অঞ্চলের দেশগুলোর নিজেদের মধ্যকার বাণিজ্যের পরিমাণ তাদের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের ৫ শতাংশেরও কম, যা সত্যিই বেশ হতাশাজনক। দেশগুলো নিজেদের ঘরের পাশের বাজার থেকে সস্তায় পণ্য না কিনে, হাজার মাইল দূরের দেশ থেকে বেশি দামে পণ্য আমদানি করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। এই অর্থনৈতিক স্থবিরতা মূলত রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবেরই একটি নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। কূটনীতির টেবিলে সবাই আঞ্চলিক সহযোগিতার বড় বড় কথা বললেও, বাস্তবে সামান্য শুল্ক ছাড় দিতে বা একটি ট্রানজিট রুট খুলে দিতে বছরের পর বছর সময় পার করে দেওয়া হয়। এই ভূখণ্ডের পররাষ্ট্রনীতির একটি বড় অংশ জুড়ে থাকে এই কাঠামোগত বাধাগুলো ডিঙিয়ে প্রতিবেশীদের সাথে একটি সম্মানজনক এবং লাভজনক কাজের সম্পর্ক তৈরি করার নিরন্তর চেষ্টা। সার্কের উত্থান, পতন এবং বহুপাক্ষিকতার সংকট আঞ্চলিক সহযোগিতার এই স্থবির অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য আশির দশকে একটি বড় ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে প্রথম এমন একটি আঞ্চলিক জোট গঠনের প্রস্তাব বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরে, যা এই ভূখণ্ডের ভাগ্য বদলে দিতে পারত। এই প্রস্তাবের আলোকেই জন্ম নেয় সাউথ এশিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর রিজিওনাল কোঅপারেশন বা সার্ক (SAARC)। শুরুতে এই জোটটিকে ঘিরে সাধারণ মানুষের মনে ব্যাপক আশা তৈরি হয়েছিল। মনে করা হয়েছিল যে, ইউরোপের মতো দক্ষিণ এশিয়াও হয়তো একদিন একটি একক বাজার ব্যবস্থায় পরিণত হবে। সার্কের মূল ভিত্তি ছিল বহুপাক্ষিকতাবাদ (Multilateralism)। তাত্ত্বিক অমিতাভ আচার্য (Amitav Acharya) তাঁর গবেষণায় আঞ্চলিকতাবাদ (Regionalism)-এর ধারণাটি বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, একই ভৌগোলিক অঞ্চলের দেশগুলো অভিন্ন নিয়মনীতির মাধ্যমে নিজেদের অর্থনৈতিক এবং নিরাপত্তাজনিত সমস্যাগুলো অনেক সহজে সমাধান করতে পারে (Acharya, 2014)। সার্কের গঠনতন্ত্রে খুব সতর্কতার সাথে এই বিষয়টি মাথায় রাখা হয়েছিল যে, বড় বা ছোট – সব দেশের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এখানে সমান থাকবে এবং কোনো দ্বিপাক্ষিক বিরোধ এই বহুপাক্ষিক মঞ্চে আলোচনা করা যাবে না। উদ্দেশ্য ছিল খুব পরিষ্কার, রাজনৈতিক বিরোধগুলো দূরে সরিয়ে রেখে অন্তত দারিদ্র্য বিমোচন, কৃষি, শিক্ষা এবং বাণিজ্যের মতো অরাজনৈতিক বিষয়গুলোতে একসাথে কাজ করা। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সার্কের এই সুন্দর স্বপ্নটি রূঢ় বাস্তবতার কাছে মুখ থুবড়ে পড়ে। সার্ক শীর্ষ সম্মেলনগুলো ধীরে ধীরে কেবল রাষ্ট্রনেতাদের ছবি তোলার আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়। দক্ষিণ এশীয় মুক্ত বাণিজ্য এলাকা বা সাফটা (SAFTA) চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও বাস্তবায়নের অভাবে তা মূলত কাগজের দলিলেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। সার্কের এই পতনের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ ছিল জোটের ভেতরে থাকা দেশগুলোর একে অপরের প্রতি তীব্র আস্থাহীনতা। গঠনতন্ত্রে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের যে নিয়ম রাখা হয়েছিল, সেটিই শেষ পর্যন্ত এর সবচেয়ে বড় দুর্বলতায় পরিণত হয়। যেকোনো একটি দেশ কোনো প্রস্তাবে রাজি না হলে পুরো প্রক্রিয়াটি স্থবির হয়ে পড়ত। ফলে বড় ধরনের কোনো আঞ্চলিক প্রকল্প বা অবকাঠামো নির্মাণ কখনোই আলোর মুখ দেখেনি। তাত্ত্বিকরা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এই পরিস্থিতিকে গঠনবাদ (Constructivism) দিয়ে ব্যাখ্যা করেন, যেখানে রাষ্ট্রের পরিচয় এবং ইতিহাস তাদের পারস্পরিক আচরণকে নিয়ন্ত্রিত করে। দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষেত্রে এই ইতিহাসটি ছিল সংঘাতের। ফলে সার্কের মতো একটি আধুনিক প্রতিষ্ঠান তৈরি করলেও, নেতাদের মানসিকতা পুরনো সেই সন্দেহ এবং অবিশ্বাসের বৃত্তেই আটকে ছিল। একটি আঞ্চলিক জোট কেবল সদর দপ্তর আর কিছু আমলা দিয়ে চলতে পারে না, এর জন্য প্রয়োজন হয় প্রবল রাজনৈতিক সদিচ্ছার, যা সার্কের ক্ষেত্রে সবসময়ই অনুপস্থিত ছিল। ভারত-পাকিস্তান বৈরিতা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার স্থবিরতা দক্ষিণ এশিয়ার যেকোনো ভূ-রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে অবধারিতভাবেই ভারত এবং পাকিস্তানের নাম চলে আসে। এই দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী এবং জটিল বৈরিতা পুরো অঞ্চলের উন্নয়ন এবং সহযোগিতাকে জিম্মি করে রেখেছে। ১৯৪৭ সালের পর থেকে এই দুই প্রতিবেশীর মধ্যে একাধিক বড় ধরনের যুদ্ধ হয়েছে এবং প্রতিনিয়ত সীমান্তে এক ধরনের স্নায়ুযুদ্ধ লেগেই আছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিভাষায় এই পরিস্থিতিকে বলা হয় নিরাপত্তা সংকট (Security Dilemma)। গবেষক টি. ভি. পল (T. V. Paul) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ দ্য ইন্ডিয়া-পাকিস্তান কনফ্লিক্ট: অ্যান এনডিউরিং রাইভ্যালরি (The India-Pakistan Conflict: An Enduring Rivalry)-এ বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করেছেন যে, কীভাবে এই দুই দেশের শত্রুতা একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে এবং তা এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশের জন্য বিরাট বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে (Paul, 2005)। দুই দেশই পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হওয়ায় সরাসরি কোনো বড় যুদ্ধে জড়ানো তাদের পক্ষে সম্ভব নয়, কিন্তু তারা প্রতিনিয়ত একে অপরের বিরুদ্ধে ছায়াযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। এই ছায়াযুদ্ধের খেসারত দিতে হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার সাধারণ মানুষকে। ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যে বাণিজ্য প্রায় শূন্যের কোঠায়, যার ফলে পুরো অঞ্চলের বাণিজ্যের সূচকটি আশঙ্কাজনকভাবে নিচের দিকে নেমে আছে। এই দুই বৃহৎ প্রতিবেশীর রেষারেষির কারণে সার্কের মতো জোটগুলো পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ভারত এবং পাকিস্তান মূলত সার্কের মঞ্চটিকে একে অপরকে আক্রমণ করার এবং কূটনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। পাকিস্তান যদি কোনো ভালো প্রস্তাব নিয়ে আসে, ভারত তা সন্দেহের চোখে দেখে বাতিল করে দেয়। একইভাবে ভারতের কোনো কানেক্টিভিটি বা ট্রানজিটের প্রস্তাবে পাকিস্তান ভেটো দিয়ে বসে। এই দুই দেশের বিরোধের কারণে সার্কের সম্মেলনগুলো বছরের পর বছর পিছিয়ে যায়। এই পরিস্থিতিকে বলা যায় অবরুদ্ধ ভূ-রাজনীতি (Deadlocked Geopolitics)। এই অবরুদ্ধ অবস্থার কারণে এই অঞ্চলের অন্যান্য ছোট দেশগুলো চরম হতাশায় ভোগে। তারা বুঝতে পারে যে, ভারত-পাকিস্তানের সমস্যা সমাধান না হওয়া পর্যন্ত পুরো দক্ষিণ এশিয়াকে নিয়ে একসাথে এগিয়ে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। ফলে বাধ্য হয়েই অনেক দেশ আঞ্চলিক সহযোগিতার বিকল্প পথ খুঁজতে শুরু করে। একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের দুটি বড় রাষ্ট্র যখন নিজেদের রাজনৈতিক অহমিকার কারণে পুরো অঞ্চলের অর্থনীতিকে স্থবির করে রাখে, তখন সেই অঞ্চলের বাকি দেশগুলোর জন্য একটি স্বাধীন এবং কার্যকর পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করা ভীষণ কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। নেপাল ও ভুটানের সাথে সম্পর্ক: উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার নতুন রূপরেখা সার্কের স্থবিরতা এবং বড় প্রতিবেশীদের মধ্যকার অন্তহীন বিরোধের কারণে পররাষ্ট্রনীতির গতিপথ কিছুটা পরিবর্তন করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে। পুরো দক্ষিণ এশিয়াকে একসাথে নিয়ে চলার স্বপ্ন বাদ দিয়ে রাষ্ট্রগুলো ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে কাজ করার উদ্যোগ নেয়। এই নতুন ধারণার নাম দেওয়া হয় উপ-আঞ্চলিকতাবাদ (Sub-regionalism)। প্রখ্যাত তাত্ত্বিক ব্যারি বুজান (Barry Buzan) এবং ওলে ওয়েভার (Ole Wæver) তাঁদের রিজিয়নস অ্যান্ড পাওয়ারস (Regions and Powers) বইয়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তা বলয় (Regional Security Complex) তত্ত্বের মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে, একটি বড় সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের ভেতরেও ছোট ছোট রাষ্ট্রগুলো নিজেদের অর্থনৈতিক এবং কৌশলগত স্বার্থে আলাদা বলয় তৈরি করতে পারে (Buzan & Waever, 2003)। এই তত্ত্বের আলোকেই জন্ম নেয় বিবিআইএন (BBIN) উদ্যোগ, যার মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ, ভুটান, ইন্ডিয়া এবং নেপাল। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো ভারত-পাকিস্তানের জটিল রাজনীতিকে পাশ কাটিয়ে এই চার দেশের মধ্যে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ, ট্রানজিট এবং জ্বালানি বাণিজ্য বৃদ্ধি করা। এই কৌশলটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর জন্য এক বিশাল সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়। নেপাল এবং ভুটানের মতো স্থলবেষ্টিত দেশগুলো এই উপ-আঞ্চলিক কাঠামোর মাধ্যমে খুব সহজেই সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের সুযোগ পেতে পারে, যা তাদের অর্থনীতির জন্য একটি গেম চেঞ্জার হতে পারে। নেপাল এবং ভুটানের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নের বিষয়টি পররাষ্ট্রনীতিতে এক বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এই দুই দেশ হিমালয়ের কোলে অবস্থিত হওয়ায় তাদের কাছে প্রচুর পরিমাণে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রাকৃতিক সুবিধা রয়েছে। অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির কারণে এই বদ্বীপ অঞ্চলের বিদ্যুতের চাহিদা ব্যাপক হারে বাড়ছে। ভুটান বা নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করার জন্য ভারতের ওপর দিয়ে ট্রান্সমিশন লাইন বা গ্রিড বসানোর কাজ শুরু হয়েছে। এটি কেবল একটি বাণিজ্যিক চুক্তি নয়, এটি হলো দীর্ঘমেয়াদী আন্তঃনির্ভরশীলতা (Interdependence)-এর এক চমৎকার উদাহরণ। জ্বালানি বাণিজ্যের এই সম্পর্ক রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক আস্থার ভিত্তি মজবুত করে। সেই সাথে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয়ের বরফ গলার যে ক্ষতিকর প্রভাব ভাটি অঞ্চলের দেশগুলোর ওপর পড়ছে, তা মোকাবেলা করার জন্য এই দেশগুলোর যৌথভাবে কাজ করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। উপ-আঞ্চলিক কাঠামোর মাধ্যমে এই দেশগুলো আন্তর্জাতিক ফোরামে পরিবেশ রক্ষার দাবিতে একসাথে আওয়াজ তুলতে পারে। সার্কের বিশাল এবং অকার্যকর ছাতার নিচ থেকে বেরিয়ে এসে এই ধরনের ছোট কিন্তু কার্যকর উদ্যোগগুলো মূলত দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতিতে এক নতুন এবং বাস্তববাদী যুগের সূচনা করেছে। শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ এবং সামুদ্রিক কূটনীতির ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব স্থলভাগের প্রতিবেশীদের পাশাপাশি সমুদ্র তীরবর্তী এবং দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর সাথে সম্পর্কের সমীকরণও দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে বিরাট পরিবর্তন আনছে। শ্রীলঙ্কা এবং মালদ্বীপের মতো দেশগুলো অনেক সময় মূল ভূখণ্ডের রাজনৈতিক ডামাডোলে কিছুটা আড়ালে থেকে যায়। কিন্তু বিশ্ববাণিজ্যের সিংহভাগ যেহেতু সমুদ্রপথে পরিবাহিত হয়, তাই এই দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর কৌশলগত গুরুত্ব অভাবনীয়। ভারত মহাসাগরের ঠিক মাঝখানে অবস্থান করার কারণে শ্রীলঙ্কা মূলত পূর্ব এবং পশ্চিমের মধ্যে সংযোগকারী একটি প্রধান সেতু হিসেবে কাজ করে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিমণ্ডলে এখন ভূমিভিত্তিক কূটনীতির পাশাপাশি নীল অর্থনীতি (Blue Economy) এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা (Maritime Security) অনেক বড় জায়গা দখল করে নিয়েছে। গবেষক রবার্ট কাপলান (Robert Kaplan) তাঁর আলোড়ন সৃষ্টিকারী গ্রন্থ মনসুন: দ্য ইন্ডিয়ান ওশান অ্যান্ড দ্য ফিউচার অফ আমেরিকান পাওয়ার (Monsoon: The Indian Ocean and the Future of American Power)-এ খুব স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন যে, একুশ শতকের বৈশ্বিক ক্ষমতার লড়াই মূলত ভারত মহাসাগরের নিয়ন্ত্রণ নিয়েই হবে (Kaplan, 2010)। এই বাস্তবতায় শ্রীলঙ্কা এবং মালদ্বীপের মতো দেশগুলোর সাথে গভীর বাণিজ্যিক এবং কৌশলগত সম্পর্ক তৈরি করা যেকোনো দেশের পররাষ্ট্রনীতির জন্য অত্যন্ত জরুরি। শ্রীলঙ্কার কলম্বো বন্দর এই অঞ্চলের নৌ-বাণিজ্যের একটি প্রধান ট্রানজিট হাব। এই বন্দরের সাথে সরাসরি শিপিং লাইন চালু করার মাধ্যমে আমদানি-রপ্তানির সময় এবং খরচ বিপুল পরিমাণে কমিয়ে আনা সম্ভব। বাণিজ্যের বাইরে পর্যটন শিল্পেও শ্রীলঙ্কা এবং মালদ্বীপের সাথে যৌথ বিনিয়োগের বিশাল সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে মালদ্বীপের সাথে সম্পর্কের একটি বড় জায়গা হলো জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলা করা। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপ যেমন তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে আছে, ঠিক তেমনি বদ্বীপ অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকাও একই ঝুঁকির সম্মুখীন। ফলে আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলনগুলোতে এই দেশগুলো প্রাকৃতিক মিত্র হিসেবে কাজ করে। সামুদ্রিক এই কূটনীতি মূলত রাষ্ট্রগুলোকে স্থলভাগের প্রচলিত সীমানা এবং দ্বন্দ্বের বাইরে গিয়ে একটি বিকল্প অর্থনৈতিক বলয় তৈরি করার সুযোগ দেয়। পরাশক্তিগুলো যখন ভারত মহাসাগরে নিজেদের নৌঘাঁটি বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত, তখন এই ছোট এবং মাঝারি দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সমুদ্র-বাণিজ্য বৃদ্ধি করাটা মূলত নিজেদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা টিকিয়ে রাখারই একটি ভিন্নতর কৌশল। কানেক্টিভিটি বা সংযুক্তির রাজনীতি এবং আগামী দিনের অর্থনীতি দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ মূলত নির্ভর করছে এর সীমানাগুলোর দেয়াল কতটা নিচু করা যায় তার ওপর। বর্তমান বিশ্বে বাণিজ্যের ধারণা পুরোপুরি পাল্টে গেছে। এখন আর কোনো দেশ একা একটি পুরো পণ্য তৈরি করে না, বরং পণ্যের বিভিন্ন অংশ বিভিন্ন দেশে তৈরি হয়ে একত্রিত হয়। এই নতুন ব্যবস্থাকে চালু রাখার জন্য প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ বা কানেক্টিভিটি। সড়কপথ, রেলপথ, সমুদ্রপথ এবং এমনকি অপটিক্যাল ফাইবারের মাধ্যমে এক দেশের সাথে আরেক দেশের ডিজিটাল সংযোগ স্থাপন করাই হলো আগামী দিনের কূটনীতির মূল কাজ। তাত্ত্বিক পরাগ খান্না (Parag Khanna) তাঁর যুগান্তকারী বই কানেক্টোগ্রাফি: ম্যাপিং দ্য ফিউচার অফ গ্লোবাল সিভিলাইজেশন (Connectography: Mapping the Future of Global Civilization)-এ চমৎকার একটি ধারণা দিয়েছেন যে, আধুনিক বিশ্বে রাজনৈতিক সীমানার চেয়ে সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থার সীমারেখা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ (Khanna, 2016)। দেশগুলো যদি নিজেদের মধ্যে নিরবচ্ছিন্নভাবে পণ্য এবং মানুষের চলাচলের ব্যবস্থা করতে না পারে, তবে তারা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় চিরকাল পিছিয়ে থাকবে। দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষেত্রে এই কানেক্টিভিটি বাড়ানোটা আক্ষরিক অর্থেই ১৯৪৭ সালের আগের সেই পুরোনো ঐতিহাসিক বাণিজ্য পথগুলোকে নতুন করে জীবিত করার এক বিরাট কর্মযজ্ঞ। কানেক্টিভিটি বাড়ানোর এই উদ্যোগের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং অমূলক রাজনৈতিক সন্দেহ। একটি দেশের ট্রাক অন্য দেশে ঢুকতে গেলে কাস্টমস এবং সীমান্তরক্ষীদের নানা রকম ছাড়পত্রের জন্য দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হয়। এই দীর্ঘসূত্রতার কারণে পণ্যের দাম বেড়ে যায় এবং বাণিজ্যের আগ্রহ নষ্ট হয়ে যায়। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন করা এবং এক দেশের গাড়ির ইনস্যুরেন্স অন্য দেশে কার্যকর করার মতো আইনি বিষয়গুলো সমাধান করা পররাষ্ট্রনীতির দৈনন্দিন কাজের একটি বড় অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এশিয়ান হাইওয়ে বা ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কের মতো বিশাল প্রকল্পগুলোর সাথে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্রগুলো মূলত নিজেদের ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা ঘুচিয়ে একটি বৃহত্তর এশীয় বাজারের অংশ হওয়ার চেষ্টা করছে। এই সংযুক্তির রাজনীতি কেবল অর্থনীতির চাকা ঘোরায় না, এটি সাধারণ মানুষের মধ্যে সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক আদান-প্রদানও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। যখন দুটি দেশের মানুষের মধ্যে নিয়মিত যাতায়াত থাকে, তখন রাজনৈতিক নেতাদের পক্ষে যুদ্ধ বা সংঘাতের জিগির তুলে ফায়দা লোটা অনেক কঠিন হয়ে যায়। সহজ করে বললে, সীমানা পেরিয়ে যখন বাণিজ্য নির্বিঘ্নে চলতে শুরু করে, তখন সেখানে সেনাবাহিনীর বন্দুকের নলের আর কোনো প্রয়োজন থাকে না। দক্ষিণ এশিয়ার পররাষ্ট্রনীতির চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত এই উন্মুক্ত এবং সংযুক্ত একটি অভিন্ন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা। আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা ফোরাম: বিমসটেক এবং ডি-৮ (BIMSTEC and D-8) সার্কের স্থবিরতা এবং বিকল্প আঞ্চলিক রূপরেখার সন্ধান প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে মিলেমিশে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক বলয় তৈরি করার স্বপ্ন প্রতিটি রাষ্ট্রেরই থাকে। মানচিত্রের দিকে তাকালে দক্ষিণ এশিয়াকে প্রাকৃতিকভাবেই একটি অখণ্ড এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ অঞ্চল বলে মনে হয়। এই অঞ্চলের মানুষের খাদ্যাভ্যাস, সংস্কৃতি এবং ইতিহাসের শেকড় একই সমতলে গাঁথা। আশির দশকে এই অভিন্নতার ওপর ভিত্তি করেই সাউথ এশিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর রিজিওনাল কোঅপারেশন বা সার্ক গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। শুরুর দিকে এই জোটকে ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ তৈরি হয়। ধারণা করা হয়েছিল, ইউরোপের দেশগুলো যদি নিজেদের ভেতরের সীমান্ত তুলে দিয়ে একটি একক বাজার তৈরি করতে পারে, তবে দক্ষিণ এশিয়াও সেই পথে হাঁটতে সক্ষম হবে। তাত্ত্বিক অমিতাভ আচার্য (Amitav Acharya) তাঁর বিভিন্ন গবেষণায় আঞ্চলিকতাবাদ (Regionalism)-এর যে রূপরেখা দিয়েছেন, সার্ক মূলত সেই তাত্ত্বিক কাঠামোরই একটি ব্যবহারিক প্রয়োগ ছিল (Acharya, 2014)। সদস্য দেশগুলো আশা করেছিল, নিজেদের ভেতরের ছোটখাটো রাজনৈতিক বিরোধগুলো একপাশে সরিয়ে রেখে তারা দারিদ্র্য বিমোচন, কৃষি এবং বাণিজ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে একসাথে কাজ করতে পারবে। বাস্তবতার জমিন অনেক সময় প্রত্যাশার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়। দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় দুই দেশ ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক বৈরিতা খুব দ্রুতই এই আঞ্চলিক জোটের কফিনে পেরেক ঠুকে দেয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিভাষায় এই দুই দেশের মধ্যকার পরিস্থিতিকে নিরাপত্তা সংকট (Security Dilemma) হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। একে অপরের প্রতি তীব্র আস্থাহীনতার কারণে এই দুই দেশ মূলত সার্কের মঞ্চটিকে নিজেদের কূটনৈতিক কাদা ছোঁড়াছুঁড়ির ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। জোটের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী যেকোনো সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতভাবে নেওয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল। এর ফলে একটি দেশ কোনো প্রস্তাবে ভেটো দিলেই পুরো প্রক্রিয়াটি অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থবির হয়ে পড়ত। ভারত-পাকিস্তানের এই ভূ-রাজনৈতিক অহমিকার কারণে দক্ষিণ এশিয়ার ছোট দেশগুলো মূলত একটি অবরুদ্ধ অবস্থার মধ্যে পড়ে যায়। তারা বুঝতে পারে, এই দুই পরাক্রমশালী প্রতিবেশীর দ্বন্দ্ব না মিটলে সার্কের ছাতার নিচে থেকে কোনো অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক ফায়দা লোটা সম্ভব নয়। এই দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা বদ্বীপ অঞ্চলের এই রাষ্ট্রটির জন্য এক বিশাল অর্থনৈতিক হতাশার জন্ম দেয়। নিজেদের উৎপাদিত পণ্য প্রতিবেশীর বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধায় বিক্রি করার যে পথটি তৈরি হওয়ার কথা ছিল, তা ফাইলের স্তূপে আটকা পড়ে থাকে। আন্তঃসীমান্ত কানেক্টিভিটি বা সড়ক যোগাযোগের বিশাল প্রকল্পগুলো দিনের পর দিন আলোর মুখ দেখে না। একটি দেশের ট্রাক অন্য দেশে প্রবেশের অনুমতি পায় না, ফলে বাণিজ্যের খরচ বহুগুণ বেড়ে যায়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এই যুগে কোনো দেশই নিজের সীমানার ভেতর একা টিকে থাকতে পারে না। সার্কের এই অকার্যকর অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য রাষ্ট্রকে বাধ্য হয়েই নতুন কোনো আঞ্চলিক রূপরেখার সন্ধান করতে হয়। নীতিনির্ধারকরা বুঝতে পারেন, ভারত এবং পাকিস্তানকে এক টেবিলে বসিয়ে সমস্যার সমাধান করাটা আপাতত এক অলীক কল্পনা। তাই পুরনো এবং অকার্যকর কাঠামোর মায়া ত্যাগ করে, রাজনৈতিক বিরোধ এড়িয়ে কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে নতুন সমমনা মিত্র খোঁজার কাজটি কূটনীতির প্রধান অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়ায়। উপ-আঞ্চলিকতাবাদের তাত্ত্বিক ভিত্তি এবং বিমসটেকের উদ্ভব পুরো একটি অঞ্চলকে এক সুতোয় গাঁথা সম্ভব না হলে, সেই অঞ্চলের ভেতরের কিছু দেশ মিলে ছোট ছোট জোট তৈরি করতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এই নতুন ধারণাকে বলা হয় উপ-আঞ্চলিকতাবাদ (Sub-regionalism)। প্রখ্যাত তাত্ত্বিক ব্যারি বুজান (Barry Buzan) এবং ওলে ওয়েভার (Ole Wæver) তাঁদের আঞ্চলিক নিরাপত্তা বলয় (Regional Security Complex) তত্ত্বে দেখিয়েছেন, বিশাল কোনো সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের ভেতরেও রাষ্ট্রগুলো নিজেদের অর্থনৈতিক এবং কৌশলগত প্রয়োজনে আলাদা ছোট বলয় তৈরি করতে পারে (Buzan & Waever, 2003)। সার্কের হতাশা কাটিয়ে ওঠার জন্য ঠিক এই তাত্ত্বিক কাঠামোর আলোকেই নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে একটি বিকল্প জোট গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই নতুন জোটটির নাম বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টি-সেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কোঅপারেশন বা বিমসটেক (BIMSTEC)। এই ফোরামের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোকে একই ছাতার নিচে নিয়ে আসা হয়েছে। ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান এবং শ্রীলঙ্কার পাশাপাশি থাইল্যান্ড এবং মিয়ানমার এই জোটের সদস্য। বিমসটেকের গঠনতন্ত্রটি অত্যন্ত সুকৌশলে তৈরি করা হয়েছে। এখানে ভারত এবং পাকিস্তানের মতো কোনো প্রকাশ্য রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের জায়গা রাখা হয়নি। এই জোটের মূল ফোকাস বা মনোযোগ সম্পূর্ণভাবে অর্থনীতি, বাণিজ্য, প্রযুক্তি এবং পারস্পরিক কানেক্টিভিটির ওপর নিবদ্ধ। বদ্বীপের এই রাষ্ট্রটির জন্য বিমসটেক এক বিশাল সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। এই জোটের স্থায়ী সচিবালয় বা সদর দপ্তর রাজধানী ঢাকায় স্থাপন করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে কোনো আঞ্চলিক জোটের সদর দপ্তর নিজের দেশে থাকাটা এক বিরাট সম্মানের বিষয়। এটি বিশ্বমঞ্চে প্রমাণ করে যে, এই উপ-আঞ্চলিক জোটে রাষ্ট্রটি একটি নেতৃত্বস্থানীয় এবং সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করতে চায়। সচিবালয় ঢাকায় থাকার কারণে জোটের যেকোনো নীতিনির্ধারণী আলোচনায় এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে এই দেশের কূটনীতিকদের একটি প্রচ্ছন্ন নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকে। এটি মূলত একটি উদীয়মান অর্থনীতির দেশের জন্য নিজেদের কূটনৈতিক দক্ষতা প্রমাণের এক বিশাল সুযোগ। এই জোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রটি মূলত নিজেদের পূর্বমুখী কূটনীতি বা ‘লুক ইস্ট’ পলিসিকে শক্ত ভিত্তি দিচ্ছে। পশ্চিমের দেশগুলোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমিয়ে এশিয়ার দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির সাথে যুক্ত হওয়ার এটি একটি কার্যকরী পথ। বিমসটেক দেশগুলোর সম্মিলিত জনসংখ্যা এবং জিডিপির আকার এতটাই বিশাল যে, নিজেদের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) বাস্তবায়ন করা গেলে প্রতিটি দেশের চেহারাই বদলে যাবে। প্রযুক্তি হস্তান্তর, জ্বালানি সহযোগিতা এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার মতো বিষয়গুলোতে সদস্য দেশগুলো অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে কাজ করছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, এই ফোরামে কোনো রাজনৈতিক ভেটো দেওয়ার সংস্কৃতি নেই। দেশগুলো তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক মতাদর্শ একপাশে সরিয়ে রেখে কেবল অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতির হিসাব কষেই টেবিলে বসে। সার্কের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে তৈরি হওয়া এই উপ-আঞ্চলিক জোটটি প্রমাণ করে, সঠিক রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে ভৌগোলিক বিভেদ ভুলে গিয়েও একটি কার্যকর অর্থনৈতিক বলয় গড়ে তোলা সম্ভব। বঙ্গোপসাগরীয় অর্থনীতি এবং ভূ-কৌশলগত সংযোগ বিমসটেকের নামকরণের মধ্যেই এর ভৌগোলিক গুরুত্বের কথা লুকিয়ে আছে। এই জোটের প্রতিটি দেশ কোনো না কোনোভাবে বঙ্গোপসাগরের সাথে যুক্ত। একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্ববাণিজ্যের প্রধান লাইফলাইন বা জীবনীশক্তি হয়ে উঠেছে সমুদ্রপথ। বঙ্গোপসাগরের উন্মুক্ত জলরাশি এই দেশগুলোকে প্রাকৃতিকভাবেই একে অপরের সাথে জুড়ে দিয়েছে। অর্থনীতিবিদ এবং কৌশলবিদরা বর্তমান সময়ের এই সমুদ্রকেন্দ্রিক অর্থনীতিকে নীল অর্থনীতি (Blue Economy) হিসেবে আখ্যায়িত করেন। গবেষক রবার্ট কাপলান (Robert Kaplan) তাঁর আলোড়ন সৃষ্টিকারী গ্রন্থ মনসুন: দ্য ইন্ডিয়ান ওশান অ্যান্ড দ্য ফিউচার অফ আমেরিকান পাওয়ার (Monsoon: The Indian Ocean and the Future of American Power)-এ স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন, আগামী দিনের বৈশ্বিক ক্ষমতার লড়াই মূলত ভারত মহাসাগর এবং এর সংলগ্ন উপসাগরগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়েই হবে (Kaplan, 2010)। এই ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় বঙ্গোপসাগরীয় দেশগুলোর নিজেদের মধ্যে একটি শক্তিশালী জোট থাকাটা সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। বিমসটেকের মাধ্যমে রাষ্ট্রগুলো মূলত এই সমুদ্রপথকে নিজেদের অর্থনৈতিক মুক্তির প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। এই উপ-আঞ্চলিক জোটের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হলো সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ভৌত কানেক্টিভিটি বা সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপন করা। স্থলপথে এক দেশ থেকে আরেক দেশে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে অনেক সময় নানা রকম আমলাতান্ত্রিক এবং কাস্টমসের জটিলতা তৈরি হয়। সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কঠোর নিয়মকানুনের কারণে বাণিজ্যের খরচ বেড়ে যায়। কিন্তু সমুদ্রপথে সরাসরি শিপিং লাইন চালু করা গেলে এই সমস্যাগুলো অনেকটাই এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ, থাইল্যান্ড বা মিয়ানমারের সাথে সরাসরি জাহাজ চলাচল শুরু হলে এই ভূখণ্ড থেকে খুব সহজেই পণ্য ওই দেশগুলোতে পাঠানো যাবে। এর ফলে সিঙ্গাপুর বা অন্য কোনো দেশের বন্দর ব্যবহার করে পণ্য পাঠানোর যে বাড়তি সময় এবং খরচ, তা পুরোপুরি বেঁচে যাবে। নেপাল এবং ভুটানের মতো স্থলবেষ্টিত দেশগুলোর জন্যও এই সামুদ্রিক কানেক্টিভিটি এক বিশাল সুযোগ। তারা এই জোটের সুবিধা নিয়ে খুব সহজেই অন্য দেশের সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে যুক্ত হতে পারবে। ভৌত যোগাযোগের বাইরে গিয়ে ডিজিটাল কানেক্টিভিটি এবং জ্বালানি গ্রিড শেয়ারিংয়ের মতো অত্যাধুনিক বিষয়গুলোও বিমসটেকের আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে। হিমালয়ের দেশগুলোতে উৎপন্ন বাড়তি জলবিদ্যুৎ যদি ট্রান্সমিশন লাইনের মাধ্যমে অন্য দেশগুলোতে আনা যায়, তবে পুরো অঞ্চলের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। এই ধরনের বিশাল মেগা প্রকল্পগুলো একা কোনো দেশের পক্ষে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সম্মিলিত বিনিয়োগ এবং পারস্পরিক আস্থার সম্পর্ক। পরাশক্তিগুলো যখন বঙ্গোপসাগরে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত, তখন এই অঞ্চলের দেশগুলোর নিজেদের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ থাকাটা যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ভূ-রাজনৈতিক চাপ সামলানোর জন্য জরুরি। বিমসটেকের মতো ফোরামগুলো মূলত সদস্য দেশগুলোকে এই সুযোগটি করে দেয়। তারা বিশ্বকে এই বার্তা দিতে সক্ষম হয় যে, বঙ্গোপসাগর কেবল পরাশক্তিগুলোর দাবার বোর্ড নয়, এটি এই অঞ্চলের কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা এবং অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের মূল কেন্দ্র। দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতার নতুন দিগন্ত ও ডি-এইট আঞ্চলিক সীমানার বাইরে গিয়ে বৈশ্বিক পরিসরেও রাষ্ট্রগুলো নিজেদের অর্থনৈতিক সুবিধার জন্য নানা রকম জোট তৈরি করে। ঠিক তেমনি একটি ব্যতিক্রমী এবং সম্ভাবনাময় জোট হলো ডেভেলপমেন্ট এইট বা ডি-৮ (D-8)। বাংলাদেশ, মিশর, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান এবং তুরস্ক – এই আটটি উন্নয়নশীল দেশ মিলে নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে এই ফোরামটি গঠন করে। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র মিল হলো এরা সবাই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ। কিন্তু এই জোটের মূল লক্ষ্য কখনোই ধর্মীয় বা রাজনৈতিক ছিল না। এর প্রধান এবং একমাত্র উদ্দেশ্য হলো বিশ্ব অর্থনীতিতে নিজেদের অবস্থান শক্ত করা এবং পারস্পরিক বাণিজ্য বাড়ানো। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আলোচনায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর নিজেদের মধ্যকার এই মেলবন্ধনকে দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা (South-South Cooperation) বলা হয়। পশ্চিমা বিশ্ব বা ‘গ্লোবাল নর্থ’-এর ওপর দীর্ঘদিনের যে অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা, তা কমিয়ে এনে নিজেদের ভেতরে প্রযুক্তি এবং সম্পদের বিনিময় ঘটানোই হলো এই তত্ত্বের মূল কথা। এই আটটি দেশের সম্মিলিত জনসংখ্যা এক বিলিয়নেরও বেশি, যা বিশ্ববাজারের এক বিশাল অংশ। এদের প্রত্যেকের হাতেই নিজস্ব কিছু প্রাকৃতিক সম্পদ এবং কারিগরি দক্ষতা রয়েছে। মালয়েশিয়া বা তুরস্কের মতো দেশগুলো শিল্প এবং প্রযুক্তিতে বেশ এগিয়েছে, আবার নাইজেরিয়া বা ইরানের হাতে রয়েছে বিপুল জ্বালানি সম্পদ। এই ভূখণ্ডের রয়েছে সস্তা শ্রম এবং বিশাল তৈরি পোশাক শিল্পের অভিজ্ঞতা। এই ভিন্ন ভিন্ন সক্ষমতাগুলোকে যদি একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর ভেতরে নিয়ে এসে কাজে লাগানো যায়, তবে পুরো জোটটি বিশ্ব অর্থনীতিতে এক অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে পরিণত হবে। পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে বাণিজ্য করার সময় উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সব সময় নানা রকম অশুল্ক বাধা, পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স এবং রাজনৈতিক শর্তের মুখে পড়তে হয়। ডি-৮ ফোরামের ভেতরে বাণিজ্য করার সময় এই ধরনের কোনো বৈষম্যমূলক শর্ত থাকে না। সদস্য দেশগুলো একে অপরকে ছাড় দিয়ে নিজেদের অর্থনীতির চাকা সচল রাখার চেষ্টা করে। এটি মূলত পশ্চিমা পুঁজিবাদের একচেটিয়া আধিপত্যকে পাশ কাটিয়ে নিজেদের জন্য একটি বিকল্প এবং স্বাধীন অর্থনৈতিক বলয় তৈরি করার এক বুদ্ধিবৃত্তিক প্রচেষ্টা। ডি-৮ ফোরামের মাধ্যমে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (PTA) কার্যকর করার চেষ্টা চলছে দীর্ঘদিন ধরে। এই চুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে হাজার হাজার পণ্যের ওপর থেকে শুল্ক বাধা উঠে যাবে। এর ফলে এক দেশের পণ্য অন্য দেশের বাজারে খুব সহজেই প্রবেশ করতে পারবে। কৃষিখাতে গবেষণা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (SME) উন্নয়ন এবং হালাল পণ্যের বৈশ্বিক বাজার ধরার মতো বিষয়গুলোতে এই জোট একসাথে কাজ করছে। তবে ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে এই দেশগুলোর মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপন করাটা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে পণ্য পরিবহনের খরচ অনেক বেশি হওয়ায় বাণিজ্যের গতি কিছুটা শ্লথ হয়ে পড়ে। তারপরও, এই ফোরামের মঞ্চ ব্যবহার করে রাষ্ট্রনেতারা নিয়মিত নিজেদের অভিজ্ঞতা বিনিময় করছেন। আন্তর্জাতিক ফোরামে, যেমন – বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা বা জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনে এই আটটি দেশ যখন একই সুরে কথা বলে, তখন পরাশক্তিগুলোও সেই দাবিকে সহজে অগ্রাহ্য করার সুযোগ পায় না। বাণিজ্য বহুমুখীকরণ ও পশ্চিমা নির্ভরতা হ্রাসের কৌশল যেকোনো রাষ্ট্রের অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় বিপদের জায়গা হলো নির্দিষ্ট কয়েকটি বাজারের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়া। বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে এবং সেই পোশাকের প্রধান ক্রেতা হলো ইউরোপ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এই একক নির্ভরশীলতার কারণে রাষ্ট্রকে সব সময় এক ধরনের মানসিক এবং কূটনৈতিক চাপে থাকতে হয়। পশ্চিমা দেশগুলোতে কোনো অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিলে বা তারা রাজনৈতিক কারণে কোনো বাণিজ্য সুবিধা স্থগিত করলে দেশের ভেতরে বিশাল এক বিপর্যয় নেমে আসে। অর্থনীতিবিদ ইমানুয়েল ওয়ালারস্টেইন (Immanuel Wallerstein) তাঁর বিশ্ব ব্যবস্থা তত্ত্ব (World-Systems Theory)-এ দেখিয়েছেন, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ‘কেন্দ্র’ বা উন্নত দেশগুলো সব সময় এই নির্ভরশীলতার সুযোগ নিয়ে ‘প্রান্তিক’ বা দুর্বল দেশগুলোকে শোষণ করে (Wallerstein, 1974)। এই কাঠামোগত শোষণের শেকল ভাঙার জন্য বাণিজ্যের বহুমুখীকরণ বা ডাইভারসিফিকেশনের কোনো বিকল্প নেই। বিমসটেক এবং ডি-৮ এর মতো ফোরামগুলো মূলত রাষ্ট্রকে সেই বিকল্প বাজার খোঁজার বিশাল এক সুযোগ এনে দিয়েছে। ডি-৮ ভুক্ত দেশগুলোর বাজারে নিজেদের পণ্যের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার জন্য কূটনীতিকরা প্রতিনিয়ত দেনদরবার চালিয়ে যাচ্ছেন। তুরস্কের মতো দেশে তৈরি পোশাক রপ্তানি বাড়ানোর জন্য শুল্ক কমানোর আলোচনা চলছে। ইন্দোনেশিয়া এবং মালয়েশিয়ার বিশাল বাজারে ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য এবং প্লাস্টিক সামগ্রী রপ্তানির সুযোগ খোঁজা হচ্ছে। এই নতুন বাজারগুলোতে একবার শক্তভাবে প্রবেশ করতে পারলে পশ্চিমা ক্রেতাদের মনমানসিকতার ওপর রাষ্ট্রের একক নির্ভরশীলতা বহুগুণ কমে যাবে। তখন পশ্চিমা কোনো দেশ যদি শ্রম অধিকার বা অন্য কোনো অজুহাতে বাণিজ্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চায়, রাষ্ট্র অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসের সাথে সেই চাপ মোকাবেলা করতে পারবে। তারা খুব সহজেই বলতে পারবে যে, তাদের হাতে বিকল্প বাজার রয়েছে। এটি মূলত অর্থনৈতিক কূটনীতির এক মাস্টারস্ট্রোক, যেখানে বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে নিজেদের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বকে আরও বেশি নিশ্ছিদ্র করা হয়। এই বহুমুখীকরণের পথে সদস্য দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ আমলাতান্ত্রিক জটিলতা অনেক সময় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। দেশগুলো মুখে মুক্ত বাণিজ্যের কথা বললেও, নিজেদের স্থানীয় শিল্পকে বাঁচানোর জন্য নানা রকম আইনি ফাঁকফোকর তৈরি করে রাখে। ভিসা প্রসেসিংয়ের জটিলতার কারণে ব্যবসায়ীদের এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাতায়াত করা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। এই সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য ফোরামের শীর্ষ সম্মেলনগুলোতে নিয়মিত কড়া ভাষায় আলোচনা হয়। দেশগুলোর চেম্বার অব কমার্স বা ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকে নিজেদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানোর জন্য উৎসাহিত করা হয়। সরকারি আমলাদের বাইরে গিয়ে ব্যবসায়ীদের হাতে বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিলে অনেক সমস্যার দ্রুত সমাধান মেলে। বিমসটেক এবং ডি-৮ মূলত রাষ্ট্রকে এই বাণিজ্য বহুমুখীকরণের প্ল্যাটফর্মটি তৈরি করে দেয়। এই মঞ্চগুলোতে নিজেদের পণ্যের গুণগত মান এবং দামের প্রতিযোগিতা প্রমাণ করে বিশ্ববাজারের নতুন নতুন হিস্যা আদায় করে নেওয়াই এখন আধুনিক কূটনীতির সবচেয়ে বড় কাজ। অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এড়ানোর সমীকরণ আধুনিক আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি বড় শিক্ষা হলো, অর্থনীতি এবং রাজনীতিকে সব সময় একসাথে মেশানো ঠিক নয়। যেখানে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব থাকে, সেখানে অর্থনৈতিক স্বার্থকে সামনে নিয়ে এলে অনেক সময় সেই দ্বন্দ্বের তীব্রতা কমে যায়। তাত্ত্বিক আর্নস্ট হাস (Ernst Haas) তাঁর নব্য-ক্রিয়াবাদ (Neo-functionalism) তত্ত্বে খুব সুন্দরভাবে এই বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন (Haas, 1958)। তাঁর মতে, রাষ্ট্রগুলো যদি ছোট ছোট এবং অরাজনৈতিক বিষয়, যেমন – কয়লার ব্যবসা বা রেল যোগাযোগের মাধ্যমে একে অপরের সাথে কাজ শুরু করে, তবে ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এই আস্থার সম্পর্ক পরবর্তীতে বড় বড় রাজনৈতিক সমস্যার সমাধানে সাহায্য করে। বিমসটেক এবং ডি-৮ ফোরামগুলো মূলত এই নব্য-ক্রিয়াবাদ তত্ত্বেরই বাস্তব উদাহরণ। এই জোটগুলোতে কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, মানবাধিকার বা সীমান্ত নিয়ে কোনো প্রকাশ্য বিতর্ক করা হয় না। আলোচনার টেবিলে কেবল প্রবৃদ্ধি, জিডিপি এবং বাণিজ্যের পরিসংখ্যানগুলোই জায়গা পায়। রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এড়িয়ে চলার এই কৌশলটি ছোট এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অত্যন্ত স্বস্তিদায়ক। সার্কের মতো ফোরামে গিয়ে যেখানে প্রতিনিয়ত তিক্ত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হতো, সেখানে বিমসটেক বা ডি-৮ এর বৈঠকে এক ধরনের ইতিবাচক এবং সহযোগিতামূলক পরিবেশ বজায় থাকে। এর ফলে রাষ্ট্রগুলোর শীর্ষ নেতারা কোনো রকম মানসিক চাপ ছাড়াই একে অপরের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে মনোযোগ দিতে পারেন। এই ফোরামগুলোতে নেতৃত্ব দেওয়ার মাধ্যমে বদ্বীপের এই রাষ্ট্রটি মূলত বিশ্বমঞ্চে প্রমাণ করছে যে, তারা রাজনৈতিক কাদা ছোঁড়াছুঁড়ির চেয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেই বেশি বিশ্বাসী। তারা এমন একটি পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে, যার মূল লক্ষ্য হলো দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করা। যখন একটি রাষ্ট্র বিশ্বমঞ্চে নিজেকে কেবল একজন ব্যবসায়ী এবং উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে তুলে ধরে, তখন পরাশক্তি বা আঞ্চলিক শক্তিগুলো তাদের সাথে শত্রুতা করার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ খুঁজে পায় না। এই অর্থনৈতিক কূটনীতি রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিতে এক বিরাট পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। বিদেশিরা এখন আর এই দেশটিকে কেবল দুর্যোগ বা সংঘাতের দেশ হিসেবে দেখে না। তারা এই ফোরামগুলোর মাধ্যমে দেখতে পায়, একটি দেশ কীভাবে নিজেদের সীমিত সম্পদ নিয়ে বিশাল বিশাল বাণিজ্যিক বলয় তৈরি করার নেতৃত্ব দিচ্ছে। এটি কূটনীতির এক নীরব কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী জয়। আগামী দিনের পৃথিবীতে সেই দেশগুলোই সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী হবে, যারা রাজনৈতিক আবেগকে দূরে সরিয়ে রেখে অর্থনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। বিমসটেক এবং ডি-৮ এর মতো ফোরামগুলোতে সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং নেতৃত্বের মাধ্যমে রাষ্ট্রটি মূলত সেই ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জন্যই নিজেদের প্রস্তুত করছে। আন্তর্জাতিক দাবার বোর্ডে কোনো গুটিই ফেলনা নয়, কেবল জানতে হয় কখন কোন গুটিটি চালতে হবে। অর্থনৈতিক কূটনীতির এই নিপুণ চালগুলোই মূলত রাষ্ট্রকে তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের দিকে একটু একটু করে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংস্থা, বৈদেশিক সাহায্য ও বাণিজ্য (International Economic Institutions, Foreign Aid, International Trade) বৈদেশিক সাহায্যের অন্তরালের রাজনীতি ও নবীন রাষ্ট্রের সংকট স্বাধীনতার পর একটি নতুন রাষ্ট্রের যাত্রা সহজ হয় না। ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে শূন্য রাজকোষ নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করা ভীষণ কঠিন এক কাজ। সাধারণ মানুষের পেটে ক্ষুধা, চারদিকে হতাশা আর রাস্তাঘাটের বেহাল দশা নীতিনির্ধারকদের এক দিশেহারা অবস্থার মধ্যে ফেলে দেয়। এই সময়টায় উন্নত বিশ্ব এবং তাদের দাতা সংস্থাগুলো ত্রাণকর্তা হিসেবে সামনে এসে দাঁড়ায়। তারা সহজ শর্তে ঋণ, খাদ্য সহায়তা এবং কারিগরি অনুদানের বিশাল প্যাকেজ নিয়ে হাজির হয়। বাইরে থেকে দেখলে এই সাহায্যগুলোকে মানবতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বলে মনে হতে পারে। দাতা দেশগুলো এমন একটি বয়ান তৈরি করে, যেন তারা নিঃস্বার্থভাবে একটি দরিদ্র ভূখণ্ডকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে সাহায্য করছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তবতায় কোনো সাহায্যই বিনা শর্তে বা নিঃস্বার্থভাবে আসে না। প্রখ্যাত তাত্ত্বিক হ্যান্স মরগেনথাউ (Hans Morgenthau) তাঁর বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন, বৈদেশিক সাহায্য মূলত একটি মোড়কবদ্ধ রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে (Morgenthau, 1962)। উন্নত দেশগুলো এই আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর ওপর নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চালায়। এই ভূখণ্ডের ক্ষেত্রে স্বাধীনতার পর ঠিক একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছিল। বিদেশি ঋণের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভর করার কারণে রাষ্ট্রটি খুব দ্রুতই সাহায্যনির্ভরতা (Aid Dependency) নামক এক ভয়ংকর ফাঁদে আটকা পড়ে যায়। দাতা সংস্থাগুলো ঋণ দেওয়ার সময় এমন সব প্রকল্প নির্বাচন করে দিত, যেগুলো থেকে দীর্ঘমেয়াদে দাতা দেশগুলোই বেশি লাভবান হতো। ঋণের টাকার একটি বিশাল অংশ বিদেশি পরামর্শকদের চড়া বেতন এবং বিদেশি যন্ত্রপাতি কেনার পেছনেই খরচ হয়ে যেত। কাগজে-কলমে বিশাল অঙ্কের ঋণ দেশের ঘাড়ে চাপলেও, সেই অনুপাতে সাধারণ মানুষের ভাগ্যের কোনো উন্নতি হতো না। এই সাহায্যনির্ভরতার কারণে আন্তর্জাতিক ফোরামে স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের ক্ষমতাও রাষ্ট্রটি ধীরে ধীরে হারাতে শুরু করে। দাতা দেশগুলোর কোনো অন্যায় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস এখানকার নীতিনির্ধারকদের থাকত না। বৈদেশিক সাহায্যে টিকে থাকা একটি রাষ্ট্রের অর্থনীতি সব সময় ভঙ্গুর থাকে। বিশ্ববাজারে দাতাদের একটু মন খারাপ হলেই দেশের ভেতরে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ধাক্কা এসে লাগে। এই পরনির্ভরশীলতার গ্লানি থেকে মুক্তির জন্য একটি শক্ত অর্থনৈতিক ভিত তৈরি করা রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য হয়ে ওঠে। সাহায্যনির্ভর এই অর্থনীতির কারণেই রাষ্ট্রকে পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেক অন্যায্য শর্ত মাথা পেতে নিতে হয়েছিল। আন্তর্জাতিক ফোরামে মাথা উঁচু করে কথা বলার জন্য অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার কোনো বিকল্প নেই, এই কঠিন সত্যটি খুব দ্রুতই নীতিনির্ধারকদের উপলব্ধিতে ধরা দেয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, বিশ্বব্যাংক এবং কাঠামোগত সমন্বয়ের ফাঁদ বৈশ্বিক অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণের জন্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে বিশাল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছিল, তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিশ্বব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ (IMF)। উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতির অভিভাবক হিসেবে এই প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করে। একটি দেশের অর্থনীতি চরম খাদের কিনারে গিয়ে দাঁড়ালে, আমদানি করার মতো বৈদেশিক মুদ্রা হাতে না থাকলে, এই প্রতিষ্ঠানগুলোই শেষ ভরসা হিসেবে সামনে আসে। তারা ঋণ দেয় ঠিকই, এর সাথে জুড়ে দেয় দেশের ভেতরের অর্থনীতি সংস্কারের নানা রকম কঠিন ও জটিল শর্ত। এই শর্তগুলোর একটি পোশাকি নাম রয়েছে, যাকে আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে কাঠামোগত সমন্বয় কর্মসূচি (Structural Adjustment Program) বলা হয়। আইএমএফ-এর কর্মকর্তারা ওয়াশিংটনের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে হাজার মাইল দূরের একটি দরিদ্র দেশের অর্থনীতির জন্য প্রেসক্রিপশন তৈরি করেন। সেই প্রেসক্রিপশনে দেশের স্থানীয় সামাজিক বাস্তবতা বা সাধারণ মানুষের কষ্ট ধারণ করার কোনো জায়গা থাকে না। ঋণের কিস্তি ছাড় করার আগে তারা নিখুঁতভাবে মিলিয়ে দেখেন তাদের দেওয়া শর্তগুলো অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হয়েছে কি না। এই আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নীতির কঠোর সমালোচনা করে অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিটজ (Joseph Stiglitz) একটি যুগান্তকারী গ্রন্থ রচনা করেছেন, যার নাম গ্লোবালাইজেশন অ্যান্ড ইটস ডিসকন্টেন্টস (Globalization and Its Discontents) (Stiglitz, 2002)। তিনি নিজে একসময় বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ হিসেবে কাজ করেছেন। ভেতরের মানুষ হওয়ার সুবাদে তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন, কীভাবে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর চাপিয়ে দেওয়া শর্তগুলো উন্নয়নশীল দেশগুলোর সাধারণ মানুষের ওপর ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনে। তাঁর মতে, আইএমএফ-এর ঋণ মূলত একটি দেশের সামাজিক কাঠামোকে ভেতর থেকে ধ্বংস করে দেয়। বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফ-এর শর্ত মানতে গিয়ে এই ভূখণ্ডের রাষ্ট্রটিকেও অনেক রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পকারখানা জলের দরে বেসরকারি খাতে বিক্রি করে দিতে হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা পাটকল বা সুতাকলগুলো রাতারাতি বন্ধ করে দেওয়া হলে হাজার হাজার শ্রমিক হঠাৎ করেই বেকার হয়ে পড়েন। এই বেকার মানুষগুলোর পুনর্বাসনের কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা দাতা সংস্থাগুলোর সেই প্রেসক্রিপশনে থাকে না। ঋণের টাকা দিয়ে সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলো হয়তো কিছুটা সুন্দর দেখানো যায়, সমাজের নিচুতলার মানুষগুলো চরম বঞ্চনা এবং হতাশার অন্ধকারে তলিয়ে যায়। অর্থনীতি বাঁচানোর নামে এই কাঠামোগত সংস্কারগুলো মূলত সমাজের প্রান্তিক মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার কেড়ে নেওয়ার এক নিষ্ঠুর প্রক্রিয়া হিসেবে কাজ করে। ওয়াশিংটন কনসেনসাস এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির টানাপোড়েন বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফ-এর এই সংস্কার নীতিগুলোকে একত্রে বোঝানোর জন্য অর্থনীতিবিদ জন উইলিয়ামসন (John Williamson) একটি বিশেষ শব্দবন্ধ তৈরি করেছিলেন, যাকে ওয়াশিংটন কনসেনসাস (Washington Consensus) বলা হয় (Williamson, 1990)। এই কনসেনসাসের মূল কথাগুলো হলো বাণিজ্য উদারীকরণ, বিদেশি বিনিয়োগের জন্য দরজা পুরোপুরি খুলে দেওয়া, সরকারি ব্যয় কমানো এবং কৃষি বা জ্বালানি খাত থেকে ভর্তুকি প্রত্যাহার করা। একটি উন্নয়নশীল দেশের সরকারের জন্য এই শর্তগুলো বাস্তবায়ন করা আক্ষরিক অর্থেই আগুনের ওপর দিয়ে হাঁটার মতো। কৃষিপ্রধান এই ভূখণ্ডে কৃষকদের বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন হলো সারের ওপর দেওয়া সরকারি ভর্তুকি। আইএমএফ-এর শর্ত মেনে সরকার সেই ভর্তুকি তুলে নিলে সারের দাম কয়েক গুণ বেড়ে যায়। প্রান্তিক কৃষকদের পক্ষে সেই বাড়তি দামে সার কিনে ফসল ফলানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। ফসলের উৎপাদন কমে গেলে দেশে খাদ্যসংকট দেখা দেয় এবং জিনিসপত্রের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিতে এই কাঠামোগত পরিবর্তনগুলো সমাজের ভারসাম্যকে প্রচণ্ডভাবে নাড়া দেয়। এই অর্থনৈতিক সংস্কারগুলো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এক ভয়াবহ অস্থিতিশীলতার জন্ম দেয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একটি সরকারকে সাধারণ মানুষের ভোটের ওপর নির্ভর করে ক্ষমতায় টিকে থাকতে হয়। ভর্তুকি প্রত্যাহার বা বিদ্যুৎ-জ্বালানির দাম বাড়ানোর মতো অজনপ্রিয় সিদ্ধান্তগুলো সাধারণ মানুষকে সরকারের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তোলে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে রাজপথে তীব্র আন্দোলন শুরু করে। পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছায়, সরকারকে আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা এবং দেশীয় রাজনীতির টিকে থাকার হিসাবের মধ্যে এক চরম টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সরকার খুব ভালো করেই জানে, আইএমএফ-এর শর্ত না মানলে পরবর্তী কিস্তির ঋণ পাওয়া যাবে না, আর ঋণ না পেলে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি পুরোপুরি ধসে পড়বে। শর্ত মেনে দেশের মানুষের পেটে লাথি মারলে রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। এই উভয়সংকটের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকদের এমন সব আপসকামী সিদ্ধান্ত নিতে হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতাকেই মারাত্মকভাবে দুর্বল করে দেয়। বৈদেশিক ঋণের শর্ত পূরণের এই রাজনীতি মূলত দেশের সাধারণ মানুষের জীবনের চেয়ে আন্তর্জাতিক আর্থিক কাঠামোর নির্দেশকে বেশি গুরুত্ব দিতে বাধ্য করে। সাহায্যনির্ভরতার শৃঙ্খল থেকে বাণিজ্যমুখী কূটনীতির ঐতিহাসিক পালাবদল বছরের পর বছর ধরে বিদেশি ঋণের বোঝা এবং দাতা সংস্থাগুলোর খবরদারি সহ্য করার পর রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এক ধরনের গভীর উপলব্ধির জন্ম হয়। তারা বুঝতে পারেন, অন্যের দয়ার ওপর নির্ভর করে কোনো জাতি বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। ভিক্ষার ঝুলি হাতে নিয়ে ঘোরার এই গ্লানিকর অধ্যায় শেষ করার জন্য প্রয়োজন নিজস্ব অর্থনৈতিক সক্ষমতা। এই উপলব্ধি থেকেই রাষ্ট্রীয় নীতির গতিপথ পুরোপুরি পাল্টে ফেলার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সাহায্য বা ত্রাণের জন্য হাত পাতার বদলে বাণিজ্যের মাধ্যমে নিজেদের পাওনা আদায় করে নেওয়ার এক নতুন এবং সাহসী যাত্রা শুরু হয়। তাত্ত্বিক পরিভাষায় এই রূপান্তরটিকে রপ্তানিমুখী শিল্পায়ন (Export-Oriented Industrialization) বলা যেতে পারে। এই ভূখণ্ডের অফুরন্ত সস্তা শ্রমকে কাজে লাগিয়ে তৈরি পোশাক এবং অন্যান্য শিল্পপণ্য বিদেশের বাজারে রপ্তানি করার এক বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু হয়। এই একটি মাত্র কৌশলগত পরিবর্তন পুরো রাষ্ট্রের মনস্তত্ত্বকে আমূল বদলে দেয়। বৈদেশিক সম্পর্কের মূল ভিত্তি হিসেবে অর্থনীতির উত্থান ঘটে এবং কূটনীতির সংজ্ঞায় আসে ব্যাপক পরিবর্তন। বাণিজ্যের এই বিস্তৃতির সাথে সাথে বিদেশের মাটিতে থাকা দূতাবাসগুলোর কাজের ধরনেও এক বিশাল কাঠামোগত পরিবর্তন আসে। আগে রাষ্ট্রদূতদের প্রধান কাজ ছিল দাতা দেশগুলোর কনসোর্টিয়াম মিটিংয়ে গিয়ে প্রচণ্ড বিনয়ের সাথে ঋণের টাকা চাওয়া। সেই জায়গাটি দখল করে নেয় আগ্রাসী অর্থনৈতিক কূটনীতি। কূটনীতিকরা আর সাহায্য চান না, তারা সরাসরি বাণিজ্যের সমান সুযোগ দাবি করেন। তারা বিদেশি ক্রেতা এবং বিনিয়োগকারীদের বোঝাতে শুরু করেন, তাদের দেশ অনুদান নেওয়ার মতো কোনো করুণার পাত্র নয়, এটি একটি বেশ লাভজনক এবং নির্ভরযোগ্য ব্যবসায়িক অংশীদার। অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথ (Adam Smith) তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ দ্য ওয়েলথ অফ নেশনস (The Wealth of Nations)-এ মুক্ত বাণিজ্য এবং শ্রম বিভাজনের যে শক্তির কথা বলেছিলেন, রাষ্ট্রটি মূলত সেই শক্তিকেই নিজেদের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেয় (Smith, 1776)। সাহায্যনির্ভরতা থেকে এই বাণিজ্যনির্ভরতায় উত্তরণ একটি অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানের পরিবর্তন ছিল না। এটি ছিল মূলত পরাধীনতার শেকল ভেঙে একটি জাতির আত্মমর্যাদা এবং অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব অর্জনের এক ঐতিহাসিক এবং অবিস্মরণীয় পালাবদল। বিশ্বমঞ্চে একটি ভিক্ষুক রাষ্ট্রের তকমা মুছে ফেলে আত্মবিশ্বাসী বাণিজ্যের অংশীদার হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করার এই সংগ্রাম এখনো চলমান। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মঞ্চে স্বল্পোন্নত দেশের দরকষাকষির লড়াই বাণিজ্যের ওপর ভর করে অর্থনীতিকে দাঁড় করানোর সিদ্ধান্ত নেওয়াটা প্রথম পদক্ষেপ হলেও, আসল লড়াইটা শুরু হয় আন্তর্জাতিক বাজারের নিয়মকানুনের মাঠে। বিশ্ব বাণিজ্য কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি একটি নির্দিষ্ট আইনি কাঠামোর ভেতর দিয়ে চলে। এই বিশাল কাঠামোর নিয়ন্ত্রক হলো বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (World Trade Organization)। এখানে বিশ্বের প্রায় সব দেশ মিলে বাণিজ্যের নিয়ম, শুল্কের হার এবং লেনদেনের শর্তগুলো নির্ধারণ করে। এটিকে মূলত বহুপাক্ষিক বাণিজ্য ব্যবস্থা (Multilateral Trading System) বলা হয়। এই ফোরামটি একটি বিশাল যুদ্ধক্ষেত্রের মতো, যেখানে কোনো গোলাগুলি হয় না, আইনি এবং অর্থনৈতিক যুক্তির চরম লড়াই চলে। উন্নত দেশগুলো সব সময় চায় উন্নয়নশীল দেশগুলো যেন তাদের বাজার পুরোপুরি উন্মুক্ত করে দেয়, তারা নিজেদের তৈরি পণ্য বিনা বাধায় বিক্রি করতে পারে। উন্নয়নশীল এবং দরিদ্র দেশগুলোর দাবি হলো, তাদের নিজস্ব দুর্বল এবং নবীন শিল্পগুলোকে বাঁচানোর জন্য কিছু সুরক্ষা বা শুল্ক প্রাচীর রাখার অধিকার তাদের দিতে হবে। বাণিজ্যের এই বৈশ্বিক দরকষাকষিতে টিকে থাকা ছোট রাষ্ট্রগুলোর জন্য ভীষণ কঠিন। এই অসম লড়াইয়ে টিকে থাকার জন্য বদ্বীপের এই রাষ্ট্রটি গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক একটি কূটনীতির আশ্রয় নেয়। তারা স্বল্পোন্নত দেশ (Least Developed Country) বা এলডিসি হিসেবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কিছু বিশেষ সুবিধা আদায়ের জন্য মরিয়া হয়ে কাজ শুরু করে। বিশ্বের অন্যান্য এলডিসিভুক্ত দেশগুলোকে নিয়ে তারা একটি শক্ত জোট গঠন করে এবং ডব্লিউটিও-এর মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনগুলোতে বেশ সোচ্চার ভূমিকা পালন করে। তাদের প্রধান দাবি ছিল উন্নত দেশগুলোর বাজারে তাদের পণ্যের জন্য শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার (Duty-Free Access) নিশ্চিত করা। পশ্চিমা দেশগুলোর বাজারে শুল্ক দিয়ে পণ্য বিক্রি করতে গেলে অন্যান্য দেশের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব নয়। অর্থনীতিবিদ রাউল প্রেবিশ (Raul Prebisch) তাঁর নির্ভরশীলতা তত্ত্ব (Dependency Theory)-এর মাধ্যমে দেখিয়েছেন, বৈশ্বিক বাণিজ্যের নিয়মগুলো মূলত উন্নত দেশগুলোর স্বার্থেই তৈরি করা হয় (Prebisch, 1950)। এই বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার ভেতরে থেকেও কূটনীতিকদের দিনের পর দিন উন্নত দেশগুলোর বাণিজ্য প্রতিনিধি এবং আইনপ্রণেতাদের সাথে ভীষণ জটিল এবং স্নায়ুক্ষয়ী দরকষাকষি করতে হয়েছে। এই নিরন্তর এবং ধৈর্যশীল কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফলেই শেষ পর্যন্ত ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এবং অন্যান্য বড় বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা আদায় করা সম্ভব হয়, যা দেশের রপ্তানি খাতকে আজকের এই বিশাল অবস্থানে নিয়ে এসেছে। এলডিসি উত্তরণের নতুন সমীকরণ এবং মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির চ্যালেঞ্জ অর্থনৈতিক সাফল্যের এই দীর্ঘ যাত্রার এক পর্যায়ে রাষ্ট্রটি একটি বিশাল মাইলফলক স্পর্শ করে। মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা কমানোর সূচকে অভাবনীয় সাফল্যের কারণে জাতিসংঘ এই ভূখণ্ডটিকে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের চূড়ান্ত স্বীকৃতি প্রদান করতে যাচ্ছে (২০২৬ সালের ২৪শে নভেম্বর চূড়ান্তভাবে স্বীকৃতি লাভ করবে)। এটি যেকোনো জাতির জন্য এক বিশাল গর্ব এবং আত্মমর্যাদার বিষয়। বছরের পর বছর ধরে যে দেশটিকে দরিদ্র এবং সাহায্যনির্ভর হিসেবে দেখা হতো, তারা নিজেদের যোগ্যতায় সেই তকমা মুছে ফেলতে সক্ষম হয়েছে। সাধারণ মানুষের মনে এই উত্তরণ এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক শক্তি এবং আত্মবিশ্বাসের সঞ্চার করে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রতিযোগিতামূলক জগতে এই সম্মানের পাশাপাশি একটি বিশাল চিন্তার মেঘও তৈরি হয়। এলডিসি থেকে উত্তরণের মানে হলো, এত বছর ধরে বিশ্ববাজারে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে যে শুল্কমুক্ত সুবিধা বা ডিউটি-ফ্রি কোটা-ফ্রি (DFQF) সুবিধা পাওয়া যেত, তা আর থাকবে না। পশ্চিমা দেশগুলোর বাজারে পণ্য ঢোকাতে গেলে নিয়ম অনুযায়ী নির্দিষ্ট হারে শুল্ক দিতে হবে। এটি রপ্তানি খাতের জন্য এক বিশাল অর্থনৈতিক ধাক্কা। এই নতুন কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পররাষ্ট্রনীতিকে সম্পূর্ণ নতুন করে সাজাতে হচ্ছে। শুল্ক সুবিধা হারানোর ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য কূটনীতিকরা এখন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (Free Trade Agreement) বা এফটিএ করার দিকে সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছেন। বিভিন্ন দেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা চলছে, দুই দেশ মিলে একে অপরের পণ্যের ওপর থেকে শুল্ক বাধা পুরোপুরি তুলে নিতে পারে। এই এফটিএ আলোচনাগুলো জটিল এবং সময়সাপেক্ষ। অন্য দেশ শুল্ক ছাড় দিলে তারা চাইবে এই দেশের বাজারও তাদের পণ্যের জন্য পুরোপুরি উন্মুক্ত করে দেওয়া হোক। দেশের ভেতরের নবীন শিল্পগুলোকে বিদেশি প্রতিযোগিতার মুখে ছেড়ে দেওয়াটা অনেক বড় একটি অর্থনৈতিক ঝুঁকি। মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির সাথে এখন পরিবেশের মানদণ্ড, মেধা স্বত্ব আইন এবং শ্রম অধিকারের মতো কঠিন শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তাত্ত্বিকরা এই প্রক্রিয়াটিকে অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব (Economic Sovereignty) অর্জনের এক নিরন্তর এবং চলমান সংগ্রাম হিসেবে দেখেন। এলডিসি উত্তরণ রাষ্ট্রটিকে বিশ্বায়নের এক নতুন এবং বেশি প্রতিযোগিতাপূর্ণ স্তরে নিয়ে এসেছে, টিকে থাকার জন্য মেধা, দক্ষতা এবং নিখুঁত অর্থনৈতিক কূটনীতির কোনো বিকল্প নেই। একুশ শতকের ভূ-অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ গতিপথ একুশ শতকের বিশ্ব অর্থনীতি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি জটিল এবং সংঘাতপূর্ণ রূপ ধারণ করেছে। বড় পরাশক্তিগুলোর মধ্যে শুরু হওয়া বাণিজ্য যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক মহামারির মতো ঘটনাগুলো প্রমাণ করেছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা বা সাপ্লাই চেইন কতটা ভঙ্গুর হতে পারে। এই নতুন বাস্তবতায় কোনো একটি নির্দিষ্ট বাজার বা নির্দিষ্ট পণ্যের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভর করা আত্মঘাতী হতে পারে। পশ্চিমা দেশগুলোর বাজারের ওপর এই ভূখণ্ডের যে একচেটিয়া নির্ভরশীলতা রয়েছে, তা যেকোনো সময় একটি বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটের কারণ হতে পারে। তাত্ত্বিক রবার্ট গিলপিন (Robert Gilpin) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ গ্লোবাল পলিটিক্যাল ইকোনমি (Global Political Economy)-এ ব্যাখ্যা করেছেন, কীভাবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা একে অপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে (Gilpin, 2001)। তাঁর মতে, বাণিজ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ মূলত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার একটি বড় হাতিয়ার। এই ভূখণ্ডের নীতিনির্ধারকদের এখন এই ভূ-অর্থনীতি (Geo-economics)-এর জটিল সমীকরণগুলো মাথায় রেখেই আগামী দিনের বাণিজ্য কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। নতুন বাজার খোঁজা এবং রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকা সম্ভব নয়। লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা এবং পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে নিজেদের পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ করার জন্য জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা চালানো হচ্ছে। চীনের মতো বিশাল অর্থনীতির দেশের সাথে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো এবং ভারতের বাজারে নিজেদের পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পুরোপুরি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। এই বাণিজ্য কূটনীতি কেবল পণ্য বিক্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এর সাথে জড়িয়ে আছে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের মতো বিষয়গুলো। বিশ্বায়নের এই যুগে একটি দেশকে প্রমাণ করতে হয়, তারা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নিয়মনীতি মেনে চলতে বদ্ধপরিকর। মেধাস্বত্ব আইন শক্তিশালী করা এবং কারখানার কর্মপরিবেশ উন্নত করার মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে একটি দায়িত্বশীল ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। সাহায্যনির্ভরতার সেই অন্ধকার যুগ থেকে বেরিয়ে এসে মুক্ত বাণিজ্যের এই আলোয় নিজেদের জায়গা করে নেওয়াটা এক নিরন্তর সংগ্রাম। পরাশক্তিগুলোর অর্থনৈতিক রেষারেষির মাঝে পড়ে যেন দেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ না হয়, সেজন্য কূটনীতিকদের দূরদৃষ্টি এবং প্রজ্ঞার সর্বোচ্চ প্রয়োগ ঘটাতে হবে। আগামী দিনের পৃথিবীতে সেই রাষ্ট্রই সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী হবে, যারা বাণিজ্য কূটনীতির এই জটিল দাবার বোর্ডে সবচেয়ে নিখুঁত চালটি দিতে পারবে। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গতিশীলতা এবং ভারতের প্রতি পররাষ্ট্রনীতি অভ্যন্তরীণ রাজনীতির মেরুকরণ ও পররাষ্ট্রনীতির অবিচ্ছেদ্য সংযোগ পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের ভুল ধারণা কাজ করে। অনেকেই মনে করেন, দেশের ভেতরের রাজনীতি আর বাইরের পৃথিবীর সাথে সম্পর্ক স্থাপন – এই দুটো সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। মনে হয় যেন কূটনীতির বিশাল ভবনগুলোতে বসে থাকা কর্মকর্তারা দেশের ভেতরের দলাদলি বা সংঘাত থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে কাজ করেন। বাস্তবে পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। একটি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি আর তার পররাষ্ট্রনীতি মূলত একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। দেশের ভেতরে যদি গভীর রাজনৈতিক বিভাজন থাকে, তবে সেই বিভাজনের ফাটল দিয়ে খুব সহজেই বাইরের শক্তিগুলো প্রবেশ করার সুযোগ পেয়ে যায়। এই ভূখণ্ডের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি শুরু থেকেই অত্যন্ত তীব্রভাবে বিভক্ত। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থার চরম অভাব রয়েছে। এক দল ক্ষমতায় থাকলে অন্য দল রাজপথে আন্দোলন করে, আবার ক্ষমতার পালাবদল হলে পরিস্থিতি ঠিক উল্টে যায়। এই নিরন্তর সংঘাতের কারণে রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিও সব সময় এক ধরনের অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যায়। বিশাল প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্ক নির্ধারণের ক্ষেত্রে এই অভ্যন্তরীণ বিভাজন সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে কাজ করে। দেশের ভেতরে যদি প্রতিবেশীর ব্যাপারে কোনো নির্দিষ্ট এবং সর্বসম্মত রূপরেখা না থাকে, তবে কূটনীতির টেবিলে শক্ত অবস্থানে বসা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই যে দেশের ভেতরের রাজনীতির সাথে বাইরের কূটনীতির জটিল সম্পর্ক, তা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তাত্ত্বিক আলোচনায় অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়। প্রখ্যাত তাত্ত্বিক রবার্ট পুটনাম (Robert Putnam) তাঁর যুগান্তকারী দ্বি-স্তর বিশিষ্ট খেলা (Two-Level Game) তত্ত্বে এই বিষয়টি খুব চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, একজন রাষ্ট্রনেতা বা নীতিনির্ধারককে সব সময় দুটি আলাদা টেবিলে দরকষাকষি করতে হয়। প্রথম টেবিলটি হলো আন্তর্জাতিক বা দ্বিপাক্ষিক আলোচনার টেবিল, যেখানে সে অন্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের সাথে বসে নানা রকম চুক্তি নিয়ে আলোচনা করে। আর দ্বিতীয় টেবিলটি হলো দেশের ভেতরের রাজনৈতিক মঞ্চ, যেখানে বিরোধী দল, সুশীল সমাজ এবং সাধারণ জনগণ বসে থাকে। নেতাকে খুব সাবধানে এই দুই টেবিলের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হয়। আন্তর্জাতিক টেবিলে বসে বিশাল প্রতিবেশীর সাথে হয়তো একটি অত্যন্ত লাভজনক চুক্তি স্বাক্ষর করা সম্ভব। কিন্তু নেতা জানেন যে, দেশে ফিরে ওই দ্বিতীয় টেবিলে সেই চুক্তির ন্যায্যতা প্রমাণ করতে না পারলে বিরোধী দলগুলো তাকে দেশবিক্রির অপবাদ দিয়ে ক্ষমতা থেকে টেনে নামানোর চেষ্টা করবে। ফলে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির এই প্রবল চাপের কারণে অনেক সময়ই লাভজনক বা বাস্তবসম্মত পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করা থেকে সরকারকে পিছিয়ে আসতে হয়। দেশের ভেতরের এই রাজনৈতিক মেরুকরণ মূলত রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক দরকষাকষির ক্ষমতাকে ভেতর থেকেই পঙ্গু করে দেয়। ঐতিহাসিক নৈকট্য বনাম আধিপত্যবাদের বিরোধিতার বয়ান এই ভূখণ্ডের রাজনৈতিক মানচিত্রের দিকে তাকালে ভারতের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত এবং স্পষ্ট ধারা চোখে পড়ে। দেশের রাজনীতি মূলত এই দুটি ধারার ওপর ভিত্তি করেই আবর্তিত হয়। একটি রাজনৈতিক ধারা সব সময় বিশাল প্রতিবেশীর সাথে ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক এবং মুক্তিযুদ্ধের সময়কার আত্মিক নৈকট্যের ওপর প্রবল জোর দেয়। তারা মনে করে, স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে জন্ম নেওয়ার পেছনে প্রতিবেশীর যে বিশাল অবদান রয়েছে, তার প্রতি এক ধরনের ঐতিহাসিক কৃতজ্ঞতা থাকা উচিত। এই ধারাটি বিশ্বাস করে যে, ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে প্রতিবেশীর সাথে সংঘাতের পথে না হেঁটে সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করলেই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব। তারা দুই দেশের মধ্যকার অমীমাংসিত সমস্যাগুলোকে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পক্ষে জোরালো অবস্থান নেয়। গবেষক স্মৃতি সরকারিয়া পট্টনায়ক (Smruti S. Pattanaik) তাঁর গবেষণাপত্রে খুব নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করেছেন যে, কীভাবে এই ঐতিহাসিক নৈকট্যের বয়ানটি একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মূল আদর্শিক ভিত্তির সাথে মিশে আছে (Pattanaik, 2014)। এই গোষ্ঠীর মতে, বিশ্বায়নের এই যুগে সীমানার বিরোধ নিয়ে পড়ে থাকার চেয়ে ট্রানজিট, বাণিজ্য এবং যোগাযোগের দুয়ার খুলে দেওয়াটা অনেক বেশি যৌক্তিক। অন্যদিকে দেশের ভেতরে আরেকটি প্রবল রাজনৈতিক ধারা রয়েছে, যাদের রাজনীতির অন্যতম প্রধান পুঁজি হলো প্রতিবেশীর আধিপত্যবাদের বিরোধিতা করা। এই ধারাটি মনে করে, বিশাল প্রতিবেশী রাষ্ট্রটি সব সময় তার ছোট প্রতিবেশীদের ওপর নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। তারা প্রতিবেশীর যেকোনো অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক প্রস্তাবকে চরম সন্দেহের চোখে দেখে। তাদের মূল বয়ানটি হলো, প্রতিবেশীর সাথে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব এবং নিজস্ব পরিচয়ের জন্য এক ভয়াবহ হুমকি। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিভাষায় এই ধরনের রাজনৈতিক চর্চাকে অনেক সময় পরিচয়ের রাজনীতি (Identity Politics) বলা হয়। এই ধারার অনুসারীরা মনে করেন, প্রতিবেশীর সাংস্কৃতিক আগ্রাসন থেকে নিজেদের আলাদা করে রাখার মাধ্যমেই কেবল রাষ্ট্রের নিজস্ব স্বকীয়তা টিকিয়ে রাখা সম্ভব। তারা সাধারণ মানুষের মনে এই ভয় ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে যে, প্রতিবেশীর উদ্দেশ্য আসলে ছোট রাষ্ট্রটিকে নিজেদের একটি করদরাজ্য বানিয়ে রাখা। অভ্যন্তরীণ রাজনীতির এই দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুকরণের কারণে প্রতিবেশীর সাথে একটি স্থিতিশীল এবং ধারাবাহিক সম্পর্ক বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এক সরকার ক্ষমতায় এসে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য অনেকগুলো চুক্তি স্বাক্ষর করে, পরের সরকার ক্ষমতায় এসে সেই চুক্তিগুলো বাতিল করে দেয় বা সেগুলোর বাস্তবায়ন আটকে দেয়। নীতির এই ধারাবাহিকতার অভাব রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে চরমভাবে অবিশ্বস্ত করে তোলে। নির্বাচনমুখী রাজনীতি এবং প্রতিবেশীর ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচন হলো ক্ষমতার পালাবদলের প্রধান হাতিয়ার। আর এই নির্বাচনের বৈতরণী পার হওয়ার জন্য রাজনৈতিক দলগুলো যেকোনো ধরনের কৌশল অবলম্বন করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করে না। এই ভূখণ্ডের নির্বাচনী রাজনীতিতে বিশাল প্রতিবেশীর ভূমিকা সব সময়ই একটি বড় ইস্যু হিসেবে কাজ করে। ভোটের মাঠে সাধারণ মানুষের মন জয় করার জন্য অনেক সময় বাস্তবসম্মত কূটনীতির চেয়ে আবেগপূর্ণ বক্তৃতা অনেক বেশি কার্যকর হয়। একারণে নির্বাচনের সময় দেখা যায়, রাজনৈতিক নেতারা প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে তীব্র ভাষায় আক্রমণ শানান। এই কৌশলটিকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় জনতুষ্টিবাদ (Populism) হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। রাজনৈতিক দলগুলো খুব ভালো করেই জানে যে, বিশাল প্রতিবেশীর প্রতি সাধারণ মানুষের মনে এক ধরনের চাপা ক্ষোভ বা অভিমান রয়েছে। সেই ক্ষোভকে উসকে দিয়ে খুব সহজেই সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জন করা যায়। বিরোধী দলগুলো সব সময় ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে যে, সরকার প্রতিবেশীর কাছে দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দিচ্ছে। এই ধরনের উসকানিমূলক প্রচারণার কারণে নির্বাচনের সময়গুলোতে দুই দেশের সম্পর্ক এক চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যায়। নির্বাচনের মাঠে প্রতিবেশীকে নিয়ে এই কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি কেবল ভোটের রাজনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী কূটনীতির ওপরও বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। নির্বাচনের আগে যে নেতা প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি কড়া কথা বলেন, ক্ষমতায় বসার পর তার পক্ষে প্রতিবেশীর সাথে হাসিমুখে কোনো চুক্তি করা বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। কারণ সাধারণ মানুষ তখন তাকে তার আগের কথাগুলো স্মরণ করিয়ে দেয়। আবার অনেক সময় দেখা যায়, নির্বাচনে জেতার জন্য রাজনৈতিক দলগুলো পর্দার আড়ালে খোদ সেই প্রতিবেশীরই আনুকূল্য লাভের চেষ্টা করে। দেশের ভেতরের রাজনীতিতে কে ক্ষমতায় আসবে বা কে বিরোধী দলে থাকবে, তা নিয়ে প্রতিবেশীর এক ধরনের অদৃশ্য পছন্দ-অপছন্দ থাকে। এই ব্যাপারটি দেশের সাধারণ মানুষের আত্মমর্যাদায় প্রবলভাবে আঘাত করে। তারা মেনে নিতে পারে না যে তাদের নিজেদের ভাগ্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে বাইরের কোনো শক্তির প্রচ্ছন্ন হাত থাকবে। তাত্ত্বিক অ্যান্টনিও গ্রামশি (Antonio Gramsci) তাঁর লেখায় সাংস্কৃতিক আধিপত্য (Cultural Hegemony)-এর যে ধারণা দিয়েছেন, দেশের রাজনীতিতে প্রতিবেশীর এই অদৃশ্য প্রভাব মূলত সেই আধিপত্যেরই একটি ভিন্ন রূপ। অভ্যন্তরীণ রাজনীতির এই দুর্বলতা এবং নির্বাচনমুখী হিসাব-নিকাশের কারণেই প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্ক সব সময় এক ধরনের অস্বস্তিকর এবং অস্থিতিশীল পরিস্থিতির জালে আটকে থাকে। অমীমাংসিত সমস্যা এবং অভ্যন্তরীণ জনমতের প্রবল চাপ পররাষ্ট্রনীতি শুধু বইয়ের পাতায় লেখা কিছু নিয়ম বা চুক্তি নয়। এর সাথে সরাসরি যুক্ত থাকে দেশের সাধারণ মানুষের আবেগ এবং দৈনন্দিন জীবনের নানা সমস্যা। বিশাল প্রতিবেশীর সাথে সীমানা ভাগাভাগি করে নেওয়ার কারণে প্রাকৃতিকভাবেই অনেকগুলো জটিল সমস্যার উদ্ভব হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো নদীর পানিবণ্টন। কৃষিনির্ভর এই ভূখণ্ডের জন্য নদীর পানি আক্ষরিক অর্থেই জীবন-মরণের প্রশ্ন। অভিন্ন নদীগুলোর পানির ন্যায্য হিস্যা না পাওয়ার কারণে দেশের ভেতরে প্রতিবেশীর প্রতি এক প্রবল বিরূপ মনোভাব তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় সাধারণ মানুষের প্রাণহানির ঘটনাগুলো পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তোলে। সীমান্তে যখন কোনো নিরপরাধ মানুষের মৃত্যু হয়, তখন দেশের ভেতরে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়। সোশ্যাল মিডিয়া এবং সংবাদপত্রের যুগে এই ধরনের খবরগুলো মুহূর্তের মধ্যে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এই বাস্তব এবং স্পর্শকাতর সমস্যাগুলো তখন আর কেবল কূটনীতির ফাইলে আটকে থাকে না, এগুলো পরিণত হয় অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সবচেয়ে বড় হাতিয়ারে। এই জনমতের চাপ যেকোনো সরকারের জন্যই এক ভয়াবহ রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করে। প্রখ্যাত গবেষক জেমস ফিয়ারন (James Fearon) আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এই পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করার জন্য অডিয়েন্স কস্ট (Audience Cost) তত্ত্বের অবতারণা করেছেন (Fearon, 1994)। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, কোনো সরকার যদি আন্তর্জাতিক টেবিলে বসে দেশের মানুষের আবেগের বিরুদ্ধে গিয়ে কোনো আপস করে, তবে দেশের ভেতরে তাকে চড়া রাজনৈতিক মূল্য চোকাতে হয়। এই অডিয়েন্স কস্টের ভয়ে সরকার অনেক সময় প্রতিবেশীর সাথে লাভজনক কোনো চুক্তিতে সই করতে সাহস পায় না। হয়তো বাণিজ্যের ক্ষেত্রে প্রতিবেশী অনেক বড় ধরনের শুল্ক ছাড় দিতে রাজি হয়েছে, কিন্তু সাধারণ মানুষ পানিবণ্টন বা সীমান্ত সমস্যার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত অন্য কোনো চুক্তির পক্ষে সায় দেয় না। সরকার বুঝতে পারে যে, পানিবণ্টনের চুক্তি ছাড়া বাণিজ্যের চুক্তি করলে মানুষ তাদের দেশদ্রোহী হিসেবে আখ্যায়িত করবে। ফলে বাধ্য হয়ে সরকারকে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা থেকে পিছিয়ে আসতে হয়। অভ্যন্তরীণ রাজনীতির এই তীব্র আবেগ মূলত বাস্তববাদী কূটনীতির পথকে রুদ্ধ করে দেয়। সাধারণ মানুষের এই ক্ষোভ সম্পূর্ণ যৌক্তিক হলেও, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দাবার বোর্ডে এই আবেগ অনেক সময় নিজের পায়ের তলার মাটি আরও নরম করে ফেলে। নিরাপত্তা উদ্বেগ, ট্রানজিট এবং কৌশলগত আস্থার গভীর সংকট ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই ভূখণ্ডের সাথে বিশাল প্রতিবেশীর একটি অদ্ভুত কৌশলগত নির্ভরতা তৈরি হয়েছে। প্রতিবেশীর মূল ভূখণ্ডের সাথে তার একটি বিচ্ছিন্ন এবং দূরবর্তী অংশের যোগাযোগের জন্য এই ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে যাতায়াত করাটা সবচেয়ে সহজ এবং সাশ্রয়ী। এই যাতায়াতের সুবিধার পোশাকি নাম হলো ট্রানজিট বা কানেক্টিভিটি। অর্থনীতির সহজ হিসেবে ট্রানজিট একটি অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসা হতে পারে। অন্য দেশের গাড়ি নিজের দেশের রাস্তার ওপর দিয়ে গেলে সেখান থেকে প্রচুর রাজস্ব আদায় করা সম্ভব। কিন্তু অভ্যন্তরীণ রাজনীতির মেরুকরণের কারণে এই ট্রানজিটের বিষয়টি অর্থনীতির বদলে পুরোপুরি একটি নিরাপত্তার ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। দেশের ভেতরের বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষগুলো সব সময় এই বলে জনমত তৈরি করার চেষ্টা করে যে, ট্রানজিট দিলে দেশের জাতীয় নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে পড়বে। তারা যুক্তি দেখায়, প্রতিবেশীর ওই বিচ্ছিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে সশস্ত্র বিদ্রোহ চলছে। সেই বিদ্রোহ দমনের জন্য ট্রানজিটের নামে প্রতিবেশী যদি সমরাস্ত্র পরিবহন করে, তবে এই রাষ্ট্রটিও সেই সশস্ত্র সংঘাতের একটি অংশে পরিণত হবে। এই ভয় বা আতঙ্ক দেশের মানুষের মনে খুব গভীরভাবে প্রোথিত হয়ে আছে। এই যে একে অপরকে সন্দেহ করার প্রবণতা, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তাত্ত্বিক পরিভাষায় একে বলা হয় নিরাপত্তা সংকট (Security Dilemma)। গবেষক জন হার্জ (John Herz) এই ধারণার প্রবর্তন করে দেখিয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় আস্থার অভাব কীভাবে রাষ্ট্রগুলোকে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বিরত রাখে (Herz, 1950)। বিশাল প্রতিবেশীটিও সব সময় এক ধরনের আশঙ্কার মধ্যে থাকে। তাদের ভয় হলো, ছোট প্রতিবেশীর ভূখণ্ড ব্যবহার করে বাইরের কোনো পরাশক্তি বা বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে। এই পারস্পরিক আস্থার সংকটের কারণেই দুই দেশের মধ্যে অনেকগুলো লাভজনক প্রকল্প মাঝপথে আটকে যায়। দেশের ভেতরে রাজনৈতিক ঐকমত্য না থাকায় সরকার চাইলেও প্রতিবেশীকে আশ্বস্ত করতে পারে না। বিরোধী দলগুলো ট্রানজিটকে ‘করিডোর’ আখ্যা দিয়ে এর বিরুদ্ধে তীব্র রাজনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলে। সরকার তখন বাধ্য হয়ে ট্রানজিটের অর্থনৈতিক সুফলের কথা বাদ দিয়ে রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার দিকে বেশি মনোযোগ দেয়। অভ্যন্তরীণ রাজনীতির এই কৌশলগত ভীতি মূলত দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে বড় দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই দেয়াল ভাঙতে না পারলে আধুনিক কানেক্টিভিটির যুগে রাষ্ট্রটি অর্থনৈতিকভাবে অনেক পিছিয়ে পড়বে। প্রাতিষ্ঠানিক কূটনীতি বনাম রাজনৈতিক কাঠামোর দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্ব একটি রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর একটি বড় ভূমিকা থাকে। পেশাদার কূটনীতিক এবং আমলারা মূলত রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থের কথা মাথায় রেখে নীতি প্রণয়ন করেন। তারা আবেগ বা দলাদলির বাইরে গিয়ে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় প্রতিবেশীর সাথে দেনদরবার চালান। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন এই প্রাতিষ্ঠানিক কূটনীতির সাথে রাজনৈতিক নেতৃত্বের চিন্তাধারার সংঘর্ষ বাধে। অনেক সময় দেখা যায়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা প্রতিবেশীর সাথে একটি নির্দিষ্ট চুক্তির খসড়া তৈরি করে রেখেছেন, যা রাষ্ট্রের জন্য দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক। কিন্তু রাজনৈতিক সরকার সেই চুক্তিটি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে দেখে যে, এর ফলে দেশের ভেতরে তাদের ভোটব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। রাজনৈতিক নেতারা সাধারণত পরবর্তী নির্বাচনের হিসাব-নিকাশ নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকেন। ফলে তারা আমলাতন্ত্রের সেই দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত পরামর্শ উপেক্ষা করে তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের দিকে ঝুঁকে পড়েন। প্রাতিষ্ঠানিক কূটনীতি এবং রাজনৈতিক স্বার্থের এই টানাপোড়েন প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্ককে সব সময় এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে রাখে। এই দ্বন্দ্ব নিরসনের একমাত্র উপায় হলো দেশের ভেতরে পররাষ্ট্রনীতির মূল বিষয়গুলোতে একটি অলিখিত রাজনৈতিক সমঝোতা তৈরি করা। উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে সাধারণত দেখা যায়, দেশের ভেতরে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অর্থনীতি বা সমাজব্যবস্থা নিয়ে চরম মতবিরোধ থাকলেও, জাতীয় নিরাপত্তা এবং প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্কের মতো বিষয়ে সবাই একমত থাকে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আলোচনায় একে বলা হয় জাতীয় ঐকমত্য (National Consensus)। সমাজবিজ্ঞানী ইয়ুর্গেন হাবারমাস (Jürgen Habermas) তাঁর তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে, উন্মুক্ত আলোচনার মাধ্যমেই একটি সমাজে এই ধরনের ঐকমত্য তৈরি হওয়া সম্ভব। কিন্তু এই ভূখণ্ডের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সহনশীলতা এবং পরমতসহিষ্ণুতার বড়ই অভাব। সরকারি দল এবং বিরোধী দলের মধ্যে ন্যূনতম কোনো আলোচনার পরিবেশ নেই। কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না। এই অবিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে বিশাল প্রতিবেশীটি অনেক সময় দেশের ভেতরের রাজনীতিতে নিজেদের পছন্দমতো গুটি সাজানোর চেষ্টা করে। তারা দেশের একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে সব সময় কাছে টেনে রাখে এবং অন্য গোষ্ঠীকে দূরে ঠেলে দেয়। অভ্যন্তরীণ রাজনীতির এই বিভাজন এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণেই মূলত রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি অনেক সময় তার নিজস্ব পথ হারিয়ে ফেলে। একটি বিভক্ত জাতি কখনোই আন্তর্জাতিক মঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। বাংলাদেশের নিরাপত্তা ইস্যুসমূহ (Security issues for Bangladesh) জাতীয় নিরাপত্তার বহুমাত্রিক ধারণা ও প্রথাগত সমীকরণ নিরাপত্তা শব্দটি শুনলে সাধারণ মানুষের মনে সবার আগে কী ভেসে ওঠে? খুব সম্ভবত বিশাল কোনো সেনাবাহিনীর কুচকাওয়াজ, সারি সারি যুদ্ধট্যাংক কিংবা আকাশে চক্কর দেওয়া যুদ্ধবিমানের ছবি। একটা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত পৃথিবীর বাঘা বাঘা রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরাও ঠিক এভাবেই ভাবতেন। তাদের কাছে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা মানেই ছিল অন্য কোনো দেশের সামরিক আক্রমণ থেকে নিজেদের ভৌগোলিক সীমানাকে সুরক্ষিত রাখা। তাত্ত্বিক পরিভাষায় এই ধারণাকে প্রথাগত নিরাপত্তা (Traditional Security) বলা হয়। তবে বদ্বীপ অঞ্চলের এই রাষ্ট্রটির বাস্তবতায় নিরাপত্তার এই পুরনো ব্যাকরণ খুব একটা কাজে আসে না। তিন দিক থেকে বিশাল আয়তনের এক প্রতিবেশী রাষ্ট্র দিয়ে ঘেরা একটি ছোট দেশের জন্য সরাসরি কোনো সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা বাস্তবে বেশ কম। তারপরও রাষ্ট্রকে বিশাল এক প্রতিরক্ষা বাহিনী পুষতে হয় এবং প্রতিনিয়ত সামরিক সরঞ্জাম আধুনিকায়ন করতে হয়। এর পেছনে মূলত কাজ করে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা। সামরিক বাহিনী এখানে কেবল যুদ্ধ করার জন্য নয়, প্রতিবেশীকে একটি প্রচ্ছন্ন বার্তা দেওয়ার জন্য কাজ করে। বার্তাটি হলো, সহজে এই ভূখণ্ডে আক্রমণ করে পার পাওয়া যাবে না। প্রখ্যাত গবেষক ব্যারি বুজান (Barry Buzan) তাঁর যুগান্তকারী গ্রন্থ পিপল, স্টেটস অ্যান্ড ফিয়ার (People, States and Fear)-এ নিরাপত্তার ধারণাকে সম্পূর্ণ নতুন একটি মাত্রায় নিয়ে গেছেন। তিনি খুব চমৎকারভাবে দেখিয়েছেন যে, আধুনিক রাষ্ট্রে নিরাপত্তা কেবল সামরিক বাহিনীর বুটের আওয়াজের মধ্যে আটকে থাকে না। অর্থনীতি, সমাজ, পরিবেশ এবং রাজনীতি – এই সবকিছুর মিলিত রূপই হলো একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত নিরাপত্তা। এই বহুমাত্রিক ধারণার চশমা দিয়ে দেখলে রাষ্ট্রের নিরাপত্তার সমীকরণটি বেশ জটিল আকার ধারণ করে। বিশাল জনসংখ্যার এই দেশে প্রাকৃতিক সম্পদের পরিমাণ এমনিতেই বেশ সীমিত। তার ওপর চারপাশের প্রতিবেশীদের সাথে অর্থনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতার এক বিশাল ব্যবধান রয়েছে। সরাসরি কোনো দেশ সামরিক আক্রমণ না চালালেও, প্রতিবেশীর যেকোনো একতরফা সিদ্ধান্তে এই দেশের অর্থনীতি বা পরিবেশ মারত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। উজানে কোনো নদী শাসন বা বাঁধ নির্মাণের কারণে ভাটির এই দেশে প্রাকৃতিকভাবেই এক বিশাল নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়। সরাসরি কোনো গোলাগুলি না হলেও, জলের অভাবে দেশের কোটি কোটি কৃষকের জীবন-জীবিকা সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে পড়ে যায়। আধুনিক বিশ্বে একটি দুর্বল বা ছোট রাষ্ট্রের জন্য প্রথাগত সামরিক হুমকির চেয়ে এই ধরনের কাঠামোগত হুমকিগুলো অনেক বেশি ভয়ংকর রূপ নিয়ে হাজির হয়। পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রকে প্রতিনিয়ত এক ধরনের নীরব এবং ক্লান্তিকর কূটনৈতিক যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হয়। নীতিনির্ধারকরা খুব ভালো করেই জানেন যে, পেশিশক্তি বা অস্ত্রের ঝনঝনানি দিয়ে এই ধরনের সংকটের সমাধান কোনোভাবেই সম্ভব নয়। ফলে তারা সামরিক খাতের পাশাপাশি অর্থনৈতিক এবং পরিবেশগত সুরক্ষার দিকে বাধ্য হয়েই বেশি মনোযোগ দেন। কাঠামোগত এই সীমাবদ্ধতার ভেতরে থেকেই রাষ্ট্র তার নিজস্ব নিরাপত্তার এক নতুন, বাস্তবসম্মত এবং বহুমুখী রূপরেখা তৈরি করে চলেছে। এই প্রথাগত নিরাপত্তার ধারণায় রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাও একটি বিশাল ভূমিকা পালন করে। একটি দেশের ভেতরে যদি রাজনৈতিক অস্থিরতা থাকে, বাইরের শক্তি খুব সহজেই সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্রের ওপর ছড়ি ঘোরাতে পারে। দেশের ভেতরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে তাই সব সময় সতর্ক থাকতে হয়। তারা কেবল বাইরের শত্রুর দিকে নজর রাখে না, দেশের ভেতরের কোনো গোষ্ঠী যেন বিদেশি শক্তির ক্রীড়নক হিসেবে কাজ করতে না পারে, সেদিকেও তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখে। রাষ্ট্রের এই প্রতিরক্ষামূলক আচরণ অনেক সময় সাধারণ মানুষের কাছে কিছুটা বাড়াবাড়ি মনে হতে পারে। তারপরও বৃহত্তর রাষ্ট্রীয় স্বার্থের কথা চিন্তা করে এই ধরনের কঠোর নজরদারি ব্যবস্থা চালু রাখা হয়। সামরিক সক্ষমতা এবং অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা নজরদারির এই সমন্বয় মূলত রাষ্ট্রকে যেকোনো আকস্মিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করার একটি শক্ত ঢাল হিসেবে কাজ করে। এই ঢালটি যত বেশি মজবুত হয়, আন্তর্জাতিক দরকষাকষির টেবিলে রাষ্ট্রের কূটনীতিকদের গলার স্বর ততটাই জোরালো থাকে। অ-প্রথাগত নিরাপত্তা এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধের বিস্তৃতি সীমান্ত মানেই হলো দুটি আলাদা রাষ্ট্রের বিভাজন রেখা। কাগজে-কলমে এই রেখাটি খুব স্পষ্ট হলেও, বাস্তবে সীমান্ত এলাকার মানুষের জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ ভিন্ন এক নিয়মে চলে। এই ভূখণ্ডের বিশাল সীমান্তজুড়ে প্রতিদিন যে পরিমাণ বৈধ বাণিজ্য হয়, তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি লেনদেন হয় সম্পূর্ণ অবৈধ পথে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিভাষায় এই বিষয়গুলোকে অ-প্রথাগত নিরাপত্তা (Non-traditional Security) হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। প্রথাগত যুদ্ধে শত্রুকে সামনে থেকে দেখা যায়, কিন্তু এই অ-প্রথাগত হুমকিতে শত্রুর কোনো নির্দিষ্ট চেহারা থাকে না। চোরাচালান, মাদক ব্যবসা এবং মানব পাচারের মতো আন্তঃসীমান্ত অপরাধগুলো রাষ্ট্রের অর্থনীতির পাশাপাশি সমাজের ভেতরের কাঠামোকেও নীরবে ধ্বংস করে দেয়। হাজার হাজার মাইল লম্বা এবং অনেক ক্ষেত্রে দুর্গম এই সীমানা পুরোপুরি পাহারা দেওয়া যেকোনো দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর জন্যই প্রায় অসম্ভব একটি কাজ। এই সুযোগটি কাজে লাগায় দুই দেশের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা বিশাল সব অপরাধী চক্র। তারা স্থানীয় সাধারণ মানুষকে টাকার লোভ দেখিয়ে এই অবৈধ কাজগুলোতে যুক্ত করে ফেলে। ফলে সীমান্ত এলাকাগুলো ধীরে ধীরে এক ধরনের ছায়া অর্থনীতির কেন্দ্রে পরিণত হয়, যা রাষ্ট্রের মূল অর্থনীতির জন্য বিরাট এক মাথাব্যথার কারণ। এই আন্তঃসীমান্ত অপরাধগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর রূপ নিয়েছে মাদক চোরাচালান। প্রতিবেশী দেশগুলোর কারখানা থেকে ফেন্সিডিল বা ইয়াবার মতো মাদকদ্রব্য প্রতিদিন স্রোতের মতো দেশের ভেতরে প্রবেশ করছে। এই মাদকের ছোবলে দেশের বিশাল একটি তরুণ সমাজ ধীরে ধীরে কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। তাত্ত্বিক রবার্ট কিওহ্যান (Robert Keohane) এবং জোসেফ নাই (Joseph Nye) তাঁদের গবেষণায় অ-রাষ্ট্রীয় সত্তা (Non-state Actors)-এর যে ক্ষমতার কথা উল্লেখ করেছেন, এই মাদক চোরাকারবারি চক্রগুলো মূলত সেই ক্ষমতারই এক ভয়াবহ বাস্তব রূপ। এদের কাছে কোনো আধুনিক সমরাস্ত্র নেই, কিন্তু বিপুল পরিমাণ কালো টাকা এবং স্থানীয় রাজনীতির সাথে গভীর যোগাযোগের কারণে এরা অনেক সময় রাষ্ট্রীয় বাহিনীর চেয়েও বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এই চক্রগুলো শুধু মাদকই পাচার করে না, অনেক সময় এরা অবৈধ অস্ত্রও দেশের ভেতরে নিয়ে আসে। এই অস্ত্রগুলো পরবর্তীতে দেশের ভেতরের রাজনৈতিক সংঘাত বা সন্ত্রাসী কার্যক্রমে ব্যবহৃত হয়। একটি সাধারণ চোরাচালানের ঘটনা কীভাবে রাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, এটি তার একটি নিখুঁত উদাহরণ। মানব পাচার এই অ-প্রথাগত নিরাপত্তা হুমকির আরেকটি অন্ধকার দিক। কাজের সন্ধানে বা একটু ভালো জীবনের আশায় দেশের হাজার হাজার দরিদ্র মানুষ প্রতিনিয়ত দালালের খপ্পরে পড়ছে। সীমান্ত পার হয়ে প্রতিবেশী দেশে যাওয়া কিংবা সমুদ্রপথে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অন্য কোনো দেশে পাড়ি জমানোর এই চেষ্টা অনেক সময়ই মর্মান্তিক পরিণতি ডেকে আনে। এই পাচার চক্রগুলোর নেটওয়ার্ক একাধিক দেশজুড়ে বিস্তৃত থাকে। ফলে একা একটি রাষ্ট্রের পক্ষে এদের শিকড় উপড়ে ফেলা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। এই সমস্যা সমাধানের জন্য প্রতিবেশী দেশগুলোর সীমান্তরক্ষী এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে গভীর সমন্বয় প্রয়োজন। বাস্তবে দুই দেশের বাহিনীর মধ্যে সেই আস্থার জায়গাটি সব সময় মজবুত থাকে না। অনেক সময় এক দেশের বাহিনী অন্য দেশের বাহিনীর দিকে শুধু অভিযোগের আঙুল তুলেই দায়িত্ব শেষ করে। এই সমন্বয়হীনতার কারণে অপরাধীরা খুব সহজেই পার পেয়ে যায়। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের তাই সামরিক বাজেট বাড়ানোর পাশাপাশি এই অদৃশ্য শত্রুদের মোকাবেলা করার জন্য গোয়েন্দা সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রাতিষ্ঠানিক কূটনীতির ওপর অনেক বেশি জোর দিতে হয়। সীমান্ত হত্যা এবং মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বের সমীকরণ সীমান্তের কাঁটাতার কেবল দুটি দেশকে আলাদা করে না, অনেক সময় এটি দুই দেশের মানুষের মনের ভেতরেও বিশাল এক বিভেদের দেয়াল তুলে দেয়। এই ভূখণ্ডের নিরাপত্তার আলোচনায় সবচেয়ে আবেগপূর্ণ এবং সংবেদনশীল বিষয়টি হলো সীমান্ত হত্যা। পৃথিবীর খুব কম সীমান্তেই শান্তিকালীন সময়ে এত বিপুল সংখ্যক সাধারণ মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। একটু ভালো রোজগারের আশায় কিংবা নিতান্তই ভুল করে সীমান্ত পার হতে গিয়ে অনেক নিরীহ মানুষকে প্রতিবেশী দেশের সীমান্তরক্ষীদের গুলির শিকার হতে হয়। প্রতিটি মৃত্যুর খবর দেশের সংবাদমাধ্যমগুলোতে আসার পর সাধারণ মানুষের মনে এক ধরনের তীব্র ক্ষোভ এবং অসহায়ত্বের জন্ম হয়। গবেষক সঞ্জয় ভরদ্বাজ তাঁর বিশ্লেষণে খুব স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন যে, এই সীমান্ত হত্যা এবং অমীমাংসিত সমস্যাগুলোই মূলত দুই দেশের মধ্যে একটি স্থায়ী অস্বস্তি তৈরি করে রেখেছে (Bhardwaj, 2003)। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যতই বন্ধুত্বের কথা বলা হোক না কেন, সাধারণ মানুষের লাশের ছবি সেই বন্ধুত্বের বয়ানকে মুহূর্তের মধ্যে ম্লান করে দেয়। এই মৃত্যুগুলো কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, এগুলো রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব এবং নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তার প্রশ্নে এক বিশাল প্রশ্নবোধক চিহ্ন হিসেবে কাজ করে। এই ধরনের মর্মান্তিক ঘটনাগুলো দেশের ভেতরের রাজনীতিতেও ব্যাপক প্রভাব ফেলে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো খুব স্বাভাবিকভাবেই সরকারের বিরুদ্ধে নতজানু পররাষ্ট্রনীতির অভিযোগ তোলে। তারা সাধারণ মানুষের এই ক্ষোভকে রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করে। সরকার তখন এক ধরনের উভয়সংকটে পড়ে যায়। একদিকে বিশাল প্রতিবেশীর সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার কৌশলগত বাধ্যবাধকতা, অন্যদিকে দেশের ভেতরের জনমতের প্রবল চাপ। তাত্ত্বিক পরিভাষায় এই পরিস্থিতিকে অডিয়েন্স কস্ট (Audience Cost) বলা যেতে পারে, যেখানে দেশের ভেতরের মানুষের আবেগকে শান্ত করাটা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক রক্ষার চেয়েও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। সরকার বাধ্য হয়ে প্রতিবেশীর কাছে কড়া প্রতিবাদলিপি পাঠায়, সীমান্তরক্ষী বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে নিয়মিত বৈঠক হয়, রাবার বুলেট ব্যবহারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। তারপরও কিছুদিন পর আবার সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। এই চক্রাকার প্রাণহানির কারণে সাধারণ মানুষের মনে প্রতিবেশী রাষ্ট্র সম্পর্কে এক ধরনের স্থায়ী মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব বা ভীতি তৈরি হয়ে যায়। তারা প্রতিবেশীর যেকোনো বাণিজ্যিক বা সাংস্কৃতিক প্রস্তাবকেও চরম সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করে। সীমান্ত ব্যবস্থাপনার এই ধারাবাহিক ব্যর্থতার পেছনে মূলত দুই দেশের অর্থনৈতিক বৈষম্য একটি বড় কারণ হিসেবে কাজ করে। সীমান্তের দুই পাশের মানুষের জীবনযাত্রার মান এবং কর্মসংস্থানের সুযোগের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত রয়েছে। অভাবের তাড়নায় মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়েও সীমানা পার হতে বাধ্য হয়। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, সীমান্ত এলাকাগুলোতে যদি যৌথ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা যায় এবং স্থানীয় মানুষের জন্য বৈধ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা যায়, এই অবৈধ যাতায়াত এমনিতেই কমে আসবে। কিন্তু এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার জন্য যে পরিমাণ পারস্পরিক রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন, তার চরম অভাব রয়েছে। প্রতিবেশী রাষ্ট্রটি মূলত সীমান্তকে একটি নিরেট নিরাপত্তার চশমা দিয়ে দেখে, আর এই ভূখণ্ডের মানুষ সীমান্তকে দেখে জীবন-জীবিকার একটি বিকল্প পথ হিসেবে। দৃষ্টিভঙ্গির এই বিশাল পার্থক্যের কারণেই সীমান্তে রক্তপাত বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। জাতীয় নিরাপত্তার এই স্পর্শকাতর দিকটি সামলাতে গিয়ে কূটনীতিকে প্রতিনিয়ত সাধারণ মানুষের আবেগের কাছে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়, যা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য চরম অস্বস্তিকর। পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূ-রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা দেশের মানচিত্রের দিকে তাকালে দক্ষিণ-পূর্ব কোণের পাহাড়ি অঞ্চলটি খুব সহজেই আলাদা করে চোখে পড়ে। সমতল ভূমির এই দেশে পার্বত্য চট্টগ্রাম যেন প্রাকৃতিকভাবেই সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি ভূগোল। উঁচু নিচু পাহাড়, ঘন জঙ্গল এবং ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষের বসবাসের কারণে এই অঞ্চলটি শুরু থেকেই রাষ্ট্রের জন্য একটি বড় ধরনের নিরাপত্তার মাথাব্যথা হয়ে আছে। দেশের মোট আয়তনের প্রায় দশ শতাংশ জুড়ে থাকা এই ভূখণ্ডের সাথে প্রতিবেশী দুটি দেশের সরাসরি সীমান্ত রয়েছে। একদিকে মিয়ানমারের দুর্গম জঙ্গল, অন্যদিকে ভারতের মিজোরাম এবং ত্রিপুরা রাজ্য। এই ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই অঞ্চলটি এক চরম ভূ-রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা (Geopolitical Sensitivity) ধারণ করে। একটা দীর্ঘ সময় ধরে এই অঞ্চলে সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন চলেছে। রাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডের সাথে এই অঞ্চলের মানুষের মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বের সুযোগ নিয়ে বাইরের শক্তিগুলো অনেক সময়ই এখানে ইন্ধন জুগিয়েছে। নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে একটি ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তির মাধ্যমে এই সশস্ত্র বিদ্রোহের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটলেও, বাস্তবে পাহাড়ের বুকের ভেতর থেকে সংঘাতের আগুন পুরোপুরি নেভেনি। পার্বত্য চট্টগ্রামের এই অস্থিতিশীলতার পেছনে আঞ্চলিক রাজনীতির অনেক গোপন সমীকরণ কাজ করে। এই অঞ্চলের দুর্গম সীমানা ব্যবহার করে অনেক সময়ই প্রতিবেশী দেশগুলোর বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠী অস্ত্র চোরাচালানের নিরাপদ রুট তৈরি করার চেষ্টা করে। বিশ্বজুড়ে মাদক ব্যবসার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল’-এর খুব কাছাকাছি অবস্থান হওয়ায়, এই অঞ্চলটি মাদক পাচারকারীদের জন্যও অত্যন্ত আকর্ষণীয়। স্থানীয় পাহাড়ি গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে নিজেদের রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের যে অভ্যন্তরীণ লড়াই চলে, তার সাথে এই অবৈধ অস্ত্র এবং মাদকের টাকার গভীর যোগসূত্র রয়েছে। রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা এবং সামরিক বাহিনীকে তাই এই অঞ্চলে সব সময় সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় থাকতে হয়। তারা খুব ভালো করেই জানে যে, পাহাড়ের ভেতরের সামান্য কোনো অস্থিতিশীলতা খুব দ্রুতই আন্তর্জাতিক রূপ নিতে পারে। তাত্ত্বিকরা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আলোচনায় অনেক সময় একে ছায়াযুদ্ধ (Proxy War)-এর চারণভূমি হিসেবে আখ্যায়িত করেন। বিশাল প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো নিজেদের ভূখণ্ডের বাইরে অন্য কোনো দেশের দুর্গম অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বলয় তৈরি করতে সব সময়ই মুখিয়ে থাকে। এই সুযোগ যেন কেউ নিতে না পারে, সেটি নিশ্চিত করাই পাহাড়ে মোতায়েন থাকা নিরাপত্তা বাহিনীর প্রধান লক্ষ্য। এই সংবেদনশীল অঞ্চলটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য শুধু সামরিক শক্তি প্রয়োগই যথেষ্ট নয়। পাহাড়ের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং তাদের ভূমি অধিকার নিশ্চিত করাটা এখানে সবচেয়ে বেশি জরুরি। যুগের পর যুগ ধরে চলে আসা বঞ্চনার অনুভূতি দূর করতে না পারলে কোনো শান্তি চুক্তিই দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয় না। রাষ্ট্রকে একই সাথে দুটি ফ্রন্টে কাজ করতে হয়। একদিকে পাহাড়ি জনপদে স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল এবং রাস্তাঘাট নির্মাণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ছোঁয়া পৌঁছে দেওয়া, অন্যদিকে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর যেকোনো ধরনের সশস্ত্র তৎপরতাকে কঠোর হাতে দমন করা। এই ভারসাম্য রক্ষা করাটা মোটেও সহজ কাজ নয়। সামান্য কোনো ভুল বোঝাবুঝি থেকেই পাহাড়ে বড় ধরনের জাতিগত সংঘাত তৈরি হতে পারে, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর কড়া সমালোচনার মুখে ফেলে দেয় রাষ্ট্রকে। জাতীয় নিরাপত্তার এই দিকটি তাই অত্যন্ত নাজুক। এখানে প্রয়োজন হয় চরম ধৈর্যের এবং পাহাড়ি ও বাঙালি – উভয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে একটি স্থায়ী আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলার। এই আস্থার প্রাচীর শক্ত করতে পারলেই কেবল পাহাড়ের ভূ-রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা থেকে রাষ্ট্র মুক্তি পেতে পারে। বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও নীল অর্থনীতির সুরক্ষা জাতীয় নিরাপত্তার আলোচনা সাধারণত স্থলভাগ বা মাটির সীমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। একুশ শতকে এসে এই ধারণায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। এখন নিরাপত্তার নতুন সীমান্ত হলো সমুদ্র। বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলরাশি এই ভূখণ্ডের জন্য কেবল একটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নয়, এটি আগামী দিনের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় প্রাণভোমরা। আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে প্রতিবেশী ভারত এবং মিয়ানমারের সাথে সমুদ্রসীমার বিরোধ নিষ্পত্তি হওয়ার পর রাষ্ট্র এক বিশাল সামুদ্রিক এলাকার ওপর নিজের একচ্ছত্র আইনি অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে। এই বিশাল জলভাগে লুকিয়ে আছে বিপুল পরিমাণ মৎস্যসম্পদ, খনিজ পদার্থ এবং অনাবিষ্কৃত গ্যাস ব্লক। এই সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করাই এখন জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। অর্থনীতিবিদরা সমুদ্রভিত্তিক এই নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে নীল অর্থনীতি (Blue Economy) নামে ডাকেন। এই বিশাল সম্পদ পাহারা দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রের নৌবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এখন আর কোনো বিলাসী ব্যাপার নয়, এটি আক্ষরিক অর্থেই টিকে থাকার এক অপরিহার্য প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সমুদ্রের এই বিশাল বিস্তৃতিতে নজরদারি করা স্থলভাগের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন। প্রখ্যাত সামরিক চিন্তাবিদ আলফ্রেড থায়ার মাহান (Alfred Thayer Mahan) তাঁর বিখ্যাত সামুদ্রিক শক্তি (Sea Power) তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে, যে রাষ্ট্র সমুদ্রের বাণিজ্য পথ এবং সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, বিশ্বরাজনীতিতে তার ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি থাকে। বঙ্গোপসাগরে এখন বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর নজর পড়েছে। চীন, যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারত – সবাই চায় এই অঞ্চলে নিজেদের নৌ-উপস্থিতি বাড়াতে। এই পরাশক্তিগুলোর ভূ-রাজনৈতিক রেষারেষির মাঝে নিজেদের সমুদ্রসীমাকে নিরাপদ রাখা ছোট একটি রাষ্ট্রের জন্য বিশাল চ্যালেঞ্জ। এর বাইরেও রয়েছে অনেক দৈনন্দিন হুমকি। বিদেশি ট্রলারগুলো প্রায়ই অবৈধভাবে এই দেশের জলসীমায় ঢুকে টনকে টন মাছ ধরে নিয়ে যায়। পাশাপাশি রয়েছে জলদস্যুদের উৎপাত এবং সমুদ্রপথে মানব পাচারের ভয়াবহ সব ঘটনা। এই বিশাল এবং উন্মুক্ত জলপথে অপরাধীদের শনাক্ত করা এবং তাদের আইনের আওতায় আনা অত্যন্ত দুরূহ একটি কাজ। এর জন্য প্রয়োজন আধুনিক রাডার ব্যবস্থা, নজরদারি বিমান এবং শক্তিশালী টহল জাহাজ। সমুদ্র কূটনীতি এখন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি অত্যন্ত ব্যস্ত এবং গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ। রাষ্ট্র বুঝতে পেরেছে যে, সমুদ্রের নিরাপত্তা একা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন প্রতিবেশী এবং অন্যান্য সামুদ্রিক শক্তিগুলোর সাথে গভীর সমন্বয়। যৌথ নৌ-মহড়া, তথ্য বিনিময় এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে মূলত সমুদ্রের এই বিশালতাকে সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে। একই সাথে সমুদ্র দূষণ রোধ এবং সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষার মতো পরিবেশগত নিরাপত্তার বিষয়গুলোও এখন সমান গুরুত্ব পাচ্ছে। সমুদ্রে কোনো তেলবাহী জাহাজ থেকে তেল ছড়িয়ে পড়লে তা পুরো উপকূলের পরিবেশকে চিরতরে ধ্বংস করে দিতে পারে। এই ধরনের অ-প্রথাগত হুমকিগুলো মোকাবেলা করার জন্য রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি এখনো বেশ প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। সামনের দিনগুলোতে স্থলভাগের সীমানার চেয়ে এই সামুদ্রিক সীমানার নিরাপত্তাই রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের সবচেয়ে বেশি ভাবাবে। বঙ্গোপসাগরের এই সুনীল জলরাশিকে নিজেদের অর্থনৈতিক মুক্তির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে হলে এর সুরক্ষায় রাষ্ট্রকে আরও অনেক বেশি বাস্তবমুখী এবং শক্তিশালী পদক্ষেপ নিতে হবে। সাইবার স্পেস এবং আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির নতুন হুমকি আধুনিক যুগে এসে যুদ্ধক্ষেত্রের সংজ্ঞাটাই পুরোপুরি পাল্টে গেছে। এখন আর শত্রুকে ঘায়েল করার জন্য গোলা বা বারুদ ছোঁড়ার প্রয়োজন পড়ে না। একটি ল্যাপটপ আর ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবহার করে হাজার মাইল দূর থেকে একটি দেশের পুরো অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়া সম্ভব। নিরাপত্তার এই নতুন এবং অদৃশ্য রণাঙ্গনটির নাম হলো সাইবার স্পেস। এই ভূখণ্ডের মানুষ যখন ধীরে ধীরে ডিজিটাল অর্থনীতির দিকে ঝুঁকছে, এই সাইবার নিরাপত্তা (Cyber Security) জাতীয় সুরক্ষার সবচেয়ে বড় মাথাব্যথা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ২০১৬ সালের ৪-৫ ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির সেই ভয়াবহ ঘটনাটি রাষ্ট্রকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, দেশের গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রযুক্তিগতভাবে কতটা অরক্ষিত। এই ধরনের একটি সাইবার আক্রমণ কেবল কিছু টাকা চুরি নয়, এটি রাষ্ট্রের আর্থিক সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত। প্রথাগত সামরিক বাহিনী দিয়ে এই অদৃশ্য আক্রমণ ঠেকানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সম্পূর্ণ নতুন ধরনের এক প্রযুক্তিগত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং অত্যন্ত দক্ষ জনবল, যার চরম অভাব এই রাষ্ট্রটিতে রয়েছে। অর্থনৈতিক সাইবার অপরাধের পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তির আরেকটি ভয়ংকর দিক হলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যবহার। একটি মিথ্যা খবর বা গুজব মুহূর্তের মধ্যে কোটি কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে গিয়ে দেশের ভেতরে চরম অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে। অনেক সময় দেখা যায়, দেশের বাইরের কোনো গোষ্ঠী সুপরিকল্পিতভাবে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে দেশের সাধারণ মানুষকে উত্তেজিত করার চেষ্টা করছে। সমাজবিজ্ঞানী মানুয়েল কাস্তেলজ (Manuel Castells) তাঁর তত্ত্বে নেটওয়ার্ক সোসাইটি (Network Society)-এর যে ক্ষমতার কথা বলেছেন, এই গুজব বা অপতথ্যগুলো মূলত সেই নেটওয়ার্কের ক্ষমতা ব্যবহার করেই রাষ্ট্রযন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়। একটি ধর্মীয় বা রাজনৈতিক গুজব থেকে ছড়িয়ে পড়া সহিংসতা সামাল দিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়। এই ধরনের তথ্যসন্ত্রাস রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য এখন প্রথাগত যেকোনো হুমকির চেয়ে অনেক বেশি বিপজ্জনক। সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্ব নিয়ন্ত্রণ করার এই আধুনিক স্নায়ুযুদ্ধ মোকাবেলা করা রাষ্ট্রের জন্য এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক এবং প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই নতুন ধারার হুমকি মোকাবেলায় রাষ্ট্রকে এখন প্রথাগত আইনের বাইরে গিয়ে নতুন নতুন সাইবার আইন তৈরি করতে হচ্ছে। এখানেও এক ধরনের সূক্ষ্ম রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। সাইবার নিরাপত্তার নামে তৈরি করা আইনগুলো অনেক সময় সাধারণ মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ণ করে বলে সুশীল সমাজ অভিযোগ তোলে। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের তাই একই সাথে দুটি কাজ করতে হয়। একদিকে সাইবার স্পেসকে অপরাধীদের হাত থেকে নিরাপদ রাখা, অন্যদিকে সাধারণ নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং বাকস্বাধীনতার সুরক্ষা নিশ্চিত করা। এই দুইয়ের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য রক্ষা করাটা অত্যন্ত কঠিন। তাছাড়া, সাইবার অপরাধীদের কোনো ভৌগোলিক সীমানা থাকে না। অন্য কোনো দেশে বসে থাকা একজন হ্যাকারকে বিচারের আওতায় আনতে হলে আন্তর্জাতিক সাইবার আইন এবং পারস্পরিক আইনি সহায়তা চুক্তির প্রয়োজন হয়। ফলে সাইবার নিরাপত্তা এখন আর কেবল দেশের ভেতরের প্রযুক্তিগত বিষয় নয়, এটি পররাষ্ট্রনীতিরও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে। আগামী দিনের পৃথিবীতে যে রাষ্ট্র সাইবার স্পেসে যত বেশি সুরক্ষিত থাকবে, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তার টিকে থাকার সম্ভাবনা ততটাই উজ্জ্বল হবে। নীল অর্থনীতি ও সমুদ্রকেন্দ্রিক কূটনীতির নতুন দিগন্ত নীল অর্থনীতির তাত্ত্বিক ভিত্তি ও ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব পৃথিবীর চার ভাগের তিন ভাগ জল। মানুষ হাজার হাজার বছর ধরে নিজের রাষ্ট্রীয় সীমানা, নিরাপত্তা এবং কূটনীতির সব হিসাব-নিকাশ কেবল ওই এক ভাগ ডাঙাকে ঘিরেই আবর্তিত করেছে। মাটির সীমানায় দেয়াল তোলা যায়, কাঁটাতার বিছানো যায়, প্রহরীর জন্য চৌকি বসানো যায়। সাগরের উন্মুক্ত এবং অশান্ত জলরাশিতে তেমন কোনো স্থায়ী দেয়াল তোলার সুযোগ নেই। আধুনিক বিশ্বব্যবস্থায় এসে মানুষের সেই চিরায়ত স্থলকেন্দ্রিক চিন্তাধারায় এক বিশাল কাঠামোগত পরিবর্তন এসেছে। অর্থনীতিবিদ এবং নীতিনির্ধারকরা বুঝতে পেরেছেন, পৃথিবীর আগামী দিনের বেঁচে থাকার প্রধান রসদ মাটির নিচে নয়, লুকিয়ে আছে সমুদ্রের অতল গহ্বরে। এই নতুন অর্থনৈতিক দর্শনের পোশাকি নাম হলো নীল অর্থনীতি (Blue Economy)। বেলজিয়ামের প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ গুন্টার পাউলি (Gunter Pauli) তাঁর যুগান্তকারী গ্রন্থ দ্য ব্লু ইকোনমি: ১০ ইয়ার্স, ১০০ ইনোভেশনস, ১০০ মিলিয়ন জবস (The Blue Economy: 10 Years, 100 Innovations, 100 Million Jobs)-এ প্রথম এই ধারণার একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা দেন (Pauli, 2010)। তাঁর মতে, সমুদ্রের ইকোসিস্টেম বা বাস্তুতন্ত্রকে কোনো রকম ক্ষতি না করে সামুদ্রিক সম্পদের সর্বোচ্চ এবং টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করাই হলো আগামী দিনের অর্থনীতির মূল ভিত্তি। এই ধারণার ওপর ভর করেই মূলত বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্র তাদের পুরনো স্থলকেন্দ্রিক কূটনীতির খোলস ছেড়ে সমুদ্রমুখী পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করতে শুরু করেছে। বদ্বীপ অঞ্চলে অবস্থিত বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির জন্য এই নীল অর্থনীতি কেবল একটি তাত্ত্বিক ধারণা নয়, এটি আক্ষরিক অর্থেই আগামী দিনের টিকে থাকার প্রধান অবলম্বন। ভূগোলের দিকে তাকালে বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত এই ভূখণ্ডের কৌশলগত গুরুত্ব খুব সহজেই অনুমান করা যায়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি বিশাল অংশ ভারত মহাসাগর এবং এর সংলগ্ন উপসাগরগুলোর ওপর দিয়ে পরিবাহিত হয়। পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সাথে মধ্যপ্রাচ্য বা ইউরোপের বাণিজ্যের সবচেয়ে সহজ এবং ব্যস্ততম রুটগুলো এই জলভাগের ওপরেই নির্ভরশীল। প্রখ্যাত সামরিক কৌশলবিদ আলফ্রেড থায়ার মাহান (Alfred Thayer Mahan) তাঁর সাড়া জাগানো গ্রন্থ দ্য ইনফ্লুয়েন্স অফ সি পাওয়ার আপন হিস্ট্রি (The Influence of Sea Power upon History)-এ সামুদ্রিক শক্তি (Sea Power) তত্ত্বের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছেন, যে রাষ্ট্র সমুদ্রের বাণিজ্য পথ এবং সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়, বিশ্বরাজনীতিতে তার ক্ষমতা এবং আধিপত্য সবচেয়ে বেশি থাকে (Mahan, 1890)। বঙ্গোপসাগর প্রাকৃতিকভাবেই এই সামুদ্রিক শক্তির একটি বিশাল ভরকেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। এই উপসাগরের ওপর দিয়ে তেলবাহী জাহাজ এবং পণ্যবাহী কার্গোগুলোর নিরবচ্ছিন্ন যাতায়াত নিশ্চিত করাটা বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য অপরিহার্য। ফলে বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর নজর খুব স্বাভাবিকভাবেই এই অঞ্চলের ওপর এসে পড়েছে। এই বিপুল ভূ-রাজনৈতিক মনোযোগের কেন্দ্রে থাকার কারণে রাষ্ট্রটিকে তার পররাষ্ট্রনীতির ছক সম্পূর্ণ নতুন করে আঁকতে হচ্ছে। সাগরের জলরাশি এখন আর কেবল জেলেদের মাছ ধরার জায়গা নেই, এটি পরিণত হয়েছে আন্তর্জাতিক দরকষাকষির এক বিশাল এবং উন্মুক্ত দাবার বোর্ডে। স্থলভাগের সম্পদের একটি নির্দিষ্ট সীমা আছে। বিপুল জনসংখ্যার চাপে মাটির ওপরের প্রাকৃতিক সম্পদগুলো খুব দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। শিল্পকারখানা চালানো, কোটি কোটি মানুষের খাদ্যের জোগান দেওয়া এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জ্বালানি নিশ্চিত করার তাগিদে রাষ্ট্রকে বাধ্য হয়েই বিকল্প পথের সন্ধান করতে হয়। সমুদ্র সেই বিশাল এবং প্রায় অক্ষত বিকল্পের একটি চমৎকার সমাধান নিয়ে হাজির হয়েছে। মৎস্যসম্পদ, সামুদ্রিক শৈবাল, তলদেশে লুকিয়ে থাকা গ্যাস, মূল্যবান খনিজ পদার্থ এবং পর্যটন – সবকিছু মিলিয়ে সাগরের ভেতরে একটি সম্পূর্ণ নতুন এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্থনৈতিক জগৎ অপেক্ষা করছে। এই সম্পদগুলোকে কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজন বিপুল পরিমাণ বিদেশি বিনিয়োগ, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি এবং দক্ষ জনবল। একটি উন্নয়নশীল দেশের একার পক্ষে সাগরের তলদেশ থেকে গ্যাস উত্তোলন করা বা গভীর সমুদ্রে বিশাল ফিশিং ট্রলার নামানো বেশ কঠিন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কূটনীতিকদের কাঁধে তাই এক নতুন এবং আধুনিক দায়িত্ব এসে পড়েছে। তাদের এখন বিদেশের মাটিতে বসে বড় বড় বহুজাতিক কোম্পানির কর্তাব্যক্তিদের বোঝাতে হয়, বঙ্গোপসাগরের তলদেশে বিনিয়োগ করাটা কতটা লাভজনক। অর্থাৎ, কূটনীতির ভাষা এখন আর কেবল সীমানা রক্ষার মধ্যে আটকে নেই, তা সরাসরি সমুদ্রের গভীরের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার সাথে মিশে গেছে। সমুদ্রসীমা বিজয় এবং আইনি কূটনীতির যুগান্তকারী প্রয়োগ মাটির সীমানা নিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে বিরোধের ইতিহাস অনেক পুরোনো। একটি নদীর পাড় বা একটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে স্থলভাগের সীমানা খুব সহজেই চিহ্নিত করা যায়। সমুদ্রের জলের ওপর সেই ধরনের কোনো স্থায়ী রেখা টানা সম্ভব নয়। বছরের পর বছর ধরে বঙ্গোপসাগরের বুকে নিজস্ব জলসীমা নিয়ে প্রতিবেশী ভারত এবং মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের এক ধরনের নীরব কিন্তু জটিল আইনি বিরোধ চলে আসছিল। কে সাগরের কতটুকু অংশ ব্যবহার করতে পারবে, কার সীমানায় মাছ ধরার অধিকার থাকবে, এসব নিয়ে কোনো সুস্পষ্ট আন্তর্জাতিক ফয়সালা ছিল না। এই অমীমাংসিত সীমানার কারণে সমুদ্রের ভেতরে থাকা মূল্যবান গ্যাস ব্লকগুলোতে কোনো বিদেশি কোম্পানি বিনিয়োগ করতে রাজি হতো না। বিনিয়োগকারীরা সব সময় আইনি জটিলতা এড়িয়ে চলতে চান। এই দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা কাটানোর জন্য রাষ্ট্রটি পেশিশক্তি বা সামরিক মহড়ার পথে না হেঁটে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি পরিশীলিত পথ বেছে নেয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তাত্ত্বিকরা এই ধরনের পদক্ষেপকে আইনি কূটনীতি (Legal Diplomacy) হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকেন। রাষ্ট্রটি নিজেদের ন্যায্য পাওনা আদায় করার জন্য জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন বিষয়ক ট্রাইব্যুনাল (ITLOS) এবং হেগের স্থায়ী সালিশি আদালতের (PCA) দ্বারস্থ হয়। আন্তর্জাতিক আদালতে গিয়ে নিজেদের অধিকার আদায় করার এই প্রক্রিয়াটি মোটেও সহজ কোনো কাজ ছিল না। এর জন্য প্রয়োজন হয় সমুদ্র আইনের চুলচেরা বিশ্লেষণ, ঐতিহাসিক মানচিত্রের দলিল এবং অত্যন্ত দক্ষ আইনি প্যানেলের। তাত্ত্বিক রবার্ট কিওহ্যান (Robert Keohane) তাঁর নয়া-উদারনীতিবাদ (Neo-liberalism) ধারণায় উল্লেখ করেছেন, আধুনিক রাষ্ট্রগুলো পারস্পরিক বিরোধ মেটানোর জন্য যুদ্ধের বদলে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এবং আইনের ওপর বেশি নির্ভর করে (Keohane, 1984)। সমুদ্রসীমা নির্ধারণের এই মামলাগুলো মূলত সেই নয়া-উদারনীতিবাদী কাঠামোর এক অনবদ্য এবং সফল প্রয়োগ। কূটনীতিকরা এবং আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা বছরের পর বছর ধরে নিরলস পরিশ্রম করে আন্তর্জাতিক বিচারকদের সামনে নিজেদের পক্ষে অকাট্য যুক্তি উপস্থাপন করেন। বিশাল পরাক্রমশালী দুই প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে অবতীর্ণ হওয়াটা একটি ছোট দেশের জন্য এক বিরাট মনস্তাত্ত্বিক সাহসের ব্যাপার। এই আইনি লড়াইয়ে কোনো দেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি করা হয়নি, কেবল আইনের ধারার ওপর ভিত্তি করে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় নিজেদের অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে। এই ধৈর্যশীল এবং বুদ্ধিভিত্তিক প্রক্রিয়ার ফলেই শেষ পর্যন্ত এক বিশাল আইনি বিজয় অর্জন করা সম্ভব হয়, যা রাষ্ট্রের কূটনীতির ইতিহাসে এক সোনালি অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। আদালতের রায়ের মাধ্যমে মিয়ানমার এবং ভারতের সাথে সমুদ্রসীমার বিরোধ অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে নিষ্পত্তি হয়। এর ফলে বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরের বুকে প্রায় এক লাখ আঠারো হাজার বর্গকিলোমিটারের এক বিশাল একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চল (Exclusive Economic Zone) লাভ করে। এই বিশাল জলভাগের আকার দেশের মূল ভূখণ্ডের আয়তনের প্রায় সমান। এই আইনি বিজয়ের ফলে সমুদ্রের ওপর রাষ্ট্রের নিরঙ্কুশ এবং প্রশ্নহীন অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এখন আর সাগরের ভেতরে গ্যাস অনুসন্ধান বা মাছ ধরার ক্ষেত্রে অন্য কোনো দেশের বাধা দেওয়ার আইনি সুযোগ নেই। এই বিজয়টি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তিকে অভাবনীয়ভাবে উজ্জ্বল করে তোলে। বিশ্ববাসী দেখতে পায়, একটি উন্নয়নশীল দেশ কীভাবে আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখে এবং সম্পূর্ণ নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে প্রতিবেশীদের সাথে এত বড় একটি বিরোধের সমাধান করতে পারে। এটি মূলত প্রমাণ করে, আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে শক্তিশালী দেশগুলোর পেশিশক্তির বিরুদ্ধে দুর্বল দেশগুলোর সবচেয়ে বড় এবং কার্যকরী রক্ষাকবচ হলো আন্তর্জাতিক আইন। এই সীমানা নির্ধারণের ফলে নীল অর্থনীতির এক বিশাল এবং নিষ্কণ্টক দুয়ার রাষ্ট্রের সামনে খুলে যায়, যা আগামী কয়েক প্রজন্মের অর্থনৈতিক মুক্তির সনদ হিসেবে কাজ করবে। সামুদ্রিক সম্পদের বিপুল সম্ভাবনা ও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা সমুদ্রসীমার আইনি বাধা দূর হওয়ার পর আসল কাজের পালা শুরু হয়। বিশাল এই জলরাশির নিচে যে পরিমাণ সম্পদ লুকিয়ে আছে, তা সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে দেশের অর্থনীতির চেহারা পুরোপুরি পাল্টে যাওয়া সম্ভব। নীল অর্থনীতির সবচেয়ে দৃশ্যমান এবং প্রাথমিক খাতটি হলো মৎস্যসম্পদ। বঙ্গোপসাগরে রয়েছে বিপুল প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ, যা দেশের ভেতরের আমিষের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ তৈরি করে। তবে গভীর সমুদ্রে আধুনিক প্রযুক্তিতে মাছ ধরার জন্য যে ধরনের বিশাল ফিশিং ট্রলার এবং প্রযুক্তির প্রয়োজন, তার দারুণ অভাব রয়েছে। এখানকার জেলেদের ঐতিহ্যবাহী নৌকাগুলো সাগরের খুব বেশি গভীরে যেতে পারে না। ফলে বিশাল একটি অংশের মাছ ধরার সুযোগ অবারিত থেকে যাচ্ছে। এই প্রযুক্তিগত শূন্যতা পূরণের জন্য পররাষ্ট্রনীতিকে নতুন করে সাজানো হচ্ছে। উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে আধুনিক মৎস্য আহরণ প্রযুক্তি এবং প্রশিক্ষণ দেশে নিয়ে আসার জন্য নিয়মিত দ্বিপাক্ষিক আলোচনা চলছে। সামুদ্রিক সম্পদের এই আহরণ কোনোভাবেই যেন পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট না করে, সেদিকেও কড়া নজর রাখা হচ্ছে। পরিবেশবিদদের ভাষায় একে টেকসই উন্নয়ন (Sustainable Development) বলা হয়, যেখানে বর্তমানের চাহিদা মেটাতে গিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্পদ ধ্বংস করা হয় না। মৎস্যসম্পদের বাইরে সাগরের তলদেশে লুকিয়ে থাকা খনিজ সম্পদের ওপর সবার সবচেয়ে বেশি আগ্রহ। বঙ্গোপসাগরের গভীরে বিপুল পরিমাণ গ্যাস এবং অন্যান্য মূল্যবান খনিজ পদার্থ, যেমন – মোনাজাইট, জিরকন এবং টাইটানিয়াম মজুত রয়েছে বলে বিজ্ঞানীদের জোরালো ধারণা। দেশের ভেতরের স্থলভাগের গ্যাসক্ষেত্রগুলো ধীরে ধীরে ফুরিয়ে আসছে। জ্বালানির এই আসন্ন সংকট মোকাবিলার জন্য সমুদ্রের তলার এই গ্যাস ব্লকগুলো অনুসন্ধান করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিমণ্ডলে এ ধরনের সম্পদের খোঁজ করাকে অনেক সময় সম্পদের রাজনীতি (Resource Politics) হিসেবে দেখা হয়। বিশাল বিশাল বহুজাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলোকে দেশের সমুদ্রে বিনিয়োগের জন্য আকৃষ্ট করতে কূটনীতিকরা নানা ধরনের অর্থনৈতিক প্রণোদনা এবং লাভজনক চুক্তির প্রস্তাব দিচ্ছেন। বিদেশি কোম্পানিগুলো এখানে আসবে তাদের নিজেদের লাভের জন্য। রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকদের অত্যন্ত সতর্কতার সাথে দরকষাকষি করতে হয়, যাতে বিদেশি কোম্পানিগুলো লাভ করলেও দেশের নিজস্ব সম্পদের ওপর রাষ্ট্রের পূর্ণ মালিকানা এবং ন্যায্য হিস্যা বজায় থাকে। এটি এক ধরনের অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং জটিল অর্থনৈতিক দড়াবাজি, যেখানে সামান্য ভুলের কারণে রাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ সম্পদ চিরতরে হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে। নীল অর্থনীতির সম্ভাবনা কেবল মাছ আর গ্যাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। আন্তর্জাতিক শিপিং, বন্দর ব্যবস্থাপনা, সামুদ্রিক জৈবপ্রযুক্তি এবং পর্যটন শিল্প এর বিশাল একেকটি অংশ। দেশের বন্দরগুলোকে আধুনিকায়ন করে যদি ট্রান্সশিপমেন্ট হাব হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তবে এই সমুদ্রবন্দরগুলোই হবে অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি। প্রতিবেশী স্থলবেষ্টিত দেশগুলোকে বন্দর সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে প্রচুর রাজস্ব আদায় করা সম্ভব। এছাড়া উপকূলীয় পর্যটন শিল্পকে আন্তর্জাতিক মানের করে গড়ে তুলতে পারলে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা এখানে ছুটে আসবেন। এই বহুমুখী খাতগুলোকে একসাথে কাজ করানোর জন্য একটি সুসমন্বিত জাতীয় নীতি এবং দক্ষ কূটনৈতিক উদ্যোগ প্রয়োজন। তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে এনে সমুদ্রভিত্তিক একটি বহুমুখী অর্থনীতির ভিত্তি দাঁড় করানো এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, উন্নত প্রযুক্তির বিনিময় এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখার কাজগুলো মূলত বিদেশের মাটিতে থাকা দূতাবাসগুলোর নিরন্তর প্রচেষ্টার ওপরই নির্ভরশীল। সমুদ্রের এই সুনীল জলরাশিকে নিজেদের অর্থনৈতিক মুক্তির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারলে রাষ্ট্র আগামী দিনে এক অদম্য অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে বাধ্য। ইন্দো-প্যাসিফিক সমীকরণ এবং পরাশক্তির রেষারেষি সমুদ্রের শান্ত জলের নিচে যেমন প্রবল স্রোত থাকে, বঙ্গোপসাগরের ভূ-রাজনীতিতেও ঠিক তেমনি এক ভয়ংকর এবং অদৃশ্য স্রোত বয়ে চলেছে। বিশ্বরাজনীতির ক্ষমতার ভরকেন্দ্র আটলান্টিক মহাসাগর থেকে সরে গিয়ে এখন ভারত মহাসাগর এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে শক্তভাবে গেড়ে বসেছে। প্রখ্যাত লেখক এবং কৌশলবিদ রবার্ট কাপলান (Robert Kaplan) তাঁর সাড়া জাগানো বই মনসুন: দ্য ইন্ডিয়ান ওশান অ্যান্ড দ্য ফিউচার অফ আমেরিকান পাওয়ার (Monsoon: The Indian Ocean and the Future of American Power)-এ খুব নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করেছেন, একুশ শতকের বৈশ্বিক আধিপত্যের লড়াই মূলত এই ভারত মহাসাগরের নিয়ন্ত্রণ ঘিরেই আবর্তিত হবে (Kaplan, 2010)। বঙ্গোপসাগর হলো এই ভারত মহাসাগরের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত উপসাগর। ফলে প্রাকৃতিকভাবেই এই বদ্বীপ রাষ্ট্রটি পরাশক্তিগুলোর এক বিশাল ভূ-রাজনৈতিক দাবার বোর্ডের একেবারে মাঝখানে এসে পড়েছে। পরাশক্তিগুলোর এই রেষারেষির কারণে নীল অর্থনীতির সম্ভাবনাগুলোর পাশাপাশি এক বিশাল কৌশলগত ঝুঁকিও রাষ্ট্রের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। কোনো একটি পরাশক্তির দিকে সামান্য ঝুঁকে পড়লেই অন্য পক্ষগুলোর রোষানলে পড়ার এক চরম এবং অমোচনীয় শঙ্কা সব সময় তাড়া করে ফেরে। এই অঞ্চলে মূলত দুটি বিশাল এবং বিপরীতমুখী কৌশলগত রূপরেখার সরাসরি সংঘর্ষ ঘটছে। একদিকে চীনের উচ্চাভিলাষী এবং অর্থনীতি-নির্ভর বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (Belt and Road Initiative)। এই প্রকল্পের মাধ্যমে চীন মূলত এশিয়া, ইউরোপ এবং আফ্রিকার দেশগুলোকে বিশাল সব অবকাঠামো, বন্দর এবং সড়কপথ দিয়ে যুক্ত করার চেষ্টা করছে। বঙ্গোপসাগরের তীরে নিজেদের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার জন্য তারা এই অঞ্চলের দেশগুলোতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ঋণ হিসেবে দিচ্ছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা মিত্ররা এবং ভারত মিলে তৈরি করেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি কৌশল, যার নাম মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক (Free and Open Indo-Pacific) কৌশল। তাদের মূল লক্ষ্য হলো সমুদ্রপথগুলোকে সবার জন্য বাধামুক্ত রাখা এবং এই অঞ্চলে নিয়মভিত্তিক একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা কায়েম রাখা। সাধারণ চোখে এই কথাগুলো খুব সুন্দর শোনালেও, এর পেছনের আসল ভূ-রাজনৈতিক উদ্দেশ্যটি হলো চীনের ক্রমবর্ধমান নৌ-শক্তি এবং অর্থনৈতিক প্রভাবকে প্রশান্ত মহাসাগর এবং ভারত মহাসাগরের ভেতরে শক্তভাবে আটকে রাখা। এই দুটি প্রবল বিপরীতমুখী স্রোতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের টিকে থাকা রীতিমতো স্নায়ুযুদ্ধের এক নতুন সংস্করণ। রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকরা এই চরম বৈরী পরিস্থিতিতে টিকে থাকার জন্য অত্যন্ত পরিণত একটি কূটনৈতিক পথ বেছে নিয়েছেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় একে ভারসাম্য রক্ষা (Balancing) এবং হেজিং (Hedging) কৌশল বলা হয়। রাষ্ট্রটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছে যে, তাদের ইন্দো-প্যাসিফিক দৃষ্টিভঙ্গি মূলত অর্থনীতি এবং সহযোগিতাকেন্দ্রিক, কোনো সামরিক জোট বা সংঘাতের অংশ হওয়া তাদের লক্ষ্য নয়। তারা দেশের অবকাঠামো নির্মাণের জন্য চীনের কাছ থেকে ঋণ এবং প্রযুক্তি গ্রহণ করছে, আবার একই সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে নিয়মিত নিরাপত্তা সংলাপ এবং অর্থনৈতিক বাণিজ্য সমানে চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিবেশী আঞ্চলিক পরাশক্তি ভারতের কৌশলগত উদ্বেগকে সব সময় সম্মানের চোখে দেখা হচ্ছে, যাতে তাদের নিজেদের সীমানার ভেতরে কোনো ধরনের অস্বস্তি তৈরি না হয়। পরাশক্তিগুলোকে একে অপরের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে নিজেদের জাতীয় স্বার্থের সর্বোচ্চ ফায়দা লুটে নেওয়ার এই কূটনৈতিক খেলাটি অত্যন্ত বিপজ্জনক। একটু অসাবধানতায় পা হড়কালে শ্রীলঙ্কার মতো চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয় বা অন্য কোনো ভূ-রাজনৈতিক সংকটে পড়ার শঙ্কা রয়েছে। এরপরও, এই ত্রিমুখী পরাশক্তির মাঝে নিজেদের স্বাধীন স্বকীয়তা বজায় রেখে নীল অর্থনীতির সুফল আদায় করা ছাড়া কূটনীতির সামনে আর কোনো সহজ বিকল্প খোলা নেই। সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতার কাঠামো সমুদ্রের বিশাল সম্পদকে কাজে লাগাতে হলে সবার আগে সেই সমুদ্রকে নিরাপদ রাখতে হবে। বর্তমান বিশ্বে সমুদ্রে প্রথাগত সামরিক হুমকির চেয়ে নতুন ধরনের কিছু অদৃশ্য হুমকি অনেক বেশি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। জলদস্যুতা, অবৈধভাবে মাছ শিকার, সমুদ্রে মানব পাচার, মাদক চোরাচালান এবং সামুদ্রিক দূষণ এখন সাগরের বুকে সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম। তাত্ত্বিক ব্যারি বুজান (Barry Buzan) তাঁর গবেষণায় এই ধরনের হুমকিগুলোকে অ-প্রথাগত নিরাপত্তা (Non-traditional Security) হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন (Buzan, 1991)। একটি দেশের নৌবাহিনী বা কোস্টগার্ডের পক্ষে একা এই বিশাল একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রতিটি ইঞ্চিতে নজরদারি করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। অপরাধী চক্রগুলো কোনো নির্দিষ্ট দেশের সীমানা মেনে চলে না, তারা খুব দ্রুত এক দেশের জলসীমা থেকে অন্য দেশের জলসীমায় পালিয়ে যায়। এই ধরনের সংঘবদ্ধ আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলার জন্য প্রয়োজন আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক স্তরে অত্যন্ত শক্তিশালী সমন্বয় এবং পারস্পরিক সহযোগিতা। সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তাই এখন কেবল সামরিক বাহিনীর কাজ নয়, এটি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দৈনন্দিন কূটনৈতিক রুটিনের একটি বড় অংশে পরিণত হয়েছে। সমুদ্রকে নিরাপদ রাখার এই তাগিদ থেকেই রাষ্ট্রটি বিভিন্ন বহুপাক্ষিক ফোরামের সাথে অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে নিজেকে যুক্ত করেছে। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর জোট ইন্ডিয়ান ওশান রিম অ্যাসোসিয়েশন (IORA) এবং বঙ্গোপসাগরীয় জোট বিমসটেক (BIMSTEC)-এর মঞ্চে তারা এই অ-প্রথাগত নিরাপত্তা হুমকিগুলোর কথা অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরছে। এই ফোরামগুলোতে রাষ্ট্রগুলো নিজেদের মধ্যে সামুদ্রিক অপরাধ দমনের তথ্য ভাগাভাগি করার জন্য নানা ধরনের চুক্তি স্বাক্ষর করছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তাত্ত্বিক পরিভাষায় এই ধরনের যৌথ উদ্যোগকে বহুপাক্ষিকতাবাদ (Multilateralism) বলা হয়। যখন একাধিক দেশ মিলে একটি নির্দিষ্ট সমস্যা সমাধানের জন্য কাজ করে, তখন সেই সমাধানের ভিত্তি অনেক বেশি মজবুত হয়। তাছাড়া, যৌথ নৌ-মহড়া, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় পারস্পরিক সহায়তা এবং সমুদ্রে তল্লাশি ও উদ্ধার অভিযানের জন্য পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর নৌবাহিনীর সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে। এই সামরিক এবং বেসামরিক সমন্বয়ের মাধ্যমে মূলত সাগরের বুকে এক ধরনের নিয়মতান্ত্রিক এবং নিরাপদ আবহ তৈরি করার চেষ্টা চলছে। একটি নিরাপদ সমুদ্র ছাড়া কোনো বিদেশি বিনিয়োগকারী এখানে তাদের মূল্যবান প্রযুক্তি বা অর্থ নিয়ে আসার সাহস দেখাবে না। এই সামুদ্রিক নিরাপত্তার একটি বড় অংশ হলো নেভাল ডিপ্লোম্যাসি বা নৌ-কূটনীতি। যুদ্ধজাহাজগুলো এখন আর কেবল যুদ্ধ করার জন্য বন্দরে বসে থাকে না। তারা নিয়মিত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বন্দরে শুভেচ্ছা সফরে যায়, যা দুই দেশের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক গভীর করতে সাহায্য করে। নৌবাহিনীর কর্মকর্তারা বিদেশের মাটিতে গিয়ে অন্যান্য দেশের নৌ-কমান্ডারদের সাথে বৈঠক করেন, অভিজ্ঞতা বিনিময় করেন। এই ধরনের মিথস্ক্রিয়া মূলত কূটনীতির একটি শক্তিশালী পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। সাগরের বুকে কোনো দেশের তেলবাহী জাহাজে জলদস্যুরা আক্রমণ করলে, কাছাকাছি থাকা যেকোনো দেশের নৌবাহিনী দ্রুত সেখানে ছুটে যায়। এই মানবিক এবং পেশাদার সামরিক আচরণগুলো বিশ্বমঞ্চে রাষ্ট্রের একটি অত্যন্ত ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করে। বিশ্ববাণিজ্যের লাইফলাইন সুরক্ষিত রাখার ক্ষেত্রে একটি দায়িত্বশীল অংশীদার হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করার মাধ্যমে রাষ্ট্রটি পরাশক্তিগুলোর কাছে নিজেদের অপরিহার্যতা তুলে ধরে। সামুদ্রিক নিরাপত্তা মূলত নীল অর্থনীতির রক্ষাকবচ, যা ছাড়া সমুদ্রের সমস্ত অর্থনৈতিক সম্ভাবনাই খাদের কিনারে মুখ থুবড়ে পড়বে। পরিবেশগত বিপর্যয় এবং সমুদ্র রক্ষার ভবিষ্যৎ কূটনীতি সমুদ্র যেমন অকৃপণ হাতে সম্পদ বিলিয়ে দেয়, রুষ্ট হলে আবার তার চেয়েও ভয়ংকর রূপে সবকিছু কেড়ে নিতে পারে। নীল অর্থনীতির একটি অন্ধকার দিকও রয়েছে, যা অনেক সময় উন্নয়ন এবং প্রবৃদ্ধির আড়ালে চাপা পড়ে যায়। যথেচ্ছভাবে সামুদ্রিক সম্পদ আহরণ, অনিয়ন্ত্রিত মাছ শিকার এবং জাহাজের বর্জ্য ফেলার কারণে সাগরের তলদেশের জীববৈচিত্র্য চরম হুমকির মুখে পড়ছে। এর পাশাপাশি সবচেয়ে বড় এবং ভয়াবহ বিপদ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন। পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে সমুদ্রের পানির উচ্চতা ধীরে ধীরে বাড়ছে এবং সাগরের পানি দিন দিন বেশি মাত্রায় অম্লীয় বা এসিডিক হয়ে যাচ্ছে। পরিবেশবিদ নরম্যান মায়ার্স (Norman Myers) এই অস্তিত্বের সংকটকে পরিবেশগত নিরাপত্তা (Environmental Security) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন (Myers, 2002)। এই বদ্বীপ অঞ্চলের জন্য সাগরের এই পরিবর্তন আক্ষরিক অর্থেই এক ভয়াবহ জীবন-মরণের প্রশ্ন। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা আরেকটু বাড়লে উপকূলীয় এলাকার বিস্তীর্ণ জনপদ চিরতরে নোনা জলের নিচে তলিয়ে যাবে। এই ধরনের পরিবেশগত বিপর্যয়ের সামনে দাঁড়িয়ে কোনো শক্তিশালী সামরিক বাহিনী বা বিশাল ব্যাংক ব্যালেন্স কোনো কাজে আসে না। পরিবেশ রক্ষার এই লড়াইয়ে রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে অত্যন্ত জোরালো এবং সোচ্চার ভূমিকা পালন করতে হচ্ছে। জলবায়ু সম্মেলনগুলোতে (COP) গিয়ে কূটনীতিকরা উন্নত দেশগুলোর চোখে চোখ রেখে তাদের ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতার কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। বায়ুমণ্ডল উত্তপ্ত করার পেছনে উন্নত দেশগুলোর শিল্পকারখানার ধোঁয়াই মূলত দায়ী, অথচ এর সবচেয়ে চরম মূল্য চোকাতে হচ্ছে এই বদ্বীপের মতো নিরীহ রাষ্ট্রগুলোকে। পরিবেশগত এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্র প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং সবুজ জলবায়ু তহবিল বা গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড আদায়ের জন্য নিরন্তর আইনি এবং কূটনৈতিক লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। সাগরের সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত কড়াকড়ি আরোপ করার চেষ্টা চলছে। ব্লু ইকোনমি যেন কোনোভাবেই ব্লু এক্সপ্লয়টেশন বা সমুদ্র শোষণে পরিণত না হয়, সেদিকে কড়া নজর রাখার জন্য আন্তর্জাতিক নীতিমালার প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করা হচ্ছে। সমুদ্রকে বাঁচিয়ে রেখে তার কাছ থেকে অর্থনৈতিক সুবিধা নেওয়ার এই ভারসাম্য রক্ষা করাটা আগামী দিনের কূটনীতির সবচেয়ে বড় বুদ্ধিবৃত্তিক পরীক্ষা। ভবিষ্যতের পররাষ্ট্রনীতি মূলত এই সমুদ্র এবং তার ইকোসিস্টেমের চারপাশে আবর্তিত হতে বাধ্য। কার্বন ট্রেডিং, সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা (Marine Protected Area) ঘোষণা এবং সমুদ্রদূষণ রোধে আন্তর্জাতিক চুক্তিতে সই করার বিষয়গুলো এখন নীতিনির্ধারকদের দৈনন্দিন কাজের অংশ। আগামী প্রজন্মকে একটি বাসযোগ্য এবং নিরাপদ ভূখণ্ড উপহার দেওয়ার জন্য সমুদ্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখাটা অপরিহার্য। এই বিশাল জলরাশির বুকে লুকিয়ে থাকা সম্ভাবনাগুলো যদি কেবল মুনাফার লোভে যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করা হয়, তবে প্রকৃতির নির্মম প্রতিশোধ থেকে এই জনপদকে কেউ বাঁচাতে পারবে না। তাই বর্তমান সময়ের কূটনীতি কেবল অর্থনৈতিক চুক্তির ফাইলে সীমাবদ্ধ নেই, তা সরাসরি সমুদ্রের গভীরের প্রবাল প্রাচীর এবং জলজ প্রাণীদের বেঁচে থাকার সংগ্রামের সাথে মিশে গেছে। সমুদ্রমুখী এই নতুন পররাষ্ট্রনীতি মূলত একটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী বেঁচে থাকার এবং প্রকৃতির সাথে ভারসাম্য বজায় রেখে সামনে এগিয়ে চলার এক অনবদ্য এবং অবিরাম যাত্রা। বাংলাদেশের সামাজিক ও অন্যান্য ইস্যুসমূহ (Social and other issues for Bangladesh) অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন ও জল-রাজনীতির জটিলতা নদী কোনো দেশের রাজনৈতিক সীমানা চেনে না। পাহাড় থেকে জন্ম নিয়ে আপন খেয়ালে সে সাগরের দিকে ছুটে যায়। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা নদীর এই স্বতঃস্ফূর্ত চলাচলের পথে দেয়াল তুলে দিতে ভালোবাসে। এই বদ্বীপ অঞ্চলের ভেতর দিয়ে জালের মতো ছড়িয়ে আছে অসংখ্য নদী, যার মধ্যে অন্তত ৫৪টি নদী সরাসরি প্রতিবেশী দেশ থেকে প্রবেশ করেছে। এই অভিন্ন নদীগুলো মূলত এই ভূখণ্ডের মানুষের প্রাণভোমরা। কৃষিকাজ, মৎস্য আহরণ এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রা – সবকিছুই আবর্তিত হয় নদীর জলের প্রবাহকে কেন্দ্র করে। তারপরও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দাবার বোর্ডে এই নদীর জলই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় দরকষাকষির হাতিয়ার। উজানে থাকা প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভৌগোলিক সুবিধার কারণে নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা রাখে। তারা নদীর বুকে বিশাল সব বাঁধ নির্মাণ করে নিজেদের কৃষি এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজ সচল রাখে। ফলে ভাটির এই দেশটিতে শুষ্ক মৌসুমে দেখা দেয় ভয়াবহ খরা। নদীর বুক ফেটে চৌচির হয়ে যায়, কৃষকের ফসলের মাঠ পরিণত হয় ধু-ধু প্রান্তরে। আবার বর্ষাকালে যখন উজানে জলের চাপ বেড়ে যায়, তখন হঠাৎ করে বাঁধের সব দরজা খুলে দেওয়া হয়। এর ফলে নিম্নাঞ্চলে দেখা দেয় প্রলয়ঙ্করী বন্যা। জলের এই কৃত্রিম নিয়ন্ত্রণের কারণে সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকা প্রতিনিয়ত চরম হুমকির মুখে পড়ছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তাত্ত্বিকরা নদীর এই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে একটি বিশেষ কাঠামোর ভেতর ফেলে বিচার করেন। গবেষক মার্ক জেইতুন (Mark Zeitoun) এবং জন ওয়ার্নার (John Warner) তাঁদের গবেষণায় একটি চমৎকার ধারণার প্রবর্তন করেছেন, যার নাম হাইড্রো-হেজিমনি (Hydro-hegemony) (Zeitoun & Warner, 2006)। তাঁদের মতে, জল কেবল তৃষ্ণা মেটানোর উপাদান নয়, এটি মূলত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বিস্তারের একটি নীরব অস্ত্র। উজানের দেশগুলো তাদের ভৌগোলিক এবং অর্থনৈতিক শক্তির জোরে জলপ্রবাহের ওপর এক ধরনের অলিখিত আধিপত্য তৈরি করে। ভাটির দেশগুলো বাধ্য হয়ে সেই আধিপত্য মেনে নেয়, কারণ সরাসরি সংঘাত বা যুদ্ধের পথে হাঁটা তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। এই আধিপত্যের কারণে দুই দেশের মধ্যে পানিবণ্টন চুক্তিগুলো সব সময় এক ধরনের ঝুলে থাকা অবস্থায় থাকে। দীর্ঘদিনের আলোচনার পরও গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মতো হাতে গোনা দু-একটি ছাড়া বাকি নদীগুলোর ভবিষ্যৎ পুরোপুরি অনিশ্চিত। তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের জন্য যুগের পর যুগ ধরে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চলছে, কিন্তু কোনো স্থায়ী সমাধান এখনো ধরা ছোঁয়ার বাইরে। আসলে নদীর পানিবণ্টন নিয়ে কূটনীতি মূলত এক ধরনের শূন্য-সমষ্টির খেলা (Zero-sum game)-এ পরিণত হয়েছে। এক পক্ষ মনে করে, অন্যকে পানি দিলে তাদের নিজেদের হিস্যা কমে যাবে। এই অবিশ্বাসের বেড়াজালে আটকে পড়ে বদ্বীপের সাধারণ কৃষকের বেঁচে থাকার সংগ্রাম দিন দিন আরও কঠিন হয়ে পড়ছে। এই জল-রাজনীতি কেবল কৃষকের ফসলেরই ক্ষতি করছে না, এটি পুরো সমাজের ভেতরে এক ধরনের স্থায়ী ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে। দেশের ভেতরে সাধারণ মানুষের ধারণা জন্মেছে যে, প্রতিবেশী রাষ্ট্রটি ইচ্ছে করেই তাদের ভাতে এবং পানিতে মারার চেষ্টা করছে। এই জনমত রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য এক বড় ধরনের চাপ তৈরি করে। সরকার চাইলেও প্রতিবেশীর সাথে অন্য কোনো বাণিজ্যিক বা কৌশলগত চুক্তি সহজে স্বাক্ষর করতে পারে না। কারণ বিরোধী পক্ষ খুব সহজেই প্রশ্ন তোলে যে, জলের মতো মৌলিক অধিকার আদায় না করে বাণিজ্যের চুক্তি কেন করা হবে। নদীর পানিবণ্টনের এই অমীমাংসিত ইস্যুটি দুই দেশের মধ্যকার সামাজিক আস্থার ভিত্তি ধরে প্রচণ্ড জোরে নাড়া দেয়। একটি সুস্থ এবং সম্মানজনক প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক গড়ে তোলার পথে এটিই সম্ভবত সবচেয়ে বড় বাধা। নদীর জল শুকিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে পরিবেশগত বিপর্যয়ও চরম আকার ধারণ করছে। নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় সমুদ্রের লবণাক্ত জল অনেক দূর পর্যন্ত দেশের ভেতরে প্রবেশ করছে। এই লবণাক্ততার কারণে মিঠা পানির মাছের প্রজাতি ধ্বংস হচ্ছে এবং কৃষি জমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে। অর্থাৎ, একটি ভৌগোলিক বঞ্চনার কারণে পুরো দেশের আর্থ-সামাজিক কাঠামো নীরবে ভেঙে পড়ছে। অবৈধ অভিবাসনের অভিযোগ ও জনতাত্ত্বিক টানাপোড়েন মানুষের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ছুটে চলার স্বভাবটি পৃথিবীর মতোই পুরোনো। একটু ভালো জীবনের আশায়, পেটের দায়ে মানুষ যুগে যুগে দেশান্তর হয়েছে। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্র সীমানার রেখা টেনে দিয়ে মানুষের এই স্বাভাবিক চলাচলের গায়ে ‘অবৈধ’ সিলমোহর লাগিয়ে দিয়েছে। এই বদ্বীপ অঞ্চল এবং এর বিশাল প্রতিবেশীর মধ্যে কয়েক হাজার মাইলের সীমান্ত রয়েছে। এই দীর্ঘ সীমান্তের অনেক জায়গাতেই কাঁটাতার নেই, আবার অনেক জায়গা নদী বা জঙ্গল দিয়ে ঘেরা। ফলে দুই দেশের মানুষের মধ্যে যাতায়াত পুরোপুরি বন্ধ করা বাস্তবে প্রায় অসম্ভব। অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে এই ভূখণ্ড থেকে অনেক মানুষ কাজের সন্ধানে সীমান্ত পার হয়ে প্রতিবেশী দেশে প্রবেশ করে বলে দীর্ঘদিন ধরে একটি রাজনৈতিক অভিযোগ রয়েছে। এই বিষয়টি প্রতিবেশী দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে একটি বিশাল হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সেখানকার রাজনৈতিক নেতারা নির্বাচনের মাঠে ভোট টানার জন্য এই ‘অবৈধ অভিবাসন’-এর জুজু কাজে লাগান। তারা সাধারণ মানুষের মনে এই ভয় ঢুকিয়ে দেন যে, বাইরের দেশের মানুষ এসে তাদের কাজ কেড়ে নিচ্ছে এবং তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ধ্বংস করে দিচ্ছে। অভিবাসনের এই জটিল মনস্তত্ত্ব বুঝতে হলে সমাজবিজ্ঞানের দিকে তাকাতে হয়। বিখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী এভারেট লি (Everett Lee) তাঁর ধাক্কা ও টান তত্ত্ব (Push and Pull Theory)-এর মাধ্যমে অভিবাসনের মূল কারণগুলো ব্যাখ্যা করেছেন (Lee, 1966)। তাঁর মতে, মানুষ নিজ জন্মভূমি ছাড়ে কারণ সেখানে অভাব, বেকারত্ব বা সামাজিক বঞ্চনা তাকে বাইরের দিকে ‘ধাক্কা’ দেয়। অন্যদিকে উন্নত দেশের ভালো মজুরি এবং কাজের সুযোগ তাকে জাদুর মতো ‘টান’ দেয়। এই ধাক্কা এবং টানের প্রবল শক্তির কাছে সীমান্তের কাঁটাতার বা সীমান্তরক্ষীর বন্দুক অনেক সময়ই হার মানে। প্রতিবেশী দেশে যারা এভাবে কাজের খোঁজে যায়, তাদের জীবন কাটে চরম আতঙ্কের মধ্যে। তারা সেখানকার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এবং কম মজুরির কাজগুলো করে। দিনমজুর, রিকশাচালক বা গৃহকর্মীর মতো পেশায় তারা নিজেদের যুক্ত করে। পরিচয়পত্র না থাকার কারণে তারা স্থানীয় প্রশাসন বা পুলিশের কাছে কোনো সাহায্য চাইতে পারে না। সমাজের সবচেয়ে নিচুতলায় চরম অমানবিক অবস্থায় তাদের বেঁচে থাকতে হয়। প্রতিনিয়ত তাদের তাড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়, যা দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর এক বিরাট কালো ছায়া ফেলে। অভিবাসন নিয়ে এই রাজনৈতিক কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি মূলত দ্বিপাক্ষিক কূটনীতিকে দারুণভাবে ব্যাহত করে। প্রতিবেশী দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব যখন প্রকাশ্যে কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে ‘উইপোকা’ বা অনুপ্রবেশকারী হিসেবে আখ্যায়িত করে, তখন এই বদ্বীপের সাধারণ মানুষের আত্মমর্যাদায় প্রবল আঘাত লাগে। দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করাও বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। কারণ এই দেশের সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কখনোই স্বীকার করে না যে তাদের নাগরিকরা অবৈধভাবে সীমান্ত পার হচ্ছে। আবার প্রতিবেশী রাষ্ট্রটিও কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া ঢালাওভাবে অভিযোগ করতে থাকে। গবেষক স্টিফেন ক্যাসেলস (Stephen Castles) তাঁর দ্য এজ অফ মাইগ্রেশন (The Age of Migration) বইয়ে দেখিয়েছেন যে, অভিবাসন কোনো একক দেশের সমস্যা নয়, এটি বিশ্বায়িত অর্থনীতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ (Castles et al., 2013)। এই সমস্যার সমাধান রাজনৈতিক বক্তৃতা দিয়ে বা সীমান্তে দেয়াল তুলে করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন দুই দেশের মধ্যে একটি নিয়মতান্ত্রিক শ্রমবাজার তৈরি করা। যদি ভিসা এবং ওয়ার্ক পারমিটের প্রক্রিয়া সহজ করা হয়, তবে মানুষ আর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অবৈধ পথে পা বাড়াবে না। কিন্তু পারস্পরিক আস্থার অভাবেই এই ধরনের বাস্তবসম্মত পথে হাঁটা সম্ভব হচ্ছে না, ফলে সামাজিক এই টানাপোড়েন এক স্থায়ী রূপ লাভ করেছে। সীমান্ত এলাকার আর্থ-সামাজিক বঞ্চনা ও ছায়া অর্থনীতি রাজধানী শহরের চাকচিক্য এবং নীতিনির্ধারকদের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ থেকে সীমান্ত এলাকার সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা বোঝা বেশ কঠিন। দেশের মূল কেন্দ্র থেকে দূরে অবস্থিত এই সীমান্তবর্তী গ্রামগুলো সব সময়ই এক ধরনের অর্থনৈতিক বঞ্চনার শিকার হয়। সেখানে বড় কোনো শিল্পকারখানা নেই, শিক্ষার ভালো সুযোগ নেই, এমনকি চিকিৎসার জন্য ভালো কোনো হাসপাতালও নেই। কৃষিকাজ ছাড়া বেঁচে থাকার আর কোনো বৈধ উপায় এই এলাকার মানুষের হাতে থাকে না। কিন্তু সীমান্তের কাঁটাতার অনেক সময় কৃষকের ফসলের মাঠকেও দুই ভাগ করে দেয়। এমন এক দমবন্ধ করা আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিতে বেঁচে থাকার তাগিদে স্থানীয় মানুষ বাধ্য হয়ে বিকল্প পথের সন্ধান করে। তারা জড়িয়ে পড়ে চোরাচালান এবং অবৈধ বাণিজ্যের সাথে। রাতের অন্ধকারে সীমান্তের ওপার থেকে নিয়ে আসে গরু, শাড়ি, মসলা বা অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য। এই অবৈধ বাণিজ্যই ওই এলাকার হাজার হাজার মানুষের জীবন বাঁচানোর প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে দাঁড়ায়। এটি কোনো সাধারণ অপরাধ নয়, এটি মূলত চরম দারিদ্র্য থেকে জন্ম নেওয়া এক নীরব বাঁচার লড়াই। এই যে মূল কেন্দ্র থেকে দূরবর্তী এলাকার মানুষের বঞ্চনা, সমাজবিজ্ঞানের পরিভাষায় একে কেন্দ্র-প্রান্তিক নির্ভরতা (Center-Periphery Dependency) বলা যায়। যদিও তাত্ত্বিক ইমানুয়েল ওয়ালারস্টেইন (Immanuel Wallerstein) এই ধারণাটি বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে দিয়েছিলেন, কিন্তু একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ কাঠামোর ক্ষেত্রেও এটি সমানভাবে প্রযোজ্য। রাষ্ট্র যখন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিকভাবে অবহেলা করে, তখন সেখানে প্রাকৃতিকভাবেই একটি ছায়া অর্থনীতি (Shadow Economy) গড়ে ওঠে। এই ছায়া অর্থনীতি আবার অনেক বড় বড় অপরাধের জন্ম দেয়। চোরাচালানের রুটে একসময় শুধু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আসলেও, ধীরে ধীরে সেখানে জায়গা করে নেয় মরণঘাতী মাদক এবং অবৈধ অস্ত্র। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অসাধু সদস্য এবং সীমান্তের ওপারের পাচারকারীরা মিলে এক বিশাল সিন্ডিকেট গড়ে তোলে। সাধারণ দরিদ্র মানুষগুলো এই সিন্ডিকেটের হাতের পুতুল হিসেবে কাজ করে। তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাল পারাপার করে, আর লাভের বড় অংশটি চলে যায় পর্দার আড়ালে থাকা রাঘববোয়ালদের পকেটে। সীমান্তরক্ষী বাহিনী যখন এই চোরাচালান বন্ধ করার চেষ্টা করে, তখন প্রায়ই ঘটে রক্তপাতের ঘটনা। সীমান্তে গুলির শব্দ, রাবার বুলেটের আঘাত এবং লাশ হয়ে ফিরে আসা সাধারণ মানুষের খবর এই বদ্বীপের জন্য এক নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এই মৃত্যুগুলো দেশের ভেতরের সমাজ এবং রাজনীতিতে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দেয়। মানুষ প্রশ্ন তোলে, কেন নিরীহ মানুষদের পাখির মতো গুলি করে মারা হবে? নৃবিজ্ঞানী ডেভিড গেলনার (David Gellner) তাঁর সম্পাদিত বর্ডারল্যান্ড লাইভস ইন নর্দান সাউথ এশিয়া (Borderland Lives in Northern South Asia) বইয়ে সীমান্ত এলাকার মানুষের এই অদ্ভুত এবং বিপন্ন জীবনযাত্রা খুব গভীরভাবে তুলে ধরেছেন (Gellner, 2013)। তিনি দেখিয়েছেন যে, সীমান্তের মানুষগুলোর কাছে দেশপ্রেম বা জাতীয়তাবাদের চেয়ে দৈনন্দিন বেঁচে থাকাটাই অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের রাষ্ট্রীয় বাহিনী কেবল বন্দুকের নল দিয়ে এই সমস্যার সমাধান করতে চায়। কিন্তু তারা ভুলে যায় যে, এই সমস্যার শেকড় প্রোথিত আছে আর্থ-সামাজিক বঞ্চনার অনেক গভীরে। যতদিন না সীমান্ত এলাকাগুলোতে বৈধ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে, ততদিন কোনো কাঁটাতার বা রাবার বুলেট দিয়ে এই ছায়া অর্থনীতি এবং তার সাথে যুক্ত লাশের মিছিল থামানো সম্ভব হবে না। পরিবেশগত বিপর্যয় এবং আন্তঃসীমান্ত জলবায়ু উদ্বাস্তু জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কার নাম নয়, এটি এই মুহূর্তের সবচেয়ে রূঢ় বাস্তবতা। বিশ্বের মানচিত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকা দেশগুলোর তালিকায় এই বদ্বীপের অবস্থান একেবারে ওপরের দিকে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ধীরে ধীরে বাড়ছে, আর তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রা। শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়গুলো প্রায় প্রতি বছরই উপকূলীয় অঞ্চলে আঘাত হানছে। জলোচ্ছ্বাসের কারণে সমুদ্রের নোনা পানি ঢুকে পড়ছে মাইলের পর মাইল কৃষিজমিতে। এই লবণাক্ততার কারণে মাটির উর্বরতা চিরতরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। যেসব কৃষক একসময় ধান ফলিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন পার করতেন, তারা এখন নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে শহরের দিকে পাড়ি জমাতে বাধ্য হচ্ছেন। এই মানুষগুলোকে বলা হয় জলবায়ু উদ্বাস্তু (Climate Refugees)। প্রকৃতির এই নিষ্ঠুর আচরণের পেছনে এই দেশের সাধারণ মানুষের কোনো হাত নেই। উন্নত বিশ্বের শিল্পকারখানার বিষাক্ত ধোঁয়ায় পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল গরম হচ্ছে, আর তার চরম মূল্য চোকাতে হচ্ছে এই বদ্বীপের দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে। পরিবেশগত এই বিপর্যয় রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য এক সম্পূর্ণ নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। পরিবেশবিদ নরম্যান মায়ার্স (Norman Myers) এই ধারণার প্রবর্তন করে একে পরিবেশগত নিরাপত্তা (Environmental Security) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন (Myers, 2002)। তাঁর মতে, পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হলে সমাজে খাদ্যসংকট, বেকারত্ব এবং পরিশেষে ভয়াবহ সংঘাতের সৃষ্টি হয়। এই বদ্বীপের ক্ষেত্রে ঠিক এই ঘটনাটিই ঘটছে। জমি হারিয়ে মানুষ যখন কাজের খোঁজে বড় শহরগুলোতে এসে জড়ো হচ্ছে, তখন শহরের ওপর এক বিশাল জনতাত্ত্বিক চাপ তৈরি হচ্ছে। বস্তিগুলো উপচে পড়ছে, সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিচ্ছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটছে। এই অভ্যন্তরীণ স্থানচ্যুতি বা ইন্টারনাল ডিসপ্লেসমেন্ট একসময় দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক রূপ নিতে বাধ্য। পেটে ক্ষুধা থাকলে মানুষ বাধ্য হয়ে কাঁটাতার পেরিয়ে হলেও একটু নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজ করবে। তখন এই পরিবেশগত সমস্যাটি আর কেবল এই দেশের ভেতরের সমস্যা থাকবে না, এটি পুরো অঞ্চলের জন্য এক বিশাল ভূ-রাজনৈতিক সংকটে পরিণত হবে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, আঞ্চলিক কূটনীতিতে এই ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয়ের বিষয়টি এখনো খুব একটা গুরুত্ব পায় না। প্রতিবেশী দেশগুলো নিজেদের সীমানা সুরক্ষিত রাখার জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করে দেয়াল তুলছে, কিন্তু তারা বুঝতে চাইছে না যে প্রকৃতির রোষ থেকে কোনো দেয়াল দিয়েই বাঁচা সম্ভব নয়। এই বদ্বীপের বিশাল একটি অংশ যদি তলিয়ে যায়, তবে কয়েক কোটি মানুষ কোথায় যাবে? এই প্রশ্নের কোনো উত্তর দ্বিপাক্ষিক আলোচনার টেবিলে খুঁজে পাওয়া যায় না। রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকরা পরিবেশ সুরক্ষার চেয়ে বাণিজ্য এবং ট্রানজিট নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকেন। অথচ অভিন্ন নদীগুলোর নাব্যতা রক্ষা, ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের সুরক্ষা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় পারস্পরিক সহযোগিতা ছাড়া এই অঞ্চলের কোনো দেশের পক্ষেই একা টিকে থাকা সম্ভব নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের এই ধাক্কা সামলাতে হলে প্রয়োজন এক সমন্বিত আঞ্চলিক উদ্যোগ। দুর্ভাগ্যবশত, রাজনৈতিক অবিশ্বাস এবং অহমিকার কারণে সেই উদ্যোগের দেখা এখনো মিলছে না। প্রকৃতির এই নীরব প্রতিশোধ হয়তো একদিন এই অঞ্চলের সব রাজনৈতিক সমীকরণকেই অর্থহীন করে দেবে। সাংস্কৃতিক বিশ্বায়ন এবং আন্তঃরাষ্ট্রীয় সামাজিক প্রভাব ভূগোল বা কাঁটাতারের সীমানা দিয়ে হয়তো মানুষের শরীরকে আটকে রাখা যায়, কিন্তু মানুষের মন বা চিন্তাকে আটকে রাখা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি, স্যাটেলাইট টেলিভিশন এবং ইন্টারনেটের অভাবনীয় বিকাশের ফলে এখন দেশের সীমানাগুলো মূলত অদৃশ্য হয়ে গেছে। এই নতুন ব্যবস্থাকে আমরা বিশ্বায়ন বা গ্লোবালাইজেশন বলে থাকি। এই বিশ্বায়নের সবচেয়ে বড় প্রভাবটি পড়েছে সমাজের সংস্কৃতির ওপর। ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে বিশাল প্রতিবেশীর সাংস্কৃতিক প্রভাব এই বদ্বীপের সমাজজীবনের প্রতিটি স্তরে খুব গভীরভাবে প্রবেশ করেছে। প্রতিবেশীর তৈরি করা সিনেমা, টেলিভিশন সিরিয়াল, গান এবং ফ্যাশন ট্রেন্ড এই দেশের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। ভাষা থেকে শুরু করে পোশাকের ধরন – সবকিছুতেই প্রতিবেশীর সংস্কৃতির এক প্রবল ছায়া দেখতে পাওয়া যায়। এই সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানকে অনেকেই খুব ইতিবাচক চোখে দেখেন। তারা মনে করেন, সংস্কৃতির কোনো নির্দিষ্ট সীমানা থাকা উচিত নয় এবং এটি মানুষের মানসিক জগতকে আরও প্রসারিত করে। তবে সমাজের একটি বড় অংশ এই বিষয়টিকে চরম উদ্বেগের সাথে পর্যবেক্ষণ করে। তাদের মতে, এটি কোনো স্বাভাবিক সাংস্কৃতিক বিনিময় নয়, এটি মূলত এক ধরনের আগ্রাসন। তাত্ত্বিক হার্বার্ট শিলার (Herbert Schiller) তাঁর গবেষণায় এই অবস্থাকে সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ (Cultural Imperialism) হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন (Schiller, 1976)। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো তাদের বিশাল মিডিয়া এবং বিনোদন শিল্পের মাধ্যমে দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর নিজস্ব সংস্কৃতি এবং মূল্যবোধকে ধীরে ধীরে ধ্বংস করে দেয়। এই বদ্বীপের সমাজেও ঠিক সেই ভয়টি কাজ করছে। অনেকেই মনে করেন, নিজস্ব ভাষা, লোকজ সাহিত্য এবং দেশীয় উৎসবগুলো ধীরে ধীরে ভিনদেশি সংস্কৃতির চাপে হারিয়ে যাচ্ছে। তরুণ সমাজ নিজেদের শেকড় ভুলে গিয়ে বাইরের চকচকে জীবনযাত্রার অন্ধ অনুকরণে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে। এই সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব সমাজের ভেতরে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক বিভাজন তৈরি করে। একদল মানুষ বাইরের এই বিনোদন ব্যবস্থাকে সানন্দে গ্রহণ করছে, আর অন্যদল এর বিরুদ্ধে নিজস্ব পরিচয় টিকিয়ে রাখার জন্য মরিয়া হয়ে লড়ছে। এই সাংস্কৃতিক টানাপোড়েন দ্বিপাক্ষিক রাজনৈতিক সম্পর্কের ওপরও বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। প্রতিবেশীর মিডিয়া বা সংবাদমাধ্যমগুলো যখন এই ভূখণ্ডের কোনো ঘটনা নিয়ে নেতিবাচক বা অতিরঞ্জিত সংবাদ প্রচার করে, তখন দেশের ভেতরে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। সাধারণ মানুষের মনে প্রতিবেশী সম্পর্কে এক ধরনের বিরূপ এবং বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব তৈরি হয়। আবার প্রতিবেশীর বিনোদন জগতে এই দেশের শিল্পীদের কাজের সুযোগ পাওয়া নিয়েও নানা ধরনের সামাজিক বিতর্ক তৈরি হয়। অর্থাৎ, সংস্কৃতির এই অদৃশ্য সুতোটি রাষ্ট্রীয় কূটনীতির চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। সরকার চাইলেও আইন করে মানুষের টেলিভিশন দেখা বা ইন্টারনেট ব্যবহার বন্ধ করতে পারে না। ফলে এই সাংস্কৃতিক বিশ্বায়নের স্রোতে গা ভাসিয়ে দিয়ে নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রাখাটা সমাজের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি রাষ্ট্র কেবল অর্থনীতি এবং সীমানা দিয়ে বাঁচে না, তার নিজস্ব একটি আত্মপরিচয় লাগে। সেই আত্মপরিচয়ের সংকট তৈরি হলে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ শক্তিও ভেতর থেকে অনেকখানি দুর্বল হয়ে পড়ে। মানব নিরাপত্তা এবং উন্নয়নের সামাজিক মূল্য নিরাপত্তা বলতে একসময় শুধু রাষ্ট্র বা ভূখণ্ডের সুরক্ষাকেই বোঝানো হতো। কিন্তু আধুনিক পৃথিবীতে চিন্তার জগতে বিশাল এক বিপ্লব ঘটে গেছে। এখন আর কেবল রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিয়ে কথা হয় না, কথা হয় রাষ্ট্রের ভেতরে বাস করা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ মাহবুব উল হক (Mahbub ul Haq) এই নতুন ধারণার প্রবর্তন করেন, যাকে তিনি মানব নিরাপত্তা (Human Security) বলে আখ্যায়িত করেছেন (Haq, 1995)। এই তত্ত্বের মূল কথা হলো, মানুষের পেটে ক্ষুধা থাকলে, চিকিৎসার অভাব থাকলে বা সামাজিক মর্যাদা না থাকলে ওই রাষ্ট্রের বিশাল সেনাবাহিনী বা আধুনিক অস্ত্রের কোনো মূল্য নেই। এই বদ্বীপের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় মানব নিরাপত্তার এই ধারণাটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি হয়তো পরিসংখ্যানের খাতায় বিশাল জিডিপি প্রবৃদ্ধির গল্প শোনাচ্ছে, কিন্তু সমাজের বিশাল একটি অংশ এখনো মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত রয়ে গেছে। ধনী এবং দরিদ্রের মধ্যকার এই বিপুল বৈষম্য সমাজের ভেতরে এক ধরনের চাপা ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে। সাধারণ মানুষের এই বঞ্চনার সাথে আন্তর্জাতিক সম্পর্কেরও গভীর যোগসূত্র রয়েছে। প্রতিবেশীদের সাথে যখন কোনো বাণিজ্যিক চুক্তি হয় বা ট্রানজিটের পথ খুলে দেওয়া হয়, তখন সেই উন্নয়নের সুফল সমাজের প্রান্তিক মানুষগুলো ঠিকমতো পাচ্ছে কি না, সেটি একটি বড় প্রশ্ন। অনেক সময় দেখা যায়, বড় বড় মেগা প্রকল্পের কারণে সাধারণ কৃষকের জমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছে, কিন্তু তাদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ বা পুনর্বাসন করা হচ্ছে না। উন্নয়নের এই রথচাকার নিচে পিষ্ট হচ্ছে অসংখ্য সাধারণ মানুষের জীবন। অন্যদিকে শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য খাতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ চাহিদার তুলনায় এখনো অনেক কম। মানুষের এই মৌলিক অভাবগুলো যখন পূরণ হয় না, তখন সমাজ খুব সহজেই অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। বেকার যুবসমাজ হতাশায় ভুগে অনেক সময় বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে বা উগ্রবাদে জড়িয়ে পড়ে। এটি তখন শুধু দেশের ভেতরের সমস্যা থাকে না, এটি আন্তঃসীমান্ত নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। প্রতিবেশী দেশগুলো তখন অভিযোগ তোলে যে এই ভূখণ্ড থেকে উগ্রবাদ ছড়াচ্ছে, যা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে আরও বেশি জটিলতা তৈরি করে। সুতরাং, পররাষ্ট্রনীতির আসল লক্ষ্য কেবল অন্য দেশের সাথে চুক্তি করা নয়, বরং সেই চুক্তির মাধ্যমে দেশের ভেতরের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করা। কূটনীতির টেবিলে পানিবণ্টন বা শুল্কমুক্ত বাণিজ্যের যে লড়াই চলে, তার চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সাধারণ মানুষের ভাতের প্লেট নিশ্চিত করা। মানব নিরাপত্তাকে বাদ দিয়ে কোনো উন্নয়নই দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয় না। এই বদ্বীপের মানুষ প্রাকৃতিকভাবেই অত্যন্ত লড়াকু। তারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সাইক্লোন, জলোচ্ছ্বাস এবং অভাবের সাথে লড়াই করে টিকে আছে। তাদের এই টিকে থাকার অদম্য স্পৃহাকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মাধ্যমে সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে পারলে এই সমাজ পৃথিবীর যেকোনো উন্নত দেশের সাথে পাল্লা দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। এর জন্য প্রয়োজন এমন একটি সমন্বিত পররাষ্ট্রনীতি, যা কেবল রাজনৈতিক হিসেব-নিকাশ মেলাবে না, বরং সাধারণ মানুষের চোখের জল মুছে তাদের আত্মমর্যাদা নিয়ে বাঁচার পথ তৈরি করে দেবে। বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর সাথে সম্পর্ক (Relations with Global Powers) ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক উত্থান ও সামুদ্রিক সমীকরণ বিশ্বরাজনীতির মানচিত্র সব সময় এক জায়গায় স্থির থাকে না। ক্ষমতার ভরকেন্দ্র সময়ের সাথে সাথে এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে স্থানান্তরিত হয়। গত শতাব্দীর পুরোটা সময় জুড়ে পৃথিবীর ভূ-রাজনৈতিক মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু ছিল আটলান্টিক মহাসাগর এবং ইউরোপ। স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর সেই সমীকরণ ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করে। বর্তমান বিশ্বে বাণিজ্যের মূল চালিকাশক্তি এশিয়া মহাদেশে স্থানান্তরিত হওয়ায় পরাশক্তিগুলোর নজর এখন ভারত মহাসাগর এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দিকে নিবদ্ধ হয়েছে। এই বিশাল জলভাগকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা নতুন ভূ-রাজনৈতিক ধারণার নাম দেওয়া হয়েছে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল। পৃথিবীর মানচিত্রে বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত বদ্বীপ অঞ্চলটি প্রাকৃতিকভাবেই এই নতুন ক্ষমতার ভরকেন্দ্রের একেবারে প্রাণকেন্দ্রে অবস্থান করছে। এশিয়ার উঠতি অর্থনৈতিক শক্তিগুলোর কাঁচামাল এবং তৈরি পণ্য পরিবহনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলো এই বঙ্গোপসাগরের ওপর দিয়েই গেছে। ফলে আগে যে অঞ্চলটিকে বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলো খুব একটা গুরুত্ব দিত না, রাতারাতি সেই অঞ্চলের কৌশলগত কদর বহুগুণ বেড়ে গেছে। সমুদ্রপথের এই নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আলোচনায় অনেক পুরনো একটি ধারণা। সামরিক কৌশলবিদ আলফ্রেড থায়ার মাহান (Alfred Thayer Mahan) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ দ্য ইনফ্লুয়েন্স অফ সি পাওয়ার আপন হিস্ট্রি (The Influence of Sea Power upon History)-এ সামুদ্রিক শক্তি (Sea Power) তত্ত্বের মাধ্যমে খুব পরিষ্কারভাবে বুঝিয়েছেন যে, যে রাষ্ট্র সমুদ্রের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবে, বিশ্বরাজনীতিতে তার আধিপত্যই সবচেয়ে বেশি হবে। এই তাত্ত্বিক কাঠামোর আলোকেই বর্তমান বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলো বঙ্গোপসাগরের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য এক ধরনের নীরব কিন্তু তীব্র প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং রাশিয়ার মতো বৃহৎ শক্তিগুলো বুঝতে পেরেছে যে, এই অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বলয় তৈরি করতে না পারলে একুশ শতকের বৈশ্বিক বাণিজ্যের রেসে তারা পিছিয়ে পড়বে। এই প্রতিযোগিতার কারণে বদ্বীপ অঞ্চলের ছোট রাষ্ট্রগুলোর জন্য এক অদ্ভুত সংকট এবং একই সাথে বিশাল এক সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে। একে তো পরাশক্তিগুলোর বিশাল আকারের অর্থনীতি এবং সামরিক শক্তি, তার ওপর তাদের পরস্পরবিরোধী বৈশ্বিক এজেন্ডা – সবকিছু মিলিয়ে এই অঞ্চলে এক চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ছোট রাষ্ট্রগুলো চাইলেই এই পরাশক্তিগুলোকে এড়িয়ে চলতে পারে না, কারণ নিজেদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং অবকাঠামো নির্মাণের জন্য এদের বিপুল পরিমাণ পুঁজির প্রয়োজন রয়েছে। অন্যদিকে কোনো একটি নির্দিষ্ট পরাশক্তির দিকে বেশি ঝুঁকে পড়লে অন্য পরাশক্তিগুলো রুষ্ট হয়ে নানামুখী চাপ প্রয়োগ করতে শুরু করে। ভূ-রাজনীতির এই প্রবল টানাপোড়েনের মাঝে পড়ে ছোট রাষ্ট্রগুলোকে বাধ্য হয়ে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পা ফেলতে হয়। ফলে বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর সাথে সম্পর্ক নির্ধারণ করাটা এখন আর কেবল গতানুগতিক কূটনীতির বিষয় নেই, এটি মূলত টিকে থাকার এক জটিল দাবার চালে পরিণত হয়েছে। চীনের অর্থনৈতিক কূটনীতি ও অবকাঠামোগত বিস্তৃতি বর্তমান বিশ্বে চীনের উত্থান এক বিস্ময়কর ঘটনা। গত কয়েক দশকে তারা নিজেদের অর্থনীতিকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে যে, এখন তাদের হাতে প্রচুর পরিমাণ উদ্বৃত্ত পুঁজি জমা হয়েছে। এই পুঁজি দেশের বাইরে বিনিয়োগ করে বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের জন্য চীন এক অভিনব কৌশল গ্রহণ করেছে, যার নাম বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (Belt and Road Initiative)। এটি মূলত এশিয়া, ইউরোপ এবং আফ্রিকাকে সড়ক, রেলপথ এবং সমুদ্রবন্দরের মাধ্যমে যুক্ত করার এক বিশাল অবকাঠামোগত পরিকল্পনা। বঙ্গোপসাগরের তীরের এই ভূখণ্ডটি চীনের এই বিশাল উদ্যোগের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। চীন খুব ভালো করেই জানে যে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো তাদের নড়বড়ে অবকাঠামো। বড় বড় সেতু, টানেল, সমুদ্রবন্দর কিংবা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের মতো বিশাল অংকের টাকা এই দেশগুলোর নিজেদের হাতে থাকে না। চীন ঠিক এই জায়গাতেই নিজেদের উপস্থিতির জানান দিচ্ছে। তারা পশ্চিমা দাতা সংস্থাগুলোর মতো মানবাধিকার বা সুশাসনের কোনো কঠিন শর্ত জুড়ে দেয় না। তারা সহজ শর্তে বিশাল অঙ্কের ঋণ নিয়ে হাজির হয়, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর রাজনৈতিক নেতাদের জন্য ফিরিয়ে দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিভাষায় চীনের এই কৌশলকে অর্থনৈতিক রাষ্ট্রকৌশল (Economic Statecraft) বলা হয়। চীনের এই বিপুল বিনিয়োগ আপাতদৃষ্টিতে অনেক আকর্ষণীয় মনে হলেও, এর ভেতরে এক ধরনের প্রচ্ছন্ন ভূ-রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ লুকিয়ে আছে। অনেক তাত্ত্বিক এবং নীতিনির্ধারক চীনের এই ঋণ প্রদান কর্মসূচিকে চরম সন্দেহের চোখে দেখেন। কৌশলগত বিশ্লেষক ব্রহ্ম চেলানি (Brahma Chellaney) এই পরিস্থিতির ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ঋণ ফাঁদ কূটনীতি (Debt-trap diplomacy) নামক একটি ধারণার অবতারণা করেছেন। তাঁর মতে, চীন ইচ্ছে করেই উন্নয়নশীল দেশগুলোকে এমন সব মেগা প্রকল্পের জন্য ঋণ দেয়, যেগুলোর অর্থনৈতিক লাভজনকতা অনেক কম। দেশগুলো যখন সেই ঋণের টাকা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়, তখন চীন সেই ঋণের বিনিময়ে দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদ, যেমন সমুদ্রবন্দর বা খনির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেয়। শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দর এর একটি বড় উদাহরণ। এই ধরনের ভীতি থাকার পরও বদ্বীপের এই রাষ্ট্রটিকে বাধ্য হয়েই চীনের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ গ্রহণ করতে হচ্ছে। কারণ দেশের ভেতরে বিশাল জনসংখ্যার কর্মসংস্থান এবং শিল্পায়নের জন্য এই অবকাঠামোগুলো নির্মাণ করা অপরিহার্য। ফলে চীনের সাথে সম্পর্কটি মূলত এক ধরনের কাঠামোগত বাধ্যবাধকতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। রাষ্ট্রটি চেষ্টা করে খুব সাবধানে ঋণের শর্তগুলো দরকষাকষি করতে, যাতে দীর্ঘমেয়াদে দেশের সার্বভৌমত্ব কোনোভাবেই হুমকির মুখে না পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল ও আদর্শিক দরকষাকষি চীন যখন অর্থনীতির মাধ্যমে এশিয়ায় নিজেদের শেকড় শক্ত করছে, যুক্তরাষ্ট্র তখন সেই প্রভাব ঠেকানোর জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি কৌশল নিয়ে মাঠে নেমেছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই কৌশলগত রূপরেখার নাম হলো ‘ফ্রি অ্যান্ড ওপেন ইন্দো-প্যাসিফিক’ বা এফওআইপি (FOIP)। এই কৌশলের মূল লক্ষ্য হলো সমুদ্রপথগুলোকে সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা এবং এই অঞ্চলে নিয়মভিত্তিক একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা কায়েম করা। সাধারণ চোখে কথাগুলো খুব সুন্দর শোনালেও, এর পেছনের আসল উদ্দেশ্যটি হলো চীনের ক্রমবর্ধমান নৌ-শক্তিকে প্রশান্ত মহাসাগর এবং ভারত মহাসাগরে আটকে রাখা। তাত্ত্বিক পরিভাষায় একে বলা হয় কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ (Strategic Containment)। এই নীতি বাস্তবায়নের জন্য যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলের সমমনা দেশগুলোকে নিয়ে কোয়াড (QUAD)-এর মতো নতুন নতুন জোট তৈরি করছে। যুক্তরাষ্ট্র চায় এই বদ্বীপের রাষ্ট্রটিও তাদের এই ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের সাথে সরাসরি যুক্ত হোক। এর জন্য তারা নিয়মিত সামরিক মহড়া, প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের মতো নানা রকম প্রস্তাব নিয়ে হাজির হয়। যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতির একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, তারা শুধু সামরিক বা অর্থনৈতিক চুক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। তারা তাদের পররাষ্ট্রনীতির সাথে গণতন্ত্র, শ্রম অধিকার এবং মানবাধিকারের মতো বিষয়গুলোকে খুব শক্তভাবে যুক্ত করে দেয়। তাত্ত্বিক রবার্ট কিওহ্যান (Robert Keohane) তাঁর নয়া-উদারনীতিবাদ (Neo-liberalism) ধারণায় দেখিয়েছেন যে, পশ্চিমা পরাশক্তিগুলো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এবং আদর্শিক মূল্যবোধ ব্যবহার করে বিশ্বব্যবস্থাকে নিজেদের অনুকূলে রাখার চেষ্টা করে। যুক্তরাষ্ট্র এই ভূখণ্ডের দেশের অভ্যন্তরীণ মানবাধিকার পরিস্থিতি, নির্বাচন ব্যবস্থা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে নিয়মিত প্রশ্ন তোলে। অনেক সময় তারা তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় ক্রেতা হওয়ার সুবাদে বাণিজ্যের ওপর শর্ত জুড়ে দিয়ে রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে। এটি মূলত এক ধরনের নরম ক্ষমতা (Soft Power)-এর ব্যবহার, যার মাধ্যমে তারা উন্নয়নশীল দেশগুলোকে নিজেদের বলয়ের ভেতরে রাখার চেষ্টা করে। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের এই দ্বিমুখী নীতি সামলানো বেশ কঠিন একটি কাজ। একে তো তাদের বিশাল বাজার দেশের অর্থনীতির জন্য বাঁচা-মরার প্রশ্ন, তার ওপর তাদের আদর্শিক চাপের মুখে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি অনেক সময় অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। তারপরও রাষ্ট্রটি চেষ্টা করে সরাসরি কোনো সামরিক ব্লকে যুক্ত না হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অর্থনৈতিক এবং সন্ত্রাসবাদ দমনের মতো বিষয়গুলোতে গঠনমূলক অংশীদারিত্ব বজায় রাখতে। রাশিয়ার কৌশলগত প্রত্যাবর্তন ও জ্বালানি কূটনীতি স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর বিশ্বমঞ্চে রাশিয়া অনেকটা গুটিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু গত এক দশকে তারা আবারও পুরনো প্রতাপ নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ফিরে আসার চেষ্টা করছে। এই ভূখণ্ডের সাথে রাশিয়ার এক গভীর ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে, যা মূলত ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় তৈরি হয়েছিল। সেই সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের সরাসরি সমর্থন না পেলে এই রাষ্ট্রের জন্ম হয়তো অনেক বেশি প্রলম্বিত হতো। সেই ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার (Historical Legacy)-কে পুঁজি করেই রাশিয়া নতুন করে এই অঞ্চলে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে। তবে এবারের কূটনীতিতে কোনো মতাদর্শিক বা সমাজতান্ত্রিক স্বপ্ন নেই, এটি পুরোপুরি বাণিজ্যিক এবং কৌশলগত। রাশিয়ার বর্তমান পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো তাদের বিশাল জ্বালানি সম্পদ এবং প্রযুক্তি। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় একে জ্বালানি কূটনীতি (Energy Diplomacy) বলা হয়। তারা উন্নয়নশীল দেশগুলোকে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং উন্নত সমরাস্ত্র সরবরাহের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তিতে আবদ্ধ করছে। এই ভূখণ্ডে রাশিয়ার সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হলো একটি বিশাল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ। এই ধরনের প্রকল্প কেবল একটি সাধারণ বাণিজ্যিক চুক্তি নয়। একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, তার রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি সরবরাহ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য কয়েক দশক ধরে ওই নির্দিষ্ট দেশের ওপর প্রযুক্তিগতভাবে নির্ভর করতে হয়। ফলে রাশিয়া মূলত একটি প্রকল্পের মাধ্যমেই এই ভূখণ্ডের সাথে আগামী পঞ্চাশ বছরের জন্য একটি অটুট কৌশলগত সম্পর্ক তৈরি করে ফেলেছে। এই নির্ভরতা রাষ্ট্রকে বৈশ্বিক ফোরামগুলোতে রাশিয়ার ব্যাপারে কিছুটা নমনীয় হতে বাধ্য করে। বিশেষ করে রাশিয়া যখন আন্তর্জাতিকভাবে নানা রকম অর্থনৈতিক অবরোধের মুখে পড়ে, তখন এই ছোট রাষ্ট্রগুলোকে সেই অবরোধ পাশ কাটিয়ে তাদের সাথে আর্থিক লেনদেন করার জন্য ব্যাপক বেগ পেতে হয়। পশ্চিমা দেশগুলোর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে রাশিয়ার সাথে এই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখাটা কূটনীতির এক বিশাল পরীক্ষা। তাত্ত্বিকরা এই অবস্থাকে অবরোধ কূটনীতি (Sanctions Diplomacy)-এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখেন, যেখানে পরাশক্তিগুলোর দ্বন্দ্বে ছোট রাষ্ট্রগুলো আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তারপরও দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে এবং জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে রাশিয়ার সাথে এই দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখা রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ত্রিমুখী পরাশক্তির মাঝে কৌশলগত ভারসাম্য বা হেজিং যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং রাশিয়া – এই তিন পরাশক্তির পরস্পরবিরোধী স্বার্থের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে একটি ছোট বদ্বীপ রাষ্ট্রের টিকে থাকার লড়াইটি সত্যিই রোমাঞ্চকর। চীন বলছে তাদের অবকাঠামো প্রকল্পে যুক্ত হতে, যুক্তরাষ্ট্র চাপ দিচ্ছে তাদের সামরিক এবং কৌশলগত বলয়ে প্রবেশ করতে, আর রাশিয়া জ্বালানি নিরাপত্তার জালে রাষ্ট্রটিকে বেঁধে ফেলছে। এই ত্রিমুখী চাপে কোনো একটি নির্দিষ্ট পক্ষের দিকে হেলে পড়লেই সর্বনাশ। তাত্ত্বিক জন মেয়ারশাইমার (John Mearsheimer) তাঁর আক্রমণাত্মক বাস্তববাদ (Offensive Realism) তত্ত্বে খুব পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন যে, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় পরাশক্তিগুলো সব সময় অন্য রাষ্ট্রগুলোর ওপর নিজেদের ইচ্ছা চাপিয়ে দিতে চায় এবং তারা কখনোই দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না। এই রূঢ় বাস্তবতায় ছোট রাষ্ট্রগুলো যদি কোনো একটি পরাশক্তির বলয়ে পুরোপুরি ঢুকে যায়, তবে অন্য পরাশক্তিগুলো তাদের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে এবং নানা রকম অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শাস্তি দেওয়া শুরু করে। এই শাস্তির হাত থেকে বাঁচার জন্য রাষ্ট্রটি অত্যন্ত সচেতনভাবে একটি বিশেষ পথ বেছে নিয়েছে, যাকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিভাষায় হেজিং (Hedging) বলা হয়। হেজিং মানে হলো কোনো একটি নির্দিষ্ট ঝুড়িতে সব ডিম না রাখা। রাষ্ট্রটি খুব সুকৌশলে তাদের সম্পর্কগুলোকে বিভিন্ন খাতে ভাগ করে ফেলেছে। অবকাঠামো নির্মাণ এবং বড় ধরনের ঋণের জন্য তারা চীনের ওপর নির্ভর করছে। কারণ এই খাতে চীনের বিকল্প অন্য কোনো দেশের কাছে নেই। আবার দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির সবচেয়ে বড় বাজার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপকে হাতে রাখছে। সেই সাথে প্রযুক্তি ও জ্বালানির জন্য রাশিয়ার সাথে চুক্তিবদ্ধ হচ্ছে। এই কৌশলটি প্রয়োগ করার মাধ্যমে রাষ্ট্র মূলত পরাশক্তিগুলোকে এই বার্তা দিচ্ছে যে, তারা সবার সাথেই ব্যবসা করতে চায়, কিন্তু কারো রাজনৈতিক দাবার গুটি হতে রাজি নয়। সহজ করে বললে, এটি হলো এক ধরনের ভারসাম্য রক্ষা (Balancing)-এর খেলা। যখন যুক্তরাষ্ট্র অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করে, তখন রাষ্ট্রটি চীনের সাথে কোনো বড় চুক্তির ঘোষণা দিয়ে ভারসাম্য তৈরি করে। আবার চীন যখন বেশি খবরদারি করতে চায়, তখন তারা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কোনো নিরাপত্তা সংলাপে বসে যায়। পরাশক্তিগুলোকে একে অপরের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে নিজেদের সর্বোচ্চ ফায়দা লুটে নেওয়ার এই কূটনৈতিক কৌশলটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হলেও, একটি ছোট রাষ্ট্রের জন্য এর চেয়ে ভালো কোনো বিকল্প এখনো তৈরি হয়নি। ভবিষ্যতের বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা ও ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের টিকে থাকার রূপরেখা আগামী দিনের পৃথিবী কোনো একক পরাশক্তির নিয়ন্ত্রণে থাকবে না। স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী সময়ের একমেরু বিশ্বের ধারণা ভেঙে গিয়ে পৃথিবী এখন দ্রুত একটি বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা (Multipolar World Order)-এর দিকে এগোচ্ছে। ভারত, ব্রাজিল বা দক্ষিণ আফ্রিকার মতো উদীয়মান শক্তিগুলো বিশ্বমঞ্চে নিজেদের হিস্যা দাবি করছে। এই নতুন ব্যবস্থায় ক্ষমতা অনেক বেশি ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকবে। পরাশক্তিগুলোর মধ্যকার এই বহুমুখী প্রতিযোগিতা বদ্বীপের এই রাষ্ট্রটির জন্য যেমন বিপদের, তেমনি বিশাল এক সুযোগেরও। আগে যেখানে যেকোনো কিছুর জন্য ওয়াশিংটন বা মস্কোর দিকে তাকিয়ে থাকতে হতো, এখন সেখানে অনেকগুলো বিকল্প দরজা খোলা রয়েছে। এই পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক সমীকরণে টিকে থাকতে হলে রাষ্ট্রের কূটনীতিকে আরও অনেক বেশি পেশাদার এবং গতিশীল হতে হবে। প্রথাগত জোটবদ্ধতার ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে এখন প্রয়োজন নির্দিষ্ট ইস্যুভিত্তিক জোট গঠন করা। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তাত্ত্বিকরা মনে করেন, এই নতুন বিশ্বব্যবস্থায় ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ হবে বহুপাক্ষিকতাবাদ (Multilateralism)। জাতিসংঘ, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা বা বিভিন্ন বৈশ্বিক জলবায়ু ফোরামগুলোতে রাষ্ট্রটিকে আরও অনেক বেশি সোচ্চার ভূমিকা পালন করতে হবে। পরাশক্তিগুলো যখন দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় পেশিশক্তি দেখানোর চেষ্টা করবে, তখন সেই আলোচনাকে বহুপাক্ষিক ফোরামে নিয়ে গিয়ে আন্তর্জাতিক নিয়মনীতির মাধ্যমে মোকাবেলা করতে হবে। বিশ্বায়ন এবং কানেক্টিভিটির এই যুগে কোনো রাষ্ট্রই একা বাঁচতে পারে না। সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থা এখন এত বেশি পেঁচানো যে, এক দেশের কারখানায় আগুন লাগলে অন্য দেশের বাজার ধসে পড়ে। এই আন্তঃনির্ভরশীলতাকে কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্রকে প্রমাণ করতে হবে যে, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তাদেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং অপরিহার্য ভূমিকা রয়েছে। পরাশক্তিগুলোর সাথে দরকষাকষির ক্ষেত্রে কোনো আবেগ বা আদর্শের ওপর নির্ভর না করে কেবল নিরেট জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সব মিলিয়ে, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের এই ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েনে রাষ্ট্রটি যদি নিজেদের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রেখে সবার কাছ থেকে বিনিয়োগ আদায় করতে পারে, তবে তা হবে কূটনীতির ইতিহাসে এক বিশাল অর্জন। আগামী দিনের পৃথিবীতে পেশিশক্তির চেয়ে মস্তিষ্কের ব্যবহারই রাষ্ট্রের টিকে থাকার চূড়ান্ত ভাগ্য নির্ধারণ করবে। বহুমুখী টানাপোড়েন এবং কৌশলগত ভারসাম্যের কূটনীতি পরাশক্তিগুলোর সাথে সম্পর্ক নির্ধারণের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রটি সব সময় এক ধরনের সূক্ষ্ম দড়াবাজির কূটনীতি অবলম্বন করে এসেছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন সরাসরি বিরোধিতা করলেও, স্বাধীন হওয়ার পর অর্থনীতির রূঢ় প্রয়োজনে রাষ্ট্রটি এই দুই দেশের সাথেই খুব দ্রুত সম্পর্ক স্থাপন করে। বর্তমানে চীন দেশের সবচেয়ে বড় উন্নয়ন অংশীদার এবং সামরিক সরঞ্জামের অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী। তাদের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায় দেশের অবকাঠামো খাতে বিপুল পরিমাণ চীনা বিনিয়োগ আসছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন হলো দেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার। এই পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক যেকোনো মূল্যে টিকিয়ে রাখা রাষ্ট্রের জন্য আক্ষরিক অর্থেই জীবন-মরণের প্রশ্ন। তাত্ত্বিকরা এই ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য হেজিং (Hedging) কৌশল গ্রহণের কথা বলেন, যার মানে হলো কোনো একটি পক্ষের সাথে পুরোপুরি জোট না বেঁধে সবার সাথে একটি ভারসাম্যপূর্ণ দূরত্ব বজায় রাখা। মুক্তিযুদ্ধের অকৃত্রিম বন্ধু সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্তরাধিকারী হিসেবে রাশিয়ার সাথে সম্পর্কটি এখন মূলত পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ এবং জ্বালানি কূটনীতির ওপর নিবদ্ধ। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে রাশিয়া মূলত আগামী কয়েক দশকের জন্য একটি কৌশলগত নির্ভরতার জাল তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং রাশিয়া – এই পরাশক্তিগুলোর পরস্পরবিরোধী স্বার্থের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ভারসাম্য বজায় রাখাটাই বর্তমান কূটনীতির সবচেয়ে বড় এবং কঠিন পরীক্ষা। কোনো একটি পক্ষের দিকে একটু বেশি হেলে পড়লেই অন্য পক্ষ রুষ্ট হবে এবং নানা রকম অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করতে শুরু করবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো জোটগুলো বাণিজ্যের সাথে প্রায়শই মানবাধিকার, শ্রম অধিকার এবং পরিবেশের মানদণ্ড জুড়ে দিয়ে এক ধরনের আদর্শিক চাপ তৈরি করে। এই বহুমুখী এবং পরস্পরবিরোধী স্রোতের মাঝে নিজেদের জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রেখে এগিয়ে চলাটা প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রটি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে যথেষ্ট পরিণত এবং ধূর্ত হয়ে উঠেছে। অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং তৈরি পোশাক খাত (Economic Diplomacy and RMG Sector) অর্থনৈতিক কূটনীতির তাত্ত্বিক ভিত্তি ও বিশ্বায়নের প্রভাব আধুনিক পৃথিবীর নিয়মগুলো আসলে খুব সোজা এবং রূঢ়। এখনকার বিশ্বে বন্দুকের গুলির চেয়ে ডলারের জোর অনেক বেশি। একটা সময় ছিল যখন এক রাষ্ট্র আরেক রাষ্ট্রকে দখল করার জন্য বিশাল সেনাবাহিনী পাঠাত। এখন আর সেই দিন নেই। এখনকার দখলদারিত্ব চলে বাজারের মাধ্যমে, পণ্যের মাধ্যমে। সীমানা পেরিয়ে এখন আর ট্যাংক ঢোকে না, ঢোকে বহুজাতিক কোম্পানির পণ্য। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এই কাঠামোগত পরিবর্তনের কারণে কূটনীতির সংজ্ঞাও পুরোপুরি পাল্টে গেছে। আগে কূটনীতিকদের প্রধান কাজ ছিল অন্য দেশের সাথে রাজনৈতিক সম্পর্ক ভালো রাখা, সামরিক চুক্তি করা। এখন তাদের মূল কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে নিজের দেশের পণ্যের জন্য বিদেশের বাজার ধরা। এই নতুন ধারার কূটনীতিকেই বলা হয় অর্থনৈতিক কূটনীতি (Economic Diplomacy)। একটি রাষ্ট্রের টিকে থাকা এবং বিশ্বমঞ্চে তার অবস্থান নির্ধারণের সবচেয়ে বড় মাপকাঠি এখন তার অর্থনৈতিক সক্ষমতা। এই ভূখণ্ডের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও ঠিক একই ঘটনা ঘটেছে। একটা দীর্ঘ সময় ধরে এই রাষ্ট্রটি মূলত বিদেশি সাহায্য এবং ঋণের ওপর নির্ভরশীল ছিল। তখন কূটনীতির কাজ ছিল দাতা দেশগুলোর কাছে গিয়ে বিনয়ের সাথে হাত পাতা। কিন্তু সেই সাহায্যনির্ভরতার গ্লানি থেকে বেরিয়ে এসে রাষ্ট্রটি যখন বাণিজ্যের পথে হাঁটা শুরু করল, তখন পররাষ্ট্রনীতির পুরো গতিপথই বদলে গেল। এই যে ক্ষমতার রূপান্তর, এর তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায় আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিখ্যাত পণ্ডিত রবার্ট কিওহ্যান (Robert Keohane) এবং জোসেফ নাই (Joseph Nye)-এর কাজে। তাঁরা তাঁদের জটিল পারস্পরিক নির্ভরশীলতা (Complex Interdependence) তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে, আধুনিক রাষ্ট্রগুলো বাণিজ্যের সুতোয় একে অপরের সাথে এত গভীরভাবে বাঁধা পড়েছে যে, প্রথাগত সামরিক শক্তির ব্যবহার সেখানে অনেকটাই অর্থহীন হয়ে গেছে। একটি রাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী দুর্বল হতে পারে, কিন্তু সেই রাষ্ট্র যদি বিশ্ববাজারে কোনো গুরুত্বপূর্ণ পণ্য সরবরাহ করে, তবে আন্তর্জাতিক টেবিলে তার গলার স্বর বেশ জোরালো হয়। বাণিজ্যের এই শক্তিকে কাজে লাগিয়েই বদ্বীপ অঞ্চলের এই রাষ্ট্রটি বিশ্বমঞ্চে নিজেদের একটি নতুন পরিচয় তৈরি করেছে। অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথ (Adam Smith) তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ দ্য ওয়েলথ অফ নেশনস (The Wealth of Nations)-এ মুক্ত বাণিজ্য এবং শ্রম বিভাজনের যে রূপরেখা দিয়েছিলেন, বিশ্বায়নের যুগে সেটিই আরও ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। রাষ্ট্রগুলো এখন বিশ্ববাজারে নিজেদের লাভজনক অবস্থানটি খুঁজে বের করার নিরন্তর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। এই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে মূলত একটি কর্পোরেট সেলস টিমের মতো কাজ করতে হয়, যাদের প্রধান লক্ষ্য থাকে যেকোনো মূল্যে রপ্তানি আয়ের গ্রাফটিকে ওপরের দিকে নিয়ে যাওয়া। এই অর্থনৈতিক কূটনীতি কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়, এটি সরাসরি দেশের কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকার সাথে যুক্ত। একটি দেশের উৎপাদিত পণ্য যদি বিদেশের বাজারে বিক্রি না হয়, তবে দেশের ভেতরের কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাবে। লাখ লাখ মানুষ রাতারাতি বেকার হয়ে পড়বে। অর্থনীতি ধসে পড়লে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও ভেঙে পড়তে বাধ্য। ফলে অর্থনৈতিক কূটনীতি কেবল অর্থ উপার্জনের মাধ্যম নয়, এটি মূলত রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা রক্ষার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। সমাজবিজ্ঞানী এবং অর্থনীতিবিদ কার্ল মার্কস (Karl Marx) তাঁর বিখ্যাত ডাস ক্যাপিটাল (Das Kapital) বইয়ে দেখিয়েছেন যে, পুঁজিবাদের মূল চালিকাশক্তি হলো প্রতিনিয়ত নতুন বাজার খোঁজা এবং সস্তা শ্রমের সর্বোচ্চ ব্যবহার করা। এই ভূখণ্ডের রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকরা বৈশ্বিক পুঁজিবাদের এই রূঢ় বাস্তবতাটি খুব ভালোভাবেই অনুধাবন করতে পেরেছেন। তারা বুঝতে পেরেছেন যে, বিশ্ববাজারে নিজেদের সস্তা শ্রমকে পুঁজি করে যদি একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করা না যায়, তবে বিশ্বায়নের এই নিষ্ঠুর চাকায় পিষ্ট হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না। এই টিকে থাকার মরিয়া তাগিদ থেকেই অর্থনৈতিক কূটনীতি রাষ্ট্রের সবচেয়ে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়ে পরিণত হয়েছে। তৈরি পোশাক শিল্পের উত্থান এবং কাঠামোগত রূপান্তর যেকোনো রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে এমন কিছু খাত থাকে, যা পুরো দেশকে টেনে নিয়ে যায়। এই ভূখণ্ডের জন্য সেই জাদুকরী খাতটি হলো তৈরি পোশাক শিল্প বা আরএমজি (RMG – Ready Made Garments)। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় সিংহভাগই আসে এই একটি মাত্র খাত থেকে। এই অভাবনীয় উত্থানের গল্পটি একদিনে তৈরি হয়নি। আশির দশকের শুরুর দিকে এই শিল্পটি যখন একটু একটু করে ডানা মেলতে শুরু করে, তখন কেউ ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি যে এটি একদিন বিশ্ববাজার দখল করে নেবে। অর্থনীতিবিদ ডেভিড রিকার্ডো (David Ricardo) তাঁর তুলনামূলক সুবিধা তত্ত্ব (Comparative Advantage Theory)-এ বলেছিলেন, একটি দেশের উচিত সেই পণ্যটিই বেশি উৎপাদন করা, যা সে অন্য দেশের তুলনায় কম খরচে এবং বেশি দক্ষতায় তৈরি করতে পারে। এই রাষ্ট্রের হাতে অফুরন্ত সস্তা শ্রম ছিল। এই বিশাল এবং সস্তা শ্রমশক্তিকে কাজে লাগিয়ে পোশাক তৈরির ক্ষেত্রে রাষ্ট্রটি বিশ্ববাজারে একটি বিশাল তুলনামূলক সুবিধা অর্জন করে। পশ্চিমা দেশগুলোর বড় বড় ব্র্যান্ডগুলো যখন দেখল যে এখানে অনেক কম খরচে পোশাক তৈরি করা সম্ভব, তখন তারা দলে দলে এখানে আসতে শুরু করল। এই তৈরি পোশাক শিল্প শুধু দেশের অর্থনীতিকেই বদলায়নি, এটি সমাজের একেবারে ভেতরের কাঠামোতেও এক বিশাল পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। লাখ লাখ গ্রামীণ নারী, যারা আগে চার দেয়ালের ভেতরে বন্দী ছিলেন, তারা কারখানায় কাজ করতে শুরু করেন। তাদের হাতে টাকা আসতে শুরু করে, যা পরিবার এবং সমাজে তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। এই যে বিশাল এক সামাজিক রূপান্তর, এর পুরোটাই সম্ভব হয়েছে বিশ্ববাজারের সাথে যুক্ত হওয়ার কারণে। আর এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে নিরবচ্ছিন্ন রাখার দায়িত্ব বর্তায় কূটনীতিকদের কাঁধে। বিদেশের মাটিতে বসে থাকা কূটনীতিকরা খুব ভালো করেই জানেন যে, তাদের দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন হলো এই পোশাক শিল্প। পশ্চিমা ক্রেতারা যদি কোনো কারণে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে দেশে এক ভয়াবহ মানবিক এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয় নেমে আসবে। তাই তাদের দৈনন্দিন কাজের একটি বিশাল অংশ ব্যয় হয় এই ক্রেতাদের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে। বিদেশি ব্র্যান্ডগুলোর সদর দপ্তরে গিয়ে তাদের বোঝাতে হয় যে, এই দেশ একটি নির্ভরযোগ্য এবং দীর্ঘমেয়াদী অংশীদার। পোশাক শিল্পের এই বিশাল বিস্তৃতির কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নিয়মকানুনগুলোও রাষ্ট্রের জন্য জীবন-মরণের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। সুতোর দাম থেকে শুরু করে জাহাজের ভাড়া – প্রতিটি বিষয় আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরশীল। বিশ্ব বাণিজ্যের এই জটিল জালে রাষ্ট্রকে অত্যন্ত সাবধানে পা ফেলতে হয়। অনেক সময় উন্নত দেশগুলো নিজেদের দেশের শিল্প বাঁচানোর জন্য নানা রকম কোটা বা বিধিনিষেধ আরোপ করে। কূটনীতিকদের তখন তীব্র প্রতিবাদ জানাতে হয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থার দ্বারস্থ হতে হয়। বিশ্ব অর্থনীতিতে এই রাষ্ট্রটি মূলত একটি বিশাল কারখানার মতো আচরণ করে, যার কাঁচামাল আসে বিদেশ থেকে এবং উৎপাদিত পণ্য বিক্রি হয় বিদেশে। এই মাঝখানের উৎপাদন প্রক্রিয়াটিকে নির্বিঘ্ন রাখাই হলো অর্থনৈতিক কূটনীতির সবচেয়ে বড় সাফল্য। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সব সময় এই চেষ্টা থাকে যেন কোনো রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব বা আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার কারণে এই শিল্পের চাকা এক মুহূর্তের জন্যও বন্ধ না হয়। তৈরি পোশাক শিল্প মূলত এই রাষ্ট্রের কূটনীতিকে এক ধরনের কাঠামোগত বাধ্যবাধকতার ফ্রেমে আটকে দিয়েছে, যে ফ্রেমের বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ আপাতত নেই। শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার এবং আন্তর্জাতিক দরকষাকষি পণ্য তৈরি করলেই তো আর হলো না, সেই পণ্য বিদেশের বাজারে প্রতিযোগিতামূলক দামে বিক্রি করতে হবে। পশ্চিমা দেশগুলোর বাজারে প্রবেশ করতে গেলে প্রতিটি পণ্যের ওপর এক ধরনের কর বা শুল্ক দিতে হয়। এই শুল্কের পরিমাণ বেশি হলে পণ্যের দাম বেড়ে যায় এবং অন্য দেশের পণ্যের সাথে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে হয়। একারণে অর্থনৈতিক কূটনীতির সবচেয়ে বড় এবং কঠিন কাজ হলো পশ্চিমা বিশ্বে পোশাকের জন্য শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার বা ডিউটি-ফ্রি অ্যাক্সেস (Duty-free access) আদায় করা। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের বাজারে ‘এভরিথিং বাট আর্মস’ (EBA) সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার এই ভূখণ্ডের পোশাক শিল্পের বিকাশে এক জাদুকরী ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু এই সুবিধাগুলো পশ্চিমা বিশ্ব এমনি এমনি দয়াপরবশ হয়ে দিয়ে দেয় না। এর পেছনে থাকে দীর্ঘ এবং ক্লান্তিকর এক দরকষাকষির প্রক্রিয়া। কূটনীতিকদের দিনের পর দিন বিদেশি আইনপ্রণেতা, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং থিংক ট্যাংকগুলোর সাথে দেনদরবার করতে হয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এই অসম ক্ষমতার সম্পর্কটি প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ রাউল প্রেবিশ (Raul Prebisch) তাঁর নির্ভরশীলতা তত্ত্ব (Dependency Theory)-এর মাধ্যমে খুব চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, বৈশ্বিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় কেন্দ্র বা উন্নত দেশগুলো সব সময় প্রান্তিক বা উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর ছড়ি ঘোরায়। উন্নত দেশগুলো বাণিজ্য সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর নানা রকম রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক শর্ত চাপিয়ে দেয়। পশ্চিমা দেশগুলো এই শুল্কমুক্ত সুবিধাকে মূলত একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার বা লিভারেজ হিসেবে ব্যবহার করে। তারা যদি এই ভূখণ্ডের কোনো অভ্যন্তরীণ নীতি বা মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তুষ্ট হয়, তবে তারা খুব সহজেই ওই বাণিজ্য সুবিধা বাতিল করার হুমকি দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে জিএসপি (GSP) সুবিধা স্থগিত করার ঘটনাটি এর একটি বড় প্রমাণ। এই ধরনের হুমকি রাষ্ট্রের অর্থনীতির জন্য এক ভয়াবহ মানসিক চাপ তৈরি করে। নীতিনির্ধারকদের তখন এক অদ্ভুত উভয়সংকটে পড়তে হয়। একদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্ব রক্ষার তাগিদ, অন্যদিকে লাখ লাখ শ্রমিকের রুটিরুজি বাঁচানোর বাধ্যবাধকতা। কূটনীতিকদের এই কাঠামোগত বৈষম্যের ভেতরে থেকেই লড়াইটা চালিয়ে যেতে হয়। তারা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা বা ডব্লিউটিও (WTO)-এর মতো আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (LDC) অধিকার আদায়ের পক্ষে অত্যন্ত জোরালো অবস্থান নেন। তারা যুক্তি দেখান যে, মুক্ত বাণিজ্যের নামে উন্নত দেশগুলো যদি তাদের বাজার পুরোপুরি খুলে না দেয়, তবে উন্নয়নশীল দেশগুলো চিরকাল দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে আটকে থাকবে। আন্তর্জাতিক আইনের বিভিন্ন ধারা এবং উপধারা বিশ্লেষণ করে নিজেদের ন্যায্য পাওনা আদায় করার এই আইনি এবং কূটনৈতিক লড়াইটি অত্যন্ত বুদ্ধিবৃত্তিক। এক ভগ্নাংশ সেন্ট শুল্ক কমানোর জন্য বাণিজ্য চুক্তির টেবিলে যে পরিমাণ তর্কবিতর্ক হয়, তা কোনো যুদ্ধের চেয়ে কম উত্তেজনাকর নয়। শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করাটা মূলত অর্থনৈতিক কূটনীতির সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে ধরা হয়, কারণ এই একটি মাত্র সুবিধার ওপর ভিত্তি করেই পুরো রপ্তানি খাতের টিকে থাকা নির্ভর করে। পরাশক্তিগুলোর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় এই বাণিজ্যিক সুবিধাগুলো আদায় করে নেওয়াই কূটনীতিকদের মূল কাজ। কমপ্লায়েন্স, শ্রম অধিকার এবং বৈশ্বিক মানদণ্ডের রাজনীতি বিশ্ববাজার এখন আর শুধু সস্তা পণ্যের খোঁজ করে না, তারা দেখতে চায় সেই পণ্যটি কীভাবে তৈরি হচ্ছে। রানা প্লাজার মতো ভয়াবহ শিল্প দুর্ঘটনার পর তৈরি পোশাক শিল্পের কর্মপরিবেশ এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিশ্বজুড়ে চরম আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। পশ্চিমা ক্রেতা এবং সরকারগুলো কারখানার নিরাপত্তার জন্য ‘অ্যাকর্ড‘ এবং ‘অ্যালায়েন্স‘-এর মতো জোট গঠন করে কঠিন সব শর্ত জুড়ে দেয়। এই শর্তগুলোকে বাণিজ্যের পরিভাষায় ‘কমপ্লায়েন্স‘ বলা হয়। কারখানায় ফায়ার এক্সিট আছে কি না, ভবনের নকশা ঠিক আছে কি না, শ্রমিকরা ট্রেড ইউনিয়ন করতে পারছে কি না – এই সব বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়। আপাতদৃষ্টিতে এই বিষয়গুলো শ্রমিকদের কল্যাণের জন্য হলেও, আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এগুলো অনেক সময় চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পশ্চিমা দেশগুলো তাদের নিজেদের দেশের ভোক্তাদের সন্তুষ্ট করার জন্য এবং নিজেদের মানবাধিকার রক্ষার ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার জন্য এই বৈশ্বিক মানদণ্ডগুলো উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর চাপিয়ে দেয়। এই মানদণ্ড চাপিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়াটিকে তাত্ত্বিকরা নরম ক্ষমতা (Soft Power)-এর একটি আগ্রাসী রূপ হিসেবে দেখেন। অনেক সময় উন্নত দেশগুলো নিজেদের দেশের অদক্ষ শিল্পকে বাঁচানোর জন্য উন্নয়নশীল দেশের পণ্যের ওপর নানা রকম পরিবেশগত বা শ্রম অধিকার সংক্রান্ত শর্ত জুড়ে দেয়, যেগুলো মূলত এক ধরনের অশুল্ক বাধা (Non-tariff barrier)। ইতালীয় তাত্ত্বিক অ্যান্টনিও গ্রামশি (Antonio Gramsci) তাঁর সাংস্কৃতিক আধিপত্য (Cultural Hegemony) ধারণায় দেখিয়েছেন যে, ক্ষমতাবানরা কীভাবে তাদের নিজেদের মূল্যবোধ এবং নিয়মকানুনগুলোকে পুরো বিশ্বের জন্য একমাত্র বৈধ নিয়ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। পশ্চিমা দেশগুলোও তাদের নিজস্ব শ্রম এবং পরিবেশগত মানদণ্ডগুলোকে বৈশ্বিক মানদণ্ড হিসেবে এই ভূখণ্ডের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। এর ফলে কারখানার মালিকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নত করার জন্য কোটি কোটি টাকা বাড়তি বিনিয়োগ করতে হচ্ছে, কিন্তু পশ্চিমা ক্রেতারা পোশাকের দাম সেই অনুপাতে বাড়াচ্ছে না। এই অসম বাণিজ্যিক আচরণ নিয়ে দরকষাকষি করা অর্থনৈতিক কূটনীতির অন্যতম বড় একটি চ্যালেঞ্জ। কূটনীতিকদের বিদেশে গিয়ে প্রতিনিয়ত দেশের পোশাক খাতের ইতিবাচক ভাবমূর্তি বা ব্র্যান্ডিং করতে হয়। তাদের বোঝাতে হয় যে রানা প্লাজা পরবর্তী সময়ে দেশের কারখানার পরিবেশ আমূল বদলে গেছে। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সংখ্যক গ্রিন ফ্যাক্টরি বা পরিবেশবান্ধব কারখানা যে এই দেশেই অবস্থিত, সেই তথ্যটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এবং ক্রেতাদের সামনে অত্যন্ত সুকৌশলে তুলে ধরতে হয়। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) বা বিভিন্ন বিদেশি ট্রেড ইউনিয়নের সাথে প্রতিনিয়ত বৈঠকে বসতে হয়, তাদের নানা রকম প্রশ্নের জবাব দিতে হয়। এই পুরো কাজটি মূলত একটি বিশাল জনসংযোগ বা পিআর (PR) ক্যাম্পেইনের মতো। যদি কোনোভাবে দেশের পোশাক শিল্প সম্পর্কে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কোনো নেতিবাচক খবর ছড়িয়ে পড়ে, তবে পশ্চিমা ক্রেতারা মুহূর্তের মধ্যে কার্যাদেশ বাতিল করে অন্য দেশে চলে যাবে। তাই অর্থনৈতিক কূটনীতি কেবল বাণিজ্যের চুক্তি সাক্ষর করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, এটি দেশের একটি দায়িত্বশীল এবং নিরাপদ উৎপাদনকারী হিসেবে ভাবমূর্তি ধরে রাখার নিরন্তর এক মনস্তাত্ত্বিক লড়াই। নতুন বাজারের সন্ধান এবং বহুমাত্রিক বাণিজ্য কৌশল অর্থনীতিতে একটি খুব প্রচলিত কথা আছে – সব ডিম এক ঝুড়িতে রাখতে নেই। এই ভূখণ্ডের রপ্তানি আয়ের একটি বিশাল অংশ কেবল যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের বাজারের ওপর নির্ভরশীল। এটি অর্থনীতির জন্য এক ভয়াবহ কৌশলগত দুর্বলতা। যদি ইউরোপে কোনো কারণে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয় বা সেখানে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়, তবে তার সরাসরি ধাক্কা এসে লাগবে এই দেশের কারখানাগুলোতে। এই মারাত্মক ঝুঁকি কমানোর জন্য অর্থনৈতিক কূটনীতি অত্যন্ত মরিয়া হয়ে নতুন নতুন বাজার খোঁজার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। বাণিজ্যের এই বহুমুখীকরণ বা ডাইভারসিফিকেশন এখন পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। ল্যাটিন আমেরিকা, আফ্রিকা, রাশিয়া এবং জাপানের মতো অপ্রচলিত বাজারগুলোতে নিজেদের পণ্যের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার জন্য কূটনীতিকরা জোর তৎপরতা চালাচ্ছেন। বিশাল জনসংখ্যার দেশ চীন এবং ভারতের বাজারেও পোশাক রপ্তানি বাড়ানোর জন্য দ্বিপাক্ষিক আলোচনা চলছে। এটি অত্যন্ত কঠিন কাজ, কারণ প্রতিটি নতুন বাজারের আলাদা আলাদা নিয়ম, আলাদা ক্রেতার রুচি এবং আলাদা ধরনের শুল্ক ব্যবস্থা রয়েছে। নতুন বাজার খোঁজার এই তাগিদকে ব্যাখ্যা করা যায় সমাজবিজ্ঞানী ইমানুয়েল ওয়ালারস্টেইন (Immanuel Wallerstein)-এর বিশ্ব ব্যবস্থা তত্ত্ব (World-Systems Theory) দিয়ে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রান্তিক দেশগুলো যদি উন্নতি করতে চায়, তবে তাদের শুধু উন্নত দেশগুলোর বাজারের ওপর নির্ভর করে থাকলে চলবে না। তাদের নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য বাড়াতে হবে এবং নতুন নতুন বাণিজ্যিক বলয় তৈরি করতে হবে। এই ভূখণ্ডটিও ঠিক সেই পথে হাঁটার চেষ্টা করছে। তারা বিভিন্ন দেশের সাথে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) এবং অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (PTA) স্বাক্ষর করার উদ্যোগ নিচ্ছে। এর পাশাপাশি শুধু পোশাকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অন্যান্য পণ্য, যেমন – ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য, আইটি সেবা এবং প্লাস্টিক সামগ্রী রপ্তানির দিকেও জোর দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ, একটি পূর্ণাঙ্গ এবং টেকসই অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড়ানোর জন্য পণ্য এবং বাজার – উভয়েরই বহুমুখীকরণ অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। এই বহুমাত্রিক বাণিজ্য কৌশল বাস্তবায়নের জন্য বিদেশের মাটিতে থাকা দূতাবাসগুলোকে নতুন করে সাজানো হচ্ছে। সেখানে বাণিজ্যিক শাখা বা কমার্শিয়াল উইং খোলা হচ্ছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের দেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে (SEZ) বিনিয়োগের জন্য আকৃষ্ট করা হচ্ছে। তাদের নানা রকম কর ছাড় এবং অবকাঠামোগত সুবিধার প্রলোভন দেখানো হচ্ছে। বর্তমান কূটনীতিতে একজন রাষ্ট্রদূতের সাফল্যের সবচেয়ে বড় মাপকাঠি হলো তিনি তার দায়িত্বপ্রাপ্ত দেশ থেকে কী পরিমাণ বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) আনতে পেরেছেন এবং ওই দেশে দেশের রপ্তানি কতটা বাড়াতে পেরেছেন। এই বাণিজ্য সম্প্রসারণের পথে অনেক সময় ভূ-রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এক দেশে বেশি রপ্তানি করতে গেলে অন্য দেশ অসন্তুষ্ট হতে পারে। এই জটিল ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণগুলো মাথায় রেখেই অত্যন্ত সাবধানে অর্থনৈতিক কূটনীতির জাল বিস্তার করতে হয়। নতুন বাজারের সন্ধান মূলত অর্থনৈতিক পরাধীনতা থেকে মুক্তির এক দীর্ঘমেয়াদী কৌশল। শ্রমিক অভিবাসন, রেমিট্যান্স এবং জনমিতিক লভ্যাংশ অর্থনৈতিক কূটনীতির আরেকটি বিশাল এবং অত্যন্ত মানবিক স্তম্ভ হলো শ্রমিক অভিবাসন। দেশের ভেতরে বিশাল এক তরুণ জনগোষ্ঠী রয়েছে, কিন্তু তাদের সবার জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি করার মতো শিল্পায়ন এখনো হয়নি। এই বিশাল কর্মক্ষম জনশক্তি, যাকে অর্থনীতিবিদরা জনমিতিক লভ্যাংশ (Demographic Dividend) বলেন, তাকে কাজে লাগানোর সবচেয়ে সহজ উপায় হলো বিদেশে রপ্তানি করা। মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে লাখ লাখ মানুষ কাজ নিয়ে পাড়ি জমাচ্ছে। এই প্রবাসীরা প্রতি বছর যে বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স দেশে পাঠায়, তা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্তিশালী রাখে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক বিরাট গতিশীলতা আনে। তৈরি পোশাক শিল্পের পর এই রেমিট্যান্সই হলো দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি। ফলে বিদেশের মাটিতে নতুন শ্রমবাজার উন্মুক্ত করা এবং পুরনো শ্রমবাজারগুলো ধরে রাখা বাংলাদেশি কূটনীতিকদের অন্যতম প্রধান দৈনন্দিন কাজ। এই শ্রমিক অভিবাসনের রাজনীতিটি অত্যন্ত জটিল। সমাজবিজ্ঞানী উইলিয়াম রবিনসন (William Robinson) তাঁর গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম (Global Capitalism) তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে, বৈশ্বিক পুঁজিবাদ মূলত সস্তা শ্রমের চরম শোষণের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। উন্নত বা তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো এই সস্তা শ্রম চায়, কিন্তু তারা শ্রমিকদের কোনো নাগরিক অধিকার বা স্থায়ী মর্যাদা দিতে চায় না। তারা শ্রমিকদের মূলত এক ধরনের ব্যবহার্য পণ্য হিসেবে বিবেচনা করে। প্রবাসে থাকা এই শ্রমিকরা অনেক সময় চরম অমানবিক পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য হন, তাদের পাসপোর্ট আটকে রাখা হয় এবং সময়মতো বেতন দেওয়া হয় না। বিদেশের মাটিতে থাকা দূতাবাসগুলোর জন্য এই শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা করা এক বিশাল কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ। তারা যদি শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে আয়োজক দেশের সরকারের সাথে বেশি কড়াকড়ি করতে যায়, তবে তারা ভিসা দেওয়া বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেয়। আবার দেশের সাধারণ মানুষ প্রত্যাশা করে যে সরকার যেকোনো মূল্যে বিদেশে থাকা তাদের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। এই দুই বিপরীতমুখী চাপের মধ্যে দাঁড়িয়ে কূটনীতিকদের কাজ করতে হয়। অনেক সময় সরকার-টু-সরকার (G2G) চুক্তির মাধ্যমে অভিবাসন ব্যয় কমানো এবং দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। দক্ষ শ্রমিক বা স্কিলড লেবার পাঠানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে, কারণ অদক্ষ শ্রমিকের চেয়ে দক্ষ শ্রমিকের মজুরি এবং সম্মান দুটোই বেশি। নার্স, প্রকৌশলী বা আইটি বিশেষজ্ঞদের ইউরোপ বা জাপানের মতো উন্নত বাজারে পাঠানোর জন্য বিভিন্ন চুক্তি স্বাক্ষর করা হচ্ছে। শ্রমিক পাঠানোর এই পুরো প্রক্রিয়াটি মূলত একটি আন্তর্জাতিক চুক্তির ফসল। আয়োজক দেশের সাথে সুসম্পর্ক বজায় না রাখলে এই বিশাল আয়ের পথ মুহূর্তের মধ্যে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। মহামারির সময় বা কোনো দেশে যুদ্ধ লাগলে এই প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনাও কূটনীতির এক বিরাট পরীক্ষা। সব মিলিয়ে, অর্থনৈতিক কূটনীতি কেবল কাগজপত্রের চুক্তি নয়, এটি লাখ লাখ সাধারণ মানুষের ঘাম এবং স্বপ্নের সাথে সরাসরি যুক্ত। বিশ্বায়নের এই যুগে একটি রাষ্ট্র তার নাগরিকদের শ্রম বিক্রি করে কীভাবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখে, এটি তারই এক বাস্তব এবং রূঢ় উদাহরণ। জনশক্তি রপ্তানি ও প্রবাসী শ্রমিকদের বঞ্চনা (Man-power exploitation) শ্রম অভিবাসনের কাঠামোগত ভিত্তি এবং অর্থনীতির মেরুদণ্ড আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রস্থান লাউঞ্জের দিকে তাকালে প্রতিদিন এক পরিচিত দৃশ্য চোখে পড়ে। হাজার হাজার তরুণ-তরুণী চোখে একবুক স্বপ্ন নিয়ে বিদেশের ফ্লাইটে ওঠার অপেক্ষায় বসে থাকেন। এই মানুষগুলো কোনো বিলাসবহুল ভ্রমণে যাচ্ছেন না। তারা মূলত নিজেদের পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে এবং একটি উন্নত জীবনের আশায় অজানা গন্তব্যে পাড়ি জমাচ্ছেন। এই নিরন্তর দেশান্তরের আইনি নাম হলো শ্রম অভিবাসন (Labor Migration)। একটি বদ্বীপ অঞ্চলের উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের জন্য এই অভিবাসন কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। এটি মূলত পুরো দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। দেশের ভেতরে পর্যাপ্ত শিল্পায়ন না হওয়ায় বিপুল পরিমাণ কর্মক্ষম মানুষের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব হয়নি। ফলে বাধ্য হয়েই রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের বিদেশের শ্রমবাজারের দিকে তাকাতে হয়। মধ্যপ্রাচ্য এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর বিশাল নির্মাণ প্রকল্প এবং সেবা খাতে এই সস্তা শ্রমের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। প্রবাসীদের পাঠানো ঘামঝরানো এই বৈদেশিক মুদ্রা বা রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক ধরনের প্রাণচাঞ্চল্য টিকিয়ে রাখে। এই বিশাল দেশান্তরের পেছনের কারণগুলো ব্যাখ্যা করার জন্য সমাজবিজ্ঞানী এভারেট লি (Everett Lee) তাঁর ধাক্কা ও টান তত্ত্ব (Push and Pull Theory)-এর অবতারণা করেছেন (Lee, 1966)। তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মানুষ এমনিতেই নিজের শেকড় ছাড়তে চায় না। দেশের ভেতরের চরম দারিদ্র্য, বেকারত্ব এবং সামাজিক অনিশ্চয়তা মানুষকে বাইরের দিকে এক ধরনের শক্তিশালী ‘ধাক্কা’ দেয়। অন্যদিকে উন্নত দেশগুলোর চকচকে জীবনযাপন, ভালো মজুরি এবং কাজের সহজলভ্যতা তাদের জাদুর মতো ‘টান’ দেয়। এই ধাক্কা এবং টানের প্রবল শক্তির কাছে মানুষ তার নিজস্ব ভিটেমাটির মায়া ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। অর্থনীতিবিদরা এই বিশাল কর্মক্ষম তরুণ সমাজকে জনমিতিক লভ্যাংশ (Demographic Dividend) হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকেন। এই বিপুল মানবসম্পদকে যদি দেশেই কারিগরি শিক্ষায় দক্ষ করে তোলা যেত, তবে দেশের চেহারাই হয়তো পাল্টে যেত। তবে বাস্তবতার রুক্ষ জমিনে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্র এই মানুষদের সরাসরি বিদেশের বাজারে রপ্তানি করার পথটিকেই সবচেয়ে সহজ এবং লাভজনক মনে করেছে। ফলে রাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতির একটি বড় অংশ এখন ব্যয় হয় এই শ্রমবাজারগুলো উন্মুক্ত রাখার পেছনে। বিদেশের মাটিতে নতুন কাজের সুযোগ খোঁজা এবং সেখানে নিজেদের নাগরিকদের পাঠাতে পারাই মূলত বর্তমান কূটনীতির এক বিশাল সাফল্যের মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাফালা ব্যবস্থা এবং আধুনিক দাসত্বের অদৃশ্য শৃঙ্খল প্রবাসে কাজের সুযোগ পাওয়াটা যতখানি স্বপ্নের মতো শোনায়, বাস্তব জীবনটা তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি নিষ্ঠুর। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে পা রাখার পর থেকেই এই শ্রমিকদের জীবনে নেমে আসে চরম শোষণের এক নতুন অধ্যায়। সেখানে অভিবাসী শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণের জন্য এক বিশেষ ধরনের আইনি কাঠামো ব্যবহার করা হয়, যাকে কাফালা ব্যবস্থা (Kafala System) বলা হয়। এই ব্যবস্থার মূল কথা হলো, একজন বিদেশি শ্রমিকের ভিসা এবং আইনি অধিকার পুরোপুরি তার নিয়োগকর্তা বা স্পনসরের ওপর নির্ভরশীল থাকবে। নিয়োগকর্তার অনুমতি ছাড়া শ্রমিক কাজ পরিবর্তন করতে পারবেন না, এমনকি নিজের দেশেও ফিরে আসতে পারবেন না। বিদেশের মাটিতে পা দেওয়ার সাথে সাথেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তারা শ্রমিকদের পাসপোর্ট নিজেদের জিম্মায় নিয়ে নেন। এর ফলে একজন স্বাধীন মানুষ মুহূর্তের মধ্যেই আইনিভাবে পঙ্গু হয়ে পড়েন। মালিকের মর্জি ছাড়া তার আর স্বাধীনভাবে চলাফেরার কোনো অধিকার থাকে না। মানবাধিকার কর্মীরা এই ভয়াবহ আইনি বন্দিদশাকে সুস্পষ্টভাবে আধুনিক দাসত্ব (Modern Slavery) হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এই কাঠামোর ভেতরে শ্রমিকরা মূলত আক্ষরিক অর্থেই তাদের মালিকের সম্পত্তিতে পরিণত হন, যেখানে তাদের নিজেদের কোনো ন্যূনতম দরকষাকষির সুযোগ থাকে না। এই ব্যবস্থার কারণে শ্রমিকদের মানবেতর পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য করা হয়। মরুভূমির চরম বৈরী আবহাওয়ায় অমানবিক পরিশ্রম করার পরও অনেক সময় মাসের পর মাস তাদের বেতন আটকে রাখা হয়। প্রতিবাদ করলে জুটতে পারে শারীরিক নির্যাতন অথবা মিথ্যা মামলায় জেল খাটার শাস্তি। প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী ইয়োহান গালতুং (Johan Galtung) তাঁর তত্ত্বে এই ধরনের পরিস্থিতিকে কাঠামোগত সহিংসতা (Structural Violence) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন (Galtung, 1969)। এই সহিংসতায় কেউ কাউকে সরাসরি গুলি করে মারে না। রাষ্ট্রের আইনি এবং অর্থনৈতিক কাঠামোটিই এমনভাবে সাজানো থাকে, যা নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠীকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। কাফালা ব্যবস্থা মূলত সেই কাঠামোগত সহিংসতারই এক নগ্ন রূপ। আয়োজক দেশের স্থানীয় প্রশাসন বা পুলিশ সব সময় তাদের নিজেদের নাগরিকদের পক্ষেই অবস্থান নেয়। একজন প্রবাসী শ্রমিক সেখানে সুবিচার পাওয়ার কোনো আশাই করতে পারেন না। গাদাগাদি করে অস্বাস্থ্যকর লেবার ক্যাম্পে থাকা এবং প্রতিনিয়ত মালিকের হুমকির মুখে জীবন পার করাটাই তাদের নিয়তিতে পরিণত হয়। যে চোখ ধাঁধানো বহুতল ভবনগুলো দেখে বিশ্ববাসী মুগ্ধ হয়, তার প্রতিটির ইট-পাথরে মিশে থাকে এই অধিকারবঞ্চিত মানুষগুলোর নীরব কান্না এবং অবর্ণনীয় বঞ্চনার ইতিহাস। বৈশ্বিক পুঁজিবাদ এবং সস্তা শ্রমের কাঠামোগত শোষণ শ্রমিক শোষণের এই অমানবিক চিত্রটি কেবল নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়। এর শেকড় ছড়িয়ে আছে বিশ্ব অর্থনীতির অনেক গভীরে। তাত্ত্বিক উইলিয়াম রবিনসন (William Robinson) তাঁর আলোড়ন সৃষ্টিকারী গ্রন্থ এ থিওরি অফ গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম (A Theory of Global Capitalism)-এ দেখিয়েছেন, বৈশ্বিক পুঁজি কীভাবে সস্তা শ্রমের সর্বোচ্চ শোষণের ওপর ভিত্তি করে টিকে থাকে (Robinson, 2004)। তাঁর মতে, বর্তমান বৈশ্বিক পুঁজিবাদ (Global Capitalism) মূলত একটি বিশাল যন্ত্রের মতো, যার প্রধান লক্ষ্য হলো যেকোনো উপায়ে মুনাফা সর্বাধিক করা। উন্নত বা তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো তাদের অবকাঠামো নির্মাণের জন্য প্রচুর সস্তা শ্রমের প্রয়োজন বোধ করে। তারা চায় শ্রমিকরা কাজ করবে, কিন্তু তারা যেন সেই দেশের নাগরিক অধিকার, স্বাস্থ্যসেবা বা পেনশনের মতো কোনো সুবিধা দাবি করতে না পারে। অর্থাৎ, তারা একজন মানুষকে গ্রহণ করে না, তারা কেবল তার শ্রমটুকু শুষে নিতে চায়। এই রাষ্ট্রগুলো মূলত গ্লোবাল সাউথ বা উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে আসা এই মানুষদের একটি সস্তা এবং ব্যবহার্য পণ্য হিসেবেই বিবেচনা করে। কাজ ফুরিয়ে গেলে তাদের ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হয়। এই শোষণের প্রক্রিয়াটি বুঝতে হলে ধ্রুপদী অর্থনীতির দিকে কিছুটা তাকাতে হয়। দার্শনিক কার্ল মার্কস (Karl Marx) তাঁর উদ্বৃত্ত মূল্য (Surplus Value) তত্ত্বে দেখিয়েছেন, পুঁজিপতিরা শ্রমিকদের তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করেই মূলত নিজেদের সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলে। আন্তর্জাতিক অভিবাসনের ক্ষেত্রে এই তত্ত্বটি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে মিলে যায়। প্রবাসী শ্রমিকরা যে পরিমাণ অমানুষিক পরিশ্রম করে মূল্য সংযোজন করেন, তার খুব সামান্য একটি অংশই তারা মজুরি হিসেবে পান। বাকি বিশাল অঙ্কের মুনাফা চলে যায় নিয়োগকর্তা এবং বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর পকেটে। এই কাঠামোগত বঞ্চনার কারণে শ্রমিকরা তাদের যৌবনের শ্রেষ্ঠ সময়টুকু বিদেশের মাটিতে হাড়ভাঙা খাটুনি করে পার করলেও, দিন শেষে তাদের হাতে খুব বেশি সঞ্চয় থাকে না। আয়োজক দেশগুলো অত্যন্ত সুকৌশলে তাদের শ্রম আইনগুলোকে এমনভাবে তৈরি করে রাখে, যাতে অভিবাসী শ্রমিকরা কোনো ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করতে না পারে বা মজুরি বৃদ্ধির জন্য কোনো ধর্মঘট ডাকতে না পারে। বিশ্বায়নের এই যুগে পুঁজি এক দেশ থেকে আরেক দেশে অবাধে যাতায়াত করতে পারলেও, শ্রমিকের স্বাধীনভাবে চলাফেরা করার বা নিজের অধিকার নিয়ে কথা বলার কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। এটি মূলত শ্রমজীবী মানুষের ওপর আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদের এক নীরব এবং দীর্ঘমেয়াদী আগ্রাসন। দূতাবাসের কূটনৈতিক সীমাবদ্ধতা এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের দড়াবাজি বিদেশের মাটিতে চরম বঞ্চনার শিকার হওয়ার পর একজন প্রবাসী শ্রমিকের কাছে শেষ আশ্রয়স্থল হলো তার নিজের দেশের দূতাবাস। তারা আশা করেন, বিপদের সময় রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিরা তাদের পাশে এসে দাঁড়াবেন। বাস্তব পরিস্থিতি এখানেও চরম হতাশাজনক। বিদেশের মাটিতে থাকা কূটনীতিকদের হাত মূলত অদৃশ্য শৃঙ্খলে বাঁধা থাকে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তাত্ত্বিক রবার্ট কিওহ্যান (Robert Keohane) তাঁর অপ্রতিসম ক্ষমতা সম্পর্ক (Asymmetric Power Relations) ধারণায় দেখিয়েছেন, দুটি দেশের মধ্যে ক্ষমতার পার্থক্য থাকলে দরকষাকষির জায়গাটি সব সময় শক্তিশালী দেশের পক্ষেই যায়। শ্রম আমদানিকারক দেশ এবং শ্রম রপ্তানিকারক দেশের মধ্যে এই ক্ষমতার পার্থক্যটি অনেক বিশাল। আয়োজক দেশগুলো খুব ভালো করেই জানে, শ্রম রপ্তানিকারক দেশের অর্থনীতির জন্য এই বাজারটি কতটা অপরিহার্য। তাই তারা কোনো ধরনের কূটনৈতিক চাপ বা মানবাধিকারের সবক শুনতে রাজি থাকে না। দূতাবাস যদি কোনো শ্রমিকের ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদে জোরালো অবস্থান নেয়, তবে আয়োজক দেশ খুব সহজেই নতুন ভিসা দেওয়া বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেয়। এই হুমকির মুখে দূতাবাসের কর্মকর্তাদের মাথা নিচু করে নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। এই কূটনৈতিক দুর্বলতা মূলত রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কূটনীতি (Economic Diplomacy)-র একটি চরম নেতিবাচক দিককে উন্মোচিত করে। কূটনীতিকদের প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়ায় যেকোনো মূল্যে শ্রমবাজার টিকিয়ে রাখা। আয়োজক দেশের সাথে রাজনৈতিক সম্পর্ক খারাপ হওয়ার ভয়ে তারা অনেক সময় নিজেদের নাগরিকদের ওপর হওয়া অমানবিক নির্যাতনগুলো দেখেও না দেখার ভান করেন। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, নির্যাতিত শ্রমিকরা দূতাবাসে গিয়ে কোনো আইনি সহায়তা পান না, উল্টো তাদের ধৈর্য ধরতে বলা হয়। রাষ্ট্র মূলত কিছু মানুষের ব্যক্তিস্বার্থ বা জীবনের চেয়ে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্বার্থ বা রেমিট্যান্সের প্রবাহকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেয়। আয়োজক দেশের প্রশাসনের সাথে লড়তে গেলে যে বিশাল কূটনৈতিক ঝুঁকি তৈরি হয়, উন্নয়নশীল দেশের সরকারগুলো সেই ঝুঁকি নিতে চায় না। এই দড়াবাজির কূটনীতিতে প্রবাসী শ্রমিকরা মূলত একটি অদৃশ্য চুক্তির বলির পাঁঠায় পরিণত হন। তারা রাষ্ট্রের অর্থনীতির চাকা ঘোরালেও, রাষ্ট্র তাদের আইনি সুরক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে চরমভাবে ব্যর্থ হয়। এই অসহায়ত্ব প্রমাণ করে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের রূঢ় ময়দানে নৈতিকতার চেয়ে অর্থনৈতিক স্বার্থের কাছে রাষ্ট্রগুলো কতটা জিম্মি হয়ে থাকে। মানব নিরাপত্তা বনাম রাষ্ট্রীয় স্বার্থের টানাপোড়েন নিরাপত্তার ধারণাটি এখন আর কেবল রাষ্ট্রের সীমানা বা মানচিত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ মাহবুব উল হক (Mahbub ul Haq) তাঁর যুগান্তকারী মানব নিরাপত্তা (Human Security) তত্ত্বে দেখিয়েছেন, মানুষের জীবনের মর্যাদা এবং ভয়হীনভাবে বেঁচে থাকার অধিকারই হলো প্রকৃত নিরাপত্তা (Haq, 1995)। এই তত্ত্বের চশমা দিয়ে দেখলে প্রবাসী শ্রমিকদের অবস্থা রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য এক চরম লজ্জার বিষয়। রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকরা হয়তো বছর শেষে জিডিপির প্রবৃদ্ধি বা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের আকার নিয়ে অত্যন্ত গর্ববোধ করেন। এই চকচকে পরিসংখ্যানের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অসংখ্য মানুষের অমানবিক যন্ত্রণার কোনো হিসাব জাতীয় বাজেটে থাকে না। যখন বিদেশের মাটি থেকে কার্গো বিমানে করে একের পর এক কফিন দেশে এসে পৌঁছায়, তখন রাষ্ট্রের এই তথাকথিত সফলতার গল্পগুলো মুহূর্তের মধ্যে অর্থহীন হয়ে যায়। একটি রাষ্ট্র তার নাগরিকদের উন্নত জীবন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিদেশে পাঠায়, কিন্তু তাদের জীবনের ন্যূনতম নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়। এই বৈপরীত্য মূলত রাষ্ট্রের সামষ্টিক স্বার্থ এবং সাধারণ মানুষের জীবনের মূল্যের মধ্যকার এক ভয়াবহ টানাপোড়েনকে সামনে নিয়ে আসে। এই টানাপোড়েনে সব সময় জাতীয় স্বার্থ (National Interest)-এরই জয় হয়। রাষ্ট্রের কাছে একজন প্রবাসী শ্রমিক মূলত রেমিট্যান্স পাঠানোর একটি যন্ত্র মাত্র। যন্ত্রটি বিকল হয়ে গেলে বা মারা গেলে তাকে দেশে ফেরত পাঠিয়ে নতুন আরেকটি যন্ত্র সেখানে প্রতিস্থাপন করা হয়। শ্রমিকের ব্যক্তিগত দুঃখ, তার পরিবারের হাহাকার বা তার ওপর হওয়া অবিচারের কোনো মূল্য রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের কাছে থাকে না। এই কাঠামোগত অসংবেদনশীলতা সমাজকে ভেতর থেকে ভীষণভাবে নাড়া দেয়। সাধারণ মানুষ প্রশ্ন তুলতে শুরু করে, যে রাষ্ট্র তার নিজের নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে পারে না, সেই রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির আসলে কী মূল্য আছে? মানব নিরাপত্তার এই চরম বিপর্যয় আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও দেশের ভাবমূর্তিকে দারুণভাবে ক্ষুণ্ণ করে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো প্রতিনিয়ত এই বঞ্চনার কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রের নিষ্ক্রিয়তার কড়া সমালোচনা করে। তারপরও পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয় না। অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে গিয়ে সাধারণ মানুষের এই যে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ, তা প্রমাণ করে একটি উন্নয়নশীল দেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো তার নাগরিকদের প্রতি কতটা নির্মম এবং অসহায় হতে পারে। আন্তর্জাতিক শ্রম আইন এবং বহুপাক্ষিক দরকষাকষির ভবিষ্যৎ দ্বিপাক্ষিক আলোচনার টেবিলে বসে এই অমানবিক শোষণ থেকে মুক্তির কোনো পথ খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। আয়োজক দেশগুলো স্বেচ্ছায় তাদের কাফালা ব্যবস্থার মতো লাভজনক আইনি কাঠামো পরিবর্তন করতে রাজি হবে না। এই কাঠামোগত বৈষম্য ভাঙার জন্য প্রয়োজন সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি কূটনৈতিক কৌশল। তাত্ত্বিক জন রাগি (John Ruggie) তাঁর গবেষণায় বহুপাক্ষিক কূটনীতি (Multilateral Diplomacy)-র ওপর জোর দিয়ে দেখিয়েছেন, শক্তিশালী দেশগুলোকে নিয়মের আওতায় আনার জন্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মিলিত চাপ অত্যন্ত কার্যকরী হতে পারে (Ruggie, 1992)। একটি একক দেশ যখন প্রতিবাদ করে, তখন তার কণ্ঠস্বর সহজেই স্তব্ধ করে দেওয়া যায়। ভারত, নেপাল, ফিলিপাইন বা শ্রীলঙ্কার মতো শ্রম রপ্তানিকারক দেশগুলো যদি একজোট হয়ে একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে, তবে আয়োজক দেশগুলো সেই সম্মিলিত চাপকে সহজে অগ্রাহ্য করতে পারবে না। এই ধরনের জোটবদ্ধ দরকষাকষি শুরু হলে মধ্যপ্রাচ্য বা অন্যান্য অঞ্চলের দেশগুলো বাধ্য হবে তাদের অমানবিক শ্রম আইনগুলো সংস্কার করতে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO)-এর প্রণীত কনভেনশনগুলো বাস্তবায়নের জন্য বৈশ্বিক ফোরামগুলোতে লাগাতার চাপ সৃষ্টি করা বর্তমান সময়ের কূটনীতির জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। মানবাধিকারের প্রশ্নটিকে এখন আর কেবল রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। মানবাধিকারের সার্বজনীনতা (Universality of Human Rights)-এর নীতি অনুযায়ী, একজন মানুষ যে দেশেরই নাগরিক হোন না কেন, কাজের জায়গায় তার ন্যূনতম সম্মান এবং আইনি সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। বিদেশের মাটিতে থাকা দূতাবাসগুলোকে এখন কেবল ভিসা প্রসেসিং বা পাসপোর্ট নবায়নের কাজ থেকে বেরিয়ে এসে শক্ত আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিতে হবে। আয়োজক দেশের আদালতে শ্রমিকদের পক্ষে আইনি সহায়তা দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত ফান্ড এবং দক্ষ প্যানেল আইনজীবী নিয়োগ করা অত্যন্ত জরুরি। আগামী দিনের শ্রম কূটনীতি কেবল সস্তা শ্রম বিক্রির চুক্তিতে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। শ্রমিকদের মর্যাদা, বীমা এবং ক্ষতিপূরণের বিষয়টি প্রতিটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তির অপরিহার্য শর্ত হিসেবে যুক্ত করতে হবে। এই অধিকার আদায়ের লড়াইটি দীর্ঘ এবং কণ্টকাকীর্ণ হলেও, নিজ দেশের নাগরিকদের আধুনিক দাসত্ব থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য এর চেয়ে ভালো কোনো বিকল্প পথ আর খোলা নেই। জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত কূটনীতি (Climate Change and Environmental Diplomacy) কার্বন নিঃসরণের বৈপরীত্য এবং এক নীরব অস্তিত্বের সংকট শিল্পবিপ্লবের পর থেকে পৃথিবীর উন্নত রাষ্ট্রগুলো নিজেদের সম্পদ বাড়ানোর এক উন্মত্ত প্রতিযোগিতায় নেমেছিল। তারা যথেচ্ছভাবে জীবাশ্ম জ্বালানি পুড়িয়েছে, পাহাড় কেটেছে এবং বিশাল বিশাল কারখানা বানিয়েছে। এর ফলে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে, যার চড়া মূল্য চোকাচ্ছে বর্তমান বিশ্ব। পৃথিবীর মানচিত্রে বদ্বীপ অঞ্চলের এই রাষ্ট্রটির কার্বন নিঃসরণের হার বৈশ্বিক মোট নিঃসরণের শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশেরও কম। অর্থাৎ, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের পেছনে এই ভূখণ্ডের মানুষের দায় প্রায় নেই বললেই চলে। তারপরও প্রকৃতির এই বিরূপ আচরণের সবচেয়ে বড় এবং ভয়াবহ শিকার হচ্ছে এই দেশটি। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ধীরে ধীরে বাড়ছে। এই উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে উপকূলীয় এলাকার বিশাল একটি অংশ চিরতরে জলের নিচে তলিয়ে যাওয়ার এক বাস্তব এবং অনিবার্য ঝুঁকির মুখে রয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটা সময় পর্যন্ত এই বিষয়গুলোকে খুব একটা পাত্তা দেওয়া হতো না। কূটনীতির টেবিলে আলোচনা সীমাবদ্ধ থাকত সীমানা, বাণিজ্য আর সামরিক শক্তির মহড়া নিয়ে। সময়ের সাথে সাথে সেই গতানুগতিক ধারণায় বড় ধরনের ফাটল ধরেছে। নীতিনির্ধারকরা খুব ভালোভাবে বুঝতে পেরেছেন যে, কোনো বিদেশি সৈন্যের আক্রমণের চেয়ে সমুদ্রের এই নীরব আগ্রাসন অনেক বেশি ভয়ংকর এবং এই আগ্রাসন কোনো শান্তি চুক্তি দিয়ে ঠেকানো সম্ভব নয়। এই ভৌগোলিক দুর্বলতা এবং প্রাকৃতিক বিপন্নতার কারণে রাষ্ট্রটির পররাষ্ট্রনীতিতে একটি সম্পূর্ণ নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। পরিবেশ বিজ্ঞানী নরম্যান মায়ার্স (Norman Myers) তাঁর গবেষণায় পরিবেশগত নিরাপত্তা (Environmental Security) নামের যে ধারণাটি সামনে এনেছিলেন, এই ভূখণ্ডের বর্তমান বাস্তবতা মূলত তার এক নিখুঁত উদাহরণ (Myers, 2002)। মায়ার্সের মতে, পরিবেশের ভারসাম্য একবার নষ্ট হলে একটি রাষ্ট্রের কাঠামোগত ভিত্তি ভেতর থেকে পুরোপুরি দুর্বল হয়ে পড়ে। কৃষিজমিতে সমুদ্রের লবণাক্ত জল প্রবেশ করার ফলে ফসলের স্বাভাবিক উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। সুপেয় মিঠা পানির তীব্র অভাব দেখা দিচ্ছে বিস্তীর্ণ অঞ্চলে। লাখ লাখ প্রান্তিক মানুষ নিজেদের আদি ভিটেমাটি হারাচ্ছে। এই মানুষগুলো বাধ্য হয়ে শহরের দিকে ছুটছে, যা অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি এবং সামাজিক শৃঙ্খলার ওপর এক ভয়াবহ মনস্তাত্ত্বিক ও বস্তুগত চাপ তৈরি করছে। এই অস্তিত্বের সংকট কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশের সীমানার ভেতরের স্থানীয় সমস্যা নয়। এর সাথে সরাসরি এবং গভীরভাবে যুক্ত আছে উন্নত বিশ্বের শিল্পনীতি, তাদের অতি-উৎপাদন এবং ভোগবাদী জীবনযাপন। একারণে এই সংকট মোকাবেলার জন্য রাষ্ট্রটিকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে অত্যন্ত জোরালো এবং আপসহীন অবস্থান নিতে হয়েছে। কূটনীতির একটি বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ অংশ এখন ব্যয় হচ্ছে এই নীরব ধ্বংসলীলার ভয়াবহ চিত্র বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরার পেছনে, যাতে উন্নত বিশ্ব তাদের ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা এড়িয়ে যেতে না পারে। অ-প্রথাগত নিরাপত্তা এবং জলবায়ু উদ্বাস্তুর ভূ-রাজনীতি জাতীয় নিরাপত্তার প্রচলিত সংজ্ঞায় সাধারণত বাইরের কোনো দেশের সশস্ত্র সামরিক আক্রমণকে সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে ধরা হয়। বদ্বীপের এই রাষ্ট্রটির জন্য সেই পুরনো সমীকরণ পুরোপুরি পাল্টে গেছে। এখানে আসল শত্রু কোনো ভিনদেশি সেনাবাহিনী বা গুপ্তচর নয়, আসল শত্রু হলো প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল এবং রুক্ষ জলবায়ু। তাত্ত্বিক পরিভাষায় এই ধরনের নতুন হুমকিগুলোকে অ-প্রথাগত নিরাপত্তা (Non-traditional Security) বলা হয়। শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়, অস্বাভাবিক জলোচ্ছ্বাস এবং অসময়ের প্রলয়ঙ্করী বন্যা প্রতি বছর দেশের যোগাযোগ অবকাঠামো এবং অর্থনীতির বিপুল পরিমাণ ক্ষতি করছে। এই বিপুল ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য প্রায় অসম্ভব একটি কাজ। সবচেয়ে বড় মানবিক এবং কাঠামোগত বিপর্যয়টি ঘটছে মানুষের বাস্তুচ্যুতির ক্ষেত্রে। নদীভাঙন এবং মাটির লবণাক্ততার কারণে যারা নিজেদের কৃষিজমি এবং জীবিকা হারাচ্ছেন, তারা বাধ্য হয়ে অন্য জায়গায় আশ্রয় খুঁজছেন। এই অসহায় এবং ঠিকানাহীন মানুষদের আন্তর্জাতিকভাবে জলবায়ু উদ্বাস্তু (Climate Refugees) হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এই উদ্বাস্তুর সংখ্যা দিন দিন এত দ্রুত বাড়ছে যে, এটি অচিরেই একটি বড় ধরনের ভূ-রাজনৈতিক সংকটে রূপ নেওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। পেটের তীব্র ক্ষুধা এবং বাসস্থানের অভাব মানুষকে শেষ পর্যন্ত সীমানা পার হতে বাধ্য করে। উদ্বাস্তু সমস্যার কারণে প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সম্পর্কের এক সম্পূর্ণ নতুন মাত্রার জটিলতা তৈরি হয়। প্রখ্যাত গবেষক থমাস হোমার-ডিক্সন (Thomas Homer-Dixon) তাঁর সাড়া জাগানো গ্রন্থ এনভায়রনমেন্ট, স্কার্সিটি, অ্যান্ড ভায়োলেন্স (Environment, Scarcity, and Violence)-এ দেখিয়েছেন যে, পরিবেশগত অবক্ষয়ের কারণে সমাজে সম্পদের তীব্র সংকট তৈরি হয় (Homer-Dixon, 1999)। এই সম্পদের সংকট শেষ পর্যন্ত ভয়াবহ সামাজিক এবং আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংঘাতের দিকে নিয়ে যায়। হোমার-ডিক্সনের এই তত্ত্বটি বর্তমান বাস্তবতার সাথে দারুণভাবে মিলে যায়। একটি নির্দিষ্ট এলাকার মানুষ যখন দলে দলে অন্য এলাকায় বা অন্য কোনো দেশে গিয়ে জড়ো হয়, তখন স্থানীয় সম্পদের ওপর প্রচণ্ড মাত্রায় চাপ পড়ে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সাথে এই নতুন আসা মানুষদের সংঘাত এবং মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। কূটনীতির ময়দানে এই স্পর্শকাতর বিষয়টি সামলানো অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ। রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক ফোরামে প্রতিনিয়ত প্রমাণ করতে হয় যে, এই প্রান্তিক মানুষগুলো স্বেচ্ছায় দেশ ছাড়ছে না, তারা মূলত উন্নত বিশ্বের সৃষ্ট দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশগত বিপর্যয়ের চূড়ান্ত শিকার। এই বাস্তুচ্যুত মানুষদের অধিকার রক্ষা এবং তাদের সম্মানজনক পুনর্বাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ওপর লাগাতার চাপ সৃষ্টি করা বর্তমান পররাষ্ট্রনীতির একটি অপরিহার্য অংশে পরিণত হয়েছে। বৈশ্বিক পুঁজিবাদ এবং পরিবেশগত ন্যায্যতার লড়াই জলবায়ু পরিবর্তনের মূল কারণ খুঁজতে গেলে অনিবার্যভাবেই আন্তর্জাতিক অর্থনীতির দিকে তাকাতে হয়। সারা বিশ্ব মূলত একটি নির্দিষ্ট এবং শক্তিশালী অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যার নাম বৈশ্বিক পুঁজিবাদ (Global Capitalism)। এই ব্যবস্থার প্রধান এবং একমাত্র লক্ষ্য হলো ক্রমাগত উৎপাদন বাড়ানো এবং যেকোনো মূল্যে মুনাফা অর্জন করা। উন্নত দেশগুলো এই পুঁজিবাদের সুফল ভোগ করে আজ এত ধনী এবং ক্ষমতাবান হয়েছে। তারা শত শত বছর ধরে কয়লা এবং তেল পুড়িয়ে নিজেদের বিশাল শিল্পকারখানা চালিয়েছে। এখন সেই কার্বনের প্রভাবে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল যখন অসহনীয়ভাবে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে, তখন তারা উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বলছে কার্বন নিঃসরণ কমাতে এবং কারখানা বন্ধ করতে। এই দ্বিমুখী নীতি আন্তর্জাতিক সম্পর্কে এক বড় ধরনের এবং যৌক্তিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সমাজবিজ্ঞানী ইমানুয়েল ওয়ালারস্টেইন (Immanuel Wallerstein) তাঁর বিশ্ব ব্যবস্থা তত্ত্ব (World-Systems Theory)-এ খুব পরিষ্কারভাবে দেখিয়েছেন যে, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ‘কেন্দ্র’ বা উন্নত দেশগুলো সব সময় ‘প্রান্তিক’ বা দুর্বল দেশগুলোকে শোষণ করে (Wallerstein, 1974)। পরিবেশের ক্ষেত্রেও ঠিক একই কাঠামোগত শোষণের পুনরাবৃত্তি ঘটছে। উন্নত দেশগুলো পরিবেশ নষ্ট করে ধনী হচ্ছে, আর তার চূড়ান্ত খেসারত দিচ্ছে প্রান্তিক দেশগুলোর সাধারণ মানুষ। এই কাঠামোগত বৈষম্য এবং শোষণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রটি জলবায়ু ন্যায়বিচার (Climate Justice)-এর দাবিটি বিশ্বমঞ্চে অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরেছে। জলবায়ু ন্যায়বিচারের এই সংগ্রাম কোনো করুণা বা ভিক্ষা চাওয়ার বিষয় নয়, সম্পূর্ণ অধিকার আদায়ের এক যৌক্তিক দাবি। কূটনীতিকরা জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনগুলোতে (COP) গিয়ে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিচ্ছেন যে, যারা পরিবেশ দূষণ করেছে, তাদেরকেই এর পূর্ণ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। আন্তর্জাতিক আইনের ভাষায় একে ‘পলিউটার পেজ প্রিন্সিপাল’ বা দূষণকারীর ক্ষতিপূরণ নীতি বলা হয়। উন্নত দেশগুলো সাধারণত আইনি বাধ্যবাধকতার ভয়ে এই দায় এড়িয়ে যাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করে এবং কোনো আইনি চুক্তিতে সই করতে চায় না। এই জায়গায় দাঁড়িয়ে একটি ছোট এবং অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল দেশের পক্ষে পরাশক্তিগুলোর সাথে চোখে চোখ রেখে দরকষাকষি করা রীতিমতো স্নায়ুযুদ্ধের শামিল। কূটনীতির টেবিলে আইনি মারপ্যাঁচ, বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্ত এবং শক্ত যুক্তির এক অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটাতে হয়। পরিবেশগত এই ন্যায্যতা আদায় করার নিরন্তর সংগ্রামটি মূলত বৈশ্বিক পুঁজিবাদের নির্মমতার বিরুদ্ধে একটি শক্ত এবং সুস্পষ্ট প্রতিবাদ। বহুপাক্ষিক কূটনীতি এবং দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর জোটবদ্ধতা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশাল ময়দানে একা কোনো ছোট রাষ্ট্রের গলার স্বর খুব একটা শোনা যায় না। পরাশক্তিগুলো সাধারণত দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় নিজেদের ইচ্ছেমতো শর্ত চাপিয়ে দেয় এবং দুর্বল রাষ্ট্রকে আপস করতে বাধ্য করে। এই কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা কাটানোর জন্য বদ্বীপের এই রাষ্ট্রটি একটি অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত এবং বাস্তবসম্মত পথ বেছে নিয়েছে। তারা বুঝতে পেরেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার হওয়া দেশগুলোর সংখ্যা পৃথিবীতে মোটেও কম নয়। আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অসংখ্য দ্বীপরাষ্ট্র ঠিক একই রকম বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। এই সমমনা এবং বিপদগ্রস্ত দেশগুলোকে নিয়ে তারা একটি শক্তিশালী জোট গঠন করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। এই অসাধারণ উদ্যোগের ফসল হলো ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরাম বা সিভিএফ (CVF)। এই বিশাল ফোরামে নেতৃত্ব দেওয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্রটি বিশ্বমঞ্চে নিজেদের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অপরিহার্য অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এই ধরনের জোটবদ্ধ হয়ে কাজ করাকে বহুপাক্ষিক কূটনীতি (Multilateral Diplomacy) বলা হয়। অসংখ্য দুর্বল দেশ যখন একমঞ্চে দাঁড়িয়ে একই সুরে কথা বলে, তখন বড় শক্তিগুলো সেই সম্মিলিত দাবিকে আর সহজে অবজ্ঞা বা উপেক্ষা করতে পারে না। এই জোটবদ্ধতার মাধ্যমে রাষ্ট্রটি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এক ধরনের বিশেষ মনস্তাত্ত্বিক ক্ষমতা অর্জন করেছে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোসেফ নাই (Joseph Nye) সামরিক শক্তির বাইরে গিয়ে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ক্ষমতার কথা বলেছিলেন, যার নাম কোমল ক্ষমতা (Soft Power) (Nye, 1990)। জলবায়ু পরিবর্তনের মতো একটি সার্বজনীন ইস্যুতে নেতৃত্ব দেওয়ার মাধ্যমে এই ভূখণ্ডটি মূলত সেই সফট পাওয়ারের সর্বোচ্চ চর্চা করছে। তারা উন্নত দেশগুলোকে নৈতিকতার কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছে এবং তাদের ঐতিহাসিক ভুলের কথা বারবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। এই দেশগুলোর অর্থমন্ত্রীদের নিয়ে গঠিত ভি-২০ (V20) জোটের মাধ্যমে তারা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক নীতিমালায় বড় ধরনের পরিবর্তনের জন্য চাপ দিচ্ছে। তারা জোরালো দাবি জানাচ্ছে যে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাদের অর্থনীতি যে বিশাল এবং অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে, তার জন্য আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থাগুলোকে নতুন করে সাজাতে হবে। বিশ্বব্যাংক বা আইএমএফ-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো যেন ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে সহজ শর্তে ঋণ এবং প্রয়োজনীয় অনুদান দেয়, সেই বিষয়ে দেনদরবার চলছে প্রতিনিয়ত। বহুপাক্ষিক কূটনীতির এই সফল প্রয়োগ প্রমাণ করে যে, সামরিকভাবে দুর্বল হলেও একটি রাষ্ট্র সঠিক কৌশল এবং জোটবদ্ধতার মাধ্যমে বিশ্বরাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব বিস্তার করতে পুরোপুরি সক্ষম। ক্ষয়ক্ষতি পূরণের তহবিল ও দরকষাকষির কৌশল জলবায়ু কূটনীতির শুরুর দিকে বৈশ্বিক আলোচনার মূল বিষয়বস্তু ছিল কেবল কার্বন নিঃসরণ কমানো বা মিটিগেশন। উন্নত দেশগুলো চেয়েছিল এই কার্বন কমানোর বিষয়টি নিয়েই আলোচনা সীমাবদ্ধ থাকুক। ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো খুব দ্রুতই উপলব্ধি করে যে, বায়ুমণ্ডলে ইতিমধ্যে যে পরিমাণ কার্বন জমা হয়েছে, তার প্রভাবে ক্ষতি যা হওয়ার তা শুরু হয়ে গেছে। এখন শুধু নিঃসরণ কমানোর কথা বলে কোনো বাস্তব লাভ নেই। এই অনিবার্য ক্ষতির হাত থেকে বাঁচার জন্য বিশাল অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন। এই কঠিন উপলব্ধি থেকেই জন্ম নেয় ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ বা ক্ষয়ক্ষতি পূরণের ধারণাটি। রাষ্ট্রীয় কূটনীতির জন্য এই তহবিলের দাবি আদায় করা ছিল এক অসাধ্য সাধন করার মতো বিষয়। উন্নত দেশগুলো কোনোভাবেই এই ফান্ডের ব্যাপারে শুরুতে রাজি হতে চাইছিল না। তাদের মনে এক ধরনের আইনি ভয় ছিল, একবার যদি তারা এই ক্ষতিপূরণ দিতে রাজি হয়, তবে ভবিষ্যতে তাদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার আইনি মামলা দায়ের করা হতে পারে। এই আইনি ভীতি কাটানো এবং একই সাথে তাদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করার জন্য কূটনীতিকদের অত্যন্ত জটিল এবং সূক্ষ্ম এক দড়াবাজির খেলা খেলতে হয়েছে। তাত্ত্বিক আলেকজান্ডার ওয়েন্ট (Alexander Wendt) তাঁর গঠনবাদ (Constructivism) তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থ স্থির কিছু নয়, আলোচনার মাধ্যমে নতুন নতুন ধারণা এবং নিয়মের জন্ম হয় (Wendt, 1999)। ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড’-এর বিষয়টি ঠিক সেভাবেই দীর্ঘ আলোচনার পর আন্তর্জাতিক নিয়মে পরিণত হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে লাগাতার কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ, অকাট্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ উপস্থাপন এবং আন্তর্জাতিক সুশীল সমাজের সাথে জোট বাঁধার মাধ্যমে অবশেষে উন্নত দেশগুলোকে এই ফান্ড গঠনে রাজি করানো সম্ভব হয়েছে। এটি জলবায়ু কূটনীতির ইতিহাসে এক বিশাল এবং যুগান্তকারী অর্জন হিসেবে স্বীকৃত। ফান্ডটি গঠন করা হলেও, সেখানে পর্যাপ্ত টাকা জমা করা এবং সেই টাকা ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর কাছে সহজে পৌঁছে দেওয়ার প্রক্রিয়াটি এখনো বেশ জটিল এবং আমলাতান্ত্রিক। দাতা সংস্থাগুলোর নানা রকম কঠিন শর্তের কারণে এই ফান্ডের আসল সুফল পাওয়া বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। কূটনীতির বর্তমান মনোযোগ তাই এই ফান্ডটি কীভাবে কার্যকর এবং বৈষম্যহীন করা যায়, সেদিকে নিবদ্ধ। এটি মূলত এক চলমান এবং ক্লান্তিকর দরকষাকষির প্রক্রিয়া, যেখানে অসীম ধৈর্য এবং আইনি দক্ষতার কোনো বিকল্প নেই। অভিযোজন কৌশল এবং ভবিষ্যৎ কূটনীতির রূপরেখা একটা সময় ছিল যখন জলবায়ু সম্মেলনে এই বদ্বীপের রাষ্ট্রটি নিজেদের শুধু একজন অসহায় শিকার হিসেবে তুলে ধরত। তারা ভাঙা বাঁধ আর ডুবন্ত গ্রামের ছবি দেখিয়ে বিশ্বের সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা করত। সময়ের সাথে সাথে এই পুরনো কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। রাষ্ট্র এখন আর শুধু কাঁদুনির সুরে কথা বলে না, তারা এখন নিজেদের প্রবল শক্তিতে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প বিশ্ববাসীকে শোনাচ্ছে। এই ঘুরে দাঁড়ানোর প্রক্রিয়ার বৈজ্ঞানিক নাম হলো অভিযোজন (Adaptation)। লবণাক্ত জলেও জন্মায় এমন ধানের জাত উদ্ভাবন করা, উপকূলীয় এলাকায় বিশাল বিশাল সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ করা এবং আগাম সতর্কবার্তা দেওয়ার আধুনিক ব্যবস্থা তৈরি করা – এই সবকিছুই হলো অভিযোজনের সফল উদাহরণ। রাষ্ট্রটি এখন বিশ্বমঞ্চে সগর্বে প্রমাণ করছে যে, তারা কেবল ত্রাণের অপেক্ষায় বসে নেই, তারা নিজেদের সীমিত সম্পদ দিয়ে প্রকৃতির রোষানল মোকাবেলা করার নতুন নতুন উপায় বের করছে। এই সফল এবং বাস্তবমুখী অভিজ্ঞতাগুলো তারা বিশ্বের অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্ত দেশের সাথে নিয়মিত ভাগ করে নিচ্ছে। এই অভিযোজন কৌশলটি ভবিষ্যৎ কূটনীতির জন্য এক বিশাল এবং নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। রাষ্ট্রটি এখন গ্লোবাল সেন্টার অন অ্যাডাপটেশন (GCA)-এর মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আঞ্চলিক কার্যালয় নিজেদের দেশে স্থাপন করেছে। এর ফলে জলবায়ু সংক্রান্ত গবেষণায় তারা এক ধরনের বৈশ্বিক জ্ঞানকেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। আগামী দিনের পৃথিবীতে জলবায়ু কূটনীতি আরও অনেক বেশি প্রযুক্তি এবং অর্থনির্ভর হয়ে উঠবে। কার্বন ট্রেডিং, সবুজ বন্ড এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রযুক্তি হস্তান্তরের মতো বিষয়গুলো নিয়ে আন্তর্জাতিক টেবিলে তুমুল দরকষাকষি চলবে। পরাশক্তিগুলো চাইবে তাদের তৈরি করা সবুজ প্রযুক্তিগুলো অত্যন্ত চড়া দামে উন্নয়নশীল দেশগুলোর কাছে বিক্রি করতে। এই বাণিজ্যিক ফাঁদ এড়িয়ে নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করার জন্য কূটনীতিকদের অর্থনীতি এবং পরিবেশ বিজ্ঞানের এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটাতে হবে। অস্তিত্ব রক্ষার এই নিরন্তর যুদ্ধে কূটনীতি সাধারণ ফোল্ডার বা চুক্তির গণ্ডি পেরিয়ে দেশের প্রতিটি মানুষের জীবন বাঁচানোর এক বাস্তব হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে। প্রকৃতির সাথে মানুষের এই অসম লড়াইয়ে বুদ্ধিভিত্তিক এবং বিজ্ঞানমনস্ক কূটনীতিই হলো টিকে থাকার শেষ এবং সবচেয়ে শক্তিশালী অবলম্বন। রোহিঙ্গা সংকট ও বহুপাক্ষিক কূটনীতি (Rohingya Crisis and Multilateral Diplomacy) মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় বঞ্চনা এবং নাগরিকত্ব হরণের ইতিহাস রাষ্ট্র নামের যন্ত্রটি মানুষের কল্যাণের জন্য তৈরি হলেও, মাঝে মাঝে এই যন্ত্রটি তার নিজের নাগরিকদের জন্যই সবচেয়ে বড় আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বসবাস করে আসা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ইতিহাস মূলত এই রাষ্ট্রীয় বঞ্চনা এবং পদ্ধতিগত শোষণের এক নির্মম আখ্যান। একটি আধুনিক রাষ্ট্র কীভাবে সম্পূর্ণ পরিকল্পিত উপায়ে তার নিজের একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে ধীরে ধীরে অস্তিত্বহীন করে দিতে পারে, তার এমন নিখুঁত উদাহরণ পৃথিবীর ইতিহাসে খুব কমই আছে। আশির দশকের শুরুতেই মিয়ানমারের তৎকালীন সামরিক জান্তা ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনের মাধ্যমে অত্যন্ত সুকৌশলে এই জনগোষ্ঠীর আইনি পরিচয় পুরোপুরি মুছে ফেলে। এই একটি মাত্র আইনের মাধ্যমে লাখ লাখ মানুষ রাতারাতি নিজেদের জন্মভূমিতে ভিনদেশি বা অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যায়। তাত্ত্বিক হানা আরেন্ট (Hannah Arendt) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ দ্য অরিজিনস অফ টোটালিটারিয়ানিজম (The Origins of Totalitarianism)-এ এই ধরনের পরিস্থিতিকে অত্যন্ত ভয়াবহ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁর মতে, মানুষের সবচেয়ে মৌলিক অধিকার হলো ‘অধিকার পাওয়ার অধিকার’, যা কেবল একটি রাষ্ট্রের স্বীকৃত নাগরিক হলেই পাওয়া সম্ভব (Arendt, 1951)। অর্থাৎ, নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার মানে হলো একজন মানুষকে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার ছাতা থেকে চিরতরে বের করে দেওয়া এবং তাকে যেকোনো ধরনের নির্যাতনের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া। রাখাইনের এই জনগোষ্ঠীর সাথে ঠিক এই ভয়াবহ কাজটিই অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় করা হয়েছিল। পরিচয়হীন এই মানুষগুলো শিক্ষা, চিকিৎসা, সম্পত্তি কেনা বা স্বাধীনভাবে চলাফেরার মতো সব ধরনের মৌলিক অধিকার থেকে যুগের পর যুগ ধরে বঞ্চিত থেকেছে। নাগরিকত্ব হরণের এই আইনি প্রক্রিয়ার পর শুরু হয় শারীরিক এবং মনস্তাত্ত্বিক নির্যাতনের এক দীর্ঘ এবং পরিকল্পিত ধারাবাহিকতা। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এবং উগ্র জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলো মিলে এই সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত বিদ্বেষমূলক প্রচারণা চালাতে থাকে। রাষ্ট্রীয় মদদে সাধারণ সংখ্যাগুরু মানুষের মনে এই বিশ্বাস ঢুকিয়ে দেওয়া হয় যে, এই সংখ্যালঘু মানুষগুলো তাদের সংস্কৃতি এবং অর্থনীতির জন্য এক বিশাল হুমকি। সমাজবিজ্ঞানী স্ট্যানলি কোহেন (Stanley Cohen) এই ধরনের রাষ্ট্রীয় প্রচারণাকে নৈতিক আতঙ্ক (Moral Panic) হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন, যেখানে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে সমাজের সব সমস্যার মূল কারণ হিসেবে দাঁড় করানো হয় (Cohen, 1972)। এই নৈতিক আতঙ্কের চূড়ান্ত পরিণতি আমরা দেখতে পাই ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে। মিয়ানমার সেনাবাহিনী অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে রাখাইন রাজ্যে এক ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ শুরু করে, যাকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো জাতিগত নিধন (Ethnic Cleansing) হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হয়, নিরীহ মানুষদের নির্বিচারে হত্যা করা হয়। প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে দশ লাখেরও বেশি মানুষ দুর্গম পাহাড় এবং নদী পার হয়ে প্রতিবেশী বদ্বীপ রাষ্ট্ বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। পৃথিবীর মানচিত্রে এত অল্প সময়ে এত বিপুল সংখ্যক মানুষের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির ঘটনা সত্যিই বিরল। এই বিশাল অমানবিক ট্র্যাজেডি কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছিল না, সম্পূর্ণটাই ছিল একটি সামরিক রাষ্ট্রের ঠান্ডা মাথার রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের ফসল। এই বিপুল সংখ্যক শরণার্থীর ভার প্রতিবেশী বদ্বীপ রাষ্ট্রটির জন্য এক কল্পনাতীত অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সংকটের জন্ম দেয়। একটি ঘনবসতিপূর্ণ এবং উন্নয়নশীল দেশের পক্ষে রাতারাতি এত বিশাল সংখ্যক মানুষের থাকা, খাওয়া এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা করা আক্ষরিক অর্থেই এক অসাধ্য সাধন। তারপরও সীমান্ত খুলে দিয়ে এই অসহায় মানুষগুলোকে আশ্রয় দেওয়ার সিদ্ধান্তটি ছিল সম্পূর্ণ মানবিক। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই মানবিক সিদ্ধান্তের ভূয়সী প্রশংসা করলেও, বাস্তবের রূঢ় জমিনে এই বিপুল জনস্রোতের ভার একা বহন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। লাখ লাখ মানুষের জন্য তড়িঘড়ি করে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, তাদের জন্য বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশনের ব্যবস্থা করা এবং সংক্রামক ব্যাধি ঠেকানোর জন্য বিশাল স্বাস্থ্যসেবার কাঠামো দাঁড় করানো – এসব কিছু করতে গিয়ে আশ্রয়দাতা রাষ্ট্রের নিজস্ব অর্থনীতি এবং প্রশাসনিক কাঠামো চরম চাপের মুখে পড়ে। স্থানীয় বনভূমি উজাড় হয়ে যায়, ফসলি জমি নষ্ট হয় এবং স্থানীয় দিনমজুরদের কাজের সুযোগ মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য অন্য একটি রাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া এই বিশাল বোঝা বহন করা দীর্ঘমেয়াদে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। একারণে শুরু থেকেই এই সংকটের একটি দ্রুত এবং সম্মানজনক সমাধানের জন্য কূটনৈতিক পর্যায়ে মরিয়া চেষ্টা শুরু হয়। দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির সীমাবদ্ধতা এবং আস্থার চরম শূন্যতা যেকোনো আন্তর্জাতিক সংকট সমাধানের প্রথম ধাপ হিসেবে সাধারণত দুই দেশের মধ্যে সরাসরি আলোচনার পথ বেছে নেওয়া হয়। এই শরণার্থী সংকটের শুরুতেও আশ্রয়দাতা রাষ্ট্রটি মিয়ানমারের সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা (Bilateral Negotiation)-এর মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ করে। এর একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও রয়েছে, কারণ এর আগে ১৯৯২ সালেও একবার একই ধরনের শরণার্থী সমস্যা তৈরি হয়েছিল এবং দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমেই অনেককে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়েছিল। সেই পুরনো অভিজ্ঞতার আলোকেই ২০১৭ সালের পর মিয়ানমারের সাথে দ্রুত একটি প্রত্যাবাসন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির কাগজে অনেক সুন্দর সুন্দর কথা লেখা থাকলেও, বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মিয়ানমার শুরু থেকেই চরম টালবাহানা শুরু করে। তারা প্রত্যাবাসনের জন্য এমন সব জটিল এবং অবাস্তব শর্ত জুড়ে দিতে থাকে, যা পূরণ করা কার্যত অসম্ভব। মিয়ানমার সরকারের এই আচরণ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। এটি মূলত তাদের দীর্ঘদিনের ‘দেরি করা এবং অস্বীকার করা’-র এক সুপরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় নীতি। তারা আলোচনার টেবিলে বসে হাসিমুখে ছবি তোলে, চুক্তি স্বাক্ষর করে, কিন্তু দেশে ফিরে সেই চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য বিন্দুমাত্র রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখায় না। দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির এই ব্যর্থতার মূল কারণ হলো দুই দেশের মধ্যকার আস্থার চরম শূন্যতা এবং ক্ষমতার অসম সমীকরণ। মিয়ানমার খুব ভালো করেই জানে যে, আশ্রয়দাতা রাষ্ট্রটি কোনোভাবেই সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে এই সমস্যার সমাধান করতে যাবে না। কারণ সামরিক সংঘাতে জড়ালে এই বদ্বীপ অঞ্চলের উন্নয়নশীল অর্থনীতি পুরোপুরি ধসে পড়বে। এই ভূ-রাজনৈতিক দুর্বলতার সুযোগটিই মিয়ানমারের সামরিক জান্তা পুরোপুরি কাজে লাগায়। গবেষক নেহগিনপাও কিপগেন (Nehginpao Kipgen) তাঁর বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখার জন্য সব সময় একটি কাল্পনিক শত্রুর প্রয়োজন হয় (Kipgen, 2013)। এই সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে সেই শত্রু হিসেবে দাঁড় করিয়ে সামরিক বাহিনী মূলত সংখ্যাগুরু মানুষের সমর্থন আদায় করে নেয়। সুতরাং, দেশের ভেতরের এই রাজনৈতিক সমীকরণ ঠিক না হওয়া পর্যন্ত মিয়ানমার কখনোই স্বেচ্ছায় এই শরণার্থীদের ফেরত নেবে না। দ্বিপাক্ষিক আলোচনার টেবিলে মিয়ানমারের প্রতিনিধিরা মূলত সময়ক্ষেপণ করার জন্যই বসেন, সমস্যা সমাধানের জন্য নয়। তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দেখাতে চান যে তারা সমস্যা সমাধানে আন্তরিক এবং আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। এই কূটচালের মাধ্যমে তারা মূলত আন্তর্জাতিক চাপ কমানোর একটি কৌশল হিসেবে দ্বিপাক্ষিক চুক্তিগুলোকে ব্যবহার করে থাকেন। আশ্রয়দাতা রাষ্ট্রটির নীতিনির্ধারকরা খুব দ্রুতই মিয়ানমারের এই কূটকৌশল বুঝতে সক্ষম হন। তারা উপলব্ধি করেন যে, একটি সামরিক এবং চরম জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রের সাথে কেবল সদিচ্ছার ভিত্তিতে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা চালিয়ে কোনো লাভ হবে না। মিয়ানমারের ওপর যদি কোনো শক্তিশালী আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগ করা না যায়, তবে তারা একজন শরণার্থীকেও ফেরত নেবে না। তাছাড়া, ফিরে যাওয়ার পর এই মানুষগুলোর নিরাপত্তা এবং নাগরিকত্ব ফিরে পাওয়ার কোনো নিশ্চয়তা মিয়ানমার দিতে রাজি হয়নি। নিরাপদ এবং সম্মানজনক পরিবেশ তৈরি না করে কাউকে জোর করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া কোনো সভ্য রাষ্ট্রের পক্ষে সম্ভব নয়। এই চরম অসহায় এবং হতাশাজনক পরিস্থিতিতে দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির সমস্ত পথ মূলত বন্ধ হয়ে যায়। সমস্যাটি আর কেবল দুটি প্রতিবেশী দেশের সীমানা বা সম্পদের বিরোধ নয়, সম্পূর্ণ একটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার এবং মানবিক সংকটে রূপ নেয়। এই রূঢ় বাস্তবতা থেকে এটা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, মিয়ানমারকে আলোচনার টেবিলে সোজা পথে আনার জন্য দ্বিপাক্ষিক প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং অনেক বেশি শক্তিশালী কোনো কূটনৈতিক অস্ত্রের প্রয়োজন। সেই অস্ত্রটির খোঁজেই রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিশাল এবং জটিল গোলকধাঁধায় প্রবেশ করতে হয়। বহুপাক্ষিক কূটনীতির রূপরেখা এবং আন্তর্জাতিক ফোরাম দ্বিপাক্ষিক আলোচনার টেবিলে বারবার প্রতারিত হওয়ার পর আশ্রয়দাতা রাষ্ট্রের সামনে একমাত্র খোলা পথ ছিল পুরো বিষয়টিকে আন্তর্জাতিকীকরণ করা। বিশ্বমঞ্চে এই সমস্যাটিকে তুলে ধরার জন্য বহুপাক্ষিক কূটনীতি (Multilateral Diplomacy)-র আশ্রয় গ্রহণ করা হয়। এর মূল লক্ষ্য ছিল বিশ্বের প্রভাবশালী দেশ এবং জোটগুলোকে এই সংকটের ভয়াবহতা বুঝিয়ে মিয়ানমারের ওপর একটি সম্মিলিত চাপ সৃষ্টি করা। বাংলাদেশ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ, মানবাধিকার কাউন্সিল এবং অন্যান্য বৈশ্বিক ফোরামে অত্যন্ত জোরালোভাবে এই মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র তুলে ধরতে শুরু করে। এই কূটনীতির একটি বড় সুবিধা হলো, এখানে একটি ছোট দেশও অনেকগুলো দেশের সমর্থন নিয়ে বড় কোনো শক্তির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারে। তাত্ত্বিক জন রাগি (John Ruggie) বহুপাক্ষিকতাবাদের আলোচনায় দেখিয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত নিয়মের একটি বেড়াজাল তৈরি করে, যা শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর স্বেচ্ছাচারিতাকে কিছুটা হলেও আটকে রাখতে সক্ষম (Ruggie, 1992)। এই নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ওপর আস্থা রেখেই রাষ্ট্রটি বিশ্বের প্রতিটি দরজায় কড়া নাড়তে শুরু করে। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধান এবং বৈশ্বিক মিডিয়াকে শরণার্থী শিবিরগুলো পরিদর্শনের আমন্ত্রণ জানানো হয়, যাতে তারা নিজেদের চোখে এই অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট দেখতে পারেন। এই কূটনৈতিক প্রচারণার ফলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি বড় ধরনের জনমত তৈরি হতে শুরু করে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন (EU), অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কোঅপারেশন (OIC) থেকে শুরু করে আসিয়ান (ASEAN)-এর মতো আঞ্চলিক জোটগুলোর সাথে প্রতিনিয়ত দেনদরবার চলতে থাকে। উদ্দেশ্য ছিল মিয়ানমারের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং তাদের সামরিক নেতাদের আন্তর্জাতিক ভ্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা। পশ্চিমা দেশগুলো এই মানবিক সংকটে বেশ জোরালোভাবে সাড়া দেয় এবং মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর ওপর নানা রকম অবরোধ আরোপ করতে শুরু করে। কিন্তু আন্তর্জাতিক কূটনীতির ময়দান খুব জটিল এবং হিসাব-নিকাশে পরিপূর্ণ। জাতিসংঘের মতো সর্বোচ্চ ফোরামে গিয়ে রাষ্ট্রটিকে চরম এক কাঠামোগত বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে যখনই মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কোনো কড়া প্রস্তাব আনার চেষ্টা করা হয়, তখনই পরাশক্তিগুলো তাদের নিজেদের স্বার্থের কারণে সেই প্রস্তাবে বাধা দেয়। বিশ্বরাজনীতির এই নির্মম খেলা প্রমাণ করে দেয় যে, লাখ লাখ মানুষের জীবন-মরণের চেয়েও পরাশক্তিগুলোর কাছে তাদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বহুপাক্ষিক ফোরামগুলোতে মিয়ানমারের পক্ষে দাঁড়িয়ে থাকা এই পরাশক্তিগুলোর ভেটো ক্ষমতা মূলত যেকোনো কার্যকর আন্তর্জাতিক পদক্ষেপকে পঙ্গু করে দেয়। প্রখ্যাত তাত্ত্বিক কেনেথ ওয়াল্টজ (Kenneth Waltz) তাঁর ম্যান, দ্য স্টেট, অ্যান্ড ওয়ার (Man, the State, and War) বইয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এই নৈরাজ্যকর কাঠামোর কথা খুব সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেছেন (Waltz, 2001)। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় কোনো কেন্দ্রীয় শক্তি না থাকায় পরাশক্তিগুলো মূলত নিজেদের প্রভাব বলয় রক্ষার জন্যই কাজ করে। এই শরণার্থী সংকটের ক্ষেত্রেও ঠিক একই ঘটনা ঘটে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো গালভরা বিবৃতি দেয়, সাধারণ পরিষদে প্রস্তাব পাস হয়, কিন্তু মিয়ানমার সরকারের ওপর এমন কোনো শক্ত চাপ তৈরি হয় না যা তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে বাধ্য করতে পারে। বহুপাক্ষিক কূটনীতি এই সমস্যাটিকে বিশ্ববাসীর নজরে আনতে পুরোপুরি সফল হলেও, চূড়ান্ত সমাধানের ক্ষেত্রে তা এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক স্থবিরতার শিকার হয়। তারপরও হাল ছেড়ে না দিয়ে বিশ্বের সমমনা দেশগুলোকে নিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদী এবং লাগাতার কূটনৈতিক চাপ বজায় রাখার চেষ্টা অব্যাহত থাকে, কারণ এই চাপের অভাবেই মিয়ানমার পার পেয়ে যাওয়ার সাহস পায়। ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ এবং পরাশক্তির স্বার্থের খেলা এই সংকটটি কেন সহজে সমাধান হচ্ছে না, তা বুঝতে হলে মিয়ানমারের মানচিত্র এবং এর ভেতরের প্রাকৃতিক সম্পদের দিকে তাকাতে হবে। মিয়ানমার মূলত দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সেতু হিসেবে কাজ করে। এর ভূগর্ভে রয়েছে বিপুল পরিমাণ তেল, গ্যাস এবং মূল্যবান খনিজ সম্পদ। বর্তমান বিশ্বের উঠতি পরাশক্তিগুলো এই বিশাল সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য মিয়ানমারের সাথে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে চলছে। চীন তার বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায় রাখাইন রাজ্যে কিয়াউকপিউ গভীর সমুদ্রবন্দর এবং অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণ করছে। এই বন্দরটি চীনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর মাধ্যমে তারা মালাক্কা প্রণালী এড়িয়ে সরাসরি ভারত মহাসাগরে প্রবেশ করার একটি বিকল্প পথ তৈরি করতে পারছে। অন্যদিকে প্রতিবেশী ভারতও তাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সাথে যোগাযোগের জন্য কালাদান মাল্টি-মোডাল ট্রানজিট ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্ট নামে একটি বিশাল প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এই বৃহৎ শক্তিগুলোর ভূ-কৌশলগত স্বার্থ (Geostrategic Interest) এতই প্রবল যে, তারা মানবাধিকার বা শরণার্থী সংকটের মতো বিষয়গুলো নিয়ে মিয়ানমারকে কোনোভাবেই অসন্তুষ্ট করতে চায় না। পরাশক্তিগুলোর এই নীরবতা এবং পরোক্ষ সমর্থন মিয়ানমারের সামরিক জান্তাকে এক ধরনের বেপরোয়া সাহস জুগিয়েছে। তারা জানে যে, জাতিসংঘে যাই হোক না কেন, তাদের ছাতা ধরার জন্য শক্তিশালী বন্ধুরা প্রস্তুত আছে। তাত্ত্বিক মাওং জার্নি (Maung Zarni) এবং অ্যালিস কাউলি (Alice Cowley) তাঁদের গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এই অর্থনৈতিক এবং কৌশলগত স্বার্থপরতাই মূলত মিয়ানমারকে বছরের পর বছর ধরে এই ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন চালিয়ে যাওয়ার বৈধতা দিয়েছে (Zarni & Cowley, 2014)। বদ্বীপ অঞ্চলের রাষ্ট্রটির জন্য এই সমীকরণ অত্যন্ত পীড়াদায়ক। যে দেশগুলো এই শরণার্থী সংকটে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারত, তারা সবাই মিয়ানমারের সাথে বিশাল বিশাল বাণিজ্যিক চুক্তিতে আবদ্ধ। আশ্রয়দাতা রাষ্ট্রটিকে এখন এই শক্তিশালী এবং স্বার্থান্ধ পরাশক্তিগুলোর সাথে অত্যন্ত সাবধানে দরকষাকষি করতে হচ্ছে। তারা সরাসরি কোনো পরাশক্তির বিরোধিতা করতে পারছে না, কারণ দেশের নিজস্ব অর্থনীতির চাকা সচল রাখার জন্য ওই একই পরাশক্তিগুলোর বিনিয়োগ এবং সাহায্য সমানভাবে অপরিহার্য। এটি কূটনীতির দাবার বোর্ডে এক চরম অস্বস্তিকর এবং উভয়সংকটে পড়ার মতো পরিস্থিতি। পশ্চিমা বিশ্ব অনেক বড় বড় মানবাধিকারের কথা বললেও তাদের পদক্ষেপগুলো মূলত কিছু নির্দিষ্ট সামরিক কর্মকর্তার ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা বা সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। মিয়ানমারের সাথে তাদের অনেক বড় বড় বহুজাতিক কোম্পানির ব্যবসা ঠিকই চলমান থাকে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এই দ্বিমুখী নীতিকে ভারসাম্যের রাজনীতি (Balance of Power Politics) দিয়ে খুব সহজেই ব্যাখ্যা করা যায়। পশ্চিমা দেশগুলো ভয় পায় যে, তারা যদি মিয়ানমারের ওপর খুব বেশি চাপ প্রয়োগ করে, তবে মিয়ানমার পুরোপুরি চীনের বলয়ে ঢুকে যাবে। এই ভয়ের কারণে তারা মিয়ানমারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার মতো কোনো চরম পদক্ষেপ নিতে পিছপা হয়। এই সব ভূ-রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের মাঝখানে পড়ে দশ লাখেরও বেশি নিরাশ্রয় মানুষের জীবন আক্ষরিক অর্থেই জিম্মি হয়ে আছে। আশ্রয়দাতা রাষ্ট্রটির কূটনীতিকদের প্রতিনিয়ত এই পরাশক্তিগুলোর রাজধানীগুলোতে ঘুরে ঘুরে তাদের বোঝানোর চেষ্টা করতে হয় যে, এই সংকট দীর্ঘায়িত হলে পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতা নষ্ট হবে, যা শেষ পর্যন্ত ওই পরাশক্তিগুলোর বাণিজ্যিক স্বার্থকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে। ভূ-রাজনীতির এই নির্মম এবং স্বার্থপর গোলকধাঁধায় মানবিকতার চেয়ে অর্থনীতির পাল্লাই সব সময় ভারী থাকে। আন্তর্জাতিক বিচারালয় এবং আইনি কূটনীতির প্রয়োগ রাজনৈতিক এবং ভূ-রাজনৈতিক সব রাস্তা যখন প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম, তখন আশ্রয়দাতা রাষ্ট্রটি সম্পূর্ণ একটি নতুন পথের সন্ধান করে। এই নতুন পথটি হলো আন্তর্জাতিক আইনের মাধ্যমে মিয়ানমারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো। অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কোঅপারেশন (OIC)-এর সমর্থন নিয়ে পশ্চিম আফ্রিকার একটি ছোট্ট দেশ গাম্বিয়া মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতে (ICJ) একটি ঐতিহাসিক মামলা দায়ের করে। এই মামলার মূল অভিযোগ ছিল, মিয়ানমার তার নিজস্ব ভূখণ্ডে ১৯৪৮ সালের জেনোসাইড কনভেনশন বা গণহত্যা সনদ লঙ্ঘন করেছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিমণ্ডলে এই পদক্ষেপটি আইনি কূটনীতি (Legal Diplomacy)-র এক অনবদ্য এবং অত্যন্ত সাহসী উদাহরণ। তাত্ত্বিক উইলিয়াম শাবাস (William Schabas) তাঁর জেনোসাইড ইন ইন্টারন্যাশনাল ল (Genocide in International Law) বইয়ে দেখিয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়াগুলো অনেক ধীরগতির হলেও, এগুলো রাষ্ট্রগুলোর অপকর্মের একটি স্থায়ী এবং দালিলিক ইতিহাস তৈরি করে (Schabas, 2000)। এই মামলা দায়ের হওয়ার পর মিয়ানমার প্রথমবারের মতো আইনিভাবে পুরো বিশ্ব সম্প্রদায়ের সামনে তাদের কাজের জবাবদিহি করতে বাধ্য হয়, যা রাজনৈতিক কূটনীতি দিয়ে কোনোদিন সম্ভব হতো না। আন্তর্জাতিক আদালতে এই আইনি লড়াইয়ের প্রাথমিক ফলাফল ছিল রীতিমতো চমকপ্রদ। আদালত মিয়ানমারের প্রতি একটি অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ জারি করে, যেখানে তাদের নিজস্ব ভূখণ্ডে থাকা বাকি সংখ্যালঘু মানুষগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। এই আদেশটি আইনিভাবে বাধ্যতামূলক হওয়ায় মিয়ানমার এক ধরনের প্রবল আন্তর্জাতিক আইনি চাপের মধ্যে পড়ে যায়। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বা আইসিসি (ICC)-ও এই জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির ঘটনার তদন্ত শুরু করে। এই আইনি পদক্ষেপগুলো মিয়ানমারের সামরিক নেতৃত্বের মনে এক ধরনের চাপা আতঙ্ক তৈরি করতে সক্ষম হয়। তারা বুঝতে পারে যে, দেশের ভেতরে তারা যতই ক্ষমতাশালী হোক না কেন, আন্তর্জাতিক সীমানার বাইরে তাদের গ্রেপ্তার হওয়ার বা বিচারের মুখোমুখি হওয়ার একটি বাস্তব শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই আইনি কূটনীতি কোনো রাতারাতি জাদুর মতো কাজ করে শরণার্থীদের ফেরত পাঠাতে পারবে না ঠিকই, কিন্তু এটি মিয়ানমারের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে এতটাই ধুলিসাৎ করে দিয়েছে যে, কোনো সভ্য দেশের পক্ষে আর প্রকাশ্যে তাদের সমর্থন করা সম্ভব নয়। এই আইনি লড়াইয়ের একটি বড় মনস্তাত্ত্বিক দিক রয়েছে। যুগের পর যুগ ধরে নির্যাতিত হওয়া একটি জনগোষ্ঠী প্রথমবারের মতো দেখতে পায় যে, তাদের ওপর হওয়া অন্যায়ের বিচার করার জন্য পৃথিবীর সর্বোচ্চ আদালতে শুনানি চলছে। এটি তাদের মনে এক বিশাল আশার সঞ্চার করে। অন্যদিকে, আশ্রয়দাতা রাষ্ট্রটিও বিশ্বমঞ্চে প্রমাণ করতে সক্ষম হয় যে, তারা কেবল মৌখিক অভিযোগ করছে না, তাদের দাবির পেছনে আন্তর্জাতিক আইনের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক আইনের একটি বড় দুর্বলতা হলো এর নিজস্ব কোনো পুলিশ বা সামরিক বাহিনী নেই, যা দিয়ে রায় কার্যকর করা যায়। আদালত রায় দিলেও সেই রায় বাস্তবায়নের জন্য শেষ পর্যন্ত জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ওপরই নির্ভর করতে হয়, যেখানে আবার সেই পুরোনো পরাশক্তির ভেটো ক্ষমতা বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তারপরও আইনি কূটনীতির এই পথ ধরে হাঁটা ছাড়া আর কোনো সম্মানজনক এবং নিয়মতান্ত্রিক বিকল্প খোলা ছিল না। এই আইনি দলিলগুলো আগামী দিনের যেকোনো রাজনৈতিক দরকষাকষিতে মিয়ানমারকে চাপে রাখার জন্য সবচেয়ে বড় এবং কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে। আর্থ-সামাজিক চাপ এবং অ-প্রথাগত নিরাপত্তা হুমকি দশ লাখেরও বেশি মানুষের এই বিশাল শিবিরগুলো কেবল কিছু তাবু বা অস্থায়ী ঘরের সমষ্টি নয়। এটি আক্ষরিক অর্থেই একটি বিশাল শহরের মতো, যেখানে মানুষের দৈনন্দিন চাহিদা এবং বেঁচে থাকার সংগ্রাম প্রতিনিয়ত নতুন নতুন সংকটের জন্ম দিচ্ছে। এত বিপুল সংখ্যক মানুষের জন্য রান্নার জ্বালানি সংগ্রহ করতে গিয়ে আশেপাশের পাহাড় এবং বনভূমি প্রায় সম্পূর্ণ উজাড় হয়ে গেছে। বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হওয়ায় পরিবেশের এক ভয়াবহ এবং অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হয়েছে। অর্থনীতিবিদ এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা এই ধরনের পরিস্থিতিকে রাষ্ট্রের জন্য এক ভয়াবহ অ-প্রথাগত নিরাপত্তা (Non-traditional Security) হুমকি হিসেবে বিবেচনা করেন। গবেষক আহসান উল্লাহ (Ahsan Ullah) তাঁর বিভিন্ন গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, বিপুল সংখ্যক শরণার্থীর দীর্ঘমেয়াদী উপস্থিতি কীভাবে স্থানীয় অর্থনীতির কাঠামোকে ভেঙে ফেলে এবং সামাজিক অস্থিরতার জন্ম দেয় (Ullah, 2011). স্থানীয় বাজারে জিনিসপত্রের দাম বহুগুণ বেড়ে গেছে, অথচ সস্তা শ্রমের সহজলভ্যতার কারণে সাধারণ মানুষের মজুরি অস্বাভাবিক হারে কমে গেছে। এই অর্থনৈতিক টানাপোড়েন স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং শরণার্থীদের মধ্যে এক ধরনের স্থায়ী মনস্তাত্ত্বিক বিভাজন এবং চাপা ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। এই বিশাল এবং ঘনবসতিপূর্ণ শিবিরগুলোতে মানুষের বেঁচে থাকার ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা থাকলেও ভবিষ্যতের কোনো আশা নেই। তরুণ প্রজন্মের সামনে লেখাপড়া বা কাজের কোনো বৈধ সুযোগ না থাকায় তারা খুব সহজেই হতাশার শিকার হচ্ছে। এই হতাশার সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন অপরাধী চক্র শিবিরগুলোতে তাদের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে। মিয়ানমার থেকে আসা ইয়াবা নামের ভয়াবহ মাদকের চোরাচালান এই শিবিরগুলোকে কেন্দ্র করেই মূলত পরিচালিত হচ্ছে। মাদকের এই বিশাল অবৈধ ব্যবসার টাকা দিয়ে অনেক ছোট ছোট সশস্ত্র গোষ্ঠী গড়ে উঠেছে, যারা নিজেদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের জন্য প্রতিনিয়ত রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে। রাতের অন্ধকারে শিবিরগুলোতে অপহরণ, খুন এবং চাঁদাবাজির মতো ঘটনাগুলো নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানব পাচারকারীরা অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে এই অসহায় মানুষগুলোকে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া বা থাইল্যান্ডে পাচার করার জন্য ফাঁদ পাতছে। এই ধরনের সংঘবদ্ধ অপরাধগুলো কেবল শিবিরের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, তা ধীরে ধীরে পুরো দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য এক বিশাল হুমকি হয়ে দেখা দিচ্ছে। সবচেয়ে বড় ভয়ের জায়গাটি হলো চরমপন্থা বা উগ্রবাদের উত্থান। যুগের পর যুগ বঞ্চনার শিকার হওয়া এবং কোনো আশার আলো না দেখা একটি জনগোষ্ঠী খুব সহজেই উগ্রবাদী মতাদর্শের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন উগ্রবাদী গোষ্ঠী এই শিবিরগুলোকে তাদের কর্মী সংগ্রহের উর্বর ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করতে পারে। এই ধরনের কোনো ঘটনা ঘটলে তা কেবল আশ্রয়দাতা রাষ্ট্রের জন্যই নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য এক ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে। রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে তাই প্রতিনিয়ত এই শিবিরগুলোর ওপর কড়া নজরদারি রাখতে হয়। তাত্ত্বিক পরিভাষায় একে মানব নিরাপত্তা (Human Security) সংকট বলা হয়, যেখানে মানুষের পেটের ক্ষুধা এবং আইনি সুরক্ষার অভাব শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের কাঠামোগত নিরাপত্তার মূলে কুঠারাঘাত করে। এই অ-প্রথাগত নিরাপত্তা হুমকিগুলো সামাল দিতে গিয়ে রাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ অর্থ এবং প্রশাসনিক শক্তি ব্যয় হচ্ছে, যা একটি উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতির জন্য আক্ষরিক অর্থেই এক রক্তক্ষরণ। মানবিক কূটনীতির ভবিষ্যৎ এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রত্যাবাসন শরণার্থী সংকটের প্রথম দিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিপুল পরিমাণ অর্থ এবং ত্রাণ সহায়তা নিয়ে এগিয়ে এসেছিল। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্তে নতুন নতুন যুদ্ধ এবং সংকট তৈরি হওয়ায় দাতাগোষ্ঠীর মনোযোগ অন্যদিকে সরে যাচ্ছে। ইউক্রেন বা ফিলিস্তিনের মতো নতুন সংকটগুলো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম দখল করে নেওয়ায় এই মানবিক বিপর্যয়টি ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো থেকে আসা ফান্ডের পরিমাণ প্রতি বছর আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিভাষায় এই পরিস্থিতিকে ডোনার ফ্যাটিগ (Donor Fatigue) বা দাতাদের ক্লান্তি বলা হয়। ফান্ডের এই ঘাটতি মেটাতে গিয়ে আশ্রয়দাতা রাষ্ট্রটিকে বাধ্য হয়ে নিজেদের কোষাগার থেকে বিশাল অঙ্কের টাকা খরচ করতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে কোনোভাবেই টেকসই নয়। দেশের ভেতরের সাধারণ মানুষ প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে, কেন তারা নিজেদের ট্যাক্সের টাকা দিয়ে অন্য দেশের নাগরিকদের বছরের পর বছর ভরণপোষণ করবে? এই অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ সামাল দিয়ে আন্তর্জাতিক ফান্ডের প্রবাহ সচল রাখার জন্য মানবিক কূটনীতি (Humanitarian Diplomacy)-কে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন করতে হচ্ছে। এই মানবিক কূটনীতির একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিশ্ব সম্প্রদায়কে এটা বোঝানো যে, কেবল ত্রাণ দেওয়াটাই এই সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। অনেক আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থা (NGO) চায় এই মানুষগুলো এখানেই থেকে যাক এবং তারা বছরের পর বছর ধরে তাদের ত্রাণ কার্যক্রম চালিয়ে যাক। কিন্তু রাষ্ট্রীয় নীতি অত্যন্ত পরিষ্কার – এই মানুষগুলোকে অবশ্যই সম্মান এবং নাগরিকত্ব নিয়ে তাদের নিজ দেশে ফিরে যেতে হবে। স্থানীয়ভাবে এদের একীভূত করার বা ইনটিগ্রেট করার কোনো সুযোগ বা রাজনৈতিক সদিচ্ছা এই রাষ্ট্রের নেই। এই বার্তাটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে খুব শক্তভাবে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। সাময়িক চাপ কমানোর জন্য ভাসানচরের মতো একটি সম্পূর্ণ নতুন এবং উন্নত সুবিধাসম্পন্ন দ্বীপে লক্ষাধিক মানুষকে স্থানান্তর করা হয়েছে। এটি মূলত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে একটি ইতিবাচক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা যে, রাষ্ট্র তার সাধ্যের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে এই মানুষদের মানবিক সহায়তা প্রদান করছে। কিন্তু এই সহায়তা কোনোভাবেই দীর্ঘমেয়াদী বন্দোবস্ত নয়। এই চরম এবং জটিল সংকটের চূড়ান্ত সমাধান মূলত মিয়ানমারের ভেতরেই নিহিত। রাখাইন রাজ্যে যদি একটি শান্ত এবং নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা না যায়, তবে কোনো আইনি বা কূটনৈতিক চাপ দিয়েই এই মানুষগুলোকে সেখানে ফেরত পাঠানো সম্ভব হবে না। মিয়ানমারের ভেতরের বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে চলমান সশস্ত্র গৃহযুদ্ধ এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে আরও অনেক বেশি অনিশ্চিত করে তুলেছে। তারপরও হতাশার কাছে আত্মসমর্পণ করার কোনো সুযোগ নেই। বহুপাক্ষিক কূটনীতির প্রতিটি দরজায় কড়া নাড়া অব্যাহত রাখতে হবে, মিয়ানমারের ওপর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবরোধ কঠোর করার জন্য দেনদরবার চালিয়ে যেতে হবে। এই দশ লাখ মানুষের ভাগ্য কেবল একটি মানবিক প্রশ্ন নয়, এটি বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার বিবেক এবং আন্তর্জাতিক আইনের কার্যকারিতার এক চরম পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি ব্যর্থ হয়, তবে তা সারা বিশ্বের অন্যান্য স্বৈরাচারী রাষ্ট্রগুলোকেও একই ধরনের জাতিগত নিধন চালানোর এক ভয়ংকর সবুজ সংকেত দিয়ে দেবে। তাই যেকোনো মূল্যে এই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করাটা কেবল বদ্বীপের এই রাষ্ট্রটির জন্যই নয়, পুরো সভ্য পৃথিবীর জন্যই অপরিহার্য। উপসংহার একটি রাষ্ট্রের পথচলা কখনো মসৃণ হয় না, ইতিহাসের পাতা উল্টালে কোথাও এমন সহজ যাত্রার সাক্ষ্য মেলে না। পৃথিবীর মানচিত্রের একটি ছোট বদ্বীপে টিকে থাকার জন্য যে পরিমাণ প্রজ্ঞা, সতর্কতা এবং দূরদৃষ্টির প্রয়োজন, তা একটি চলমান দাবা খেলার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এই নিষ্ঠুর ময়দানে কেউ কাউকে বিনাযুদ্ধে এক ইঞ্চি জায়গাও ছেড়ে দেয় না, নিজের জায়গাটি নিজের যোগ্যতায়, দক্ষতায় এবং কূটনীতির জোরে আদায় করে নিতে হয়। আমরা এই দীর্ঘ আলোচনায় দেখেছি কীভাবে একটি সদ্য স্বাধীন দেশ, যার অর্থনীতি ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত এবং ভবিষ্যৎ ছিল ঘোর অনিশ্চিত, সে শূন্য থেকে শুরু করে আজ বিশ্বের অন্যতম জটিল ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের (Geopolitical equation) কেন্দ্রবিন্দুতে এসে দাঁড়িয়েছে। এটি কোনো জাদুকরী মন্ত্রের ফল নয়, বরং এটি হলো নিরন্তর টিকে থাকার এক অবিশ্বাস্য রাষ্ট্রীয় আখ্যান। পররাষ্ট্রনীতি (Foreign Policy) আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ নয় যে, এটি ঘষার সাথে সাথে রাতারাতি সব আন্তর্জাতিক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। এটি হলো ক্রমাগত দরকষাকষি, নিজের অবস্থান থেকে কৌশলগত কারণে কিছুটা ছাড় দেওয়া এবং বিনিময়ে দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থ আদায়ের এক নীরব যুদ্ধ। এই যুদ্ধে অস্ত্রের ঝনঝনানি নেই, বারুদের গন্ধ নেই, কিন্তু আছে মস্তিষ্কের চরম ও চূড়ান্ত ব্যবহার। কখনো বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর রেষারেষির মাঝে অত্যন্ত সন্তর্পণে ভারসাম্য রক্ষা (Balancing act) করতে হয়, আবার কখনো বা বিশাল প্রতিবেশীর চোখরাঙানি উপেক্ষা করে নিজের মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানোর সাহস দেখাতে হয়। একটি ছোট বা মাঝারি আকারের রাষ্ট্রের জন্য এই কাজগুলো মোটেও সহজ নয়। পদে পদে থাকে খাদের কিনারে ছিটকে পড়ার ভয়, থাকে ভুল পদক্ষেপে সবকিছু হারানোর শঙ্কা। এই যে অনন্ত যাত্রা, এর কোনো শেষ নেই, কোনো চূড়ান্ত গন্তব্যও নেই। একটি রাষ্ট্র যখন কোনো একটি কূটনৈতিক সংকট পার করে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে, পরক্ষণেই দেখা যায় নতুন কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত সংকট দরজায় কড়া নাড়ছে। যতদিন একটি রাষ্ট্র মানচিত্রে তার সার্বভৌম অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখবে, ততদিন তাকে এই কূটনীতির জটিল খেলা খেলে যেতেই হবে। আগামী দিনের পৃথিবী হয়তো আরও অনেক বেশি রূঢ়, স্বার্থপর এবং জটিল হবে। অর্থনৈতিক কূটনীতি (Economic diplomacy) এবং পরিবেশগত নিরাপত্তার (Environmental security) মতো বিষয়গুলো সামনের দিনগুলোতে অস্তিত্ব রক্ষার প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠবে। পরাশক্তিগুলোর মেরুকরণ আরও দ্রুত বদলাবে, নতুন নতুন জোট তৈরি হবে, আর সেই পরিবর্তনশীল পৃথিবীতে নিজের শেকড় শক্ত রাখাটাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। পরিশেষে বলা যায়, বর্তমান বিশ্বে কোনো রাষ্ট্রই সম্পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। কিন্তু বিশ্বায়নের এই যুগে পারস্পরিক নির্ভরতা যেন কোনোভাবেই পরাধীনতায় বা অন্ধ অনুকরণে রূপ না নেয়, সেদিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখাই হলো সফল কূটনীতির মূল কথা। সময়ের সাথে সাথে কাজের কৌশল বদলাবে, মিত্র বদলাবে, অগ্রাধিকার বদলাবে, কিন্তু অপরিবর্তিত থাকবে একটি মাত্র বিষয় – রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ জাতীয় স্বার্থ (Supreme National Interest)। এই স্বার্থকে ধ্রুবতারা মেনে, বাস্তবতার রুক্ষ জমিনে শক্ত করে পা রেখে যে রাষ্ট্র সামনের দিকে এগোতে পারবে, মানচিত্রের বুকে সগৌরবে মাথা উঁচু করে টিকে থাকার অধিকার কেবল তারই আছে। এই ভূখণ্ডের আগামী দিনের সফলতা নির্ভর করছে সেই নির্মোহ কূটনৈতিক প্রজ্ঞা এবং অবিচল দূরদৃষ্টির ওপর।